


শরীরের স্মৃতি বড় গভীর। তা ঢাকা পড়ে সমাজ-সংসারের চাপে কিন্তু হারায় না। কপালকুণ্ডলা শরীরে হাওয়া খেলে যাচ্ছে আর তার মনে পড়ে যাচ্ছে স্বাধীন জীবনের স্মৃতি, তার একাকী স্বাধীন শরীরের স্মৃতি, সমাজস্পর্শহীন বিবাহপূর্ব শরীরের স্মৃতি। তার নবকুমারকে মনে পড়ছে না, নবকুমারকে সে ভালোবাসে না। সে ভালোবাসে তার নিজের একাকে, প্রকৃতির মধ্যে সেই একাকী-সঞ্চারস্বাধীনা মুহূর্তকে। এই বঙ্কিমকে কীভাবে বলি দেব? দেব না! হিন্দুত্বের দুর্বিপাক যতই বঙ্কিমকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুক, ভাসাতে পারে না।
১৮.
না! বঙ্কিমকে আমি কিছুতেই হিন্দুত্ববাদীদের হাতে তুলে দিতে পারি না। বঙ্কিম-বঙ্কিম বলে সত্যজিতের চারু-মাধবী কি আর এমনি এমনি গুনগুন করে? বঙ্কিম যেভাবে মেয়েদের শরীর আর মন যত্ন করে বুঝেছিলেন, কতজন তা পারেন?
জানি, জানি! বিরুদ্ধ-যুক্তির অভাব নেই। শিশিরকুমার দাশ মোক্ষম উপমাটি প্রয়োগ করেছিলেন। শৃঙ্খলিত শিল্পী। সমাজের ভালো, পরিবারের ভালো, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ, পরিশুদ্ধ হিন্দু-ধর্মের কথা এসবই তাঁর ছিল। কমলাকান্তের দপ্তরে মেয়েদের সম্বন্ধে একটা-দুটো কথা পড়ে একেলে নারীবাদীরা তাঁকে ‘সেক্সিস্ট’ বলবেন। এসব মেনে নিচ্ছি। তবু বঙ্কিমকে ফেলতে পারছি না। কী করে ফেলব? কেমন করে ফেলব? ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসটি পড়লে, মন দিয়ে পড়লে, বঙ্কিমকে ফেলা অসম্ভব। নারীর মন আর শরীর– দুই যে কী গভীরভাবে বুঝতেন!

কপালকুণ্ডলা তো স্বাধীনা। ভাগ্যদোষে স্বাধীনা। বাবা-মাকে হারিয়ে সমুদ্র-তীরবর্তী নির্জন তটভূমিতে কাপালিক পালিতা। সামাজিক সংস্কার তার নেই। বিবাহ কী, নর-নারীর ভালোবাসা কেমন, তা সামাজিকভাবে সে জানতেও পারেনি। হঠাৎ-ই তার জীবনে নবকুমারের আবির্ভাব। সে যে নবকুমারকে দেখেই ভালোবেসে ফেলেছিল, তা নয়। নবকুমার অবশ্য ফেলেছিল। সমুদ্রের ধারে আলুলায়িতকুন্তলা এই রমণীকে দেখে সুন্দরবিলাসী নবকুমারের মন দ্রবীভূত, সে রূপের পাথারে পথ হারিয়েছিল। কপালকুণ্ডলা হারায়নি। সমুদ্র-তীরবর্তী বনভূমিতে একাকিনী ভ্রমণই তার বিলাস। এই রমণী পরোপকারশালিনী। তাই যখন সে বুঝতে পারল কাপালিক নবকুমারকে দেবীর চরণে বলি দেবে, তখন সে নবকুমারকে বাঁচিয়েছে, এ পরোপকার মাত্র উদ্বেল প্রণয় নয়। নবকুমারকে সে বিবাহ করেছে আত্মরক্ষার্থে, অধিকারীর পরামর্শে। নবকুমারের সঙ্গে অন্যত্র চলে না গেলে তার প্রাণসংশয়। নবকুমারের সঙ্গে একাকিনী যাওয়ার জন্যই অধিকারী তাদের বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। এই হল কপালকুণ্ডলার পক্ষে বিবাহের ইতিহাস।
‘বিষবৃক্ষ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ উপন্যাসে বঙ্কিম বিবাহকে সামাজিকতা ও পারিবারিকতার দিক দিয়ে বিচার করেছেন, কপালকুণ্ডলা উপন্যাসে তা করেননি। ‘কপালকুণ্ডলা’-র পক্ষে বিবাহ কী রূপ নিয়েছিল, তাই বঙ্কিমচন্দ্রের বিচার্য। বিবাহ কপালকুণ্ডলার শরীরের ব্যক্তিগত অধিকার এক অর্থে হরণ করেছিল। তার চুল আর আলুলায়িত রাখা সম্ভব হল না। তা বেণীবন্ধনে ধৃত। মেয়েদের শাসন করার জন্য সমাজ-পুরুষ কুন্তলরাশিকেই লক্ষ্যবস্তু করে তোলে। কপালকুণ্ডলার নাম বদলে গেল, তার সজ্জা ভিন্নপ্রকার হল। সে গৃহবধূতে রূপান্তরিত। এই রূপান্তর বাহ্য, রূপান্তর অন্তরে হয়নি।
পুরনো স্বাধীন প্রাকৃতিক অভ্যেসগুলিকে সংসারের জন্য অস্বীকার করতে হচ্ছে। ‘বিবাহ’ নামের প্রতিষ্ঠানটি যে মেয়েদের জন্য দাসীবৃত্তি হয়ে উঠতে পারে, বনবালা স্বাধীনচারিণী কপালকুণ্ডলা তা টের পাচ্ছে। শুধু টেরই পাচ্ছে না– সেকথা মুখে উচ্চারণও করছে। ‘যদি জানিতাম যে, স্ত্রীলোকের বিবাহ দাসীত্ব, তবে কদাপি বিবাহ করিতাম না।’ মেয়েদের পক্ষে বিবাহ দাসীবৃত্তি জানলে কখনও যে, সে বিয়ে করত না একথা মৃণ্ময়ী শ্যামাসুন্দরীকে বলেছে। মৃণ্ময়ীর ভিতর থেকে কপালকুণ্ডলা কথা বলেছে। তার ভিতরের সত্তাকে মৃণ্ময়ী নাম দিয়ে ঢেকে রাখা সম্ভব হয়নি। শ্যামাসুন্দরী তার ননদ। তার বরের দুটো বিয়ে। যাতে ননদাইয়ের মন সতীনের থেকে শ্যামাসুন্দরীর দিকে চলে আসে, সেজন্য বিশেষ একটি লতার পাতা খোলা চুলে রাত্রিবেলায় তুলতে হবে। সংসারী মেয়েদের পক্ষে কাজটি কঠিন, সমাজ-পরিবার রাত্রিবেলায় মেয়েদের বাইরে যেতে দেবে কেন? শ্যামাসুন্দরী আর কপালকুণ্ডলা দু’জনে একসঙ্গে গিয়েও বকুনি খেয়েছে। কাজটাও সম্পন্ন হয়নি। পরের দিন কপালকুণ্ডলা শ্যামাসুন্দরীর সঙ্গে পরামর্শ করে, শ্যামাসুন্দরীর যাওয়ার দরকার নেই। কপালকুণ্ডলাই যাবে, শ্যামাসুন্দরীর হয়ে সেই স্বামী-বশীভূতকারী ওষধি তুলে আনবে। শ্যামাসুন্দরী অবশ্য দ্বিধা করেছিল। নবকুমার কী বলবে?
এ কাজে কপালকুণ্ডলার অবশ্য উৎসাহের অভাব ছিল না। কারণ, সে পরোপকারী। নবকুমারকে কাপালিকের হাত থেকে সে বাঁচিয়েছিল। সে মহতী পরোপকারে যাচ্ছে। নবকুমারের সঙ্গে সেই সময় তার কথোপকথনে বঙ্কিম কপালকুণ্ডলার মানবিক দৃঢ়তাকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ন। কাজই কি তোমার ঔষধ তল্লাসে? আমাকে গাছের নাম বলিয়া দাও। আমি ওষধি তুলিয়া আনিয়া দিব।
ক। আমি গাছ চিনিতে পারি, কিন্তু নাম জানি না। আর তুমি তুলিলে ফলিবে না। স্ত্রীলোকে এলোচুলে তুলিতে হয়। তুমি পরের উপকারে বিঘ্ন করিও না।
কপালকুণ্ডলা এই কথা অপ্রসন্নতার সহিত বলিলেন। নবকুমার আর আপত্তি করিলেন না। বলিলেন, ‘চল, আমি তোমার সঙ্গে যাইব।’
কপালকুণ্ডলা গর্বিতবচনে কহিলেন, ‘আইস, আমি অবিশ্বাসিনী কি না, স্বচক্ষে দেখিয়া যাও।’
এই সংলাপ উচ্চারণের সাহস ও স্পর্ধা সমকালের সাধারণ বাঙালি মেয়েদের পক্ষে দেখানো অসম্ভব। কপালকুণ্ডলা তো সাধারণ নয়। কপালকুণ্ডলার গর্বিত বচন শুনে নবকুমার হাত ছেড়ে গৃহে গেল। তার অহমিকা আহত হল। কপালকুণ্ডলা একাকিনী বনে প্রবেশ করল। তারপর?
এখানে বঙ্কিমচন্দ্র ‘কপালকুণ্ডলা’-র শরীরের এক আশ্চর্য অনুভূতির বিবরণ দিয়েছেন। সে পরিচ্ছেদের গোড়াতে বঙ্কিম কিটসের ‘Ode to a Nightingale’ কবিতার থেকে একটা অংশ উদ্ধার করেছিলেন–
‘Tender is the night.
And haply the Queen moon is on her throne,
Clustered around by all her starry fays;
But here there is no Light’
চাঁদের আলোর মুক্তি তো এখানে কপালকুণ্ডলার শরীরে মনে প্রবেশ করছে না। বঙ্কিম লিখেছেন উপন্যাসে, কীটসের কবিতার পাশাপাশি, ‘সপ্তগ্রামের এই ভাগ যে বনময়, তাহা পূর্বেই কতক কতক উল্লিখিত হইয়াছে। গ্রামের কিছু দূরে নিবিড় বন। কপালকুণ্ডলা একাকিনী এক সঙ্কীর্ণ বন্য পথে ওষধির সন্ধানে চলিলেন। যামিনী মধুরা, একান্ত শব্দমাত্রবিহীনা। মাধবী যামিনীর আকাশে স্নিগ্ধরশ্মিময় চন্দ্র নীরবে শ্বেত মেঘখণ্ড-সকল উত্তীর্ণ হইতেছে; পৃথিবীতলে বন্য বৃক্ষ, লতা-সকল তদ্রূপ নীরবে শীতল চন্দ্রকরে বিশ্রাম করিতেছে, নীরবে বৃক্ষপত্র-সকল সে কিরণের প্রতিঘাত করিতেছে। নীরবে লতাগুল্মমধ্যে শ্বেত কুসুমদল বিকশিত হইয়া রহিয়াছে। পশুপক্ষী নীরব। কেবল কদাচিৎ মাত্র ভগ্নবিশ্রাম কোন পক্ষীর পক্ষস্পন্দনশব্দ; কোথাও ক্বচিৎ শুষ্ক-পত্রপাতশব্দ; কোথাও তলস্থ শুষ্কপত্রমধ্যে উরগজাতীয় জীবের ক্বচিৎ গতিজনিত শব্দ; ক্বচিৎ অতি দূরস্থ কুক্কুররব। এমত নহে যে, একেবারে বায়ু বহিতেছিল না; মধুমাসের দেহস্নিগ্ধকর বায়ু অতি মন্দ; একান্ত নিঃশব্দ বায়ু মাত্র; তাহাতে কেবলমাত্র বৃক্ষের সর্বাগ্রভাগারূঢ় পত্রগুলি হেলিতেছিল; কেবলমাত্র আভূমিপ্রণত শ্যামা লতা দুলিতেছিল; কেবলমাত্র নীলাম্বরসঞ্চারী ক্ষুদ্র শ্বেতাম্বুদখণ্ডগুলি ধীরে ধীরে চলিতেছিল। কেবলমাত্র তদ্রূপ বায়ুসংসর্গে সম্ভুক্ত পূর্বসুখের অস্পষ্ট স্মৃতি হৃদয়ে অল্প জাগরিত হইতেছিল।
কপালকুণ্ডলার সেইরূপ পূর্বস্মৃতি জাগরিত হইতেছিল; বালিয়াড়ির শিখরে যে সাগরবারিবিন্দুসংস্পৃষ্ট মলয়ানিল তাঁহার লম্বালকমণ্ডলমধ্যে ক্রীড়া করিত, তাহা মনে পড়িল; অমল নীলানন্ত গগনপ্রতি চাহিয়া দেখিলেন; সেই অমল নীলানন্ত গগনরূপী সমুদ্র মনে পড়িল।’
কিটসের কবিতাতেই কেবল চাঁদ ওঠেনি, ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসে সপ্তগ্রামের নিকটবর্তী বনভূমিতেও কপালকুণ্ডলার মাথার ওপরে চাঁদ উঠেছিল। আর বাবু বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর কিটস-পড়া মন দিয়ে এই কপালকুণ্ডলার শরীর আর মনকে বুঝতে চাইছিলেন। সাধু-বাংলায়, কাব্যময় শব্দবিন্যাসে বঙ্কিম চন্দ্রাহত নীরব বনভূমির মধ্যে কপালকুণ্ডলার শরীর-মনের গল্প বলছেন। কপালকুণ্ডলার চুলের মধ্যে হাওয়া খেলছে। তখন ‘বায়ুসংসর্গে সম্ভুক্ত পূর্বসুখের অস্পষ্ট স্মৃতি হৃদয়ে অল্প জাগরিত হইতেছিল।’

শরীরের স্মৃতি বড় গভীর। তা ঢাকা পড়ে সমাজ-সংসারের চাপে কিন্তু হারায় না। কপালকুণ্ডলা শরীরে হাওয়া খেলে যাচ্ছে আর তার মনে পড়ে যাচ্ছে স্বাধীন জীবনের স্মৃতি, তার একাকী স্বাধীন শরীরের স্মৃতি, সমাজস্পর্শহীন বিবাহপূর্ব শরীরের স্মৃতি। তার নবকুমারকে মনে পড়ছে না, নবকুমারকে সে ভালোবাসে না। সে ভালোবাসে তার নিজের একাকে, প্রকৃতির মধ্যে সেই একাকী-সঞ্চারস্বাধীনা মুহূর্তকে।
এই বঙ্কিমকে কীভাবে বলি দেব? দেব না! হিন্দুত্বের দুর্বিপাক যতই বঙ্কিমকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুক, ভাসাতে পারে না।
আসুন, আমরা বঙ্কিমের সঙ্গে সঙ্গে কীটসের কবিতা উচ্চারণ করি:
‘Away! away! for I will fly to thee,
Not charioted by Bacchus and his pards,
But on the viewless wings of Poesy,’
যাও মৃণ্ময়ী, তুমি আবার কপালকুণ্ডলা হয়ে সমুদ্রের আদিতম বেলাভূমিতে চন্দ্রাহত রাত্রে একাকিনী ভ্রমণ করো।
………………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন সিরিয়াসলি নেবেন না-র অন্যান্য পর্ব
………………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved