

গ্রিক ভাষা ও সাহিত্য এমনভাবে গুলে খেয়েছেন যে, তাঁকে নতুন এক আঙ্গিক খুঁজে নিতেই হত। তাই তিনি দীর্ঘ অধ্যবসায়ে উদ্ভাবন করেছেন এক মিশ্রমাধ্যম। যেখানে গোটা কবিতার বই আসলে একটা উপন্যাস বা সিনেমার মতো। যদিও প্রকীর্ণ কবিতার প্রাণ সেখানে আছে। তাঁর কাব্যে তিনি অনায়াসে মিলিয়ে দিয়েছেন লিরিক, গান, তাংগো নাচের তাল ও গমন। মিশিয়ে দিয়েছেন প্রাচীন গ্রিক নাটকের আঙ্গিক, চিঠি ও প্রবন্ধ।
তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ২০১৭ সালে। পরোক্ষে। স্বাভাবিক। তিনি দূরের কবি। নাম একেবারেই অজানা। আমাদের বাংলা কবিতার যে আটপৌরে ধারণা সে তো মূলত ছোট প্রকীর্ণ লিরিক-প্রাণ। তাতে নির্মাণ কম। সে আত্মজীবন খোঁজে। আমাদের সময়ে কবিরা প্রেমে পড়ে ও ব্যর্থ হয়েই কবিতার প্রেরণা খুঁজেছেন। সেখানে অ্যান কারসন একেবারেই মানচিত্রে আসেন না।
২০১৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার ৭০ বছরে এক কবিতা রেসিডেন্সিতে ডাক পাই। সেই প্রকল্পে আমাকে এক যৌথ কবিতার বই লিখতে হয় ইংরেজ কবি ও চিত্রশিল্পী নিকি আরস্কটের সঙ্গে। সেই বই লেখার প্রথম দফা হয় ওয়েলসে, অ্যাবারেস্টউইথ নামক সমুদ্র শহরে। নিকির সঙ্গে প্রথম কাজের বৈঠকেই উঠে আসে তার পরিচয় এবং সেই ঘটনাতেই জানতে পারি, নিকি– অ্যান কারসন-এর প্রত্যক্ষ ছাত্রী। সৃষ্টিশীল লেখার মাস্টার্স ডিগ্রি ক্লাসে। মার্কিন দেশে। আমি কারসনের নাম শুনিনি বলায় সে কেমন দমে যায়। আর সেই প্রথমদিন থেকেই শুরু হয় ঘোষিত মৌলবাদী এই বাঙালি কবিকে কারসোনায়িত করার কাজ।

পরের দিনই ওয়ার্কশপে সে নিয়ে আসে ‘ডিক্রিয়েশন’ নামক এক মোটা বই। ‘মোটা’– কারণ বইটি স্প্যানিশ ইংরেজি দ্বিভাষী। যেহেতু আমার দখলের ভাষা স্প্যানিশ, তাই আমার সুবিধে হবে ভেবে সে ওই বই দিয়ে আমার ‘অ্যানপ্রাশন’ ঘটায়। যদিও বইটা সে ধার দিয়েছিল। আর তার কয়েকদিনের মধ্যে সে আমাকে উপহার দিয়েছে ‘রেড ডক>’ নামক আরেকটি বই। কবিতার। আমার কেমন অচেনা লাগে সেই কবিতার ধাঁচ। ‘রেড ডক>’ কি কাব্যোপন্যাস? না। একটা কাহিনির আভাস থাকলেও প্রতিটা অংশ পড়া যায় বিচ্ছিন্ন কবিতা হিসেবে। এতে রয়েছে প্রবন্ধ। রয়েছে লিরিক কবিতা। রয়েছে দীর্ঘ কবিতা।
‘ডিক্রিয়েশন’-এ ছিল চিঠি প্রবন্ধ ও কবিতার এক মেধাবী মিশ্রণ। তবে সে প্রবন্ধ কোনও কেজো গদ্যের নয়। এই ধারাটির নাম ‘ভার্স এসে’ (Verse essay)। আছে নাটকের মতো দৃশ্য ও সংলাপ। কিন্তু এতকালের প্রচলিত কোনও ধারাতেই এই বইকে ফেলা যাবে না। এ এক মিশ্র মাধ্যম।

তবে আমার এই সাধারণ আলাপ এক চিরস্থায়ী সংলাপে পরিণত হল নিকির দেওয়া আরেকটা বইতে– ‘Men in the Off Hours’। ২০০০ সালে প্রকাশিত এই কবিতার বইটির জন্য কারসন পশ্চিমা কবিতার সবচেয়ে ঘ্যাম সম্মান ‘গ্রিফিন’ পুরস্কার পান। এই বইটিতেই অ্যান কারসন সবচেয়ে জোরালোভাবে নিজের স্বর খুঁজে পেলেন। এখানেও আছে কবিতা ও গীতল গদ্যের মিশ্রণ। গীতল প্রবন্ধ। কিন্তু বইয়ের নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে– এখানে আছে এক প্রচ্ছন্ন কৌতুকবোধ। যা তাঁর প্রথম মিশ্র কবিতার বই ‘Autobiography of Red’-এ (১৯৯৮) শুরু হলেও যেন ‘অবসর সময়ে পুরুষেরা’ বইটিতে এসে সে এক শিখর স্পর্শ করল। সমালোচকেরা বলেন– এটি একটি উপন্যাস এবং একটি কবিতা। আমাদের বাংলাভাষার ছটফটে তরুণ কবির জয়গান করা সংস্কৃতির জন্য অ্যান কারসন এক অন্য শিক্ষা। তাঁর জন্ম ১৯৫০ সালে। তাঁর প্রথম প্রধান কবিতাবই ১৯৯৮ সালে। ২০০০ সালে প্রকাশিত হল ‘অবসর সময়ে পুরুষেরা’। কবির বয়স ৫০! ২০০১ সালে বেরল ‘The Beauty of the Husband: A Fictional Essay in 29 Tangos’। এ এক আখ্যায়িত গীতল কবিতার বই। এই বইয়ের আবেদন এমনই তীব্র যে, ইংরেজি ভাষার কবিতার তখনও অবধি সবচেয়ে রক্ষণশীল প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার ‘টি এস এলিয়ট প্রাইজ’ জয় করা প্রথম মহিলা কবি হয়ে ওঠেন অ্যান কারসন (এতে অবশ্য এলিয়ট প্রাইজের দৈন্যই প্রমাণিত হয়)।

নিকি আমাকে বুঝিয়েছিল, অ্যান কারসনের কবিতা আসলে এক ধ্রুপদী দুষ্টুমি! তিনি প্রাচীন গ্রিক (প্রকাশ্যে না বললেও তাঁর সমস্ত ছাত্রই জানেন লাতিন ভাষাও আছে তাঁর জ্ঞানভাণ্ডারে) ভাষা ও সাহিত্য এমনভাবে গুলে খেয়েছেন যে, তাঁকে নতুন এক আঙ্গিক খুঁজে নিতেই হত। তাই তিনি দীর্ঘ অধ্যবসায়ে উদ্ভাবন করেছেন এই মিশ্রমাধ্যম। যেখানে গোটা কবিতার বই আসলে একটা উপন্যাস বা সিনেমার মতো। যদিও প্রকীর্ণ কবিতার প্রাণ সেখানে আছে। তাঁর কাব্যে তিনি অনায়াসে মিলিয়ে দিয়েছেন লিরিক, গান, তাংগো নাচের তাল ও গমন। মিশিয়ে দিয়েছেন প্রাচীন গ্রিক নাটকের আঙ্গিক, চিঠি ও প্রবন্ধ। তাঁর সমস্ত বইয়ের নামই তাই অভিনব। ‘The Beauty of the Husband: A Fictional Essay in 29 Tangos’। ‘Decreation: poetry, essay, opera’।

তাঁর বই খুললে প্রচলিত কবিতা-পাঠকের জন্য বেশ জোরালো প্রতিরোধ অপেক্ষা করে আছে। যেমন ধরা যাক, ‘Autobiography of Red’ বইয়ের শুরুতে লেখা আছে কাব্যোপন্যাস। কিন্তু বই খুললেই তাতে আখ্যানের নামগন্ধ পেতে পড়তে হয় অজস্র পাতা। বইয়ের কয়েক পৃষ্ঠা এগনোর পরেই ‘Appendix A’, ‘Appendix B’ ও ‘Appendix C’ অর্থাৎ এগিয়ে যাওয়ার আগে আমাদের মন দিতে হবে পরিশিষ্টে। বইয়ের ২১-তম পাতায় গিয়ে পাঠক আবিষ্কার করবেন ‘Autobiography of Red: A romance’। মজা হল এ রোমান্স তো লাতিনের রোমান্স। অর্থাৎ এখানে নাটকের মতো সংলাপ থাকতে পারে, গান থাকতে পারে। যদিও এ কাব্যোপন্যাস আমাদের নতুন পুরাণ নির্মাণের দিকে নিয়ে যায় শেষ অবধি। নায়ক Geryon আসলে এক বালক এবং লাল ডানাওয়ালা দৈত্য। ‘The Beauty of the Husband: A Fictional Essay in 29 Tangos’ এক ভাঙা বিয়ের কাহিনির ছাঁচ বহন করে। প্রতিটা টুকরো দীর্ঘ ও হ্রস্ব পঙ্ক্তির এক বিচিত্র প্রয়োগ– যা আসলে তাংগো নাচের তালের সঙ্গে মিলিয়ে নির্মাণ করা।

একজন বড় কবির পরিচয়– তাঁর কাজের প্রভাব কতটা পড়েছে অনুজাত কবিদের উপর। কারসনের ছাত্রছাত্রীরা সে পরিচয় বহন করে চলেছেন। আমার সহকবি নিকি নির্মাণ করেছেন ইংরেজি ভাষার প্রথম কবিতা কমিক্স। গ্রাফিক নভেলের কবিতাজন্ম। অ্যালিস অসোয়াল্ড নির্মাণ করেছেন ‘ইলিয়াড’-এর মৃত সমস্ত চরিত্রদের নিয়ে তাঁর বিখ্যাত কবিতার বই ‘মেমোরিয়াল’।
দীর্ঘকাল পড়িয়েছেন কারসন। প্রাচীন গ্রিক। যদিও ২০১৪ সালের মধ্যে তিনি ইংরেজি ভাষার সমস্ত পুরস্কারই পেয়েছেন। গ্রিফিন, এলিয়ট ও গুগেনহাইম ফেলোশিপ, ম্যাকআর্থার গ্রান্ট (যাকে মার্কিনরা ‘জিনিয়াস গ্রান্ট’ বলে ডাকেন)। তবুও তাঁর সমস্ত বইয়ের লেখক পরিচিতিতে লেখা থাকে দু’টি লাইন: ‘জন্ম কানাডায়, প্রাচীন গ্রিক ভাষা পড়িয়ে জীবনধারণ করেন’। জানি না তাঁর বইয়ের উপর নোবেলের সোনালি গোল ছাপ তাঁকে কতটা বিব্রত করবে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved