Boston Marathon: Sportsmanship Beyond Borders | Robbar
Robbar
  • ১৮ কার্তিক ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৫ নভেম্বর ২০২৬

একটি গান্ধীবাদী দৌড়

বস্টন ম্য়ারাথন। ২১ বছরের এক দৌড়বিদ হয়তো ব্য়র্থই হতেন যদি না তাঁর পাশে এসে দাঁড়াতেন দুই অপরিচিত ভিন্নদেশের প্রতিযোগী। একজন ক্রীড়াবিদের প্রতি আরেকজন ক্রীড়াবিদের ব্য়বহার কীরকম হওয়া উচিত, তার সীমান্তহীন উদাহরণ এই ঘটনা। একটু থেমে, শুধুমাত্র নিজের জয়চিন্তা সরিয়ে, আরেকজনের পাশে দাঁড়ানো কি শুধুই ক্রীড়াবিদদের আঙিনায় গণ্ডিবদ্ধ থাকবে?

শেষ আপডেট: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ২০:৩৭   
Facebook WhatsApp Messenger

দৌড়তে শুরু করেছিলাম আমরা, একসঙ্গে। কখনও কক্ষপথে। কখনও কক্ষপথের বাইরে। কর্পোরেটে। ঘৃণাভাষ্যে। এমনকী, ম্যারাথনেও। বিভূতিভূষণের লেখায় যে-ধরনের দৌড়-দৃশ্যের জন্ম হয়, এ খানিক আলাদা। আমরা শুধুই দৌড়চ্ছিলাম। কী আমাদের লক্ষ্য? কোথায় আমাদের মোক্ষ? কিচ্ছু জানি না। হাঁপ ধরছিল যাদের, হোঁচট খেতে শুরু করেছিল দ্বিতীয় ল্যাপের পরেই, যাদের মুখে উঠে এসেছিল একদলা রক্ত, তাদের পিছনে ফেলে এসেছি। অক্লেশে। কেউ থামতে শেখায়নি আমাদের। বলেছে, ‘রেভেনিউ জেনারেট’ না করতে পারলে তুমি ডিলিট। তুমি একা। তুমি চিরতরে নিঃসঙ্গ। যাও! ট্যাক্সের প্রয়োজন নেই আর।

zoom
রবসন-অজয়-অ্যারন

তবু এ-লেখা ততখানি ডিপ্রেসিং হবে না মশাই! মোদ্দা ব্যাপারখানা কী? ১৮৯৭ সাল থেকেই, বস্টন শহরে একটি বিরাট ম্যারাথনের আয়োজন করা হয়, যা পৃথিবীর প্রাচীনতম। দেশবিদেশের অসংখ্য অ্যাথলিটের সঙ্গে, এ বছর অজয় হরিদাসও দৌড়চ্ছিলেন। ২১ বছর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কিন্তু ম্যারাথন রেসের বাঁশি বাজা ইস্তক, যখন চতুর্থবারের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন অজয়, ফিনিশ লাইন তখনও মাইলখানেক দূরে। অর্থ হয়, বাকি পথটুকু বুকে ভর দিয়ে অতিক্রম করতে হবে! অজয়ের দম ফুরিয়ে আসছে। এখানেই কি রেসের ইতি টেনে দেবে সে? যে অক্লান্ত প্রশিক্ষণে নিজেকে প্রস্তুত করেছিল অহর্নিশি, এইবারই সমস্তটা ভোগে?

ঠিক তখনই, পিছন থেকে এগিয়ে এল দুটো হাত। যে-কারণে মানবমনের আশা পুরো ধুলো হয়ে যায় না! অ্যারন বেগস, উত্তর আয়ারল্যান্ডের মানুষ। বয়স ৪০ পেরিয়েছে। বস্টন ম্যারাথনে দৌড়চ্ছেন এই প্রথম! কিন্তু ফের গোল বাঁধল। অজয়ের শরীর এতই দুর্বল হয়ে পড়েছে, একা হাতে অ্যারন টেনে তুলতে পারছিলেন না। চাই আরও একটা কাঁধ! এহেন দৃশ্যের কাছে এসে, থামলেন, ব্রাজিলের অ্যাথলিট রবসন ডি অলিভেরা। কোনওরকম ব্যক্তিগত জয় অথবা রেকর্ডের পরোয়া করলেন না কেউ। মাটি টেনে তুললেন অজয়কে। তারপর তিনজন অ্যাথলিট, তিনটে পৃথক দেশ, তিন অপরিচিতের তবু কাঁধে কাঁধ, কোনও রক্ত-ঘামের সম্পর্কে না জড়িয়েও ফিনিশ লাইনে পৌঁছলেন। অ্যারন বললেন, ‘কোন ফিনিশ লাইনে পৌঁছব, একা একা দৌড়ে? বস্টন ম্যারাথনের যে সুদীর্ঘ এবং ঐতিহাসিক যাত্রাপথ, সেটুকু উপভোগ করব না একসঙ্গে?’ রবসন লিখেছেন, ‘একের চেয়ে দুইয়ের শক্তি বেশি।’ সবসময়। সবখানে। চিরায়ত সত্য। না থামলে টের পেতেন কি!

রবসন-অজয়-অ্যারন যেমন যৌথতার ছবি এঁকেছেন, বলেছেন, সংগঠিত জয়ের যে উল্লাস, তেমনই দৃঢ়ভাবে আছে, স্পোর্টসম্যানশিপ। কেন? একজন ক্রীড়াবিদের সম্মান অথবা আত্মার খবর, সবচেয়ে যোগ্যভাবে পড়তে পারেন অপর ক্রীড়াবিদ। তেমনই সমীচীন।

zoom
মতি নন্দী

মনে পড়ছে, মতি নন্দীর একটি ছোটগল্প। নাম, ‘অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ’। গল্পে শুরুয়াতে আমরা জেনেছি, সংবাদপত্রে একজন ক্রীড়াবিদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু সেই সাক্ষাৎকারে আছে, একটি ভুল তথ্য। কী সেই তথ্য? লন্ডন অলিম্পিক্সের ট্রায়াল চলছিল। মুম্বইয়ে। ‘হপ স্টেপ অ্যান্ড জাম্প’ ইভেন্টে, হরষিত চ্যাটার্জি লাফিয়েছিলেন, সাড়ে ৪৮ ফুট। ভারতীয় দলে চান্সও পেয়েছিলেন সেই বছর। তাই, স্পোর্টস এডিটর, চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন অবিনাশ মজুমদার। অবিনাশের দাবি, সে এবং হরষিত– দু’জনেই ট্রায়ালে সাড়ে ৪৪ ফুট লাফিয়েছিল। এদিকে সাড়ে ৪৮ ফুট লাফিয়েছিল, বোম্বাইয়ের হেনরি লোবেরো। এরপরই দেখুন কীভাবে অবিনাশের স্পোর্টসম্যানশিপ জ্যান্ত হচ্ছে আমাদের সামনে–

চিত্তরঞ্জন প্রশ্ন করলেন, আপনি হেনরির হয়ে ওকালতি করছেন কেন?

অবিনাশ উত্তর দেয়, ‘কত বাসনা নিয়ে একজন অ্যাথলিট মাঠে আসে, প্র্যাকটিস করে, দিনের পর দিন কষ্ট সয়ে, ডিসিপ্লিনড থেকে, কত সাধ আহ্লাদ বর্জন করে সে একটু একটু করে এগোয়। তার এগোনো মানে দেশের এগোনো, জাতির এগোনো। এজন্য তাকে সম্মান, শ্রদ্ধা দেওয়া উচিত। চুরি করে সেটা একজন নিয়ে নেবে আর তাতে আপনারা সাহায্য করবেন?’

কিন্তু অবিনাশ সেটুকু বলেই থেমে থাকেনি। নিজের চালচুলো আর সম্বলটুকু বেচে দিয়ে মুম্বই গিয়েছিল। ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র হেড-অফিসে। খুঁজে বের করেছিল, ১৯৪৮ সালের সেই পেপার-কাটিং। তারপর সেটা খামে ভরে চিত্তরঞ্জনের অফিসের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়েছিল। তারপর অবিনাশের কী হল? জানি না। জয়রাম দত্ত লেনের ভিতরে অবিনাশের ধুঁকতে থাকা বাড়ি, অবিনাশের গ্যাস-স্টোভের দোকানে কি সোনার মেডেল ঝুলেছে তারপর? জানি না। হেনরির সঙ্গে অবিনাশের দেখা হলে কী কথা বিনিময় হত দু’জনের? জানি না। শুধু দেখতে পাই, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যেন ট্রিপল জাম্পের প্র্যাকটিস করছে ওরা। দু’জন অ্যাথলিট। সেভাবেই আসলে একটা ক্রীড়া-জীবনের ল্যাপ সম্পূর্ণ হয়। তারপর আবার, আবার…

সহ-খেলোয়াড়ের প্রতি অবিনাশের এই সম্মান, কখনওই লোকদেখানো ছিল না। উচ্চস্বরে প্রতিবাদও ছিল না। কেবল ছিল, ভিতরের যে অদম্য ‘আমি’, তাকে খানিকক্ষণ থেমে যেতে বলা। কিন্তু থামছি আদৌ? মগজের প্রতি স্নায়ুতে, প্রতি পলে, নানা ধরনের নোটিফিকেশন আসে। সম্প্রতি নোটিফিকেশন এল, বুকস্টল ভাঙতে হবে! যে প্রৌঢ় ছুটে গেলেন, বই আগলে বললেন, ‘এগুলো চিরায়ত সাহিত্য, নষ্ট করো না’– থেমে রইলাম তাঁর সম্মুখে? দুর্দান্ত এক নেশায় পেয়েছে আমাদের। কীসের নেশা, মাইরি বলছি, জানি না! শুধু জানি দৌড়তে হবে। আর এ লেখাটা শেষ করে ফেলতে হবে দ্রুত। নইলে পরবর্তী কপির ডেডলাইন মিস করে যাব!

zoom
‘নিউ ডন’

চোখের সামনে ১০৮খানা ফাঁকা চেয়ার, বৃত্তাকারে সাজানো। এ হল একটি ইন্সটলেশন আর্ট, যার নাম, ‘নিউ ডন’। শিল্পী দোয়েল যোশী এবং নীল ঘোষ বালসার। উভয়েই মুম্বই-নিবাসী। তাই ভারত তথা সমগ্র দক্ষিণ-এশিয়ার সংস্কৃতির সঙ্গে, নিবিড় যোগাযোগের সেতু হিসেবে বেছে নিয়েছেন একটি সংখ্যা, ‘১০৮’। যেমন, শ্রীকৃষ্ণের ১০৮টি নাম। সন্ধিপুজোয় ব্যবহৃত পদ্মফুলের সংখ্যা ১০৮। যেমন, পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব চাঁদের ব্যাসের প্রায় ১০৮ গুণ! সেই সামঞ্জস্যের কথা মাথায় রেখেই, ১০৮খানা চেয়ার। যেহেতু, শিল্পের কোনও উদ্দেশ্য– মহৎ অথবা ক্ষুদ্র–থাকাটাই অবশ্যম্ভাবী, তাই প্রশ্ন উঠেছে, চেয়ারগুলো কী করছে সেখানে? চেয়ারগুলো বলছে, দু’দণ্ড থেমে যাওয়ার কথা। নির্মাণ করছে একটি স্বতন্ত্র স্পেস, যেখানে আপনি এসে বসবেন। অহেতুক। তাকিয়ে দেখবেন, অবসন্ন পাখি ও মানুষেরা ঘরে ফিরছে। অথবা, নিত্য যা-কিছু ঘটছে, সূর্য উঠছে, পৃথিবী একঘেয়ে গোল্লাপাক দিচ্ছে– সেই সমস্তকে ছুটি দিয়ে দিলেন একরকম। তারপর নতুন কোনও চিন্তা-সুতোর নাগাল পেয়ে গেলেন, ওই! নিউ ডন-এর মূল উদ্দেশ্যে আসলে সেটাই।

একসময় নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করে বসবেন, অজান্তেই, আজ অবধি আমাকে থামতে বলেছে কেউ? দূরে তাকালে দেখতে পাবেন, দ্রাবিড়ীয় ভঙ্গিতে শ্যাডো প্র্যাকটিস করছে কোনও বছর তেরোর কিশোর। হাতে ব্যাট।

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন রোদ্দুর মিত্র-র অন্যান্য লেখা

………………….

ajay haridasse art installation boston boston marathon marathon Moti Nandi Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on