

আজ এত বছর পরে পিছন ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার ছেলেবেলা আসলে কোথাও হারিয়ে যায়নি। বাগমারীর সেই মাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল-ক্রিকেট, অজিতের স্মৃতি, দেবাশীষের বন্ধুত্ব, পরেশদার হারমোনিয়াম, দাদুর লাঠি, নরেনদার ইঁদুরের গল্প, পুজোর প্রতিমা, মহালয়ার ভোর, রাঁচির বড় বাড়ি, ঘাটশিলার পাহাড়, সুবর্ণরেখার ধারে হাঁটা, সুব্রতর সঙ্গে বন্ধুত্ব– সবই আমার মধ্যে কোথাও না কোথাও রয়ে গিয়েছে। আর হয়তো সেইসব মানুষ, সেইসব দিন, সেইসব ছোট ছোট ঘটনা সব মিলেই অজান্তে আমাকে গড়ে তুলেছে, আমার জীবনদর্শনকে আকার দিয়েছে।
সব মানুষেরই ছেলেবেলা ভিন্ন ভিন্ন রকমের হয়। কারও ছেলেবেলা কেটে যায় গ্রামে-মাঠে-ঘাটে, কারও শহরের গলিতে, কারও বা অভাব-অনটনের মধ্যে। আমার ছেলেবেলাটাও ছিল নানা ঘটনা, মানুষ, আনন্দ, দুঃখ আর অজস্র ছোট-বড় স্মৃতিতে ভরা। আজ এত বছর পরে পিছন ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই দিনগুলিই আসলে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
আমার জন্মের আগের কথা আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি না। শুধু মা-বাবা, কাকা-পিসিদের মুখে শুনেছি পূর্ববঙ্গের কথা। দেশভাগের আগে আমার মা-মামিমারা পূর্ববঙ্গেই থাকতেন। কিন্তু দাঙ্গার সময় তাঁদের খুব কষ্টের মধ্য দিয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে এদেশে চলে আসতে হয়। আমার বাবা ও পিতামহ অবশ্য তার আগেই এদেশে ছিলেন। দেশভাগ, দাঙ্গা, ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে আসা– এইসব ঘটনার প্রত্যক্ষ স্মৃতি আমার নেই, কিন্তু বড় হতে হতে আত্মীয়স্বজনের মুখে শোনা সেইসব কাহিনি আমার শৈশবের অদৃশ্য পটভূমি হয়ে উঠেছিল।

এদেশে আসার তিন-চার বছর পরে আমার জন্ম। পূর্ব কলকাতার বাগমারীতে। সেখানেই ধীরে ধীরে আমার বড় হয়ে ওঠা। আজ এত বছর পরে মনে হয়, বাগমারীর সেই বাড়ি, সেই পাড়া, সামনের মাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলো– সব মিলিয়েই যেন আমার পৃথিবীটা তৈরি হয়েছিল।
ছোটবেলার একটি ঘটনা হঠাৎ মনে পড়ে গেল। আমি ও দাদা মায়ের সঙ্গে বালি গিয়েছিলাম। বালিতে আমাদের মামার বাড়ি ছিল। হাওড়া লাইনের লিলুয়া, বেলুড়, বালি– সেই বালি। সেটিই ছিল আমার জীবনে প্রথম রেলগাড়ি দেখা। বিশাল, লম্বা, ‘কু-ঝিকঝিক’ শব্দে ছুটে চলা ট্রেন দেখে আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, গাড়িটা বুঝি আমাদের গিলে ফেলতে আসছে! তখন আমি মায়ের কোলে। পুরো ট্রেনযাত্রায় আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে কাটিয়েছিলাম। ট্রেন থেকে নেমে তবেই চোখ খুললাম।
কিন্তু বালিতে পৌঁছনোর পর সেই ভয় একেবারে কেটে গেল। কতদিন বালিতে ছিলাম মনে নেই, কিন্তু সেখানে মামাতো দাদা-দিদিদের আদর, ভালোবাসা আর সঙ্গ পেয়ে দিনগুলো খুবই আনন্দে কেটেছিল। একসময় আবার কলকাতার বাগমারীর বাড়িতে ফিরে এলাম।
………………………………………
ছোটকাকা বহুদিন পর কলকাতায় আসায় তাঁকেও আবার দেখলাম। তিনি আটপুরে থাকতেন এবং সেখানে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। শ্রাদ্ধাদি শেষ হলে কাকা আবার আটপুরে ফিরে যান। বাবা ও বড়কাকাও নিজেদের কাজে ফিরে গেলেন। আমরাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলাম। পরেশদা নিজের দেশে ফিরে গেলেন। তবে রেখে গেলেন গানের একটি রেশ– ‘সোনার হাতে, সোনার কাঁকন’।
………………………………………
এরপর একদিন দেখলাম আমাদের বাড়িতে প্রচুর লোকজন এসেছে। ছোট ছিলাম, তাই বুঝতে পারিনি কেন এত মানুষ! বাড়িতে অনেক লোক এলে ছোটদের যেমন আনন্দ হয়, আমারও হয়েছিল। পরে জানতে পেরেছিলাম, সেদিন আমাদের ঠাকুরমা মারা গিয়েছিলেন। বড় হয়ে সেই দিনের কথা ভাবলে একটু লজ্জাই লাগে। যে ঘটনায় বাড়ির সবাই শোকে ভেঙে পড়েছিল, তার কিছুই না বুঝে আমি তখন লোকজনের ভিড় দেখে আনন্দে বিভোর।
এরপর বছরখানেকের মধ্যেই আমায় বাগমারীর ‘আদর্শ বিদ্যালয়’-এ ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রায় দু’বছর পড়েছিলাম। পরে স্কুল বদলে গড়পার রোডের ‘এথিনিয়াম ইনস্টিটিউশন’-এ তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হলাম। অনেক বড় হয়ে জানতে পেরেছিলাম, 101/A গড়পার রোডের যে বাড়িটিতে আমাদের স্কুল ছিল, সেটিই ছিল সত্যজিৎ রায়ের জন্মস্থান।
আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল খুব বেশি দূরে ছিল না। আমরা হেঁটেই যাতায়াত করতাম। ধীরে ধীরে বেশ কিছু বন্ধু হয়েছিল। তবে তাদের মধ্যে দেবাশীষ মিত্র ও অজিত শিকদার হয়ে উঠেছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। তিন বন্ধুর বেশ ভালোই দিন কাটছিল। হঠাৎ একদিন দেখলাম অজিত দু’দিন ধরে স্কুলে আসছে না। তারপর খবর এল, অজিত একটি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে! খবরটি শুনে পুরো ক্লাসেরই খুব মন খারাপ হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দু’জনের– আমার আর দেবাশীষের মতো শোক হয়তো ক্লাসের আর কেউ পায়নি। তখন তো ‘সময় সব দুঃখকে ধীরে ধীরে মুছে দেয়’, অর্থাৎ ‘Time is the best healer’– এই কথার অর্থ বুঝতাম না। তবু সময়ের সঙ্গে আমরাও আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলাম।
বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি আর দেবাশীষ প্রায়ই স্কুল ছুটির পর এদিক-ওদিক ঘুরতে বেরিয়ে পড়তাম। কোনওদিন মানিকতলা, কোনওদিন ছায়া সিনেমা। আবার কখনও কাঁকুড়গাছি, উল্টোডাঙা। এইভাবেই একে একে ক্লাসে উঠতে লাগলাম। নতুন বই এল, নতুন বন্ধু এল, কিন্তু দেবাশীষের মতো বন্ধু আর কোনওদিনও হয়নি। পরবর্তীকালে আমরা দু’জন একইসঙ্গে বিদ্যাসাগর কলেজেও পড়েছি।
পাড়া, মাঠ আর ছেলেবেলার দস্যিপনা
পাড়াতেও আমার বেশ কিছু বন্ধু ছিল। রোজ তাদের সঙ্গে ক্রিকেট, ফুটবল খেলতাম। ভোরবেলা ফুটবল আর বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে ক্রিকেট– এই ছিল আমাদের নিয়মিত জীবন।
বাগমারী পার্ক তখন বেশ বড় ছিল। ফুটবল খেলার জন্য দুটো মাঠ ছিল– একটা বড়, অন্যটা তুলনায় ছোট। পাড়ার যে দল আগে মাঠে পৌঁছত, তারাই বড় মাঠটা দখল করত। সত্যি বলতে কী, আমরা কোনওদিনই বড় মাঠটা পেতাম না। তাই একদিন আমরা আগের রাতে একটা পরিকল্পনা করলাম– পরদিন অন্য দিনের তুলনায় এক ঘণ্টা আগে মাঠে পৌঁছে বড় মাঠ দখল করব।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা আকাশ অন্ধকার থাকতেই মাঠে পৌঁছে গেলাম। একটু বিশ্রাম নিয়ে খেলা শুরু করলাম। খেলছি তো খেলছিই। বেশ কিছুক্ষণ পর সবাই যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, এমন সময় রাস্তা দিয়ে একজন ভদ্রলোককে যেতে দেখে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম ক’টা বাজে। ভদ্রলোক বললেন, রাত সাড়ে তিনটে! আমরা তখন বুঝলাম, আমরা যখন মাঠ দখল করতে এসেছি তখন রাত দুটো! এত বড় দুঃসাহস আর কোনওদিন দেখাইনি।
ছোটবেলার আরও একটি ঘটনা মনে পড়ে। ১৯৬১ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আমাদের বাড়ির সামনের মাঠে সারাবছর ধরে নানা অনুষ্ঠান হয়েছিল। ছবি আঁকার প্রতিযোগিতাও হয়েছিল এবং আমি ও দাদা দু’জনেই তাতে অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেই প্রতিযোগিতায় দাদা প্রথম আর আমি দ্বিতীয় হয়েছিলাম। মনে আছে, একদিন পাড়ার মাঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। পরিচালক ছিলেন পল্টু সেনগুপ্ত। তিনি আমার দাদাকে ‘অমল’-এর চরিত্রে অভিনয় করতে বলেছিলেন এবং দাদা সেই ছোট বয়সেই খুব সুন্দরভাবে চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছিল। বড়রা সম্ভবত ‘রক্তকরবী’ করেছিলেন। আরেকদিন ছিল গান-বাজনার অনুষ্ঠান– অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা নিয়ে। শতবর্ষের অনুষ্ঠান শেষ হয়েছিল ইডেন গার্ডেনে। সেখানে গান, বাজনা, সিনেমা, নাটক, আলোচনা সভা– নানা ধরনের অনুষ্ঠান হয়েছিল। প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে চলেছিল সেই অনুষ্ঠান। আমি আর দাদা পাড়ার গুরুজনদের সঙ্গে একদিন সেখানে গিয়েছিলাম।
পরের বছর কোনও এক সময় কর্পোরেশনের নির্বাচন হয়। কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে বাবাকে ভোট ও নাগরিক সমস্যার ওপর কিছু কার্টুন আঁকার অনুরোধ করা হয়। বাবা প্রায় ৪০টির মতো কার্টুন এঁকেছিলেন। সেগুলির বিষয় ছিল সমসাময়িক নানা সমস্যা– বৃষ্টির জল জমে থাকা, রাস্তায় আলোর অভাব, স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রভৃতি। আমাদের বাড়ির সামনের মাঠেই বাবার আঁকা কার্টুনগুলি টাঙানো হয়েছিল। প্রচুর মানুষ সেগুলি দেখতে এসেছিলেন– এই দৃশ্যটি আজও আমার মনে পড়ে। সাধারণ মানুষের সমস্যাও যে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা যায়, তা দেখে অনেকে খুব খুশি হয়েছিলেন। তখন কংগ্রেসের যুগ। অনেক কংগ্রেস নেতাও সেই প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন এবং কার্টুনগুলির প্রশংসা করেছিলেন। পরে অন্যান্য এলাকা থেকেও কার্টুনগুলি প্রদর্শনের জন্য চেয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। দুঃখের বিষয়, সেই কার্টুনগুলির আর কোনওটিই ফেরত আসেনি।
আমাদের সংসার
আমাদের জীবনযাত্রা ছিল খুবই সাধারণ। সকালে যখন কলের জল আসত, তখন আমরা সবাই কলতলায় চলে যেতাম। দাঁত মেজে, স্নান সেরে একে একে ঘরে ফিরতাম।
আমাদের এক পিসি অল্প বয়সেই বিধবা হয়ে আমাদের বাড়িতেই থাকতেন। তিনি আমাদের পাঁচ ভাইবোনকে একসঙ্গে এক থালায় বসিয়ে সকালের খাবার খাওয়াতেন। আমার বড়কাকার এক ছেলে, দুই মেয়ে এবং আমরা দুই ভাই– এই পাঁচজনকে নিয়েই আমাদের ছোট্ট কচিকাঁচার দল।

আমার দাদা আমার থেকে প্রায় চার বছরের বড় ছিল। সে আগে থেকেই এথিনিয়ামে পড়ত। আমাকে প্রথমে মা পাড়ার একটি স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। পরে বড়কাকা একদিন তাঁর নিজের ছেলেকে এবং আমাকে হাত ধরে এথিনিয়ামে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে দেন। আমায় আর দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তে হয়নি– স্কুলের শিক্ষকরা কেন জানি না, আমাকে সরাসরি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করে নেন।
তখন এখনকার মতো প্রতি বছর পাঠ্যবই বদলে যেত না। ফলে আমার ভাগ্যে বেশিরভাগ সময় জুটত ছেঁড়া-ফাটা পুরনো বই। দাদা পেত নতুন বই, তারপর সেই বই পড়ত কাকার ছেলে, শেষমেশ সেটি আমার হাতে আসত। অবশ্য কোনও বই যদি নতুন পাঠ্যতালিকার সঙ্গে না মেলে, বাবা সেটি আমায় নতুন করে কিনে দিতেন।
আমাদের সঙ্গে ঠাকুরদাদাও থাকতেন। বয়স হয়ে যাওয়ায় তাঁকে ঘরে একা শুতে দেওয়া হত না। মা আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে দাদুর ঘরের মেঝেতে বিছানা করে শুতেন। এর কিছুদিন পর হঠাৎ আমাদের সেই পিসিমা মারা গেলেন। তখন মেদিনীপুর থেকে প্রায় ২৫ বছরের একটি ছেলেকে বাড়িতে রাখা হয়েছিল। মূলত সে দাদুর দেখাশোনা করত। অবসর সময়ে আমাদের সঙ্গেও গল্প করত। তার নাম ছিল নরেন। দাদুর কোনও দরকার হলেই নরেনদা ছুটে যেত।
একদিনের একটি মজার ঘটনা মনে পড়ে। আমাদের বাড়িতে তখন ইঁদুরের খুব উপদ্রব। এক রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছি; পরদিন সকালে দেখি, নরেনদা হাতে কী একটা নিয়ে দাদুর কাছে গিয়ে বলছে, ‘কর্তাবাবু, আপনাকে দেখাতে এনেছি।’ দাদু সেটি দেখে চিৎকার করে উঠলেন। আমরা দৌড়ে গিয়ে দেখি, একটি বোর্ডের ওপর ছোট-বড় মিলিয়ে ১০-১২টা মরা ইঁদুর পাশাপাশি শোয়ানো! পরে জানতে পেরেছিলাম, মাঝরাতে নরেনদার ঘুম ভেঙে যায়। সে দেখে ঘরের মধ্যে অনেকগুলো ইঁদুর ছোটাছুটি করছে, এমনকী খাটের ওপরও উঠে পড়ছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নরেনদা একে একে অতগুলো ইঁদুর মেরে ফেলেছিল।
একসময় নরেনদা মেদিনীপুর ফিরে গেল। আমরা খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। তবে কয়েকদিনের মধ্যেই খবর এল, নরেনদার মতোই আরেকজন দাদা আমাদের বাড়িতে আসবেন। তার নাম পরেশ।
পরেশদা আসতেই আমরা ছোটরা খুব খুশি হয়ে গেলাম। কারণ তাঁর কাঁধে ঝোলানো ছিল একখানা হারমোনিয়াম। অর্থাৎ তিনি গান জানেন! সেদিনই বিকেলে পরেশদা গান ধরলেন– ‘সোনার হাতে, সোনার কাঁকন, কে কার অলংকার।’ সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গান। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরলেই গানের আসর বসত। চলত সন্ধে পর্যন্ত। পরেশদা গাইতেন আর আমরা ছিলাম শ্রোতা। আমাদের পড়াশোনা আর পরেশদার গান– দু’টিই সমান তালে চলত।
………………………………………
ছোটকাকার বিয়েতে আমাদের খুব আনন্দ হয়েছিল। কাকা যাঁকে বিয়ে করবেন, তাঁকে আমরা ছোটবেলা থেকেই চিনতাম ও তাঁদের বাড়িতে যেতাম। কাকার বিয়েতে একটি মজার সমস্যা হয়েছিল। আমাদের বাড়ির প্রধান দরজা আর হবু-কাকিমার বাড়ির প্রধান দরজা ছিল একেবারে মুখোমুখি। তিন-চার পা হাঁটলেই এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যাওয়া যায়। তাই প্রশ্ন উঠল– বরকে আনবে কী করে? বরণই বা কোথায় হবে?
………………………………………
ছুটির দিনে দুপুরবেলা দাদু আমাদের পড়াতে বসাতেন। তিনি বসতেন একটি ইজি চেয়ারে। মাঝেমাঝে একটানা পড়তে ভালো না লাগলে আমরা নানা অজুহাতে উঠে যেতে চাইতাম। তখন দাদু তাঁর লাঠি দিয়ে পথ আটকে জিজ্ঞাসা করতেন, ‘কোথায় যাচ্ছিস?’ তাই আমাদের সকলকেই মনে রাখতে হত– একটু আগেই কী অজুহাত দিয়েছিলাম, পরেরবার যাতে অন্য কিছু দিই!
এইভাবেই দিন কাটছিল। এর মধ্যেই হঠাৎ দাদু অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁকে ঠিকমতো দেখাশোনা করার জন্য বাবা ও বড়কাকা পালা করে ছুটি নিতে বাধ্য হলেন। এই সময় পরেশদার গানও বন্ধ হয়ে গেল। যমে-মানুষে টানাটানি চলার পর একদিন দাদু আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন! বাড়িতে স্বাভাবিকভাবেই শোক নেমে এল।
এরই মধ্যে বাবা একটি ‘oil painting’-এর অর্ডার পেলেন। দাদুর মৃত্যুর পর বাবা ও কাকারা এক মাস হবিষ্যি করেছিলেন। ছোটকাকাও দাদুর মৃত্যুর খবর পেয়ে কলকাতায় আসেন। সেই সময় আত্মীয়স্বজনও আসতেন অনেকে। এই সমস্ত কিছুর মধ্যেই বাবা সেই এক মাসের মধ্যে তাঁর ছবিটি শেষ করেন। ছবিটি ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।
ছোটকাকা বহুদিন পর কলকাতায় আসায় তাঁকেও আবার দেখলাম। তিনি আটপুরে থাকতেন এবং সেখানে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। শ্রাদ্ধাদি শেষ হলে কাকা আবার আটপুরে ফিরে যান। বাবা ও বড়কাকাও নিজেদের কাজে ফিরে গেলেন। আমরাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলাম। পরেশদা নিজের দেশে ফিরে গেলেন। তবে রেখে গেলেন গানের একটি রেশ– ‘সোনার হাতে, সোনার কাঁকন’।
মেলা, ম্যাজিক আর আমাদের মাঠ
পুজোর সময়টা বাদ দিলে আমাদের বাড়ির সামনের মাঠে সারা বছরই কোনও না কোনও অনুষ্ঠান লেগে থাকত। একদিন দেখলাম, বিরাট একটি লড়ি করে প্রচুর মালপত্র এসেছে। জানা গেল, মেলা বসবে। নাগরদোলা, মেরি-গো-রাউন্ড-সহ নানা ধরনের শিশুদের বিনোদনের আয়োজন। খেলনা, জামাকাপড়, মিষ্টি, আচার– নানা ধরনের দোকানও বসল।
প্রায় দু’ সপ্তাহ মেলা চলার পর শুরু হল সন্তোষকুমারের ম্যাজিক! টিকিট কেটে আমাদের সেই ম্যাজিক দেখতে হত। মেলা দেখার জন্য বাবার কাছ থেকে আগে থেকেই পয়সা চেয়ে রাখতাম। সন্তোষকুমারের ম্যাজিকের প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘নরখাদক’। ছোট ছিলাম বলে বেশি কিছু বুঝতাম না। তাই যা দেখতাম, তাতেই শিহরিত হতাম। প্রায় এক মাস ধরে মেলা চলত। প্রথমদিকে পড়াশোনায় বেশ অসুবিধা হত। পরে অবশ্য এইসবের সঙ্গে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কখনও সারা সপ্তাহ ধরে চলত অবিরাম সাইকেল চালানোর প্রতিযোগিতা। কখনও এক মাস ধরে রাম-রাবণের যুদ্ধ নিয়ে যাত্রা। কখনও আবার সার্কাস। আমাদের ছোটবেলার বিনোদনের জগৎটা যেন ছিল সীমাহীন।
রাঁচির স্মৃতি
ছোটকাকা স্কুলের ছুটিতে একবার আমাকে নিয়ে রাঁচিতে বড়পিসির বাড়িতে গিয়েছিলেন। তখন রাঁচি যেতে হলে ‘মুড়ি’ জংশন থেকে ট্রেন বদল করতে হত। সেই ছোট, ন্যারো-গেজ ট্রেনে চেপেই রাঁচি পৌঁছেছিলাম। বড় পিসেমশাই তখন বিহারের ঊষা কোম্পানির ম্যানেজার। ঊষা কোম্পানির গো-ডাউনের ওপরের তলায় ছিল পিসিদের থাকার জায়গা। বিরাট বিরাট ঘর, প্রশস্ত হলঘর, বড় বারান্দা, বিশাল ছাদ– সবকিছু এত বড় বড়, দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আসলে আমাদের বাবা-কাকারা ছিলেন উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে আসা মানুষ। ফলে এত বড় বাড়ি বা এত বড় পরিসরের সঙ্গে আমার ছোটবেলা থেকে পরিচয় ছিল না।
পিসি-পিসেমশাইয়ের সঙ্গে তাঁদের চার মেয়ে ও এক ছেলে ছিল। তাদের মধ্যে তিনজন আমার চেয়ে বড়, একজন ছোট। আর পিসির ছেলে ছিল আমার সমবয়সি। পিসেমশাই আমাকে রাঁচির অনেক জায়গা ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন– রাঁচি হিল, মোরাবাদি হিল, টেগোর হিল এবং আরও অনেক দর্শনীয় স্থান। সেই ভ্রমণের স্মৃতি আজও মনে আছে।
………………………………………
একদিন সকালে দেখলাম, বাবা বাজার থেকে বেশ কিছু জিনিসপত্র কিনে এনেছেন– উনুন, হাতা, কড়াই, মাছ, সবজি ইত্যাদি। মা রান্না করলেন। বাবা খেয়ে কলেজে চলে গেলেন। আমরা দুই ভাই কিছুটা বুঝলাম, কিছুটা না বোঝার ভান করলাম। তবে বুঝতে অসুবিধা হল না– আমাদের যৌথ পরিবার ভেঙে গিয়েছে।
………………………………………
রাঁচি যাওয়ার আসল কারণ অবশ্য ছিল অন্য। ছোটকাকা নিজের বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে বড় পিসেমশাই ও তাঁর পরিবারকে নিজেই রাঁচি গিয়ে নিমন্ত্রণ করবেন স্থির করেছিলেন। কাকার বিয়ে উপলক্ষে পিসির পরিবারের সবাই আমাদের সঙ্গেই কলকাতায় আসেন। ট্রেনে ফেরার সময় মনে আছে প্রচুর কালোজাম খেয়েছিলাম। এতটাই খেয়েছিলাম যে শেষে পেটের সমস্যা দেখা দিয়েছিল!
ছোটকাকার বিয়েতে আমাদের খুব আনন্দ হয়েছিল। কাকা যাঁকে বিয়ে করবেন, তাঁকে আমরা ছোটবেলা থেকেই চিনতাম ও তাঁদের বাড়িতে যেতাম। কাকার বিয়েতে একটি মজার সমস্যা হয়েছিল। আমাদের বাড়ির প্রধান দরজা আর হবু-কাকিমার বাড়ির প্রধান দরজা ছিল একেবারে মুখোমুখি। তিন-চার পা হাঁটলেই এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যাওয়া যায়। তাই প্রশ্ন উঠল– বরকে আনবে কী করে? বরণই বা কোথায় হবে?
শেষ পর্যন্ত ঠিক হল, বর অর্থাৎ আমার কাকাকে ট্যাক্সিতে তুলে এপাড়া-ওপাড়া ঘুরিয়ে উল্টোদিকের বাড়িতে নিয়ে আসা হবে। তাই করা হয়েছিল।
অনুষ্ঠান শেষ হলে রাঁচির সবাই ফিরে গেল। ছোটকাকাও বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান শেষ করে কাকিমাকে নিয়ে কর্মস্থলে চলে গেলেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন।
পরে আবার রাঁচি যাওয়ার সুযোগ হয় ১৯৬৬ সালে বড়পিসির বড় মেয়ে সাধনাদির বিয়েতে। পিসেমশাইয়ের বড় মেয়ের বিয়ে– প্রচুর মানুষ নিমন্ত্রিত হয়েছিল। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারে এত বড় আয়োজন আগে কখনও দেখিনি। অঢেল খাওয়া-দাওয়া, বিরাট আয়োজন– সবই আমার কাছে বিস্ময়কর ছিল। পরে জানতে পেরেছিলাম, বড়দিদির শ্বশুরবাড়ি ‘পাট্টাদার’– রাঁচির জমিদার পরিবার। সম্ভবত সেই কারণেই পিসেমশাই এত এলাহি আয়োজন করেছিলেন।
কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, বছরখানেকের মধ্যেই শুনলাম রাঁচিতে ভয়াবহ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হচ্ছে। পিসিরা বাড়িছাড়া হয়ে কোনওরকমে প্রাণে বেঁচেছিলেন। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে পিসেমশাই সবাইকে নিয়ে ‘পি.পি. কম্পাউন্ড’ নামে একটি এলাকায় অপেক্ষাকৃত ছোট একটি বাড়িতে উঠলেন।
পরে পিসির দ্বিতীয় মেয়ে মলিনাদির বিয়ে হয়। সেটিও ছিল বড় আয়োজনের বিয়ে। কলকাতা থেকে আমরা অনেকেই গিয়েছিলাম। বর ও বরযাত্রীরা এসেছিল নৈহাটি থেকে। তিন দিন থেকে আমরা কলকাতায় ফিরে আসি।
আমাদের কলকাতার বাড়ি ছিল অতি সাধারণ। ঘরগুলির ছাদ টিনের। বড় পিসির বাড়ি ছিল অনেক সুন্দর, বড়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই বড় বাড়ির চেয়ে আমার নিজের টিনের ঘরটাই ছিল বেশি প্রিয়। নিজের বাড়িতে যে সুখ পাই, সেই সুখ অন্য কোথাও পাইনি। আজও পাই না।
পুজোর দিনগুলি
এরপর মাসখানেকের মধ্যেই পুজো এসে গেল। তখন আমাদের পাড়াতেই দুর্গাপ্রতিমা তৈরি হত। বাঁশ বাঁধা, খড় দিয়ে কাঠামো তৈরি করা– প্রতিমা তৈরির প্রতিটি পর্যায়েই আমি নতুন কিছু দেখতে পেতাম। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় দেখে যেতাম কতদূর কাজ এগিয়েছে। ফেরার সময়ও দাঁড়িয়ে দেখে নিতাম। সেই সময়ের মহালয়ার ভোরবেলার কথা আজও মনে পড়ে। আমাদের পাড়ায় কেবল বাবার বন্ধু সুধীরকাকুর বাড়িতেই রেডিও ছিল। মহালয়ার দিন ভোরে সেখানে গিয়ে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় মহিষাসুরমর্দিনী শুনতাম। পাড়ায় আর কারও বিশেষ উৎসাহ ছিল না, তাই অনেক সময় আমি একাই যেতাম।
রেডিওর অনুষ্ঠান শেষ হলে প্যান্ডেলে গিয়ে দেখতাম কারিগররা কাপড়ের ওপর সুতো দিয়ে অপূর্ব সুন্দর নকশা তৈরি করছেন। আজও ভাবলে অবাক হয়ে যাই– কী অসম্ভব সুন্দর ছিল তাঁদের কাজ! আমাদের পাড়ার প্রতিমাশিল্পীর নাম ছিল চিন্তাহরণ পাল। তিনি মানুষ হিসেবেও খুব ভালো ছিলেন। একবার প্রতিমা তৈরি প্রায় শেষ, শুধু রং করা বাকি। প্রতিমার সিংহটি সামনের দু’-পা তুলে অসুরের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে– এমন ভঙ্গিতে তৈরি করা হয়েছিল। সেই সিংহের পা ধরেই পাড়ার এক-দু’জন বাচ্চা একদিন ঝুলতে শুরু করে। হঠাৎ পা গেল ভেঙে! চিন্তাহরণবাবু কোনওরকমে সেটি মেরামত করেন। সে বছরের মতো পুজো বেঁচে গেল। এরপর থেকে প্রতিমা সম্পূর্ণ করে, শুধু রং করা বাকি, এমন অবস্থায় প্রতিমা মাঠের প্যান্ডেলে আনা হত এবং রং করা হত।

এক বছর পুজোর সময় প্রবল বৃষ্টি। দশমীর দিন রাতভর ঝড়-বৃষ্টির ফলে রাস্তাঘাট, মাঠ– সব জায়গা জলে ডুবে গিয়েছিল। প্যান্ডেল ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল। প্রতিমাও প্রায় গলে গিয়েছিল। কোনওরকমে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এরপর থেকে আমাদের পুজোটা যেন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ল। পাড়ার বড় দাদারা একে একে কেউ বিদেশে, কেউ চাকরিসূত্রে দিল্লি বা বোম্বাই চলে গেলেন। চিন্তাহরণবাবুও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। পুজোর জন্য সেক্রেটারি পাওয়া যাচ্ছিল না। একবার কুমোরটুলিতে গিয়েও ভালো প্রতিমা পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত একটি প্রতিমা পাওয়া গেল, কিন্তু দেখা গেল তার চারপাশে পাঁচ-পাঁচটি অসুর দাঁড়িয়ে! কী আর করা– সেই প্রতিমা এনেই পুজো করা হল।
আরও এক বছর পরে পাড়ার ননীদা এসে বললেন, ‘তোরা যদি আমার সঙ্গে থাকিস, তাহলে আমি পুজো নামিয়ে দেব।’ আমরা বন্ধুরা রাজি হয়ে গেলাম। কাজ শুরু হল। কিন্তু আমাদের মুখ দেখে কেউ চাঁদা দিতে রাজি হচ্ছিল না। তাই ঠিক হল, রবিবার ননীদাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা চাঁদা তুলতে যাব। ননীদার মুখ দেখে অনেকেই একটু বেশি চাঁদা দিতে রাজি হলেন। সেই একবারই আমি পাড়ার পুজোর কাজে সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছিলাম।
আমাদের পাড়ার মানুষ
আমাদের পাড়াটা ভীষণ ভালো ছিল। একটি ঘটনা বললেই হয়তো সেটা বোঝা যাবে।
পাড়ার এক ভদ্রলোক তখন ট্রাম কোম্পানিতে চাকরি করতেন। হঠাৎ কোনও কারণে ট্রাম কোম্পানিতে এক মাসেরও বেশি সময় ধর্মঘট চলল। তাঁর পরিবার-সন্তানাদি ছিল, তাই এক মাস কাজ না করে বাড়িতে বসে থাকার মতো অবকাশ বা সামর্থ্য তাঁর ছিল না। ধর্মঘট যেদিন শুরু হয়, তিনি সময় নষ্ট না করে তার পরের দিন সকালেই আলু নিয়ে বাগমারী বাজারে বসে গেলেন আলু বিক্রি করতে।
আশ্চর্যের বিষয়, পাড়ার প্রতিটি পরিবার তো বটেই, পাশের পাড়ার মানুষও খবর পাওয়া মাত্র তাঁর কাছ থেকে আলু কিনতে শুরু করলেন। ধর্মঘট মিটে যাওয়ার পর সেই ভদ্রলোক প্রত্যেক বাড়িতে গিয়ে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছিলেন।
এই ঘটনাটি আমার কাছে আজও আমাদের পাড়ার মানুষগুলির পারস্পরিক সম্পর্কের একটি অসাধারণ উদাহরণ।
সংসার ভাঙার দিন
বছরের সব দিন তো একরকম যায় না। আমাদের জীবনেও একদিন পরিবর্তন এল।
একদিন সকালে দেখলাম, বাবা বাজার থেকে বেশ কিছু জিনিসপত্র কিনে এনেছেন– উনুন, হাতা, কড়াই, মাছ, সবজি ইত্যাদি। মা রান্না করলেন। বাবা খেয়ে কলেজে চলে গেলেন। আমরা দুই ভাই কিছুটা বুঝলাম, কিছুটা না বোঝার ভান করলাম। তবে বুঝতে অসুবিধা হল না– আমাদের যৌথ পরিবার ভেঙে গিয়েছে।
নতুন করে জীবন শুরু হল।
এতদিন বাবা-কাকাদের নিজের সন্তান আর ভাইয়ের সন্তান– এই পার্থক্য করতে দেখিনি। এবার ধীরে ধীরে সেই পার্থক্য চোখে পড়তে শুরু করল। তবে একটা কথা সত্যি– বাবা-কাকারা নিজেরা সেই পার্থক্য করতে চাননি। পরিস্থিতিই তাঁদের বাধ্য করেছিল।
একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়ার সময় বাবা আমাদের 5/1D থেকে 5/1A-তে নিয়ে এলেন। 5/1D-তে আমাদের একটি ঘর ছিল। দাদা সেই ঘরেই শুত। গৌরীমাসি সেখানে এসে আমাদের পড়াতেন। এর প্রায় এক বছর পর গৌরীমাসিরও বিয়ে হয়ে গেল। পরে তিনি রেলে চাকরি পেয়ে লিলুয়া রেল-কলোনিতে চলে গেলেন। আমরা দুই ভাই কয়েকবার তাঁর সেই কলোনিতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। পরে তিনি ভদ্রেশ্বরে বাড়ি করে চলে যান। সেখানেও কয়েকবার গিয়েছি। মাসির বাড়িতে যেতে এবং সেখানকার সবার সঙ্গে মিশতে আমার খুব ভালো লাগত।
এই সবের মধ্যেই বাবার জ্যাঠতুতো ভাই খদ্দরকাকা কলকাতায় এসে আমাদের আগের বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। তিনি খুব গান্ধীভক্ত ছিলেন বলেই বড়রা তাঁকে ‘খদ্দর’ বলে ডাকত। খদ্দরকাকা খুব ভালো যোগাসন করতেন। পরে তাঁর নির্দেশেই আমিও যোগাসন করতে শুরু করি।
কলেজ যাওয়ার পথে
ক্রমশ আমরা বড় হতে লাগলাম। আমাদের মধ্যে দাদাই পড়াশোনায় সবচেয়ে ভালো ছিল। মেজদা অর্থাৎ কাকার ছেলেও ভালো ছাত্র ছিল। আর আমি ছিলাম পড়াশোনায় তুলনামূলক দুর্বল।
এক এক করে উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করে আমরা কলেজে ভর্তি হলাম। দাদা ভর্তি হল বঙ্গবাসী কলেজে, মেজদা গুরুদাস কলেজে আর আমি অর্থনীতিতে অনার্স নিয়ে বিদ্যাসাগর কলেজে। স্কুলের বন্ধু দেবাশীষ মিত্রও একই কলেজে ভর্তি হয়।
………………………………………
একদিন পাশের একটি বাংলো থেকে চার-পাঁচটি মেয়েকে বেরিয়ে গান গাইতে দেখলাম– ‘সামনে যা দেখি, জানি না সে কি, আসল কি নকল সোনা।’ এই দুটো লাইনই বারবার গাইছে। ঘরে ফিরে মাকে জিজ্ঞাসা করলাম। মা নির্বিকারভাবে বললেন, কয়েকটি মেয়ে এসেছিল, আলাপ করতে। তারা আমার নাম জানতে চাইলে মা না কি বলেছিলেন, ‘ওর ডাকনাম সোনা।’ আমি তখন অনেকটাই বুঝে গিয়েছিলাম ব্যাপারটা।
………………………………………
এরই মধ্যে বড়কাকা মধ্যমগ্রামে বাড়ি করে তাঁর পরিবার নিয়ে চলে যান। আবার আমার মনে একটা ধাক্কা লাগে। সংসার আলাদা হলেও পাঁচ ভাইবোনের তো দেখা হত, কথা হত, গল্প হত। সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে ভেবে প্রথম দিকে খুব মন খারাপ হত।
কাকার নতুন বাড়ির গৃহপ্রবেশের দিন বাবা ঘরজুড়ে বিরাট একটি আলপনা দিয়েছিলেন– সেটি আজও মনে আছে। পরে আমি মাঝেমধ্যেই বড়কাকার বাড়িতে যেতাম। দাদা নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ায় বাবা তাকে রাঁচিতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তাই বাড়িতে যখনই একা লাগত, আমি মধ্যমগ্রামে বড়কাকার বাড়ি চলে যেতাম। সেখানে বেশ ভালোই কাটত খুড়তুতো ভাইবোনদের সঙ্গে।
অসুস্থতা ও হাওয়া বদল
এর কিছুদিনের মধ্যেই আমার শরীর খারাপ হতে শুরু করল। বাবা আমাকে ধর্মতলায় ডাক্তার পি কে সেনের কাছে নিয়ে গেলেন। পরীক্ষা করে জানা গেল, আমার যক্ষ্মা হয়েছে।
ডাক্তার আমাকে ছ’ মাসের জন্য প্রায় ঘরবন্দি করে দিলেন। প্রতিদিন দু’বার– দিনে একবার, রাতে একবার– ইঞ্জেকশন নিতে হত। পাড়ার চারুদা এসে প্রতিদিন ইঞ্জেকশন দিয়ে যেতেন। কয়েকমাস পর ডাক্তার ইঞ্জেকশন দিনে একবার করলেন। আরও দু’ মাস পরে একদিন অন্তর। ধীরে ধীরে ওষুধ বন্ধ হল।
এরপর ডাক্তার পি কে সেন বাবাকে বললেন, আমাকে কোনও পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যেতে। বাবার কলেজের সহকর্মী ছিলেন শিল্পী গণেশ হালুই। তিনি বাবাকে একটি ঠিকানা দিয়েছিলেন– ঘাটশিলার রাজবাড়ির। বাবা কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে আমাকে ও মাকে নিয়ে ঘাটশিলা গেলেন। সেখানে পৌঁছে খাওয়া-দাওয়া সেরে দুটো সাইকেল রিকশা নিয়ে কিছুটা পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে নির্দিষ্ট বাংলোয় পৌঁছলাম। জায়গাটি ছিল বেশ নির্জন। আশেপাশে বাড়িঘর প্রায় ছিলই না। বাবা কয়েকদিনের বাজার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দিয়ে কলকাতায় ফিরে গেলেন। বলে গেলেন, দু’মাস পরে এসে আমাদের নিয়ে যাবেন। এরপর প্রয়োজনমতো আমি নিজেই বাজার করে আনতাম।
হঠাৎ একদিন দেখি খদ্দরকাকা ও কাকিমা ঘাটশিলার বাংলোয় এসে হাজির। তাঁরা এক সপ্তাহের জন্য বেড়াতে এসেছিলেন। বড় পিসেমশাই আমাকে খুব ভালোবাসতেন– হঠাৎ দেখি তিনিও আমাকে দেখতে চলে এসেছেন। প্রায় চারদিন ছিলেন ওঁরা সবাই। সেই কয়েকটি দিন দারুণ আনন্দে কেটেছিল। তারপর একে একে সবাই চলে গেলেন। আবার রইলাম– আমি আর মা।
ঘাটশিলায় আমার দু’জন বন্ধু হয়েছিল– একজন আমার সমবয়সি, আর একজন দাদার মতো। দাদার মতো যিনি ছিলেন, তাঁর সঙ্গে প্রতি রবিবার ভোরবেলা সুবর্ণরেখা নদীর ধারে হাঁটতে যেতাম।
………………………………………
একদিন সকালে বাবা জানতে চাইলেন, ‘ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?’ আমি বললাম, ‘ব্যাঙ্কে চাকরি করব।’ বাবা বললেন, ‘ঠিক আছে। তবু তুমি একবার আর্ট কলেজের অ্যাডমিশন টেস্টটা দাও।’ সত্যি বলতে, কোনওদিন ভাবিনি ছবি আঁকাকে জীবিকা হিসেবে নেব। কিন্তু ছোটবেলা থেকে বাবার কথার অমান্য করিনি। তাই পরীক্ষায় বসলাম। পাশও করলাম। ভর্তি হলাম আর্ট কলেজে, প্রথম বর্ষে।
………………………………………
আর আমার সমবয়সি ছেলেটির নাম ছিল সুব্রত। ওরাও আগে বাগমারীর সাতকড়ি মিত্র লেনে থাকত। সুব্রতর বাবা ছিলেন রেলের গার্ড। একটি ট্রেন দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। তারপর থেকে সুব্রত ও তার মা দিদিমার কাছেই থাকত। প্রতিদিন বিকেলে সুব্রত আর আমি কাছাকাছির মধ্যে ছোট ছোট পাহাড়ের ওপর বসে গল্প করতাম।
একদিন পাশের একটি বাংলো থেকে চার-পাঁচটি মেয়েকে বেরিয়ে গান গাইতে দেখলাম– ‘সামনে যা দেখি, জানি না সে কি, আসল কি নকল সোনা।’ এই দুটো লাইনই বারবার গাইছে। ঘরে ফিরে মাকে জিজ্ঞাসা করলাম। মা নির্বিকারভাবে বললেন, কয়েকটি মেয়ে এসেছিল, আলাপ করতে। তারা আমার নাম জানতে চাইলে মা না কি বলেছিলেন, ‘ওর ডাকনাম সোনা।’ আমি তখন অনেকটাই বুঝে গিয়েছিলাম ব্যাপারটা।
সুব্রতর সঙ্গে একদিন ঝরনায় স্নান করতে গিয়েছিলাম। একদিন গিয়েছিলাম ঘাটশিলার ফুলডুংরি পাহাড় দেখতে। শুনেছিলাম, হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের ‘সত্যকাম’ ছবির শুটিং না কি সেখানে হয়েছিল। আমাদের বাংলোর পাশে আরও একটি বড় বাংলো ছিল। পরে জানতে পারলাম, সেখানে ‘সন্ধ্যারাগ’ ছবির শুটিং হয়েছিল।
একদিন রাতে শুয়ে শুয়ে নানা কথা ভাবছি। হঠাৎ বাইরে দুপদাপ শব্দ শুনে ভয় পেয়ে গেলাম। মা অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। কিন্তু আমার ঘুম কিছুতেই আসছিল না। একসময় শব্দ থেমে যাওয়ায় আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে মাকে ঘটনাটি বললাম। মা একেবারে নির্বিকারভাবে বললেন, ‘ওরা তো রোজই আসে’। জানলাম, ওরা হনুমান!
কয়েকদিনের মধ্যেই বাবা এসে আমাদের কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন। কিন্তু কলকাতায় ফিরে এসেও বহুদিন ঘাটশিলার স্মৃতিগুলো মনে ছিল। সময়ের সঙ্গে অনেক স্মৃতিই যেমন মিলিয়ে যায়, আমারও অনেক কিছু মুছে গিয়েছে। তবে কিছু কিছু স্মৃতি মনের কোণে রয়ে গিয়েছে। আজ এত বছর পরে লিখতে বসে সেগুলোই আবার মনে পড়ছে।
অর্থনীতি থেকে শিল্পকলার পথে
অসুস্থতার কারণে আমার পড়াশোনার বেশ ক্ষতি হয়েছিল। ফলে অর্থনীতিতে অনার্স আর রাখা সম্ভব হল না।
একদিন সকালে বাবা জানতে চাইলেন, ‘ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?’ আমি বললাম, ‘ব্যাঙ্কে চাকরি করব।’ বাবা বললেন, ‘ঠিক আছে। তবু তুমি একবার আর্ট কলেজের অ্যাডমিশন টেস্টটা দাও।’ সত্যি বলতে, কোনওদিন ভাবিনি ছবি আঁকাকে জীবিকা হিসেবে নেব। কিন্তু ছোটবেলা থেকে বাবার কথার অমান্য করিনি। তাই পরীক্ষায় বসলাম। পাশও করলাম। ভর্তি হলাম আর্ট কলেজে, প্রথম বর্ষে।
………………………………………
HMV Company-র একটি প্রেক্ষাগৃহে আমাকে HMV-র একটি স্টিরিও সিস্টেম (Stereo 666) উপহার দেওয়া হয়। বিখ্যাত সংগীত-শিল্পী চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় আমার হাতে পুরস্কারটি তুলে দিয়েছিলেন। আমার সঙ্গে আমার বন্ধু অসিত পোদ্দার, কমলাক্ষ গঙ্গোপাধ্যায় ও সুবীর রায় গিয়েছিল পুরস্কার আনার সময়।
………………………………………
কিন্তু প্রথম দিকে কলেজে যেতে ভালো লাগত না। নিয়মিত ক্লাস করতাম না। ফলে প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার ফল ভালো তো হয়ইনি, বরং বেশ খারাপ হয়েছিল। কোনওমতে পাশ করে দ্বিতীয় বর্ষে উঠলাম।
একদিন বাবার সহকর্মী, আর্ট কলেজের অধ্যাপক সুনীল পাল আমাকে ডেকে শুধু বললেন, ‘তোমার যদি এই কলেজ ভালো না লাগে, তাহলে ছেড়ে দাও। কিন্তু তোমার বাবার মান-সম্মান নষ্ট করার কোনও অধিকার তোমার নেই।’
সুনীলবাবুর কথায় আমার পায়ের তলার মাটি যেন কেঁপে উঠেছিল।
সেই মুহূর্তে প্রথম উপলব্ধি করলাম– সত্যিই তো, বাবাকে অপমানিত করার আমি কে? তারপর থেকে মন দিয়ে ক্লাস করা শুরু করলাম। নিয়মিত অনুশীলন শুরু করলাম।
কলেজে আমার প্রথম বন্ধু হয়েছিল মনোজ পাল, আদিত্য বসাক, নীতিশ রায় ও অভিজিৎ গুপ্ত। দ্বিতীয় বর্ষে নতুন বন্ধু হল নির্মল– নির্মলেন্দু মণ্ডল। নির্মল খুব ভালো স্কেচ করতে পারত। আমার বাবা কলেজের অধ্যাপক হওয়ায় নির্মল মাঝেমধ্যেই আমাদের বাগমারীর বাড়িতে আসত। বাবা একদিন নির্মলকে বলেন, ‘তুই প্রতি রবিবার অনুপকে নিয়ে যাস স্কেচ প্র্যাকটিস করতে।’ সেইমতো প্রায় প্রতিটি ছুটির দিন আমরা বেরিয়ে পড়তাম স্কেচ করতে। আজ আমি নিঃসংকোচে বলতে পারি, গাছ, মানুষ, প্রকৃতি– এসব আঁকা আমি নির্মলের কাছ থেকেই শিখেছি।
দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় পাঁচজন প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছিল। আমি তাদের একজন ছিলাম।
তৃতীয় বর্ষ থেকে আমরা শিল্পের বিভিন্ন শাখায় ভাগ হয়ে গেলাম। আমি, মনোজ, আদিত্য ও অভিজিৎ গেলাম ‘Applied Arts’ বিভাগে। নির্মল, নীতিশ ও রবীন তালুকদার গেল ‘Fine Arts’ বিভাগে। আর ভাস্কর্য অর্থাৎ ‘Sculpture’ বিভাগে গেল স্বপন, জনার্দন, জগন্নাথরা।
সেই সময় আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে দূরদর্শনে একটি অনুষ্ঠানও হয়েছিল। আমি, পার্বতী, কমলাক্ষ, জগন্নাথ ও স্বপন অংশ নিয়েছিলাম। পরিচালনা করেছিলেন পঙ্কজ সাহা। তখন সাদা-কালো দূরদর্শনের যুগ।
একদিন হঠাৎ কলেজের নোটিস বোর্ডে একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল। HMV-র পক্ষ থেকে একটি আর্ট কম্পিটিশনের আয়োজন করা হয়েছে। আমরা অনেকেই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং সেইমতো ছবি জমা দিলাম। এরপরই পুজো এসে গেল। পুজোর পর আমাদের কলেজ থেকে প্রতি বছর তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষামূলক ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হত। সব ছাত্রছাত্রীর খরচ রাজ্য সরকার বহন করত।
আমরাও রওনা দিলাম। নিউ জলপাইগুড়ি হয়ে কালিম্পং, কালিম্পং থেকে দার্জিলিং, তারপর হাওড়া হয়ে বাড়ি। বাড়ি ফিরে পরদিন কলেজ যাওয়ার সময় বাবা বললেন, ‘একবার কলেজে খোঁজ নিস, কম্পিটিশনের ব্যাপারে কেউ কিছু জানে কি না!’ আমি কাউকে কিছু না জানিয়ে সোজা HMV-র অফিসে গেলাম। সেখানে কাগজপত্র দেখে তাঁরা বললেন, ‘পেইন্টিংয়ে প্রথম হয়েছেন অনুপ রায়। ফোটোগ্রাফিতে প্রথম হয়েছেন অজয় ঘোষ।’ তারপর কলেজে ফিরে দেখি, অনেকেই ইতিমধ্যে খবরটি জেনে গিয়েছে।
এরপর HMV Company-র তরফ থেকে আমাকে জানানো হয় যে, তারা প্রথম স্থানাধিকারীদের পুরস্কৃত করতে চায়। নির্দিষ্ট দিনে দক্ষিণ কলকাতায় HMV Company-র একটি প্রেক্ষাগৃহে আমাকে HMV-র একটি স্টিরিও সিস্টেম (Stereo 666) উপহার দেওয়া হয়। বিখ্যাত সংগীত-শিল্পী চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় আমার হাতে পুরস্কারটি তুলে দিয়েছিলেন। আমার সঙ্গে আমার বন্ধু অসিত পোদ্দার, কমলাক্ষ গঙ্গোপাধ্যায় ও সুবীর রায় গিয়েছিল পুরস্কার আনার সময়। ওরাও খুব উৎসাহী ছিল আমার এই পুরস্কারের ব্যাপারে।
………………………………………
জানতে পারলাম, মৃণাল সেন তাঁর আসন্ন ছবি ‘কোরাস’-এর একটি ছোট দৃশ্যের জন্য কয়েকজন তরুণ ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে কাজ করতে চান। আমাদের যে দৃশ্যটিতে অভিনয় করতে হবে, সেখানে কোনও সংলাপ ছিল না। আমাদের মূল কাজ ছিল ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এবং দৃশ্যটির আবহ তৈরি করা। সেই সময়ের বিশিষ্ট অভিনেতা অনুপকুমার আমাদের সাজিয়ে-গুছিয়ে অভিনয়ের জন্য প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন।
………………………………………
HMV-র সেই স্টিরিও সিস্টেমটি আজও আমার কাছে আছে। এত বছর পেরিয়ে গেলেও সেটিকে দেখলে সেই প্রতিযোগিতা, কলেজ-জীবনের সেই দিনগুলি এবং প্রথম পুরস্কার পাওয়ার আনন্দের কথা মনে পড়ে।
চতুর্থ বর্ষে কলেজ থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আগ্রার বিভিন্ন জায়গায়, রাজস্থানের আমের ফোর্ট, চিত্তোর দুর্গ এবং আরও নানা স্থানে। সেখান থেকে আমেদাবাদ, নাগপুর হয়ে হাওড়ায় ফিরলাম। সেই ভ্রমণটি ভীষণ ভালো লেগেছিল। মোরে বাবু নামে আমাদের একজন অধ্যাপক ছিলেন– তিনিই আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন।
শেষ বছরে কলেজ থেকে আমাদের কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই ভ্রমণে আমাদের সঙ্গে ছিলেন বাধন দাস– আমরা তাঁকে ‘বাধনদা’ বলেই ডাকতাম।
কলেজে প্রতি বছর বাৎসরিক পরীক্ষার পর একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। আমি দু’বার সেই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। একবার ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’, পরের বছর ‘শাপমোচন’।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি ঘটনা না বললেই নয়। কলেজের চতুর্থ বর্ষে আমার বন্ধু অভিজিৎ গুপ্ত একদিন আমাকে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেনের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। অভিজিৎ স্কুলজীবন থেকেই মৃণাল সেনের ছেলে কুণাল সেনের বন্ধু ছিল। সেই সূত্রেই তার মৃণালবাবুর বাড়িতে যাতায়াত ছিল এবং সেদিন আমিও তার সঙ্গে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। মৃণাল সেনের বাড়িতে ঢুকে আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, আমার সহপাঠী নীতিশ, মনোজ ও পার্বতী আগে থেকেই উপস্থিত। কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারলাম, মৃণাল সেন তাঁর আসন্ন ছবি ‘কোরাস’-এর একটি ছোট দৃশ্যের জন্য কয়েকজন তরুণ ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে কাজ করতে চান। ছবিটি ছিল বেকারত্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক চলচ্চিত্র। আমাদের যে দৃশ্যটিতে অভিনয় করতে হবে, সেখানে কোনও সংলাপ ছিল না। শুধু সেই সময়ের তরুণ প্রজন্মের কয়েকটি মুখের ক্লোজ-আপ শট দেখানো হবে। অর্থাৎ আমাদের মূল কাজ ছিল ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এবং দৃশ্যটির আবহ তৈরি করা। সেই সময়ের বিশিষ্ট অভিনেতা অনুপকুমার আমাদের সাজিয়ে-গুছিয়ে অভিনয়ের জন্য প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন। সেদিনই তাঁর বাড়িতে আমাদের সেই দৃশ্যের শুটিং হয়ে গেল। ঘটনাটি খুব বড় কিছু ছিল না, কিন্তু আমার ছাত্রজীবনের স্মৃতিতে সেটি বিশেষভাবে জায়গা করে নিয়েছে।
কলেজজীবনের শেষ রাত
কলেজের একটি ঘটনা দিয়ে আমার এই আখ্যান শেষ করতে চাই। আমাদের কলেজে প্রতি বছর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ছাত্রছাত্রীদের কাজের একটি প্রদর্শনী হত, যা ২ জানুয়ারি পর্যন্ত চলত। কলেজের শেষ বছরের সেই প্রদর্শনীর দায়িত্ব পড়েছিল আমাদের ওপর। কলেজের নিয়মই ছিল– যারা সেই বছর পাশ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে, তাদেরই প্রদর্শনীর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা ঠিক করেছিলাম সারারাত জেগে সব কাজ শেষ করে ফেলব। কিন্তু বাস্তবে রাত তিনটের মধ্যেই আমাদের কাজ শেষ হয়ে যায়। তারপর বাকি রাতটুকু কলকাতার রাত কেমন দেখতে, তা দেখার জন্য আমরা এদিক-ওদিক ঘুরতে বেরলাম। শেষে ক্লান্ত হয়ে ময়দানে গিয়ে বসেছি– কিছুক্ষণ পর দেখি কয়েকজন লোক এবং সঙ্গে কিছু মহিলা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আমরা বাকিরা না বুঝলেও আমাদের বন্ধু অসিত বুঝেছিল যে, ওরা নিষিদ্ধপল্লির। হঠাৎ অসিত চিৎকার করে বলল, ‘পালা!’ অসিতের গলা শুনে আমরাও দৌড়ে ময়দান চত্বর থেকে বেড়িয়ে কলেজের গেটে এসে দাঁড়ালাম। তারপর ধীরে ধীরে সূর্য উঠল। বাস চলতে শুরু করল। আমরা যে যার বাড়ি ফিরে গেলাম।
বিকেলে আবার কলেজে গেলাম। প্রদর্শনীর উদ্বোধন হল। উদ্বোধন করেছিলেন বিশিষ্ট ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজ।
এরপর শুরু হল পরীক্ষার প্রস্তুতি। মার্চ মাস পর্যন্ত পরীক্ষা চলল। নির্দিষ্ট দিনে ফল বেরল এবং আমাদের কলেজজীবন শেষ হল। এবার শুরু জীবনযুদ্ধ। আমরা বন্ধুরা সকলেই তখন নিজেদের কর্ম-জগতের খোঁজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বিজ্ঞাপনের এজেন্সিতে যোগ দিল, কেউ স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করল, কেউ আবার সিনেমা জগতে আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দিল, আর কেউ কেউ সংবাদপত্রে নিজেদের কর্মজীবন শুরু করলাম।
আজ এত বছর পরে ফিরে তাকালে মনে হয়, মানুষের জীবনে ছেলেবেলা আসলে একটি নির্দিষ্ট বয়সে শেষ হয় না। ধীরে ধীরে নানা দায়িত্ব, বিচ্ছেদ, অসুখ, পড়াশোনা, সম্পর্ক, স্বপ্ন ও বাস্তবতা এসে তাকে বদলে দেয়। একসময় হঠাৎ বুঝতে পারি, আমরা আর সেই মাঠে ফুটবল-খেলা ছেলেটি নই, আর সেই ভোরবেলায় রেডিওতে মহিষাসুরমর্দিনী শুনতে ছুটে যাওয়া শিশুটিও নই। কলেজের শেষ পরীক্ষার ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে যেন জীবনের একটি দরজা বন্ধ হয়ে আরেকটি দরজা খুলে গেল। সামনে তখন কর্মজীবন, দায়িত্ব, অনিশ্চয়তা এবং নিজের পরিচয় তৈরি করার সংগ্রাম। প্রতিটি মানুষের জীবনযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার ছেলেবেলার অবসান ঘটে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই।
তবু আজ এত বছর পরে পিছন ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার ছেলেবেলা আসলে কোথাও হারিয়ে যায়নি। বাগমারীর সেই মাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল-ক্রিকেট, অজিতের স্মৃতি, দেবাশীষের বন্ধুত্ব, পরেশদার হারমোনিয়াম, দাদুর লাঠি, নরেনদার ইঁদুরের গল্প, পুজোর প্রতিমা, মহালয়ার ভোর, রাঁচির বড় বাড়ি, ঘাটশিলার পাহাড়, সুবর্ণরেখার ধারে হাঁটা, সুব্রতর সঙ্গে বন্ধুত্ব– সবই আমার মধ্যে কোথাও না কোথাও রয়ে গিয়েছে। আর হয়তো সেইসব মানুষ, সেইসব দিন, সেইসব ছোট ছোট ঘটনা সব মিলেই অজান্তে আমাকে গড়ে তুলেছে, আমার জীবনদর্শনকে আকার দিয়েছে। আজ যখন ছবি আঁকি, যখন কোনও মুখ, গাছ, নদী, পাহাড় কিংবা কোনও সাধারণ মানুষের জীবন আমার চোখে ধরা পড়ে, তখন হয়তো সেই ছোট্ট বাগমারীর ছেলেটিই আমার ভিতরে কোথাও থেকে তাকিয়ে থাকে।
জীবন অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ছেলেবেলাটা এখনও আমার সঙ্গে হাঁটে।
……………………
পড়ুন শারদ সংখ্যা-র অন্যান্য লেখা
……………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved