Vidyasagar meets Ramakrishna: Two Remarkable Minds | Robbar
Robbar
  • ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঈশ্বর এবং এক সাধক

১৮৮২-র ৫ আগস্ট থেকে ঝাড়া একমাস ওই মানুষটা, দ্যাট রিমার্কেবল ম্যান, আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এবং আজ ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৮৮২; আমার ৬২তম জন্মদিনে আমি আক্রান্ত অস্তিত্বের সংকটে। আমি কে? আমি কী? আমি ঠিক জানি না। সব গুলিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন দক্ষিণেশ্বরের সেই পূজারী ব্রাহ্মণ, এক মাস আগে। আমার এই বাদুড়বাগানের বাড়িতে। কলকাতার সবাই তাঁকে চেনেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস নামে।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ১৮:৪৮   
Facebook WhatsApp Messenger

১১০.

আজ ১৮৮২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। কাল ছিল আমার ৬২-তম জন্মদিন। আমার জন্মদিন আমার কাছে একেবারেই বিশেষ কোনও দিন নয়। তবে শহরের কারও কারও কাছে আমার জন্মদিন ইতিমধ্যেই বিশেষ একটি দিন হিসেবে গজিয়ে উঠতে শুরু করেছে। এই ব্যাপারে আমি কিন্তু কিছুটা উদ্বিগ্ন। বেশ বুঝতে পারছি আমি একজন বরেণ্য ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছি। এই অহং আমি বহন করে বেড়াতে চাই না। আবার ফেলে দিতেও তো পারি না। ক’দিন আগেই, আমার সুহৃদ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র জ্যোতি, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, আমাকে একটি সভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ধনীপুত্রের খেয়াল, ‘সারস্বত সমাজ’ না কি একটা তৈরি করে আমার ঘাড়ে ভার চাপাতে চেয়েছিল। আমি আমার এই লেখার টেবিলে বসে অনেক ভাবলুম, কী করা যায়! একটা শব্দ নিয়ে বিশেষ চিন্তা করলুম। টু ইউজ ইট অর নট টু ইউজ ইট। তারপর দিলুম লিখে সেই শব্দটাই মনের মধ্যে নিজের সম্বন্ধে যে শব্দ ঝিম মেরে আছে: আমাদের মতো লোককে পরিত্যাগ করো। হোমরা-চোমরাদের লইয়া কোনও কাজ হইবে না।

zoom
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

এই হোমরা-চোমরার মনের শান্তি নষ্ট করেছে, গত একমাস ধরে, এক মূর্খ সাধক। তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল এই বাড়িতে, অর্থাৎ আমার বাড়িতে, এই ঘরে, এই লেখার টেবিলটায় মুখোমুখি। সে আমার থেকে বয়সে বেশ ছোট, ১৫-১৬ বছরের তফাত। আমি দেখা করতে চাইনি। সাধু-সন্ন্যাসীদের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র টান নেই। তার মূল কারণ একটাই। ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না ঈশ্বরচন্দ্র। কিন্তু দ্যাট ম্যান, আ রিমারকেবল ম্যান, আমাকে নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে। আমি কী? আমি কে? বিশ্বাসী? না অবিশ্বাসী? নাস্তিক? না আস্তিক? ইনফিডেল? স্কেপটিক? অ্যাগনস্টিক? নাকি আপাদমস্তক অনীশ? কোথায় আন্ডারলাইন করব? এতদিন তো জেনেছি আমি তেমনভাবে ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। কেননা ঈশ্বর কোনও কাজের নয়। যা করেছি। নিজে করেছি। আর কম তো করিনি কিছু। কোথা থেকে কোথায়? সারা পথ আমি একা। ভগবান কোথায়? থাকলেও তাঁকে প্রত্যহ স্মরণ করি না। পুজো করা তো দূরের কথা। তিনি আছেন কি নেই, এসব ভেবে দেখার আমার সময় নেই। আমার বন্ধু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে এই নিয়ে তো আমার মূল অমিল। ‘ব্রহ্ম ব্রহ্ম’ করে হিমালয়ে গিয়ে জীবন কাটাচ্ছে প্রজাদের খাজনার অর্থে। ফান্ডামেন্টালি অ্যান এসকেপিস্ট। আমাদের চারধারে এত সমস্যা। কিচ্ছু যায় আসে না দেবেন্দ্রর। পাশে এসে দাঁড়াতে তো পারত! প্রায় একেবারে এক বয়সি আমরা। আমার তো ১৮২০। আর যতদূর জানি, ওর জন্ম ১৮১৭। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মে জীবনটা নষ্ট করল। আর তার মূলে ওই ব্রহ্ম। কিন্তু এই ৬২ বছর বয়সে এ আমার কী হল? আমি নিজেকে এই প্রথম প্রশ্ন করতে বাধ্য হলুম, আমি সত্যিই নাস্তিক না আস্তিক?

zoom
ঈশ্বরচন্দ্রের হস্তাক্ষর

এ কথা ঠিক, আমি পত্রের শীর্ষে ‘শ্রীহরি’ লিখি। কিংবা ‘শ্রীদুর্গা’। ওটা তো অধিকাংশ বাঙালির মতোই, আমার মুদ্রাদোষ। আবার একথাও ঠিক, আমি গলায় পইতে ধারণ করি। ওটা তো সংস্কার। এবং আমার জীবনচর্চা ও সামাজিক পরিচয়ের অঙ্গ। একটা ব্যাপার আমার কানে এসেছে। দেবেন্দ্রর বড় ছেলে দ্বিজেন্দ্রনাথ আমার সম্বন্ধে একটা কথা বলে বেড়াচ্ছে। বলছে, বিদ্যাসাগর ওই একরমের নাস্তিক, যাকে বলে ‘অজ্ঞেয়বাদী’। এই অবধি আমি অ্যাকসেপ্ট করছি। পরের বাক্যটির জন্য আমি দ্বিজেন্দ্রকে আজকাল দেখেও চিনতে পারি না। ও বলেছে, এই অজ্ঞেয়বাদীদের সে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। দ্বিজেন্দ্রকে তাচ্ছিল্য করে নয়, ওকে করুণা করে ওর সহ্যশক্তিকে আমি চ্যালেঞ্জ করি না।

zoom
কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য

আমাকে আজকাল অনেকেই সহ্য করতে পারে না। এই যেমন কৃষ্ণকমল। কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য। রামজয় তর্কালঙ্কারের পুত্র। সংস্কৃত কলেজে আমার ছাত্র ছিল। তবে বাপের লাইনে গেল না। প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়ে দর্শন পড়ল। এবং পজিটিভিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এখন নাস্তিকদের মাতব্বর হয়েছে। সেদিনের কমল, আমার ছাত্র, আমার সম্বন্ধে লিখেছে– সাহিত্যক্ষেত্রে বিদ্যাসাগর তাঁহার রাজতক্তার নিকট আর কাহারও আসন হইতে পারে, একথা কল্পনা করিতেও পারেন না। তাঁহার এই লিটারারি জেলাসি সম্বন্ধে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। বিদ্যাসাগরের আরও একটা প্রধান দোষ ‘বামুনপণ্ডিতি’ ভাব! আমার মধ্যে বামুনপণ্ডিতিভাব? কমল বলেছে, ওপর থেকে বোঝবার উপায় নেই। কিন্তু আমার মধ্যে সংকীর্ণতার চোরাস্রোত বইছে। আর আমার সাহিত্যিক ঈর্ষা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা এতই যে, কমল ইংরেজিতে লিখেছে, আমি সিংহাসনের পাশে কোনও ভাইয়ের আবির্ভাব ভাবতেও পারি না। একটা কথা এই লেখার টেবিলে বসে স্বীকার করছি, আমি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: আমি নিজেকে সত্যিই একজন হোমরা-চোমরা বলে ভাবতে শুরু করেছি। আমার কাজের ফিরিস্তি একবার শুনুন। আর আমার অতি সামান্য ব্যাকগ্রাউন্ডটা ভাবার চেষ্টা করুন। তাহলে বুঝবেন আমার লড়াইটা। সুতরাং আমার মধ্যে দেখা দিল অহংকার। উচিত ছিল না। কিন্তু মানুষী দুর্বলতা। আমি কন্ট্রোল করতে গিয়ে পারিনি। দু’-একটা উদাহরণ দিই। একদিন এসব কথা আর কেউ মনে রাখবে না। তবু বলে যাচ্ছি। আমার জন্মদিনের স্বীকারোক্তি: প্রতিষ্ঠা হল ‘ভারতসভা’। প্রতিষ্ঠা করলেন শিবনাথ শাস্ত্রী। সে অবিশ্যি আসলে চ্যাঙরিপোতা গ্রামের শিবনাথ ভট্টাচার্য। সংস্কৃত কলেজ থেকে সংস্কৃতে এম.এ. পাশ করে ‘শাস্ত্রী’ উপাধি পেল। তারপর হঠাৎ ব্রাহ্ম হল। তখন তো ব্রাহ্ম ইন্টেলেকচুয়াল হওয়ার স্রোত। সেই স্রোতে ঝাঁপ দিল শিবনাথ। এবং শিবনাথ আমাকে আমন্ত্রণ জানাল তার ওই ‘ভারতসভা’-র সভাপতি হওয়ার জন্য। আমি প্রত্যাখ্যান করলাম। শিবনাথ বয়সে এবং অন্য সব কিছুতেই আমার থেকে অনেক ছোট। তবু সে আমার এই প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে পারল না। প্রতিশোধ নিল। তার ‘আত্মচরিত’-এ লিখল, তার বাপ মজিলপুরের হরনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে আমার তুলনা করে, তার বাপ আর আমি কেউ আত্মসমীক্ষাও সংশোধন করতে জানি না। এবং আমি সেটা হজম করলাম নিছক অভিজাত ভদ্রতায়। কিন্তু রাগটা থেকেই গেল। এবং আমারও বদহজম হল চাপা রাগের। তাতে ফল কী হল? শুনুন তাহলে। অনেকেই জানেন না। আমার থেকে বছর পাঁচেকের বড়ই হবে, নদীয়ার এক শ্যামাচরণ ভট্টাচার্য, লিখে বসল একখানা ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’! কথাটা আমার কানে এল। এবং আমি কিঞ্চিৎ খোঁজখবর নিলাম। এবং জানলাম: শ্যামাচরণের জন্ম বিহারের পূর্ণিয়ায়। কেননা শ্যামচরণের বাপ হরনারায়ণ পূর্ণিয়ায় রানি ইন্দ্রাবতীর দেওয়ান। সেখানে গ্রামের পাঠশালায় পড়াশোনা। তারপর কলকাতায় আকস্মিক অভ্যুত্থান। ডিরোজিওর ছাত্র রামতনু লাহিড়ীর বাড়িতে থেকে শ্যামাচরণ শেখে ফরাসি, ল্যাতিন, গ্রিক। এবং সংস্কৃত। এসব আমার কানে আসে। কিন্তু শ্যামাচরণ কলকাতায় কার বাড়িতে উঠে, থেকে, খেয়ে এসব শিখল সেটাও তো কম ইম্পর্ট্যান্ট নয় আমার কাছে। রামতনু তখন হিন্দু সমাজে ‘একঘরে’। সে জাতিভেদ মানে না। সে পইতে ত্যাগ করেছে। যদিও রামতনু বিধবা বিবাহের পক্ষে। তবু রামতনুর বাড়িতে শ্যামাচরণের এই বড় হয়ে ওঠা, আমি কেন জানি না মেনে নিতে পারিনি। তবে আমার কিছু এসে যেত না, যদি না সে বিদ্যা ফলাত ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ লিখে। এবং যেই না সে বইটা দিল আমার হাতে, দু’-চার পাতা উল্টেই আমি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একঘর লোকের সামনে বললাম, ছি ছি, এই বই ছাপিয়ে বের করলে? ব্যাস, ওইটুকুই আমি বলেছিলাম। শ্যামচরণ ধ্বংস হয়ে গেল। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে সে আর বেরতে পারেনি। চেষ্টা করেছিল বাঁচার, ‘ব্যবস্থা দর্পণ’, ‘পাঠ্যসার’ এই সব লিখে। আমার পথের কাঁটা হতে। কিন্তু সেই ক্ষমতা বা প্রতিভা তার ছিল না।

zoom
বিদ্যাসাগরের বাবা ও মা

এবার একবার আমার কথা ভাবুন। মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান আমি। বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে, বালক আমি, পায়ে হেঁটে কলকাতায় এসে বাঙালির নবজাগরণের একটা মুখ হয়ে উঠলাম। এরপর অপার দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে করতে অলংকার, ব্যাকরণ, কাব্য, ন্যায়, স্মৃতি, বেদ, বেদান্ত, জ্যোতিষ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করার পরে হিন্দু আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমার ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভের যাত্রার কথা। আমি ‘মহাসাগর’ পেরিয়ে ‘সাগর’ হয়েছি, এই কথাটা কি আমাকে বলে দিতে হবে? অবিশ্বাস্য জার্নি। মানতেই হবে।

১৮৪১-এর ২৯ ডিসেম্বর। তারিখটা আপনারা ভুলে গিয়েছেন। আমি ভুলিনি। কেন না ওই দিন আমি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে জয়েন করলাম হেড পণ্ডিতের পদে। বলা যেতে পারে আমার যাত্রা হল শুরু। এবং বুঝলাম, সাহেবদের রাজ্যে উন্নতি করতে ইংরেজি জানতেই হবে। এবং ইংরেজিতে অনর্গল হতে আমার বেশি দেরি হয়নি। তবে মাইকেল মধুসূদনের সঙ্গে কখনও ইংরেজি বলি না। ‘মধু’ সাহেবদের ইংরেজির ভুল ধরে, বলে ‘অশিক্ষিত’ এবং এই শহরে ওই-ই একমাত্র মানুষ, যে আমাকে ‘Vid’ বলে ডাকে! বিদ্যাসাগর থেকে ‘ভিড’। ১০ বছরের মধ্যে, ১৮৫১-র ২২ জানুয়ারি, আমি সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল। আমি সবে ৩১। এবং ওই বয়সেই আমি লিখে প্রকাশ করলুম– সংস্কৃত ব্যাকরণের ‘উপক্রমণিকা’ এবং ‘ব্যাকরণ কৌমুদী’। বাঙালির নবজাগরণে যুক্ত হল সংস্কৃত ভাষা। শুরু হল নতুন যুগ। ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি বাঙালি ঘরে ঘরে শুরু করল সংস্কৃত ভাষার চর্চা। আমি টোলের সংস্কৃতকে তুলে আনলাম বাঙালির ড্রয়িং রুমে।

zoom
মাইকেল মধুসূদন দত্ত

আমার ‘বোধোদয়’, ‘বর্ণপরিচয়’, ‘কথামালা’ থেকে ‘সীতার বনবাস’ বা ‘শকুন্তলার’ মতো বইয়ের কথা বলছি না, যা হয়ে উঠল বাঙালির লেখাপড়ায় বড় হয়ে ওঠার অঙ্গ। কিন্তু তবু আমার শত্রুর অভাব নেই। এবং তার সবথেকে বড় কারণ, আমি বাঙালি বিধবার দুঃখ সহ্য করতে না পেরে, তাকে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি পুনরায় বিয়ে করার অধিকার ও আইনি সম্মতি। আর বিধবা বিয়ের বিপক্ষে, আমাকে আঘাত করে, ঈশ্বরগুপ্ত লিখতে পারল এই অশ্লীল পঙ্‌ক্তি: একেবারে তরে যাক যত রাড়ি আছে। এহেন ঈশ্বরগুপ্তকে নিয়ে কিছু বাঙালির আদিখ্যেতা, তাও সহ্য করেছি।

zoom
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস

যে আসল কথাটা বলতে গিয়ে আমার জন্মদিনে এত বকবক করলাম, সেই কথায় ফিরে আসি এবার। কথাটা খুব সিম্পল: ১৮৮২-র ৫ আগস্ট থেকে ঝাড়া একমাস ওই মানুষটা, দ্যাট রিমার্কেবল ম্যান, আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এবং আজ ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৮৮২; আমার ৬২-তম জন্মদিনে আমি আক্রান্ত অস্তিত্বের সংকটে। আমি কে? আমি কী? আমি ঠিক জানি না। সব গুলিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন দক্ষিণেশ্বরের সেই পূজারী ব্রাহ্মণ, এক মাস আগে। আমার এই বাদুড়বাগানের বাড়িতে। কলকাতার সবাই তাঁকে চেনেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস নামে।

আমি দেখা করতে চাইনি। কিন্তু দেখা করতেই হল। আসলে মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত আমার বিদ্যালয়ে মাস্টারি করেন। তিনি আবার শ্রীরামকৃষ্ণের পরম ভক্ত। ইনিই পরে লিখবেন ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’, ‘শ্রীম’ নামে। মহেন্দ্র একদিন আমাকে বললেন, দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণ একদিন আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। আমি বললাম, আমি নাস্তিক মানুষ। ঈশ্বর সত্যিই আছেন কি না, আমি জানি না। আর সাধু-সন্ন্যাসীদের প্রতি আমার কোনও আগ্রহ নেই। উত্তরে মহেন্দ্র বললেন, আপনি সাধু-সন্ন্যাসী বলতে যা বোঝেন, উনি ঠিক তা নন। উনি গেরুয়া পরেন না। লালপেড়ে কাপড় পরেন। জামা পরেন। বার্নিশ করা চটিজুতোও পরেন। উনি রানি রাসমণির ঠাকুরবাড়িতে একটি ঘরে বাস করেন। সেই ঘরে তক্তপোশ পাতা আছে। তার ওপর বিছানাও আছে। এবং মশারিও আছে। এবং উনি বিবাহিত। সন্ন্যাসীর কোনও বাহ্যিক চিহ্ন ওঁর নেই। তবে উনি ঈশ্বর ছাড়া আর কিছু জানেন না, কাউকে জানেন না। আমি তখন বলে ফেললাম, ঠিক আছে, নিয়ে এসো একদিন। শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে ঠিক করলেন আমার সঙ্গে দেখা করার দিন ও লগ্ন– ৫ আগস্ট শনিবার বিকেল ঠিক চারটে। সেদিন শ্রাবণের কৃষ্ণাষষ্ঠী।

zoom
ঈশ্বরচন্দ্রের বাদুড়বাগানের বাড়ি

বিকেল ঠিক চারটে। এই লেখার টেবিলে আমরা মুখোমুখি। শ্রীরামকৃষ্ণ আমাকে কিঞ্চিৎ অবাক করে একঘর লোকের সামনে বললেন, এতদিন খাল, বিল, হ্রদ, নদী দেখেছি। এইবার সাগর দেখছি। আমিও দুম করে বলে দিলাম, তাহলে নিয়ে যান নোনাজল। রামকৃষ্ণের স্মার্ট উত্তর, তুমি তো অবিদ্যার সাগর নও। কত বই পড়েছ। তুমি তো ক্ষীরের সাগর। এবার আমি চুপ। এবং শ্রোতা। বলছেন রামকৃষ্ণ: এই আসক্তি ও অবিদ্যার সংসারে তোমার দয়া, ভক্তি, বৈরাগ্য এই সব বিদ্যার ঐশ্বর্য। কিন্তু আসল বিদ্যা তো ব্রহ্মকে জানা। ব্রহ্ম সকল বিদ্যা ও অবিদ্যার পার। ব্রহ্ম মায়াতীত। এবং নির্লিপ্ত। তাই তোমাকে আমার প্রশ্ন, তুমি ব্রহ্মকে জেনেছ তো বিদ্যাসাগর? তাঁকে জানাই আসল বিদ্যা। না, আমি ব্রহ্মকে জানি না, বললাম আমি। তারপর বললাম, আপনি জেনে থাকলে আমাকে জানান, তিনি কেমন। উত্তরে রামকৃষ্ণ বললেন, ব্রহ্ম তো কখনও এঁটো হননি। মুখে উচ্চারণ করে জানানো যায় না তিনি কেমন। তুমি যা জানো, বেদ, পুরাণ, তন্ত্র, দর্শন, সব এঁটো। শুধু জিভ স্পর্শ করেনি ব্রহ্মকে! আমার মুখে কোনও উত্তর ছিল না।

আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে চুপ! শ্রীরামকৃষ্ণ আমার চোখে চোখ রেখে বললেন, মনে রেখো বিদ্যাসাগর, ব্রহ্ম উচ্ছিষ্ট নন। ওই ‘উচ্ছিষ্ট’ শব্দটি তিনি যেন ছুড়ে মারলেন আমার সকল বিদ্যার গায়ে। রাত ন’টা নাগাদ শ্রীরামকৃষ্ণ ঘোড়ার গাড়িতে উঠে পড়লেন। দক্ষিণেশ্বর অনেক দূরের পথ। ঝিরঝিরে বৃষ্টি নেমেছে। আমি আমার হাতে ধরা মোমের বাতিটা তুলে ধরলাম। তাঁর মুখের ওপর বাতির কম্পমান বিভা। এ কার মুখ? মায়াতীত। নিস্পৃহ। বিদ্যা-অবিদ্যার বাইরে। আমি নিজের চোখে দেখলাম চৈতন্যের এক অজানা অচেনা স্তর। আমার সমস্ত বিদ্যা প্রণাম হয়ে লুটিয়ে পড়ল শ্রীরামকৃষ্ণের শ্রীচরণে। আমার থেকে এই অনন্য মানুষ অন্তত ১৬ বছরের ছোট! তবু তাঁর চরণ স্পর্শ করল আমার সমর্পণ!

zoom
অন্তিমশয্যায় ঈশ্বরচন্দ্র

সব শেষে আমার এই স্বীকারোক্তি: শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে আরও নয় বছর বেঁচে থাকব। এবং মোমের নরম আলোয় দেখা সেই মুখ নয় বছর ধরে আমাকে হন্ট করল। ক্রমশ আমার আফিংয়ের নেশা বাড়ল। বাড়ল পেটের যন্ত্রণা। ডাক্তার মহেন্দ্র গুপ্ত বললেন, পেটে ক্যান্সার। আমি অপেক্ষা করছি মৃত্যুর জন্য। দেখা দিল হিক্কা। আর বমি। সেই কষ্ট সহ্য করতে আমি চোখ বুঝলাম। আর দেখা দিল সেই মুখ, সেই বিভা, সেই নিস্পৃহ পবিত্রতা। আর চোখের সামনে আমি দেখতে পেলাম আমার মৃত্যুর সময়: ১৮৯১-এর ২৯ জুলাই রাত্রি ২ টো ১৮ মিনিট। আর তারপর দেখলাম অপার আলোর সমুদ্রে দক্ষিণেশ্বরের সেই সন্ন্যাসী আমার জন্য মধুর প্রতীক্ষায়। আমি সমস্ত অবিদ্যা পিছনে ফেলে সেই মধুরের পানে হাত বাড়ালাম। প্রশ্ন করবেন না কেন? আমি এখনও জানি না। হয়তো জানবও না কোনওদিন। কিংবা অনুভব করেও বলতে পারব না। কিছু অনুভব চিরকাল অব্যক্ত। তাই থাক।

…………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য পর্ব

…………………..

Debendranath Tagore Ishwar Chandra Vidyasagar jyotirindranath tagore Krishnakamal Bhattacharya Michael Madhusudan Dutta Ramakrishna Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shakuntala

Share this article on