

২৭ মে, ২০২৬। প্রয়াত হয়েছিলেন অনীক দত্ত। ক্লান্ত বাংলা ছবির শিরায় বুদ্ধির ইঞ্জেকশন পড়েছিল তাঁর হাতেই। তিনি আদ্যন্ত পলিটিকাল। ভূতের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন চিন্তিত ছিলেন, ভোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তা কিছু কম ছিল না। কখনও বদমেজাজি, কখনও হাস্যময়। নানা রঙের অনীক দত্ত কিংবা তাঁর নতুন ছবি– দেখা যাবে না আর কখনওই বড়পর্দায়।
অনীকদার কথা বলতে গিয়ে এখনও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না যে, বারবার ‘ছিল’, ‘করত’ এরকম অতীতসূচক ক্রিয়াপদ ব্যবহার করতে হবে।
অনীকদা আমাদের থেকে বছর আটেকের বড় ছিল, তাই আমরা দু’জনেই কলকাতার পাঠভবন স্কুলের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও, স্কুলে থাকতে আলাপ হয়নি– পরিচয় হয়েছিল অনেক পরে। কিন্তু সেই পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব হতে বেশি দেরি হয়নি, কারণ পাঠভবনের কিছু মূল্যবোধে আমরা বড় হয়েছি– রাজনৈতিকভাবে উদার, প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি, বাংলাভাষা আর সংস্কৃতির প্রতি গভীর টান, আর রসবোধ যা সংযত-সুভদ্র থেকে চটুল, ফিচেল– এইসব ধাপ পেরিয়ে একালের অপভাষাসমৃদ্ধ রকের ভাষায় চলে যেত অনায়াসে।

অনীকদার প্রথম ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’, যা বাংলা ছবির জগতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে, তাতে এই সবক’টি লক্ষণই উপস্থিত। একদিক থেকে দেখলে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে এটি বামঘেঁষা প্রতিরোধের ছবি, আবার আরেকদিক থেকে, কৌতুকরসে সম্পৃক্ত এক আষাঢ়ে গপ্প, খানিকটা সুকুমার রায়ের হ-য-ব-র-ল ঘরানার। ভূতেরা হানাবাড়িতে থাকে– এ তো সবাই জানে, কিন্তু উন্নয়নের ধাক্কায় তারাও উচ্ছেদ হয়ে গৃহহারা হতে চলেছে, তাদেরও ভবিষ্যৎ সঙ্গীন– এই হল ছবির মূল বিষয়। যে চৌধুরী বাড়িতে একদল ভূতের ডেরা, সেখানে এক লোভী ব্যবসায়ীর শপিং মল আর মাল্টিপ্লেক্স তৈরি করার পরিকল্পনা– একজোট হয়ে ভয় দেখিয়ে ভূতেরা কীভাবে বানচাল করবে, এই নিয়ে মূল গল্পটি। ভূতের গল্প হলেও, আসলে মজার ছবি। যার মজাদার ভূতেরা খানিকটা লীলা মজুমদার-শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্পের ভূতেদের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই ছবিটির প্রায় প্রতি দৃশ্যে আছে অনীকদার স্বাক্ষর– যা তার পরবর্তী অনেক ছবিতেও কোনও না কোনও রূপে আমরা পেয়েছি। অনীকদার রসবোধে গোপাল ভাঁড় থেকে শুরু করে সুকুমার রায়, পরশুরাম, শিবরাম চক্রবর্তীর মতো বিভিন্ন ধারা এসে মিশেছে, মিশেছে নবারুণ ভট্টাচার্যের পুরন্দর ভাট ঘরানাও। সঙ্গে আছে অনবরত কথা নিয়ে খেলা। যার অনেকটাই আধুনিক ইঙ্গবঙ্গ সমাজের দ্বিভাষিক ‘pun-অভ্যাস’। ছবিগুলো বারবারই দেখা যায় শুধু তার সংলাপ আর রসিকতাগুলো ফের উপভোগ করার জন্য।

তবে, অনীকদার ছবির ‘বিশেষত্ব’ বুঝতে গেলে আঙ্গিকের সঙ্গে বিষয়বস্তুর মিশেল না-দেখলে চলবে না। অনীকদার একাধিক ছবিতে ক্ষমতার অপব্যবহার (সে রাজনীতিবিদ থেকে মস্তান বা ব্যবসায়ী– যে-ই হোক না কেন), খোলাবাজারের হাওয়ায় ভোগবাদ ও লোভ মানুষকে বিপথগামী করা দেওয়ার বিপদ এবং কিছু মানবিক মূল্যবোধের আর সাধারণ মানুষের (বা ভূতেদের!) একত্র হয়ে এসবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার সম্ভাবনা– এই বিষয়বস্তু বারে বারে ফিরে এসেছে। অনীকদার সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হাসতে হাসতে দর্শককে হঠাৎ এই ধরনের বিষয় নিয়ে গভীর কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারা।

২
‘মেঘনাদবধ রহস্য’-তেও সেই একই ক্ষমতার প্রকাশ, অন্যভাবে। রহস্যকাহিনির আঙ্গিকে সেটা এক আধুনিক পারিবারিক নাটক। কিন্তু আসলে তা মূলত রাজনৈতিক ছবি, যা শেষ বিচারে ন্যায়-অন্যায়ের এক চিরন্তন নীতিকথায় গিয়ে পৌঁছয়। সাত-আটের দশকের কলকাতায় বড় হয়ে ওঠা এমন কেউই প্রায় নেই, যাঁর আত্মীয়-বন্ধু-প্রতিবেশী-পরিচিত মহলে– কেউ-না-কেউ নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েননি। তাই সেই ছবির নকশাল নেতা ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী, যিনি পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন, নিছকই গল্পের চরিত্র ছিলেন না। তাঁর মতো অনেকের কথা আমরা শুনেছি, হয়তো দেখেওছি। তিনি যেন শিক্ষিত উদারমনা বাঙালি মধ্যবিত্তের বৃহত্তর পরিবারের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ– একমত না-হতে পারি, কিন্তু তাঁদের আদর্শবাদকে শ্রদ্ধা না-করে উপায় নেই।

অনীকদা নিজেও সেই বৃহৎ পরিবারেরই অঙ্গ ছিল– তাই ওর সঙ্গে আলাপ থেকে ঘনিষ্ঠতা হতে বেশি সময় লাগেনি। তর্ক করতে ভালোবাসত আর তর্কের সেই ধার নিজের ছবিতেও ব্যবহার করতে চাইত। যখন ‘ভবিষ্যতের ভূত’-এর চিত্রনাট্য লিখছিল, আমাকে অনুরোধ করেছিল দুই বামপন্থী ভূতের তর্কের কিছু সংলাপ ভেবে দিতে– তাদের একজন খানিকটা রক্ষণশীল আর অন্যজন খানিকটা মুক্তমনা– সব কিছুকেই প্রশ্ন করে। বলেছিল, তুমি তো একে বামপন্থী, তায় তার্কিক, তোমার যা মনে হয় লেখো। যা লিখেছিলাম তার থেকে কয়েকটা লাইন ছবিতে ব্যবহার করেছিল। একটা ছোট নমুনা এখানে দিচ্ছি:
রক্ষণশীল বামপন্থী ভূত: ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ তো ‘চিনের চাউমিন আমাদের চাউমিন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নকশাল… হুঃ!
মুক্তমনা বামপন্থী ভূত: আমি নকশাল নই– মায়ের চেয়ে মাওয়ের ওপর বেশি দরদ আমার নেই। কিন্তু বাস্তবটাকে তো মানতে হবে! আর বাহাত্তুরে বুড়োদের দিয়ে ভর্তি ওটা কি পলিটবুরো, না পলিটবুড়ো? বুড়ো বাম বা বুড়ো ভাম, এসব দিয়ে কিছু হয় না!
হাসির আড়ালে এই তর্কে একটা জিনিস স্পষ্ট– দুই পক্ষ এক আদর্শে বিশ্বাস করলেও তাদের আদর্শকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ নিয়ে মতভেদ আছে। অনীকদার সঙ্গেও আমার রাজনীতি নিয়ে তর্ক হত, যদিও রাজ্যের উন্নতির যে রূপ আমরা দেখতে চাইতাম, তা নিয়ে কোনও দ্বিমত ছিল না।

৩
‘মেঘনাদবধ রহস্য’ ছবিটির শেষ দৃশ্যে, ইন্দ্রজিতের মৃত্যুস্থলে, পুকুরের পাড়ে, তন্ময় হয়ে বসে আছে এক তরুণী, নেপথ্যে দেবজ্যোতি মিশ্রের কথা ও সুরে ‘তোমরা এখনও কি ঘুমের মধ্যে জেগে তারার মিছিল দেখো আকাশের গায়ে’ গানটি বাজে। সে আসলে ইন্দ্রজিতের সন্তান, জন্মের আগেই পিতৃহীন হয়েছে। সেই মুহূর্তে ছবিটি আর রহস্য বা রাজনৈতিক কাহিনি থাকে না, এক অনাথ সন্তানের নিজের ইতিহাস এবং শিকড় সন্ধানের এক মর্মস্পর্শী আখ্যান হয়ে দাঁড়ায়। চিরন্তন মানবিক অনুভূতির মেঘলোক থেকে এখানে পরিচালক এক চোরা তির নিক্ষেপ করছেন দর্শকের হৃদয়ে, মেঘনাদ-সুলভ অমোঘ দক্ষতায়।
ইন্দ্রজিতের মতো চরিত্রের আদর্শবাদ, সাহস আর আত্মত্যাগ আমাদের বুকে যে বেদনার তির বেঁধায়, তার অভিঘাত বর্তমান রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে, বিশেষত বাম রাজনীতির ম্লান দশায়, আজ তীক্ষ্ণতর। তবু যতদিন দারিদ্র, অসাম্য, নিপীড়ন থাকবে, ততদিন শোষণহীন মুক্ত সমাজের স্বপ্ন বেঁচে থাকবে– ‘পথে এবার নামো সাথী’ গানটা হৃৎস্পন্দন বাড়াবেই।
অনীকদা নিজেও এখন সেইরকম একটা অপূর্ণ স্বপ্ন হয়ে থেকে গেল আমাদের মধ্যে। যে সরকারের সে ছিল তীব্র সমালোচক এবং যার জন্য তাকে অনেক মূল্যও দিতে হয়েছে– তার নির্বাচনে পরাজয়ের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অনীকদা চলে গেল। তার অকালমৃত্যুর বেদনা কখনও যাওয়ার নয়। আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের যে ক্ষতি হল, তা অপরিমেয় এবং অপূরণীয়। তবু মনে রাখতে হবে, এক বিদীর্ণ এবং মলিন সময়ের প্রেক্ষাপটে অনীকদার ক্যামেরার লেন্সে আমাদের ঐতিহ্যের অপসৃয়মাণ আভা যেন সূর্যাস্তের আলোর মতো প্রতিফলিত হয়ে অল্পকালের জন্য হলেও উদ্ভাসিত করেছিল আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনা। অনীকদা আর নেই। কিন্তু তার ছবি, আপসহীন ব্যক্তিত্ব এবং মূল্যবোধ যে এক বিকল্প সম্ভাবনার পথ দেখিয়েছে, তার জন্য আমরা তাকে মনে রাখব। এবং আশা করা যায় তা পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

অনীকদার চলে যাওয়ার ঠিক পরে এই কবিতাটা লিখেছিলাম, সেটা দিয়ে শেষ করছি এই লেখা:
অনেক ছিল ছবি করার, অনেক ছিল কথা বলার,
অনেক ছিল পথ হাঁটার, অনেক প্রতিবাদের।
অনীক ছিল ছবি করার, অনীক ছিল কথা বলার,
অনীক ছিল পথ হাঁটার, অনীক প্রতিবাদের।
[লেখার সঙ্গে ব্যবহৃত প্রতিটি ছবিই অনীক দত্তর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া]
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved