

আজকের কলকাতা নিয়ে লিখতে বসলে কালপেঁচাকে নকশা শুরু করতে হত সেক্টর ফাইভ দিয়ে। ডালহৌসির কেরানির বদলে একঝাঁক আইটি এমপ্লয়ি, স্টেট বাসের পরিবর্তে সকাল সাড়ে আটটার সাট্ল, মুরগির মতো মাথা গুঁজে অফিস দৌড় আর সপ্তাহ শেষে শপিং মলে মজলিশ। রাস্তার যূথবদ্ধ জীবন নিয়ে লিখতে হলে কিছু কিছু জিনিস যদিও অপরিবর্তনীয় থাকত। ফেরিওয়ালা, মেছুনি, বই বিক্রেতা আজও আছে বহাল তবিয়তে এই শহরে। তবে তাদের অনেকের হাতেই আইফোন, স্মার্টফোন আর সেকেন্ড হ্যান্ড বইয়ের বাজার ফুটপাথকে ছাপিয়ে আজ ফেসবুক পেজেও।
‘এই সেই কলকাতা!… সুদূর পল্লীগ্রামের নিশ্চিন্ত কোলে বসে আপনারা এই কলকাতার স্বপ্ন দেখেছেন… সবার আগে কলকাতার একজন নগণ্য নাগরিক কালপেঁচার আন্তরিক অভিনন্দন গ্রহণ করুন… দুপুরের পিচ গলা পথে পায়ে হেঁটে দেখলে পয়সা লাগবে না… কলকাতার আসল বায়োস্কোপ দেখুন। নকল বায়োস্কোপ ছবিতে না দেখে জ্যান্ত বায়োস্কোপ দেখুন।’
১৯৫১ সালে বিনয় ঘোষ ‘কালপেঁচার নকশা’ লিখছেন কলকাতায় বসে। তিনি বলছেন, ‘কালীঘাটের কালি দেখুন… কলিকালের গঙ্গা… তারপর চিড়িয়াখানা, জিরাফ, উট, হাতি, ভাল্লুক, উল্লুক… এরই নাম চিড়িয়াখানা, দ্বিতীয় নাম কলকাতা।’ অর্থাৎ কলকাতার মান, ধাম, সম্ভ্রমকে উপেক্ষা করে শহরটা আসলে একটা পেল্লাই চিড়িয়াখানা। এখানকার জন্তু-জানোয়ারের হদিশ পেতে গেলে কোনও মানুষ লেখক নয়, বরং দু’-দণ্ড আয়েশ করে বসতে হবে কালপেঁচার সামনে। সাদা লক্ষ্মী প্যাঁচা নয়, কালচে, কটা রঙের পাখি, যে সহজেই আত্মগোপন করতে পারে রাতের অন্ধকারে। সন্তর্পণে গাছের ডালে বসে কালপেঁচা লক্ষ করে সব কিছু, তারপর ব্যঙ্গের খোঁচা দিয়ে খসখস করে লিখতে থাকে যা কিছু তার দৃষ্টিগোচরে। মানুষ যা করে তুলেছে অত্যন্ত স্বাভাবিক, সহজ বা দৈনন্দিন, সেই রীতিনীতির খোলসকে পেঁয়াজের মতো আস্তে আস্তে ছাড়িয়ে আমাদের সামনে পেশ করে এই নিশাচর। অবশ্য এই আসরে সে একা নয়, রয়েছে তার পূর্বজ হুতোম প্যাঁচা। হুতোম যেমন উনিশ শতকের হুজুক আর বুজরুকির আরশি, কালপেঁচা তেমন বিশ শতকের বিচিত্র চিড়িয়াখানার গল্প বলছে আমাদের। কিন্তু প্রশ্ন হল: কলকাতাকে এমন নিবিড়ভাবে জানতে হলে বারবার প্যাঁচার দৃষ্টিই এত জরুরি হয়ে পড়ে কেন? তাও আবার শুভ্র, সুন্দর লক্ষ্মীপেঁচা নয় বরং ধূসর, বিকট, হুতোম বা কালপ্যাঁচা!

এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে বিশ্বসাহিত্য, উপকথা বা লোকগানে। যেমন আমাদের চারপাশের প্যারোডি, প্রহসন বা অনেক ব্যঙ্গ কবিতার মুখ্য চরিত্র হল ‘নন-হিউম্যান’। শুধু হুতোম বা কালপেঁচা নয়, ভার্জিনিয়া উলফের ‘ফ্লাশ’, যেখানে এলিজাবেথ ব্যারেটের ককার স্প্যানিয়ল লিখছে তার মনিবের আত্মজীবনী। কিংবা মেইজি জাপানে লেখা ‘I am a cat’, যেখানে বিড়াল কথক বলে চলেছে জাপানি মধ্যবিত্ত শ্রেণির হালহকিকত। পাখি, বাঘ, কুকুর, বিড়াল, এমন হাজারো না-মানুষরা আসলে আমাদের জুম আউটে (দূর থেকে দেখা, বার্ড আই ভিউতে) সাহায্য করে। যে সমাজকে আমরা চিরায়ত মনে করে আসছি, তাকে ভেঙে, টুকরো টুকরো করে আমাদের সামনে তুলে ধরে বিশ্লেষণ করে নন-হিউম্যানরা। হুতোম বা কালপেঁচারও সেই একই উদ্দেশ্য। তবে কালীপ্রসন্ন সিংহ আর বিনয় ঘোষের লেখার ধরনে মিল থাকলেও, পার্থক্য রয়েছে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে। কালপেঁচায় উদ্ধৃত:
‘হুতোমের একমাত্র লক্ষ্য ছিল সমাজের বিকৃতিগুলির উপর তীব্র বিদ্রুপবাণ নিক্ষেপ করা, আমার লক্ষ্য তা নয়, কেবল বিদ্রুপ করবার জন্যই আমি বিদ্রুপ করিনি… হাস্যরসের পিছনে প্রত্যেক মানুষের জীবনে যে করুণ ট্রাজেডি বা কমেডি আছে তার দিকেই আমি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা করেছি… হিউমারিস্ট এর কাজ অনেকটা ডেন্টিস্ট এর মত, খারাপ দাঁত তুলে দেওয়া… তা না হলে অনেক কঠিন ব্যাধি হতে পারে, ঠিক তেমনি স্যাটারিস্টের কাজ, মানুষের সমাজের খারাপ দাঁতগুলো তুলে দেওয়া, তাতে হয়তো একটু যন্ত্রণা হতে পারে তবু তোলা দরকার।’
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ট্রাজেডি আর কমেডির মধ্যে একটা সূক্ষ্ম রেখা বিদ্যমান, এপারে আসলে হাসি, ওপারে কান্না। এই আলো-আঁধারির মাঝেই খেলা করেন বিনয় ঘোষের মতো হিউমারিস্টরা। ‘কালপেঁচার নকশা’ (১৯৫১), ‘কালপেঁচার দুকলম’ (১৯৫২) আর ‘কালপেঁচার বৈঠক’ (১৯৫৭) পাঁচের দশকে প্রকাশিত হলেও পরে এগুলি একসঙ্গে ছাপা হয় পাঠভবন প্রকাশনী থেকে। বাংলা ভাষায় এমন প্রাঞ্জল লেখা, কলকাতাকে নিয়ে সরস প্রবন্ধ সংকলন অত্যন্ত বিরল। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনকে জানতে হলে এই রচনা সংগ্রহে রাখা উচিত। বিনয় ঘোষকে নিয়ে আলোচনা হলে তাঁর আকরগ্রন্থ বা আর্কাইভাল কাজগুলি যেভাবে আলোচিত হয়, সেভাবে সামনে আসে না কালপেঁচা ছদ্মনামের রচনা। ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’ লেখবার জন্য তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার পান ১৯৫৯ সালে। সারা রাজ্যে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়িয়ে, ফিল্ড সার্ভে করে লেখা এই বই সমাদৃত হয় বিদ্বজনমহলে। অধ্যাপক বা গবেষকরা তাঁর ‘সাময়িক পত্রে বাংলার সমাজচিত্র’ বা ‘টাউন কলিকাতার কড়চা’র মতো বই নিয়ে মেতে থাকেন। বিনয় ঘোষ মার্কসিস্ট পরিমণ্ডলেও উদযাপিত তাঁর সমাজতান্ত্রিক আদর্শে লেখা বইগুলির জন্য। এই বৃহৎ কর্মকাণ্ডের মধ্যে অনেকসময় চাপা পড়ে যায় তাঁর সরস রচনাগুলি। এগুলিকে ‘লঘু সাহিত্য’ বলে এককোণে ফেলে রাখার প্রবণতা নতুন কিছু নয়। হাসিঠাট্টা হলে তা শিশুসাহিত্য অবধি ঠিক আছে কিন্তু মধ্যবিত্ত সংস্কৃতি নিয়ে এমন রম্যরচনা পাত্তা পায় না পণ্ডিতমহলে। এমন উদাসীনতা সত্ত্বেও বলা যায় যে ৫০০-র বেশি পৃষ্ঠা জুড়ে কালপেঁচার এই বাঙালি বৃত্তান্ত পড়তে কিন্তু একটুও ক্লান্তি লাগে না।

নকশার প্রথমে হুতোমি ঢঙে লেখা শুরু হলেও অচিরেই তা বদলে যায়। পোস্ট-কলোনিয়াল মধ্যবিত্ত বাঙালিকে যদি স্ট্যাটিসটিক্স বা সরকারি পুঁথির বাইরে খুঁজতে হয় তাহলে এই রচনা-পড়া সমাজবিজ্ঞানীদের অবশ্য কর্তব্য। প্রথম পর্বে (নকশায়) তিনি কলকাতার রাস্তার যূথচারী সংস্কৃতি ধরতে চেয়েছেন। বাসযাত্রী, রিকশাযাত্রী, কলকাতার ভিখারি, পাগল, মেছুনি, কেরানি– প্রত্যেকেই এই যূথবদ্ধ জীবনের অংশ। হুতোমি কায়দায় লেখা শুরু হলেও আমাদের চমক লাগে ‘ওগো ভাড়াটিয়া বাড়ি’ প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে। বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া, এই দুই শ্রেণির নিত্য কলহ যেমন ধরা পড়েছে বিনয় ঘোষের লেখায়, তেমনই আবার মধ্যবিত্ত ভাড়াবাড়ি যেন ‘ছোটলোকের’ বস্তির কাছে রাজপ্রাসাদের মতো। আমি নিজে টালিগঞ্জ (চারু মার্কেটের) রেল কলোনির বস্তির ধারে ভাড়াবাড়িতে কাটিয়েছি জীবনের প্রথম ১৫টা বছর। তাই ‘ভদ্র-ইতর’ টানাপোড়েনের যে বাস্তব ছবিটি লেখক আঁকতে চেয়েছেন, তার প্রত্যেকটা বাক্য আরও জীবন্ত মনে হয় এই বই পড়ে। বিশ শতকের ভাড়াবাড়ি প্রসঙ্গ মৃণাল সেনের চালচিত্র, খারিজ বা আরও নানা সিনেমায় উঠে এসেছে। কলকাতার ইতিহাস লিখতে গেলে এই ভদ্রলোক ভাড়াটিয়া শ্রেণি, নন-বেঙ্গলি বাড়িওয়ালা আর প্রান্তিক বস্তিবাসীকে নিয়ে আসতে হয় একটা ত্রিকোণ সমীকরণে, বিনয় ঘোষের লেখায় তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রায়শই। নানা জাতি, ভাষাগোষ্ঠী আর শ্রেণির তারতম্যে কলকাতা শহরের গলিঘুঁজি ভরে ওঠে কানায় কানায়, সেই সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার খোঁজ নেয় কালপেঁচা। কলকাতার বিবিধ পরিসরের ছবি এঁকে চলেন লেখক: ‘ভাগ্যলক্ষ্মী হেয়ার কাটিং সেলুন, স্টেট বাস, পার্ক স্ট্রিট, চীনা পল্লী’, আরও কত কী! মজা করে বাঙালির আলস্যকে কালপেঁচা বলে ‘ঘুমিওপ্যাথি’ আর মনের হদিশ পেতে পড়ে ‘ছাইকোলজি’।

নকশা লেখার ঠিক এক বছর পরে প্রকাশিত হয় বিনয় ঘোষের ‘কালপেঁচার দু কলম’। এই বইতে মধ্যবিত্তের ব্যবহার্য নানা জিনিস, আপাত দৃষ্টিতে যা তুচ্ছ, আলোচনার পরিসরে সচরাচর আসে না, সেই সমস্ত বিষয় উঠে এসেছে ব্যঙ্গের ছলে। যেমন হাঁচি, ঘড়ি, খোপা, দাড়ি, হাততালি: এইসব শিরোনাম পড়লে মনে হয় এগুলো নিয়ে আবার পাতার পর পাতা লেখা যায় না কি! সবচেয়ে আশ্চর্যের পর্ব হল ‘কিন্ডারগার্টেন কলকাতা’। লেখক বলছেন:
‘‘একবার এক ভদ্রলোককে ‘কি করেন’ জিজ্ঞাসা করতে তিনি প্রমটলি উত্তর দিয়েছিলেন– ‘টিউশনি’… তরুণ যুবক ছাত্র নন, রীতিমত বয়স্ক সংসারী লোক, পুত্রকন্যাদি নিয়ে বেশ বড় পরিবার– অথচ তিনি যে কেবল টিউশনিই করেন, আর কিছু করেন না, এটা চট্ করে যেন ভাবা যায় না। তাই তাঁকে আবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম: ‘আর কি করেন? কাজ করেন কোথায়?’ তিনি কথাটা শুনে একটু যেন বিরক্ত হয়েই বললেন: ‘শুধু টিউশনি করি’। হুবহু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শুধু লিখি’ উত্তর দেওয়ার মতন।’’

পাঁচের দশকে কেউ টিউশনি করে পেট চালাচ্ছে, এই দৃশ্য ছিল বড়ই বেমানান আর আজব। আজকের দিনে এমন বিষয় মামুলি লাগলেও গত শতাব্দীর দশটা-পাঁচটা ডিউটি করা কেরানির কাছে এই পেশা ছিল হাসি-মশকরার জিনিস। এমন বিচিত্র সব প্রফেশন নিয়ে কালপেঁচা লিখেছেন তাঁর অধ্যায় ‘কিন্ডারগার্টেন কলকাতা’। এই সূত্র ধরে ভাবতে ভাবতে মনে হয়, যদি কালপেঁচাকে নিয়ে আসা যায় আজকের জেন-জি যুগে, ব্যাপারটা ঠিক কেমন দাঁড়ায় তাহলে? পেঁচা ওরফে বিনয় ঘোষ যদি কাউকে জিজ্ঞেস করে বসেন, আপনার প্রফেশনটা কী মশাই? কেউ হয়তো বলবে আজ্ঞে, আমি রিলমেকার; দুটো করে ভিডিও, গড়পড়তা খান দশেক শর্টস সপ্তাহ জুড়ে, এতেই আমার চলে যায় অনায়াসে। পেঁচা তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে যদি বিদ্রুপ করতে যায় ছোকরাকে, তাহলে মাসিক আয় শুনে নিশ্চয়ই ভিরমি খেতে হবে তাকে। সপ্তাহান্তে দুটো ভ্লগ ইউটিউবে, মাস গেলে লক্ষ টাকা আমদানি হয় পকেটে। ফুড ভ্লগার, মুয়া (MUA), ভাইরাল কন্টেন্ট, বিচিত্র সব নেশা, পেশা; কালপেঁচা কি বলত একে ‘মিমমেকার কলকাতা’? আরেক ছোকরা সরকারি চাকরি বলে যেই না ফোলাল বুক, পুরোনো হাওয়া বেলুনের মতো চুপসে গেল তার মুখ, কারণ সরকারিতে এখন কনট্র্যাকচুয়াল, ছ’-মাস বাদে চাকরি খোয়ালে ব্যাক আপ সেই রিলমেকার দাদাই। আপিস-ফেরতা কেরানি এখন লাইফস্টাইল ভ্লগ করে, দু’বেলা প্রোটিন শেক খেয়ে হাতের গুলি বানায় আর শুট করে। এই কেরানি পালোয়ান, রিলমেকার মশাই আর সরকারি চুক্তিভিত্তিক ভাইকে নিয়ে কালপেঁচার বাঁধা গান শুনতে বড় ইচ্ছে করে। প্রশ্ন জাগে: হাসির খোরাক পেতে বিশ শতকের কলকাতার থেকে কি অনেক এগিয়ে ২০২৬-এর এই শহর?

একেবারে নিশ্চিত হয়ে বলা যায়, আজকের কলকাতা নিয়ে লিখতে বসলে কালপেঁচাকে নকশা শুরু করতে হত সেক্টর ফাইভ দিয়ে। ডালহৌসির কেরানির বদলে একঝাঁক আইটি এমপ্লয়ি, স্টেট বাসের পরিবর্তে সকাল সাড়ে আটটার সাটল, মুরগির মতো মাথা গুঁজে অফিস দৌড় আর সপ্তাহ শেষে শপিং মলে মজলিশ। রাস্তার যূথবদ্ধ জীবন নিয়ে লিখতে হলে কিছু কিছু জিনিস যদিও অপরিবর্তনীয় থাকত। ফেরিওয়ালা, মেছুনি, বই বিক্রেতা আজও আছে বহাল তবিয়তে এই শহরে। তবে তাদের অনেকের হাতেই আইফোন, স্মার্টফোন আর সেকেন্ড হ্যান্ড বইয়ের বাজার ফুটপাথকে ছাপিয়ে আজ ফেসবুক পেজেও। বিনয় ঘোষের নকশায় আছে বাসযাত্রী, ছ্যাকরাগাড়ি আর মোটরযাত্রীদের কথা। পাঁচের দশকে কলকাতার নব্য ধনীরা কিনছেন হাডসন, হাম্বার পন্টিয়াক; এর মধ্যে অনেক কোম্পানির এখন আর কোনও অস্তিত্ব নেই। একুশ শতকীয় কালপেঁচা মোটরগাড়ি নিয়ে লিখতে বসলে নিশ্চই তার শিরোনাম হত– ওলা, উবার, রেন্টালের দিনকাল, হলুদ ট্যাক্সি ‘নো রিফিউজাল’। উবার উপাখ্যান নামক অধ্যায়তে লেখা থাকত ভাড়া দেখে মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস আর রাসবিহারী থেকে রতনবাবু রবীন্দ্র সরোবর গিয়েছেন রেড রোড ঘুরে, কারণ কোনও এক ব্রাহ্মমুহূর্তে ম্যাপ জননীর নিদান ছিল তাই। ‘কালপেঁচার দু কলম’-এ বিনয় ঘোষ লিখেছেন দাড়ি, খোঁপা, হাততালি নিয়ে। একুশ শতকে বাঙালির প্রসাধন নিয়ে লিখতে গেলে খোঁপার বদলে কেরাটিন, দাড়িতে ফ্রেঞ্চ কাট আর প্রেমের ঠিকানা ‘ওয়ো’ নিয়ে নকশা আঁকা হবে। বিনয় ঘোষের পেচকটি হুতোমের থেকে ভিন্ন, শুধু ব্যঙ্গের খোঁচা দেওয়াই নয়, বরং মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ট্রাজেডি বা কমেডি বের করে আনাই ছিল তার উদ্দেশ্য। এই লক্ষ্যের কথা মাথায় রেখে আজকের কল্লোলিনীর বিষাদের দৃশ্য চোখে পড়ে। ট্রাজেডি তো আছে প্রভূত পরিমাণে, পদপিষ্ট পর্ব থেকে বই সংহার, কিন্তু কমেডি করার পরিসর আছে কি? হুতোম রসিকতা করেছেন সাহেবি কেতা নিয়ে, গোপাল হেসেছেন স্বয়ং মহারাজকে নিয়ে, আজকের কালপেঁচা কি পারবে ঊর্ধ্বতনকে ব্যঙ্গ করতে? যতক্ষণ না এর সদুত্তর পাওয়া যায়, ততক্ষণ বিনয় ঘোষের নকশা হাতে তুলে নেওয়া যায়, আয়তনে হুতোমের দ্বিগুণ হলেও এই বায়োস্কোপ দেখতে মন্দ লাগে না।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved