Aparna Sen movie Yugant celebrates side characters
Robbar
  • ৮ কার্তিক ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৬ অক্টোবর ২০২৬

যুগান্তের ইশারা

যে-জীবন খুব করে বাঁচতে চায় মানুষ, সেই যাপনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার নিজেরই ইচ্ছে, পছন্দ– অন্য কোনও সময়ে। আর এই অনন্ত চক্রব্যূহের সাক্ষী রোজকার দিনে ইতস্তত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পার্শ্বচরিত্রেরা। চিত্রপরিচালক অপর্ণা সেন তা অনুভব করেছেন। তাঁর সিনেমা-নির্মাণে ফিরিয়ে এনেছেন বারবার, রূপকে-সংকেতে।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ১৯:২৯   
Facebook WhatsApp Messenger

আমি যে বাড়িতে থাকি, যেখানে ঘুমই, যে ফোনে কথা বলি, সেই ফোন, আমার বইপত্র, চা খাওয়ার কাপ, আমার ভালোলাগা পোশাক। আমার ভালোলাগা মানুষ। প্রেম। খুঁজে পাওয়া পুরনো হাতের লেখা। হয়তো আমার, কিংবা অন্য কারও। কেউ লিখে দিয়েছিল কিছু, সেই লেখা। শব্দ। অক্ষর। বাড়ির সামনের জঙ্গল। গাছপালা। এক চিলতে রোদ্দুর এই, এক্ষুনি এসে পড়ল গায়ে। আমার এই শরীর। এর মধ্যে কত মানুষের স্পর্শ। চুম্বন। আশীর্বাদ। স্নেহ। এই এত কিছুর মধ্যে ছড়িয়ে আছি– আমি। ছড়িয়ে আছে, আমার জীবন।

অথচ এই এতসব নিষ্পাপ, বাকহীন পার্শ্বচরিত্রের কথা আমরা ভাবি না। তাকিয়ে দেখিও না। ‘যুগান্ত’ সিনেমার তেমনই এক পার্শ্বচরিত্রের কথা আজ বলব। সে কোনও নারী নয়, পুরুষ নয়– একটি খাতা। অর্ধসমাপ্ত এক উপন্যাসের কতকগুলি পৃষ্ঠা সে-খাতার আয়ু।

zoom

ছবিতে মোট চারবার খাতাটিকে দেখতে পাই আমরা। তিনবার স্বচক্ষে। আর একবার দীপুর সংলাপের মধ্য দিয়ে। যাঁরা ‘যুগান্ত’ দেখেছেন, তাঁদের মনে করতে অনুরোধ করব ছবিটির কাহিনিস্রোত। দীপু ও অনু, বিবাহিত। প্রেম ঠিক যেখানে পৌঁছে থমকে দাঁড়ায়, সম্পর্কের নানাবিধ জটিলতা যখন সেই প্রেমকে গ্রাস করতে শুরু করে, সেইখানেই তারা দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আইনিভাবে বিচ্ছেদ না হলেও, একে-অপরের থেকে দূরে দু’টি ভিন্ন শহরে থাকে দীপু ও অনু। তাদের সম্পর্ক পুরোপুরি মরে যায়নি। সেই ধুঁকতে থাকা সম্পর্কের মাটিকে আরেকবার স্পর্শ করার জন্য তারা দেখা করে সেই সমুদ্র কিনারায়, যেখানে বিয়ের পর প্রথম তারা বেড়াতে এসেছিল। স্টেশনে দেখা হওয়ার পর কথা চলতে থাকে। কলকাতা থেকে কীভাবে শিফট করল অনু, কত পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে– আসে সে-প্রসঙ্গও। এবং এই সামান্য ঘটনা বিবরণের মধ্যেই অপর্ণা সেন কেন পরিচালক হিসেবে এক আশ্চর্য, তা নিঃশব্দে বুঝিয়ে দেন।

কলকাতা থেকে জিনিসপত্র শিফটিংয়ের প্রসঙ্গে দীপু বলে, ‘আচ্ছা, আমার ডিকশনারিগুলো কোথায় গেল বলো তো?’ তখনই অনুর সামনে এক স্মৃতি-সুড়ঙ্গ খুঁড়ে দেন পরিচালক। অনুর সঙ্গে-সঙ্গে আমরাও দেখতে পাই– আলো-অন্ধকার ঘর, প্রচুর বই, জিনিসপত্রের মধ্যে একটা খাতা। খাতায় দীপকের লেখা অসমাপ্ত উপন্যাস। সে-ই পার্শ্বচরিত্র। বোঝা যায়, এইমাত্র খাতাটি দেখতে পেয়েছে অনু। প্যাকিংয়ের সময়।

ছবির বেশ কিছুটা পরের অংশে দেখতে পাব, বম্বের নতুন ফ্ল্যাটে শিফট করেছে দীপু। সে আবাসেও প্রচুর জিনিসপত্র। সবই আনপ্যাকড অবস্থায় রাখা। কেবল দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে অনুর নাচের বাঁধানো ফোটোগ্রাফ! তাহলে সমস্ত কিছুর মধ্যে ওটুকুই কি তার কাছে প্রধান?

রবীন্দ্রনাথ আজীবন তাঁর গানে ‘ডোর’ কথাটিকে ফিরিয়ে ফিরিয়ে এনেছেন। বলেছেন প্রকাশ্য অথবা গোপনে, আড়ালময় বন্ধনের কথা। যেমন, ‘বাঁধনবিহীন সেই যে বাঁধন অকারণ’। জীবনে এমন কত অকারণের অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে থাকি আমরা। এই অর্থে ‘অকারণ’ যে, সেখানে বন্ধনের ইচ্ছা আজও কোনও কারণ ছাড়াই জেগে আছে।

যেমন এই দু’টি পৃথক দৃশ্য। অনু কলকাতা ছেড়ে চলে যাবে। তার সেই চলে যাওয়াকে ঘিরে যে-ঘর, সেখানেও প্রচুর ঢাকা দেওয়া জিনিসপত্র। বই। কিন্তু তার মধ্যে থেকে অনু হাতে তুলে নিল কী? দীপুর অসমাপ্ত উপন্যাসের খাতা। অন্যদিকে, দীপুর বম্বের নতুন ফ্ল্যাট। সেখানেও ঢাকা দেওয়া আসবাব। না-খোলা জিনিস। তার মধ্যে কেবল অনুর নাচের ছবি দেওয়ালে টাঙিয়ে রেখেছে দীপু। দু’জনেই দু’জনকে ছুঁয়ে রয়েছে ওরা। এভাবেই। দু’জনের অজান্তে।

পার্শ্বচরিত্রের প্রসঙ্গে ফিরি। দীপুর উপন্যাসের খাতাটি খুঁজে পাওয়ার পর, অনু বেশ কিছু পাতা উল্টে বুঝতে পারে যে, লেখাটি শেষ করেনি দীপু। শেষে লিখে রেখেছে একথা, ‘মেকি? সাজানো…? শুরু করলেই শেষ করতে হবে? এটা শেষ না-হলে কার কতটুকু ক্ষতি?’

‘যুগান্ত’র ১ ঘণ্টা ২৩ মিনিট ৫৪ সেকেন্ড– রাতে, ঘুমের আগে নিজের লেখা উপন্যাস অনুকে পড়ে শোনাচ্ছে দীপু। দ্বিতীয়বার খাতাটিকে এখানে আমরা দেখতে পাই। আচমকাই শেষ হয়ে যায় দীপুর পড়া। ছবির এই অংশের সংলাপ-মুহূর্তটি এমন:

দীপু। বলো?
অনু। শেষ হয়নি তো?
দীপু। যতটা হয়েছে…?
অনু। তুমি খুব ভালো লেখো!
দীপু। ব্যস?
অনু। দ্যাখো, দীপু তোমার স্টাইল একেবারে ব্রিলিয়ান্ট! ব্রিলিয়ান্ট! কিচ্ছু বলার নেই।
দীপু। কিন্তু?
অনু। সত্যি কথা বলব?
দীপু। (কিছুটা রাগতভাবে) ন্যাচারালি, মিথ্যে কথা বলার জন্য রাত জেগে শোনালাম এতক্ষণ!
অনু। কী আশ্চর্য! রেগে যাচ্ছ কেন?
দীপু। তুমিই বা এত ভণিতা করছ কেন? বলো, ভালো লাগেনি, ফুরিয়ে গেল।
অনু। তা নয়। ভালো লাগেনি নয়। ভালো লেগেছে। কিন্তু… এটা জাস্ট আমার মতো দীপু। মানে অ্যাবসোলিউটলি আমার ব্যক্তিগত মত।
দীপু। অবভিয়াসলি! তুমি যে সাহিত্য সমালোচক নও, সেটা সবাই জানে। ভণিতা না রেখে বলো তো!
অনু। যাদের সম্পর্কে তুমি লিখেছ তাদের তুমি চেনো না।
দীপু। আই সি…!
অনু। আমি তোমাকে বানিয়ে-বানিয়ে বলতে চাই না দীপু।
দীপু। ঠিক আছে…। তুমিই-বা এত অ্যাপলোজেটিক হচ্ছ কেন? ভালো লাগেনি। লাগেনি।
অনু। তা নয়। ভালো লাগেনি, নয়।
দীপু। মেকি? সাজানো?
অনু। কিছুটা।

কিন্তু এই সংলাপটিকে কেবল এইটুকু ভাবলে হয়তো ভুল করব আমরা। কারণ এরপরই অনু বলছে, ‘তুমি যাদের চেনো, তাদের নিয়ে লেখো না। তোমার অফিসের বন্ধু-বান্ধব। বিজ্ঞাপনের জগৎ।’ দীপুর প্রত্যুত্তর চিনিয়ে দেয় চরিত্রটির নির্জনতা, আত্মপ্রশ্নের স্বভাব। দীপু বলে, ‘সেটাও তো মেকি’।

zoom

আশ্চর্য হই এর ঠিক পরের অংশে। উপন্যাসের প্রসঙ্গ নিভে গিয়েছে। দীপু ও অনু ঘনিষ্ঠ অবস্থায় একে-অপরকে আদর করতে-করতে পাগলের মতো খাট থেকে নেমে এসেছে মাটিতে। ওই ভীষণ কামোন্মাদ মুহূর্তে হঠাৎ শিথিল হয়ে যায় দীপু। অনু জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে তার, কেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল সে? দীপু নিজেও হতবাক। ‘কী ভাবছে’র উত্তরে বলে, ‘আমার উপন্যাসটার কথা।’

লেখার পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যাঁরা নিজের মনকে নিরন্তর নিয়ে গিয়েছেন, তাঁরা হয়তো অনেকেই স্বীকার করবেন যে, লেখা আসলে এক মানসিক যৌনক্রিয়া। সেখানে মনের অর্জিত শব্দের সঙ্গে চিন্তার মিলন ঘটে। দীপুর লেখা অসমাপ্ত। মিলন সম্পূর্ণ নয় সেখানে। নতুন শরীরের কাছে তার মন যাবে কী করে! এমন সূক্ষ্মতর সংকেতের অতুলনীয় প্রয়োগ বাংলা ছবিতে এখনও পর্যন্ত এমন নির্ভারভাবে হয়েছে বলে জানা নেই। ১৯৯৭ সালে শঙ্খ ঘোষ ‘যুগান্ত’ সম্পর্কে লিখেছিলেন:

বেশ কিছু ভালো বাংলা ছবি আমরা দেখেছি। এমন ছবিও কখনও কখনও দেখেছি যার মধ্যে কোনও কোনও মুহূর্ত যেন ভরাট হয়ে ওঠে কবিতার স্বাদ নিয়ে। কিন্তু বিশ্বচরাচরকে সামনে নিয়ে এসে, অতিকথায়, লোককথায় ভরপুর করে রেখে, প্রকৃতি-মানুষকে-মেলানো এমন এক আতুর ছবি হয়ে ওঠে ‘যুগান্ত’, যা আমাদের সম্পূর্ণতই টেনে নেয় কোনও কবিতার অভিজ্ঞতার দিকে।

zoom
অপর্ণা সেন ও শঙ্খ ঘোষ

‘কবিতার অভিজ্ঞতা’ কথাটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সেই সূত্রেই আরও দু’বার ছবির পার্শ্বচরিত্র, অর্ধসমাপ্ত উপন্যাসের খাতা এসে দাঁড়ায় দীপু ও অনুর মধ্যে। বেড়াতে আসার সময় খাতাটি সঙ্গে নিয়ে এসেছিল অনু। থাকার ঘরের আলমারিতে সেই খাতা খুঁজে পায় দীপু। শেষ পৃষ্ঠায় পৌঁছে বহু বছর আগে তার লিখে রাখা শব্দগুলির সামনে দাঁড়ায়। আবিষ্কার করে তার আভিমান-শব্দের তলায় অনু লিখে রেখেছে ‘চরৈবেতি’। আনন্দ হয় তার। এমনটাই তো চেয়েছিল দীপু।

কিন্তু জীবনে যা চাই, আর যা পাই– সেই পার্থক্যের নামই তো নিয়তি! ছবির শেষে, সমুদ্রের ধারে অনুকে দীপু যখন বলছে সে বম্বের মেকি জীবন থেকে পালাতে চায়, সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে, উপন্যাসটা শেষ করবে এবার, তখন অনুর সংশয়, হতাশা ও চিন্তাবাক্য দীপুকে নিরাশ করলেও দর্শককে শিল্পের আনন্দস্বাদ দিয়ে যায়। অনু যা চেয়েছে এতদিন, দীপু যখন আজ তা করছে, তখন এই বিগতযৌবনা পৃথিবীর এক বিগতযৌবনা নারী তাকে বাধা দিতে চায় কেন?

zoom

খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, দীপুর লেখা উপন্যাসটির নাম ‘চক্রব্যূহ’। মেকি পৃথিবীর চক্রব্যূহ থেকে দীপু বেরিয়ে এলেও, অনু পারেনি। সেই পারা ও না-পারার কাছে, এই পর্যন্ত পৌঁছতে আমাদের সাহায্য করল কে? একটা খাতা। অসমাপ্ত উপন্যাসের কয়েক পৃষ্ঠা।

অপর্ণা সেনের একাধিক ছবিতে এমন প্রাচুর্য ছড়িয়ে আছে। দেখি আর অবাক হই। তাঁর মতো বিশ্বমানের পরিচালক বাংলা ভাষায় ছবি তৈরি করে চলেছেন, এ আমাদের যথেষ্ট গর্ব।

বাতাস বলে দিচ্ছে, এখন হেমন্তকাল। অপর্ণা সেন, আপনি আমাদের হেমন্তলক্ষ্মী!

anjan dutta Aparna Sen bengali movie film direction Indian movie Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shankha Ghosh

Share this article on