about a rare tagore venyle record ekti raktim marichika | Robbar
Robbar
  • ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ১২ অক্টোবর ২০২৬

একটি হারানো রবীন্দ্র-রেকর্ড

১৯৭৬-এর একটি অনুষ্ঠান এবং ১৯৮৩-র একটি রেকর্ড নির্মাণ। একই সুরে, লয়ে, ছন্দে, রঙে বিন্যস্ত। রবীন্দ্ররচনা পরিবেশনার ভাবনাটি যতখানি অভিনব, তার চেয়েও বিস্ময়কর হল এই ভাবনার রূপায়ণের প্রক্রিয়াটি। ১৯৭৬-এর অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা এবং শঙ্খ ঘোষের গ্রন্থনায়, সুভাষ চৌধুরীর সংগীত পরিচালনায় ’৮৩-তে তার ধ্বনিমুদ্রিত রূপের বাস্তবায়ন আমাদের একইসঙ্গে বিস্মিত, আনন্দিত করে।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ১২, ২০২৬, ১৯:৫২   
Facebook WhatsApp Messenger

অনেক কিছুই ছেড়ে ছেড়ে যেতে হয় আমাদের। মানবসভ্যতার ইতিহাসই তো পুরনোকে ছেড়ে নতুনকে আঁকড়ে ধরার নিরবচ্ছিন্ন যাত্রা। কিন্তু তাই বলে যা যায়, তা কি একেবারেই যায়? কোথাও কি থাকে না তার কোনও চিহ্ন, চর্চা বা তাকে ফিরে পাওয়ার কোনও আকাঙ্ক্ষা? না, সব হারিয়ে যায় না একেবারে। আজকের বৈদ্যুতিন প্রযুক্তি শাসিত পৃথিবীতেও আমরা বিশ্বাস করি পুরনো গান, পুরনো কথা, পুরনো প্রেম, পুরনো ভালোবাসা কিছুই একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় না। কোথাও না কোথাও, কোনও না কোনওভাবে, কেউ না কেউ সেসব বাঁচিয়ে রাখে বুকের রক্তিম ভালোবাসা দিয়ে। পুজো এলেই যেমন মহালয়া শোনার জন্য ডাক পড়ে রেডিও-সারাইওয়ালার, তেমনই কখনও কখনও শ্রান্ত অবসরে মনে পড়ে দম দেওয়া কলের গানের কথা, সুখী গৃহকোণে গ্রামোফোনের অবিসংবাদী উপস্থিতি, বাঙালির বৈঠকখানায় পান্নালাল-দিলীপকুমার রায় বা সুধীরলাল চক্রবর্তী, অখিলবন্ধু ঘোষের অনায়াস আসা-যাওয়া। আমার এসব কথার খেই ধরে আমাদের স্মৃতির যাত্রা পিছন দিকে ছুটে যাবে কয়েক দশক। খুব বেশিদিনের কথা তো নয়! মাত্র ৪৩ বছর আগের কথা বলছি। আজকের এই লেখায় আমরা গত শতকের নবম দশকে তৈরি হওয়া এমন একটি সংকলনের (১৯৮৩) কথা বলব যেটি রবীন্দ্রসৃষ্টির শ্রবণীয় উপস্থাপনার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী এবং অভিনব। তার আগে আরও আগের কিছু কথা বলে নেওয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না। 

zoom
হেমেন্দ্রমোহন বসু

১৮৭৭ সালে টমাস আলভা এডিসন (১৮৪৭-১৯৩১) আমাদের হাতে ধ্বনিকে বন্দি করার একটি কল তুলে দিলেন নেহাত আকস্মিকভাবে। ইনিই সেই ব্যক্তি যিনি বৈদ্যুতিক বাল্ব আবিষ্কার করে রাতের অন্ধকার পৃথিবীকে আরও একটু আলো-ঝলমলে করে তুলতে পেরেছিলেন। শব্দকে (sound) ধরে রাখার সেই কলের কী নাম দেবেন, তা তিনি তখনই ঠিক করে উঠতে পারেননি। তাঁর পরীক্ষাগারের ডায়েরিতে প্রায় ২০টা সম্ভাব্য নাম লিখে রেখেছিলেন তিনি। সেসবের মধ্যে থেকে ‘ফোনোগ্রাফ’ নামটিই চালু হয়ে যায়। ফোনোগ্রাফের আবিষ্কার মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। শব্দ বা ধ্বনিকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের এই পদ্ধতি আবিষ্কারের আগে একমাত্র লেখা বা ছবি আঁকার মাধ্যম ছাড়া, আমাদের বাচিক শব্দের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার কোনও পথ ছিল না আমাদের সামনে। ধ্বনি ধারণের সেই প্রযুক্তি যখন ভারতে এল, তাকে যাঁরা প্রথম ব্যবহার করলেন, সেই প্রযুক্তির সম্ভাবনার ছাই উড়িয়ে যাঁরা দেখতে চাইলেন– তাঁদের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে কয়েকজন বাঙালির নাম। প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ফোনোগ্রাফ যন্ত্রের নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাঁরই দেখাদেখি তাঁর ভাগনে যন্ত্রবিৎ হেমেন্দ্রমোহন বসু তো ভারতে প্রথমদিককার এই ধ্বনিধারণ প্রযুক্তিকে একবারে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে কাজে লাগিয়ে ফোনোগ্রাফে বাজানোর উপযুক্ত সিলিন্ডার রেকর্ড (Pathe-H. Bose’s Record) তৈরির কোম্পানি (ধর্মতলার মার্ব্‌ল হাউজে তাঁর দোকানের নাম ছিল The Talking Machine Hall) খুলেছিলেন।

zoom
The Talking Machine Hall-এর বিজ্ঞাপন

সেই কোম্পানি থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সিলিন্ডার রেকর্ড তৈরি করেছিলেন হেমেন্দ্রমোহন। এখানে বলে রাখা ভালো যে, হেমেন্দ্রমোহনের আগে জগদীশচন্দ্রই প্রথম রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠ রেকর্ডে ধরে রেখেছিলেন। রথীন্দ্রনাথ তাঁর ‘পিতৃস্মৃতি’-তে লিখেছেন, “যৌবন বয়সে বাবা কী মিষ্টি অথচ জোরালো গাইতে পারতেন, লোকে তাঁর গান শোনার জন্য কিরকম পাগল হয়ে যেত, যারা না শুনেছে তারা কল্পনা করতে পারবে না। গ্রামোফোন তখন আবিষ্কার হয়নি, তাঁর গলার রেকর্ড কয়েকটি মাত্র আছে, কিন্তু তাও বৃদ্ধবয়সে নেওয়া, তখন গলা পড়ে গেছে। তখনকার দিনে ফোনোগ্রাফ নামে মেশিন ছিল, মোমের সিলিণ্ডারের উপর রেকর্ড উঠত। তার নকল নেওয়া যেত না। ‘কুন্তলীন’-এর এইচ. বোস এই মেশিন এ দেশে আমদানি করেন। তিনি বাবার গলার বিস্তর রেকর্ড নিয়েছিলেন।”

zoom
পাথে থেকে প্রকাশিত ‘বন্দে মাতরম্‌’ রেকর্ড

হেমেন্দ্রমোহনের নানাবিধ ব্যবসায়িক উদ্‌যোগের অন্যতম ছিল ‘কুন্তলীন’ নামের মাথার চুলে মাখার তেল, ‘কুন্তলীন’ নামে সাহিত্য পুরস্কারও তিনি চালু করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের এই রেকর্ডিংয়ের স্মৃতি ধরা আছে অমল হোমের লেখায়, “মনে পড়ে শিবনারায়ণ দাস লেনে হেমেন্দ্রমোহনের বাসভবনে যেদিন কবি গান দিতে আসতেন, কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটের মুখ থেকে সে সরু গলির দু’ধারে লোক দাঁড়িয়ে যেত। আর আমরা ছেলেরা বসু মশায়ের বাড়িতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। রেকর্ড নিখুঁত করবার জন্য কখনো কখনো রবীন্দ্রনাথ যখন একটি গান দু’বার গাইতেন, তখন আমাদের সে অপ্রত্যাশিত আনন্দের সীমা থাকত না।” এটা যে-সময়ের কথা সেটা বিশ শতকের একেবারে শুরুর সময়। সিলিন্ডার রেকর্ডেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম্‌’ রেকর্ড করা হয়। 

zoom
zoom
হেমেন বসুর ‘কুন্তলীন’ তেলের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথের বয়ান

১৯০১ সালে প্রথম গ্রামোফোন কোম্পানি (তখন নাম ছিল গ্রামোফোন অ‍্যান্ড টাইপরাইটার কোম্পানি, পরে সে-নাম বদলে গ্রামোফোন কোম্পানি লিমিটেড হয়, যাকে আপামর রসিক শ্রোতা ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ বা ‘এইচএমভি’ নামে চেনেন আজও) তাদের শাখা অফিস খোলে কলকাতায়। এদের রেকর্ডগুলো আকৃতিতে কানা ছাড়া চ্যাপ্টা থালার মতো। সিলিন্ডার রেকর্ড দেখতে বেলানাকৃতি– ‘প্রবাসী’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা শান্তা দেবীর বর্ণনায় ‘গেলাসের মতো’ রেকর্ড। কলকাতার এই গ্রামোফোন কোম্পানিই পরবর্তী প্রায় নয় দশক যাবৎ ভারত-সহ সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গ্রামোফোন রেকর্ডের অবিসংবাদী ঠিকানা হয়ে ওঠে। পরে নানা সময়ে অবশ্য আরও নানা রেকর্ড কোম্পানি তাদের গ্রামোফোন রেকর্ডের পসরা সাজিয়ে বসে কলকাতায়, যাদের মধ্যে হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি এবং মেগাফোন দু’টি সফল বাঙালি ব্যবসায়িক উদ্‌যোগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। গ্রামোফোন কোম্পানি ব্রিটিশ ব্যবসায়িক উদ্‌যোগ। কিন্তু হেমেন্দ্রমোহন যে-কোম্পানি খুলেছিলেন– সেটি ফরাসি প্যাথেফোন কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতায় রেকর্ড বাজারজাত করত, রেকর্ড ছাপানো হত ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামে। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে যে-সময়ে হেমেন্দ্রমোহন তাঁর রেকর্ড কোম্পানি তৈরি করেছিলেন, সেটা ভারতের পরাধীনতার সময়। তাই গ্রামোফোন কোম্পানির মতো একটা ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে গাঁটছড়া না বেঁধে ফরাসি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবসায়িক উদ্‌যোগে বৃত হওয়ার নেপথ্যে  তাঁর এক ধরনের ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবেরও পরিচয় পাই আমরা। প্রসঙ্গত জগদীশচন্দ্রের আর-এক ভাগনে বিজ্ঞানী দেবেন্দ্রমোহন বসুর লেখা থেকে খানিকটা উদ্ধৃত করা যাক, ‘বঙ্গ-বিভাগের বিরুদ্ধে জন-আন্দোলন গড়ে উঠবার ফলে রাজনীতিতে স্বরাজ লাভের আর শিক্ষা ও শিল্পে স্বদেশী আন্দোলনের জন্ম। এতে আমাদের গোষ্ঠীও প্রভাবিত হয়।… রবীন্দ্রনাথ ওই আন্দোলনের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হয়ে যান আর তাঁর বিখ্যাত স্বদেশী গানগুলি ওই সময়কার রচনা। তিনি তাঁর সর্বাধুনিক গানগুলি গেয়ে শোনানোর জন্য আচার্য জগদীশচন্দ্রের গৃহে একদিন অন্তর আসতেন। হেমেন্দ্রমোহন বসু সেইসব গান মোমের রেকর্ডে বাণীবদ্ধ করে রাখতেন। দুর্ভাগ্যবশত ঐগুলি থেকে ধাতব ম্যাট্রিকস তৈরির কলা কৌশল এদেশে প্রচলন হবার আগেই ঐ সব রেকর্ডের গুণগত উৎকর্ষ নষ্ট হয়ে যায়।’

zoom
পাথে থেকে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ রেকর্ড

জগদীশচন্দ্র-হেমেন্দ্রমোহনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের এই সখ্য এবং স্বদেশিয়ানার প্রভাব রবীন্দ্রনাথকে প্রায় আড়াই দশক গ্রামোফোন কোম্পানির থেকে দূরেই রেখেছিল। গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে যখন সে-যুগের বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান একের পর এক রেকর্ডে প্রকাশিত হচ্ছে এবং সেইসব গানের বাণী এবং সুরের বিকৃতি রবীন্দ্রনাথকে পীড়িত করছে, সেই রকম সময়ে ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথের সলিসিটর খগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের তরফে গ্রামোফোন কোম্পানিকে অভিযোগ জানিয়ে তাঁর রয়‍্যালটি দাবি করেছিলেন। এইভাবে গ্রামোফোন কোম্পানি কলকাতায় তাদের কাজকর্ম শুরু করার দেড় দশক পরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ তৈরি হয় কিছুটা বিরূপ আবহাওয়ায়। শেষ পর্যন্ত ১৯২৬ সালের ৫ অক্টোবর এইচএমভির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠ তাদের রেকর্ডে ধারণ করার ব্যাপারে চুক্তি হলে এই দ্বৈরথের অবসান ঘটে। ১৯২৬-এ রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠ রেকর্ড করে এইচএমভি, রবীন্দ্রনাথের অনুমোদন নিয়ে সাহানা দেবী, দিনেন্দ্রনাথের গানও রেকর্ড হয় এইচএমভিতে। এরপরে বিভিন্ন শিল্পীর আরও অসংখ্য রেকর্ড এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হয়েছে রবীন্দ্ররচনাসম্ভারের পসরা নিয়ে। যদিও এখানে উল্লেখ করে রাখা উচিত যে, ১৯০৯-’১০ সাল নাগাদ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বোন অমলা দাশ (‘মিস দাস [অ‍্যামেচার]’ নামে সেগুলি প্রকাশিত হত) গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে বেশ কিছু রবীন্দ্রনাথের গান এবং ব্রাহ্মসমাজের কয়েকজন গায়ক কিছু ব্রহ্মসংগীতের পাশাপাশি রবীন্দ্রগানও রেকর্ড করেন, কিন্তু সেসব রবীন্দ্রনাথের ‘প্রত্যক্ষ’ অনুমোদনপুষ্ট বলে মনে হয় না।

zoom
অমলা দাশের [মিস দাস (অ‍্যামেচার)] গাওয়া রবীন্দ্ররেকর্ড
১৯৩২ সালে চণ্ডীচরণ সাহা (সি সি সাহা) জার্মানি থেকে আধুনিক রেকর্ডিং-বিদ্যা শিখে এসে নিজে ‘হিন্দুস্থান মিউজিক্যাল প্রোডাক্টস অ‍্যান্ড ভ্যারাইটিস, সিন্ডিকেট, লিমিটেড’ নামে একটি রেকর্ডিং কোম্পানি খুললে সেখান থেকে এইচএমভির সমান্তরালে রবীন্দ্ররচনার বিভিন্ন কৃতি রেকর্ড-জাত হতে শুরু করে। রবীন্দ্রসৃষ্টিকে রেকর্ডে ধরে রাখার ব্যাপারে হিন্দুস্থান রেকর্ড ১৯৩২ থেকে ওই শতাব্দীর বাকি সময় জুড়ে একটা বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল; রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং হিন্দুস্থানের এই উদ্‌যোগের সঙ্গী হয়েছিলেন। এই সময়ের কিছু পরে সেনোলা, পাইয়োনিয়ার, কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি থেকেও রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা, নাটক প্রকাশিত হতে থাকে। আজ পর্যন্ত বাংলা সংস্কৃতির যতরকম নমুনা রেকর্ডে প্রকাশিত হয়েছে তার সিংহভাগই রবীন্দ্রনাথের দখলে। আজকের যেসব শ্রোতা পুরনো গ্রামোফোনের যুগটাকে চোখে দেখেননি, বা যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের জন্যও বলে রাখা দরকার যে, ১৯০৩ সালে এদেশে প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হওয়ার (প্রথম রেকর্ডিং হয় ১৯০২-এর ৮ নভেম্বর, শনিবার) সময় থেকে ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত প্রায় ৬৮-৬৯ বছরের সময়টা গালার তৈরি কয়েক লক্ষ ৭৮-আরপিএম (রেভোল্যুশনস পার মিনিট) রেকর্ড তৈরি হয়। এই রেকর্ডের এক-এক পিঠে সাড়ে তিন মিনিটের মতো ধ্বনির নমুনা ধরা থাকত। ফলে রেকর্ডে ধরে রাখার মতো গানের দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন মিনিটের বেশি হওয়া সম্ভব ছিল না। দীর্ঘতর পরিবেশনার (বিশেষত নাটক বা নাট্যাংশ) জন্য একাধিক রেকর্ডের সেট (set) প্রকাশিত হত। রবীন্দ্রনাট্যের দীর্ঘতর কৃতি পরিবেশনার জন্য সাড়ে তিন মিনিটের একাধিক রেকর্ডের সেট প্রকাশিত হওয়ার স্মৃতি আমাদের হয়তো মনে থাকবে– বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের প্রযোজনায় ‘চিরকুমার সভা’ (১৯৪৩), সন্তোষ সেনগুপ্তের সংগীত পরিচালনায় ‘চণ্ডালিকা’ (১৯৪৯) এবং ‘চিত্রাঙ্গদা’ (১৯৫৮) এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একথা বলা বাহুল্য মাত্র যে, একটা দীর্ঘ পরিবেশনাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে তার পারম্পর্য এবং সুখশ্রাব্যতা বজায় রেখে পরিবেশন করা মুনশিয়নার পরিচয়বাহী। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষের লগ্নে ৭৮-আরপিএম-এ গালার রেকর্ডের পাশাপাশি ভিনাইল (বা ভাইনিল) রেকর্ডও তৈরি হতে শুরু করে ভারতে বহুল পরিমাণে, যদিও প্রথম ভিনাইল (পলিভিনাইল ক্লোরাইড নামের যৌগ) ভারতে প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। ৭৮-আরপিএম রেকর্ডে যে বৃত্তাকার খাদে ধ্বনি ধারণ করা হত– তাদের আকৃতি এবং গভীরতার তুলনায় ভিনাইলের খাদ অনেক ছোট এবং মসৃণ। এ কারণে ৭৮-আরপিএম রেকর্ড ‘কোর্স গ্রুভ’ (coarse groove) এবং ভিনাইল ‘মাইক্রো গ্রুভ’ রেকর্ড নামেও পরিচিত। মাইক্রো গ্রুভ রেকর্ডে অনেক বেশি সময়ের রেকর্ডিং ধরে রাখা সম্ভব, তাই ধীরে ধীরে ৭৮-আরপিএম গালার রেকর্ডের জায়গা দখল করে ভিনাইল রেকর্ড। ফলে রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্যের মতো দীর্ঘ সময়ের উপস্থাপনাগুলি বেশি বেশি করে প্রকাশিত হতে থাকে রেকর্ডে। ১৯৬১ সালের পরে রবীন্দ্র-গীতিনাট্যের রেকর্ড-প্রযোজনা পরিমাণে যে বেড়েছে তার কারণ সহজেই অনুমেয়। 

zoom
হিন্দুস্থান কোম্পানির প্রথম রেকর্ড, নিচে রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরিত মন্তব্য

একটি রক্তিম মরীচিকা (১৯৮৩) 

গ্রামোফোন রেকর্ডে রবীন্দ্ররচনার দীর্ঘতর পরিবেশনার সূত্র ধরে একটি বিশেষ উপস্থাপনার কথা এখানে উল্লেখ করব। রবীন্দ্ররচনার অসংখ্য পরিবেশনার ভিড়েও এই উপস্থাপনাটি চারিত্র্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। ১৯৮৩ সালে এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হয় ১২ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের ৩৩১/৩-আরপিএম ঘূর্ণনমাত্রার দীর্ঘবাদন (long-playing) ধ্বনিমুদ্রিকা (gramophone record)। নাম ‘একটি রক্তিম মরীচিকা’। রবীন্দ্রসৃষ্টির অকৃপণ সম্ভারে আমরা প্রায়ই কবিতা-গান-ছবির মধ্যে গতায়াত খেয়াল করে থাকব– কবিতা হয়ে ওঠে গান, গান বদলে যায় কাব্যিক ব্যঞ্জনায়, ছবি-কবিতা-গান হাত ধরাধরি করে হাজির হয় আমাদের সামনে। এই অ‍্যালবামে রয়েছে ১২টা গান-কবিতা, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ যে-সমস্ত গানকে কবিতায় বদলে নিয়েছিলেন সেরকম ১২টা গান-কবিতার সম্মিলনে তৈরি হয়েছিল এই ধ্বনিময় সংকলন। ‘সানাই’ (১৯৪০) কাব্যগ্রন্থের ২২টা কবিতা তৈরি হয়েছিল গান থেকে– আগে গান, পরে কবিতা। কেবল ‘প্রেম এসেছিল নিঃশব্দচরণে’ (রচনা: ২৮.১২.১৩৪৬ অথবা ১০.০৪.১৯৪০) গানের ক্ষেত্রে ঘটেছিল উল্টো প্রক্রিয়া, ‘সানাই’-এর ‘আসা-যাওয়া’ (‘ভালোবাসা এসেছিল/ এমন সে নিঃশব্দ চরণে’, রচনা ২৮ মার্চ, ১৯৪০) কবিতাটি সুরপথের বাসিন্দা হয়েছিল। গান-কবিতার এরকম ১২টা যুগ্মক নিয়ে এই সংকলন গ্রামোফোন রেকর্ডে থিতু হওয়ার সাত বছর আগে, ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট রবীন্দ্রসদনে সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় বসেছিল আসর, একই শিরোনামে– ‘একটি রক্তিম মরীচিকা’। কেন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন? সেই অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত ৮৬ পৃষ্ঠার পুস্তিকার ৭৯ পৃষ্ঠায় লেখা আছে, ‘রবীন্দ্রসংগীতজ্ঞগণের পক্ষে শুধুমাত্র সংগীত-পরিবেশনই যথেষ্ট নয়, রবীন্দ্রসংগীতের যথাযথ কাব্যপরিচিতি ও উপলব্ধিরও প্রয়োজন। আন্তরিকতার সঙ্গে সেই মহৎ অনুভাবনাকে রূপদান করে তোলাই গীতশিল্পীদের প্রকৃত কাজ। তাই আমরা আমাদের অনুসন্ধিৎসাকে উৎসাহিত করার জন্য ক্রমাগত জড় মানসিকতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে রবীন্দ্রসংগীতের গভীর ব্যঞ্জনা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে চাই। এই বোধ থেকেই ‘একটি রক্তিম মরীচিকা’ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা।’ এই অনুষ্ঠানকে বিন্যস্ত করেছিলেন শঙ্খ ঘোষ। সংগীত-পরিচালনা করেছিলেন সুভাষ চৌধুরী। সুভাষ চৌধুরীর অনুষঙ্গে এই উদ্‌যোগে শামিল হয়েছিল ইন্দিরা শিল্পীগোষ্ঠী। ২৩টি গানের মধ্যে অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়েছিল ২২টি গান। ‘দোষী করিব না তোমায়’ গানটির সুর সংগ্রহ করা সম্ভব না-হওয়ার কারণে সেটি ওই অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়নি বলে পুস্তিকায় লেখা আছে (পৃ. ৭৯)। এই গানের শৈলজারঞ্জন মজুমদার-কৃত স্বরলিপি ছাপা হয়েছে ‘স্বরবিতান ৬৩’-তে, যার প্রথম প্রকাশ ১৩৯৮-এর শ্রাবণ মাসে। ফলে ১৯৭৬-এ এই গানের সুর না-পাওয়ার কারণ পরিষ্কার। কিন্তু পুস্তিকার ‘অনুষ্ঠান-প্রসঙ্গে’ অংশে কবিতার লাইনটায় ভুল ছাপা হয়েছে একটা শব্দ: ‘তোমায়’; ‘সানাই’-এর ‘আত্মছলনা’ কবিতার প্রথম দু’টি লাইন হল ‘দোষী করিব না তোমারে,/ ব্যথিত মনের বিকারে’, আর এর গীতিরূপটি হল ‘দোষী করিব না, করিব না তোমারে/ আমি নিজেরে নিজে করি ছলনা।’ 

zoom

এই অনুষ্ঠানটি যখন ১৯৮৩-তে রেকর্ডবদ্ধ হচ্ছে, সেসময় মূল ভাবনার বিস্তারে কিছুটা রাশ টানতে হয়েছে গ্রামোফোন রেকর্ডের সীমাবদ্ধতার কারণে। দীর্ঘবাদন ধ্বনিমুদ্রিকার প্রথম পিঠে রয়েছে ২০ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের রেকর্ডিং, দ্বিতীয় পিঠে ২৪ মিনিট ১ সেকেন্ড; মোট ৪৪ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড। ১২ ইঞ্চি দীর্ঘবাদন রেকর্ডে এর চেয়ে বেশি সময়ের ধ্বনি ধারণ করা সম্ভব নয়। ফলে ২২টার বদলে ১২টা গান ও কবিতার জায়গা হল এখানে। ’৭৬-এর অনুষ্ঠানে পাঠে অংশ নিয়েছিলেন অজিত রায়, সুপ্রিয় ঠাকুর, সুচিত্রা মিত্র, সুতপা ভট্টাচার্য, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শঙ্খ ঘোষ; আর গানে ছিলেন জয়শ্রী রায়, অরূপরতন বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীনন্দা মল্লিক, প্রণব চৌধুরী, মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্ঘ্য সেন, শ্রীনন্দা চৌধুরী (পরে মুখোপাধ্যায়), অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেন, সুবিনয় রায়, প্রসূন দাশগুপ্ত, সুপূর্ণা চৌধুরী, সুচিত্রা মিত্র এবং সমবেত গানে ইন্দিরা শিল্পীগোষ্ঠী– যাঁদের মধ্যে একক পরিবেশনায় উপস্থিত জয়শ্রী রায়, অরূপরতন বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীনন্দা মল্লিক, প্রণব চৌধুরী, মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীনন্দা চৌধুরী, প্রসূন দাশগুপ্ত, সুপূর্ণা চৌধুরী ছাড়াও ছিলেন আরও ১৪ জন গায়ক। যন্ত্রানুষঙ্গে রমেশ চন্দ, সলিল মিত্র, দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায়-সহ আরও অনেকে। ’৮৩-র ধ্বনিমুদ্রণে গান-কবিতার সংখ্যা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুশীলবের কিছু মুখও গেল বদলে; অজিত রায়, সুপ্রিয় ঠাকুর, সুতপা ভট্টাচার্য, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বদলে আমরা পেলাম গৌরী ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ঋতু গুহ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে; আর ইন্দিরা শিল্পীগোষ্ঠীর তালিকায় যুক্ত হল নতুন নাম: অনিমেষ চৌধুরী, অমিয়াংশু মুখোপাধ্যায়, স্বপন সোম, ইত্যাদি। এই অ‍্যালবামের প্রযোজক এইচএমভির বিমান ঘোষ, শব্দগ্রহণে সমীর মজুমদার। ১৯৭৬-এর পুস্তিকার জন্য লেখা শঙ্খ ঘোষের ‘একটি রক্তিম মরীচিকা’ প্রবন্ধটির অতি সংক্ষিপ্ত অংশ বাংলা পরিচিতি হিসেবে এবং বিমান ঘোষের ইংরিজিতে লেখা পরিচিতি রেকর্ড কভারের পিছনে ছাপা হয়। 

zoom

এই এতটুকু বলে যদি থেমে যাই, তাহলে এই সংকলনের প্রতি মহা অবিচার করা হবে। এই রেকর্ডের প্রচ্ছদটিও এই রেকর্ড বা এই সংকলনের অংশ। প্রচ্ছদে রবীন্দ্রনাথের আঁকা যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে সেটি আনুমানিক ১৯২৯-’৩০ সালের। রবীন্দ্রনাথের বাকি সব ছবির মতো এটিও নামচিহ্নিত নয়। উন্মুখ এক নারীর কালো অবয়ব, হাত দু’টি উপরে তোলা, দু’পাশে তার ঊর্ধ্বমুখী রক্তিম লেলিহান অগ্নিশিখা। ছবিটা এক লহমায় যেন আমাদের স্মৃতিকে টেনে নিয়ে রোদাঁর ১৯০৫-এর সেই বিখ্যাত ভাস্কর্য ‘প্রডিগল সান’-এর কাছে– একই উদগ্র আর্তি, একই উন্মুখ ব্যাকুলতা যেন দু’টি সৃষ্টিরই অন্তর্বয়ান রচনা করেছে। ১৯৭৬-এ যখন ‘একটি রক্তিম মরীচিকা’র পরিকল্পনা করছেন, তখন এই ছবিটিই পরিকল্পনার নেপথ্য প্রণোদনা জুগিয়েছিল। শঙ্খ ঘোষের লেখা থেকে কিছুটা উদ্ধৃতি আমাদের এই বক্তব্যের সমর্থনে ব্যবহার করি– “প্রথমে ভাবতে লোভ হয় যেন আগুন থেকে উঠে আসছেন কৃষ্ণা, বর্ণের বিন্যাসও যেন সেদিকে, এক চকিত ইঙ্গিত, কিন্তু তার পরেই আবার সরে যায় সে-ভাবনা। কেননা এর দাহ যে কেবল দু’-পাশের ওই আগুনরঙেরই, তা নয়; এর আঁচ লেগেছে ওই নারীর সমস্ত আর্ত ভঙ্গিমায়, তার ঊর্ধ্বোৎক্ষিপ্ত দুই ব্যাকুল বাহুর ছন্দে, অসীম প্রত্যাশায় তার চোখের মুখের রেখায়।… অবনীন্দ্রনাথ বলতেন রবিকাকার ছবি একটা ভল্‌কানিক ইরাপ্‌শনের মতো, সেকথার এক তীব্র উদাহরণ এই ছবি। এর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কারো হঠাৎ মনে পড়তে পারে ‘সানাই’ থেকে পাওয়া এক শব্দগুচ্ছ, ছবিটির নাম দিতে ইচ্ছে করে: একটি রক্তিম মরীচিকা!” ফলে এই সংকলন শুধু গান আর কবিতার যুগ্মক নয়, গান, কবিতা এবং ছবির ত্র্যহস্পর্শ ঘটে সংকলনটি এক অনন্যতায় উত্তীর্ণ হয়। প্রসঙ্গত বলে রাখা চলে যে, ১৯৭৬-এর যে পুস্তিকা সেটিতে কিন্তু এই ছবি ছিল না। ছিল পাণ্ডুলিপির কয়েকটি ছবি, কবিতা এবং গান। এই পুস্তিকার অলংকরণ এবং অনুষ্ঠানের মঞ্চসজ্জা করেছিলেন হিরণ মিত্র। 

zoom
১৯৭৬-এর পুস্তিকার প্রচ্ছদ

কিন্তু এখানেই কথা ফুরল না। ’৭৬-এর পুস্তিকায় প্রকাশিত শঙ্খ ঘোষের প্রবন্ধ ‘একটি রক্তিম মরীচিকা’ এই সমগ্র পরিকল্পনার আনুপূর্বিক সুর ধরে দিয়েছে সেকথা আগেও বলেছি। কিন্তু যেকথা এখনও বলা হয়নি তা হল– এই পুস্তিকায় আরও দু’টি অনবদ্য প্রবন্ধ ছিল। কানাই সামন্তের ‘গান থেকে কবিতা’ (পৃ. ৪৯-৬১) এবং বিমলাকান্ত রায়চৌধুরী ও সতীন্দ্র ভৌমিকের ‘রাগ ও রস’ (পৃ. ৭০-৭৮)। কানাই সামন্ত! রবীন্দ্ররচনা আজ যে-রূপে এবং সজ্জায় আমাদের হাতে এসেছে তার নেপথ্য কারিগর কানাই সামন্ত (১৯০৪-’৯৫)। ৯১ বছরের দীর্ঘ জীবনে কানাই রবীন্দ্রময়তায় আক্রান্ত ছিলেন। স্বদেশি আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবাসী হয়ে অবনীন্দ্রনাথের উৎসাহে যে-ছেলে ওরিয়েন্টাল সোসাইটি অব ইন্ডিয়ান আর্ট প্রতিষ্ঠানে চিত্রবিদ্যা শিখে বিশ্বভারতীর কলাভবনে ভর্তি হলেন এবং তার পরের প্রায় সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলেন রবীন্দ্ররচনাকে গুছিয়ে দেওয়ার কাজে– তাঁকে এইরকম একটা উদ্‌যোগে শামিল করার প্রকল্পটি শুধু অভিনব নয়, অত্যাবশ্যকও বটে। তিনি ছাড়া কে-ই বা গান থেকে কবিতার দিকের এই বিপরীতমুখী যাত্রার সূত্রধারণ করবেন! ভাবের ললিত ক্রোড়ে নয়, রবীন্দ্ররচনার অতলান্ততায় নিলীন এই কবি-মানুষটির রচনাটি স্বকীয়তায়, চিন্তার বৈদগ্ধ্যে ভাস্বর। রবীন্দ্রনাথের কবিতা আর গানের মধ্যে যে নিত্য চলাচল ঘটে তার সুর বেঁধে দিয়েছেন এই লেখায়। একটু উদ্ধৃতি দেওয়া যাক– ‘এইমাত্র মনে উঠেছিল একটি কথা: গানের নাটকীয়তা। অর্থবহ কোনো শব্দ এটি? আমরা তাই মনে করি। কেননা, রবীন্দ্রনাথের গান বা গানের দেহ– অবয়ব– হল উৎকৃষ্ট গীতিকবিতা। তাতে যেমন আছে কবিত্বের সার ও গানের অর্থাৎ সুরের অবাঙ্‌মন অভিমুখী অভিসার তেমনি অনেক সময়েই আছে বা থাকতে পারে কোনো কথা বা কাহিনীর ক্রমিক উদ্‌ঘাটন, এমন-কি, কোনো নাটকের অভাস মাত্রে অনুভূত বিচিত্র ঘাত-প্রতিঘাত। এই আশ্চর্য গুণগুলি বাংলার প্রাণের প্রাণ থেকে প্রসৃত, বাঙালির ভূত-ভবিষ্যৎ বর্তমানের অন্তর্লোকে লালিত পালিত পুষ্ট, বৈষ্ণবপদাবলীতে তথা লীলা কীর্তনেও প্রভূত পরিমাণে ছিল বা আছে। নতুন যুগে নতুন ভাবে রবীন্দ্রনাথকেই সে-সবের যোগ্যতম উত্তরাধিকারী বলা যায়। …রবীন্দ্রনাথ কবি ছিলেন, সুরস্রষ্টা ছিলেন, আখ্যানকথক যেমন ছিলেন তেমনি ছিলেন নাট্যকার এমন-কি নটেশ, এর অভ্রান্ত সাক্ষ্যগুলি যদি লুপ্ত হয়েও যেত আজ ইতিহাসের পাতা থেকে, কয়েকটি গান কেবল আপন স্বরূপে বা স্বধর্মে বর্তমান থাকলেই ঐ গানের স্রষ্টা সম্পর্কে সব কথা নিঃশেষে জানা যেত।’ 

zoom
zoom

এই পুস্তিকার অন্য প্রবন্ধে বিশিষ্ট সংগীতকোবিদ বিমলাকান্ত রায়চৌধুরী (১৯০৯-১৯৮০) এবং সতীন্দ্র ভৌমিক ‘সানাই’ কাব্যগ্রন্থের যে কবিতাগুলি গানের হাত ধরে এসেছে, তাদের রাগরূপ এবং তার সঙ্গে গানের ভাবের সম্পর্ক নির্ণয়ের প্রচেষ্টা রয়েছে। ওঁদের প্রবন্ধের শেষ লাইনটি ‘একটি রক্তিম মরীচিকা’ প্রকল্পের মূল থিমের অনুরণন– “কোনো রাগের সঙ্গে চিরস্থায়ী এবং অবিকৃতভাবে কোনো ‘রস’ বা ‘ভাব’কে যুক্ত করা অসমীচীন– কিন্তু এই গীতরচনা ও স্বরযোজনাতে খুব সার্থকভাবে করুণরসের প্রকাশ হয়েছে অনুশোচনা ও বিষাদের সঞ্চারী ভাবে।” 

১৯৭৬-এর অনুষ্ঠান আর ১৯৮৩-র নির্মাণ একই সুরে, লয়ে, ছন্দে, রঙে বিন্যস্ত। রবীন্দ্ররচনার এবংবিধ পরিবেশনার ভাবনাটি যতখানি অভিনব, তার চেয়েও বিস্ময়কর হল এই ভাবনার রূপায়ণের প্রক্রিয়াটি। এতরকমের এতজন মানুষ যে ঐকান্তিক আগ্রহ, নিষ্ঠা এবং নিমগ্নতা নিয়ে এই কাজটি করেছেন সেটি অনন্যপূর্ব। কেউ হয়তো এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করবেন রবীন্দ্র-গীতিনাট্যের রেকর্ড সংস্করণগুলির কথা, যে-কথা আমিও এই লেখায় বলেছি আগেই। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, শ্রবণীয় মাধ্যমে রবীন্দ্র-গীতিনাট্যের যে এরকম পরিবেশনা সম্ভব– সেটি যেমন আমাদের বিস্মিত করে, তেমনই ১৯৭৬-এর এই অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা এবং ’৮৩-তে তার ধ্বনিমুদ্রিত রূপের বাস্তবায়নও আমাদের একইসঙ্গে বিস্মিত, আনন্দিত করে। শঙ্খ ঘোষের গ্রন্থনায়, সুভাষ চৌধুরীর সংগীত পরিচালনায় এরকম আরও দু’টি সংকলন তৈরি হতে পেরেছিল– ১৯৮৬ সালে ‘বাসায় ফেরা ডানার শব্দ’ (একটি দীর্ঘবাদন গ্রামোফোন রেকর্ড) এবং ১৯৮৯-তে ‘জীবনশিল্পী রবীন্দ্রনাথ: হে মহাজীবন’ (ছ’টি দীর্ঘবাদন গ্রামোফোন রেকর্ড)। ওই দু’টি সংকলনও বিষয় নির্বাচনের অনন্যতায় এবং উপস্থাপনার বিশিষ্টতায় উজ্জ্বল। আশা করি ভবিষ্যতে কখনও ওই দু’টি সংকলন নিয়ে কথা বলার অবকাশ পাওয়া যাবে। আপাতত ‘একটি রক্তিম মরীচিকা’র রেকর্ডে ধরে রাখা শ্রাব্য-রূপটি কেমন যদি কেউ শুনতে চান, সেটি তাঁদের জন্য রইল।

——————————-

কৃতজ্ঞতা: শ্রীনন্দা মুখোপাধ্যায় (ইন্দিরা শিল্পীগোষ্ঠী), রাহুল সেন (‘বিভাব’), স্বপন সোম, সন্দীপন চক্রবর্তী, সৌরভ জানা

Ekti Raktim Marichika gramophone record Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shankha Ghosh venyle record একটি রক্তিম মরীচিকা

Share this article on