গড়পড়তা বাঙালির কাছে দার্জিলিংয়ের রূপলাবণ্য নতুন করে চেনার নয়। তবু পড়তে ভালো লাগে ‘টুং সোনাদা ঘুম পেরিয়ে: দার্জিলিংয়ের পার্বত্য রেলপথের কথা’। ১০৫ বছর আগে রবার্ট বি. অ্যাডিসের লেখা এই বই পড়লে মনে হয় যেন, এক অলীক ট্রেনে চড়ে কবেকার পার্বত্য রেলপথের রোদ-হাওয়া মাখতে মাখতে এগিয়ে চলার সুযোগ পাওয়া গিয়েছে। আর এ কথা কে না জানে, পাহাড়ের কাছে গেলে আত্মগরিমা কিংবা হীনম্মন্যতা চলে যায়।
ধরা যাক, অফিসের কাজে মাথা-পাগল অবস্থা। হঠাৎ একটু জিরিয়ে নেবেন বলে বারান্দায় এসেছেন, দেখলেন, দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা! এআইয়ের যুগে এ তো হামেশাই হচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির ঢের আগে থেকে, বহু যুগ ধরেই এমন কাজ করে আসছে বই। আমার হাতে এখন যে বই, সেই বইয়ের নাম ‘টুং সোনাদা ঘুম পেরিয়ে: দার্জিলিংয়ের পার্বত্য রেলপথের কথা’। হাতে নিলেই, ঘিঞ্জি কলকাতার বুকেও, ঝমঝম করে টয় ট্রেন চলতে শুরু করে যেন। দূরে আকাশের মিনারে মুখ তুলে দাঁড়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়, শতাব্দীপ্রাচীন এই বইয়ের সঙ্গে চলুন পাড়ি দিই পাহাড়ে।
লীলা মজুমদারের ‘পাকদণ্ডী’ উপন্যাসের যে অংশটা বইয়ের প্রথম পাতায় রাখা, সেখানে আছে– দার্জিলিং স্টেশনে নামলেই বোঝা যায় ‘সমতলের দুশ্চিন্তা সমতলেই পড়ে আছে।’ এই বইয়ের পাতা উল্টালেও যেন গায়েব হয়ে যায় শহরের একিউআই, যানজট, অতি-আলোর আতিশয্য! দীপ্তজিৎ মিশ্র বড় চমৎকার ভাষান্তরের কাজ করেছেন এ বইয়ে।
১০৫ বছর আগে রবার্ট বি. অ্যাডিস লিখেছিলেন ‘দার্জিলিং অ্যান্ড ইটস মাউন্টেন রেলওয়ে’। পর্যটকদের সামনে এই পার্বত্য এলাকা, এর ইতিহাস এবং ঐতিহ্য তুলে ধরাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। সে বই প্রকাশিত হয়েছিল দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের উদ্যোগে। সঙ্গে ছিল অসংখ্য ছবি। বাংলা বইটিতে সেই সব ছবিও রাখা হয়েছে। জুড়ে দেওয়া হয়েছে দু’টি পরিশিষ্ট, যা নিঃসন্দেহে বইটির শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। সঙ্গে রয়েছে আরও নানা আকর্ষণ।

মনে রাখতে হবে, এই বইয়ের লেখক একজন সাহেব। তিনি তাঁর মতো করে লিখেছেন। ফলে দার্জিলিংয়ে এলে যে কেবল ভূগোল পাল্টায় না, মানুষগুলির চেহারা, পোশাকও বদলে যায় অনেকটা– এমন তথ্য আমাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় ঠেকতে পারে। কিন্তু সেটাই এই বইয়ের মজাও। মনে রাখতে হবে, আজ দার্জিলিং নিয়ে অসংখ্য ট্র্যাভেল ভ্লগ চাইলেই দেখতে পারবেন। আর যদি বইও পড়তে চান, সেক্ষেত্রেও বিকল্পের ছড়াছড়ি। সুতরাং এই পুরনো বইটি নিশ্চিতভাবেই ভ্রমণকথা হিসেবে ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। এর গুরুত্ব অন্যত্র। তা ‘অনুবাদকের কথা’ অংশে লেখক লিখেছেনও।
এই বই যেন ‘টাইম অ্যান্ড স্পেস’কে দুমড়ে, আপনাকে পৌঁছে দেয় সেই কোনকালের দার্জিলিংয়ে। সেখানে পৌঁছনোর যাত্রাপথও অতীতের ধুলোয় নিজস্ব মানচিত্র তৈরি করে রাখে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। অ্যাডিস সাহেব লিখছেন, ‘গঙ্গার উত্তর তীরে সান্তাহারে, পর্যটককে ব্রডগেজ লাইনের ট্রেন থেকে মিটারগেজ লাইনে ট্রেন পরিবর্তন করতে হয়। তবে অদূর ভবিষ্যতে ব্রডগেজ ট্র্যাকটি শিলিগুড়ি পর্যন্ত সম্প্রসারিত হলে এই ঝঞ্ঝাট আর পোহাতে হবে না।’ ১৯২১ সালে প্রকাশিত বইয়ে এ’কথা বলা হচ্ছে। সামান্য সময় পরেই সান্তাহার থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত ব্রডগেজের লাইন হয়ে গিয়েছিল। আর তার বছর দুয়েকের মধ্যেই একেবারে কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত! সে-কথাও লেখকই জানিয়ে দিয়েছেন ‘*’ চিহ্নিত অংশে। ফলে পড়তে পড়তে এই পরিবর্তনটাও দিব্যি জানা হয়ে যায়।
তবে একজন সাধারণ পাঠকের কাছে এইসব শুকনো তথ্যের চেয়ে বেশি জরুরি পাহাড়কে ছুঁতে পারার আকাঙ্ক্ষা। তাই যখন পড়তে পড়তে দেখা যায়, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘার যমজ শিখর দাঁড়িয়ে আছে, বাঁ দিকে কাবরু ও জানু এবং ডান দিকে পান্ডিম শৃঙ্গ।… দার্জিলিং থেকে অবসরে এগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে। তবে বাতাসিয়া লুপ থেকে দেখা এই দৃশ্যটি ভ্রমণকারীর স্মৃতিতে নিশ্চিতভাবে এক অমলিন ছাপ রেখে যাবে। এই মাহেন্দ্রক্ষণে দার্জিলিং শহরটিও দেখা যায়– পাহাড়ের বনাবৃত ঢালের উপরে এর সাদা ও লাল রঙের ছাদ বিশিষ্ট ঘরবাড়িগুলো চমৎকার আলো ছড়ায়…’ তখন মন উন্মনা হয়ে যায়। গড়পড়তা বাঙালির কাছে দার্জিলিং বা বাতাসিয়া লুপ কিংবা কাঞ্চনজঙ্ঘার এই রূপলাবণ্য নতুন করে চেনার নয়। তবু পড়তে ভালো লাগে। এক অলীক ট্রেনে কবেকার পার্বত্য রেলপথের রোদ-হাওয়া মাখতে মাখতে যেতে কে না চাইবে! কে না জানে, পাহাড়ের কাছে গেলে আত্মগরিমা কিংবা হীনম্মন্যতা চলে যায়।
তারপর দার্জিলিংয়ে পৌঁছে সেখানকার পথঘাটে ঘুরে বেড়ানো। কেবলই পাহাড় নয়, মানুষকেও দেখা। আর সেই কাজে দারুণ সঙ্গত দেয় বইয়ের পাতায় পাতায় ছাপা অসংখ্য ছবি! পাঠক ঘুরে বেড়াবেন দার্জিলিংয়ের আশপাশেও। যাবেন কালিম্পং, তিস্তা উপত্যকার অনুপম সৌন্দর্যের অভ্যন্তরে। সর্বোপরি, একজন সাহেব অত বছর আগে সেই সময়ের দার্জিলিংকে দেখে কেমন মুগ্ধ হয়েছিলেন, সে-কথাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বইয়ের ‘পরিশিষ্ট’ অংশ দু’টির একটিতে রয়েছে টয় ট্রেন যে বন্ধ হয়ে যেতে পারে, সেই বিষয়ে ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সেই সংক্রান্ত বিবরণ। পরের অংশটিতে দার্জিলিং নিয়ে হওয়া সমস্ত সিনেমার সংক্ষিপ্ত তথ্যপঞ্জি। যদিও এই অংশটি বইটির বাকি চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায়নি। বইয়ে যে অন্য চমক রয়েছে, সে-কথা আগেই বলা হয়েছে। এবার সেই চমকের কথা বলি। বইটি কিনলে তার ভিতরে আপনি পেয়ে যাবেন সেই সময়ে দার্জিলিংয়ে যাত্রার ট্রেনের টিকিট, মানচিত্রের মতো নানা উপহার। অবিকল খয়েরি রঙে প্রিন্ট করা টিকিটটি হাতে নিলে মনে এক ছেলেমানুষি পুলক জাগে। তবে এগুলি না থাকলে বইটির আকর্ষণ যে বিরাট কমে যেত, তা নয় বোধহয়। অনুবাদক যত্ন নিয়ে অনুবাদ করেছেন। বইটির ছাপা ঝকঝকে। বিশেষত ছবিগুলি যেভাবে যত্নের সঙ্গে ছাপা হয়েছে, তাতে চোখের আরাম হয়। প্রচ্ছদ এবং বইটির আকার এমন, দেখলেই হাতে তুলে নিতে ইচ্ছে করে। বাই উঠলেই কটক যে যাওয়া যায় না, সে-কথা আমবাঙালি ভালোই জানে। এই বই তাই তার কাছে সত্যিই একটা টিকিটের মতো। হাতে নিয়ে মনের অলিন্দে উঁকি দিলেই হল। বাকিটা… হঠাৎ মেঘ কেটে গিয়ে কাঞ্চনজঙঘা দেখতে পাওয়ার মতো… ম্যাজিক!
টুং সোনাদা ঘুম পেরিয়ে: দার্জিলিংয়ের পার্বত্য রেলপথের কথা
রবার্ট বি. অ্যাডিস
ভাষান্তর: দীপ্তজিৎ মিশ্র
বইদেশিক
৩২৫্
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved