

বাঙালির পুজোর সঙ্গে জুড়ে রয়েছে বাংলা বিজ্ঞাপন। পুজোর বাংলা বিজ্ঞাপন নান্দনিকতার প্রদর্শনক্ষেত্র। এখন তাতে এসে মিশেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সৌন্দর্যবোধ। খানিকটা খরচ বাঁচাতেও এই উপায় অবলম্বন করেন নির্মাতারা। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি পুজোর বিজ্ঞাপনে বাঙালিয়ানার ছাপ নেই। কারণ বাঙালির যা কিছু, তা একান্তই বাঙালির, এআই-এর নয়।
বাঙালির একান্ত আপনার দুর্গাপুজো যত বড় হয়েছে, ততই হয়েছে বাণিজ্যিক। হয়ে উঠেছে ‘ইভেন্ট’। প্রয়োজন হয়েছে বিজ্ঞাপনের। ২০১৫ সালে যেমন, দক্ষিণ কলকাতার ‘সবচেয়ে বড় দুর্গা’র খবর সমগ্র বঙ্গবাসীই জেনে গিয়েছিল বিরাট বিরাট হোর্ডিংয়ের সৌজন্যে। কলকাতা শহরে ছোট-বড়-মেজ পুজোর হোর্ডিং ছেয়ে যায় মাসখানেক আগে থেকেই। থিম-শিল্পী-পৃষ্ঠপোষক রাজনৈতিক নেতাদের নাম– সবকিছুই জানিয়ে দেওয়া হয় সেই প্রচার অভিযানে। অনেক বাংলা সিনেমার পিআর-এর বাজেটকেও হয়তো বড় পুজোর প্রচারের খরচ টেক্কা দিয়ে দেবে সহজেই।
এহেন রাজকীয় প্রচার আয়োজন এবার অন্য বছরের থেকে একটু আলাদা– এআই জেনারেটেড ইমেজে ছয়লাপ। ২০২৩-‘২৪ থেকে এআই চ্যাটবটগুলিতে প্রম্পট দিয়ে ইমেজ জেনারেট করার ব্যবস্থা শুরু হলেও, ২০২৫-এ চ্যাটজিপিটি এবং গুগলের জেমিনাই বিনামূল্যে ছবি তৈরি করতে শুরু করলে, তা তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন ট্রেন্ড একে আরও জনপ্রিয় করে। ২০২৫ সালের মার্চে ঘিবলি কার্টুনের ধাঁচে কিংবা হালের আটের দশকের মেজাজে ছবি তৈরির কথা সকলেরই জানা। তার সঙ্গে ক্রমাগত বাংলা-সহ বিভিন্ন ভাষার লেখা সঠিকভাবে ইমেজে বসানোর দক্ষতা এআই বাড়াচ্ছে বলে, প্রচারসামগ্রী তৈরিতে জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। এই বছরের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে প্রচারের অনেক মালমশলাও এআই দিয়ে বানানো হয়েছিল। ফলে দুর্গাপুজোই বা বাদ পড়বে কেন?

এতে আপাতভাবে কোনও সমস্যা না থাকলেও, একটু তলিয়ে দেখলেই চোখে পড়বে– এআই-নির্মিত বিজ্ঞাপনগুলিতে একধরনের নিজস্বতার অভাববোধ হয়। একই এআই বট, একই প্রম্পটে দু’বার আলাদা ইমেজ তৈরি করে ঠিকই, কিন্তু তার ধাঁচ প্রায় সমগোত্রীয়। এটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। সুদীর্ঘ কয়েক শতক ধরে বাঙালির দুর্গাপুজোর মূর্তি, চালচিত্র, আলপনা, মণ্ডপ সজ্জা– এইসবের যে নিজস্ব আঙ্গিক তৈরি হয়েছে, তা এআই-নির্মিত ছবিতে দুর্লভ। দুর্গার হাত-বিভ্রাটকে আপাতত পাশে সরিয়ে রাখছি। খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, এক ধরনের উত্তর-ভারতীয় প্রাধান্য রয়েছে এআই দিয়ে তৈরি ছবির নান্দনিকতায়। দুর্গার মূর্তি শুধু নয়, এই শারদোৎসবের অন্যান্য অনুষঙ্গ যা বিজ্ঞাপনে চলে আসে, সেটা উৎসবমুখর মানুষের পোশাক হতে পারে, কিংবা আলো বা রং– সবেতেই এমন বৈশিষ্ট্য, যা ঠিক বাঙালির নয়। বাংলার মাটি, জল, কাশফুলের গন্ধ সেইসব বিজ্ঞাপনে নেই। কিন্তু ঠিক কেন এমন হয়?
প্রথমে দেখা যাক, এআই কীভাবে কোনও ছবি তৈরি করে। এআই আসলে একটি তথ্যনির্ভর ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম, যা মূলত, বহুল পরিমাণে তথ্য (ডেটা) দিয়ে প্রশিক্ষিত একটি ব্যবস্থা এবং এই ব্যবস্থা তথ্যের ধরন বিশ্লেষণ করে নিমেষেই অসংখ্য ‘হিডেন ইকুইজিশন’ তৈরি করে নিতে পারে। ফলস্বরূপ, তৈরি করতে পারে অটোমেশন সিস্টেম। গোটা জিনিসটাকে একটা বিরাট দোকানের একটামাত্র কাউন্টার হিসেবে ভেবে নিতে পারি আমরা, আর এই কাউন্টারে এসে যা বলা হয়, তাই সে সাজিয়ে এনে ধরে আমাদের সামনে। এআই নিজে কোনও মৌলিক ছবি বানায় না।

ইন্টারনেটে থাকা কোটি কোটি ছবি এবং বিভিন্ন ছবির অনলাইন আর্কাইভ থেকে কোনও এআই, ছবিগুলিকে গিলে নেয়। ডিজিটাল ছবির ক্ষুদ্রতম অংশ, পিক্সেলে, সেই ছবিগুলিকে ভেঙে নিয়ে সেই তথ্য, সংখ্যারাশি রূপে মজুত করে রাখে তার ভাণ্ডারে। এরপর চ্যাটবটকে অর্থাৎ সেই কাউন্টারে ছবি তৈরির জন্য যা প্রম্পট দেওয়া হয়, সেখান থেকে খুঁজে নেয় কি-ওয়ার্ড। সেই কি-ওয়ার্ডগুলিকে মিলিয়ে বিপুল তথ্যভাণ্ডারের থেকে নেওয়া তিল তিল পিক্সেলে ক্রমে জন্ম হয় একটি ছবির। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ডিফিউশন কিংবা জেনারেটিভ অ্যাডভারশিয়াল নেটওয়ার্ক নামের জটিল পদ্ধতি ব্যবহার করে ছবি তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়া আসলে নেতির প্রক্রিয়া, প্রচুর তথ্য থেকে বাদ দিয়ে একটি স্পষ্ট ছবি তৈরির পদ্ধতি। তাই এআই চ্যাটবটে কোনও ছবি তৈরির প্রম্পট হিসেবে কী কী থাকবে, তার সঙ্গে কী কী থাকবে না, তাও লিখলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। তাছাড়া নিজের জেনারেট করা ইমেজ থেকেও ভুল ঠিক শিখে নেয় যে কোনও এআই। ছবিতে লেখা বসানোর দক্ষতা বাড়াতেও আগে তৈরি অসংখ্য বইপত্র, প্রচ্ছদ, পোস্টার, বিজ্ঞাপন ইত্যাদির বিশেষ বিবরণ-সহ এআই-এর প্রশিক্ষণ চলে। এর জন্যই ইমেজে বাংলা ভাষা লেখার ক্ষেত্রেও এআই দক্ষতা অর্জন করছে ধীরে ধীরে। যদিও যুক্তাক্ষর তৈরিতে এখনও হামেশাই ভুল করে।
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় যে-ইমেজ যত সহজলভ্য হবে, এআইও সেই ধরনের ইমেজকে তত ভালো করে বানাতে পারবে। ঠিক এই কারণেই এআই বাংলার দুর্গাপুজো সম্বন্ধীয় তথ্যর থেকে অনেকগুণ বেশি তথ্য পায় নবরাত্রি, গরবা, দশেরা প্রভৃতির। সংখ্যার বিচারে ভারতের অনেক বেশি মানুষ এইসব উৎসবে অংশ নেয়। বিভিন্ন দিক থেকে জড়িত পুঁজির পরিমাণও এইসব অবাঙালি উৎসবে বেশি। তাই বাংলার কোনও বারোয়ারি পুজো উদ্যোক্তা এআই চ্যাটবটে প্রম্পট দিয়ে যখনই বিজ্ঞাপন তৈরি করছেন, তাতে আলাদা করে বিশেষ কোনও নির্দেশ না দিলে, তৈরি হচ্ছে একটি উত্তর ভারতীয় ধাঁচের ইমেজ। তা বাংলার উৎসবের যে নিজস্ব নান্দনিকতা, তার থেকে অনেক দূরে। সেখানে বাদ পড়ে যাচ্ছে মূর্তির পিছনের চালচিত্র, ডাকের সাজ, মণ্ডপের আলপনা, বাঙালির পোশাক, রং, আলো। থাকছে না শিউলি, কাশফুল, ঢাক, ধুনুচির মতো মোটিফ। বিজ্ঞাপনগুলি হচ্ছে উগ্র-বাস্তব ইমেজে ভরা, চড়া রঙের এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একই ধরনের রঙের প্যালেটের। এতে গ্রাফিক ডিজাইনারকে দিয়ে বিজ্ঞাপন বানানোর সময় আর অর্থ বাঁচে; কিন্তু আহত হয় বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

একটি বিজ্ঞাপনও যে সংস্কৃতির উপাদান, সেই বোধেরও কিছু অভাব রয়েছে। দায়িত্বজ্ঞানহীনতা আর যত্নের অভাবও কি নেই? ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচালনায় নারকেল তেলের বিজ্ঞাপন কীভাবে এই সর্বজনীন উৎসবের মুখ হয়ে উঠেছে, তা তো আমাদের সবারই জানা। এইরকম আরও অসংখ্য বিজ্ঞাপন আমাদের এই উৎসবের মরশুমের আমেজকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়, যা তার বিজ্ঞাপনী অভীষ্টকেও ছাপিয়ে যায় বহুদূর। সেই কালোত্তীর্ণ সৃজনশীল কাজগুলির অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে নিজের মাটির প্রতি দরদ, ভালোবাসা ও তার বহিঃপ্রকাশ। তাই যেনতেনপ্রকারেণ প্রচারসামগ্রী বানিয়ে আমরা এই বহমান সৃজনশীল ধারাটিকে অশ্রদ্ধা করছি না তো? বাংলা মুদ্রণসংস্কৃতি অত্যন্ত প্রাচীন। আঠেরো শতকে বাংলার পঞ্চানন কর্মকারের তৈরি চলমান হরফ ইন্দো-আর্য ভাষাগুলির মধ্যে প্রথম। বাংলা পঞ্জিকায় যেসব বিজ্ঞাপন উনিশ শতকে ছাপা হয়েছে, তা আজ রীতিমতো গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে। এই সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে মাথায় রাখাটা প্রয়োজনীয়।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য একেবারেই স্থির কোনও বিষয় নয়। সংস্কৃতির বিবর্তন আছে, বহুমুখী যাত্রা আছে। তা আশেপাশের বিভিন্ন উপাদানে প্রভাবিতও হয়। বাংলার দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে যে উৎসব, তা কয়েকশো বছরের সাংস্কৃতিক যাত্রাপথের এক জীবন্ত দলিল। এর মধ্যে আছে কৃষিভিত্তিক সমাজের ছাপ, প্রাক্-শীতের রোগাবালাইয়ের প্রকোপ থেকে বাঁচার আর্তি, আবার রয়েছে স্বাধীনতার লড়াইয়ের বিপ্লবীদের স্বাদেশিকতার বয়ান। ‘হিন্দুদের দেবদেবী: উদ্ভব ও বিকাশ’ গ্রন্থে হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য দুর্গাপুজো নিয়ে লিখেছেন ‘…বৈদিক, পৌরাণিক, তান্ত্রিক, লৌকিক বিচিত্র রীতি-পদ্ধতি দুর্গাপূজায় সম্মিলিত হয়ে দুর্গাপূজাকে বাঙ্গালীর সার্বজনীন উৎসবে পরিণত করেছে।’ এখানে দুর্গা বাপের বাড়ি আসেন সপরিবারে। বাৎসল্য রসে টইটুম্বুর আগমনী ও বিজয়ার গান বাংলার শারদোৎসবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বাংলার টেরাকোটা মন্দিরগুলিতে খোদাই হয়ে রয়েছে দুর্গার কাহিনি। এখানেই হিন্দু-মুসলিম পরিচয়ের মাঝে আটকে থাকা চিত্রকরেরা পটে ‘লিখেন’ আর গেয়ে শোনান দুর্গার মহিষাসুর বধের গল্প। ভারতের আর যেকোনও প্রান্তের শরৎ-উৎসবের সঙ্গে এর অমিল অত্যন্ত প্রকট। এ কোনও উচ্চ-নীচের বিষয় নয়। এটি নিজস্বতার প্রশ্ন।

এআই-নির্মিত বিজ্ঞাপনগুলি আসলে একধরনের হেজিমনি তৈরি করে। আপাতভাবে খুব বিপদহীন মনে হলেও এই ইমেজগুলি আমাদের বোধের বদল ঘটাতে পারে অচিরেই। আমরা দৃশ্যমানতাকেই গুরুত্ব দিই, মনে রাখি। তা থেকেই রূপ পায় আমাদের ভাবনার ভাষা। ক্রমাগত একই ধরনের ইমেজ দেখার ওপর আমাদের নান্দনিকতার নির্মাণ নির্ভরশীল। নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ছবিগুলিই স্বাভাবিক হয়ে যায়, যা দেখে তারা বড় হয়। সেখানে কোনও দায়দায়িত্ব-যত্নহীন কাজে যেন বাংলার অতি প্রাচীন, বিচিত্র, সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ধারাটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়– সে দায় আমাদেরও। শঙ্কা হয়, যা তৈরিতে লেগেছিল কয়েক শতক, সেই নিজস্বতা কয়েক বছরেই ধ্বংস হয়ে যাবে না তো? সময় আর খরচ বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের সংস্কৃতিকেই আমরা বন্ধক রাখছি না তো?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved