Iran Promoted Harmony and Unity at the World Cup। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শত্রু দেশে বন্ধুত্বের গান

বিশ্বকাপে চমৎকার ফুটবল খেলেছে ইরান। কিন্তু তার চেয়েও বেশি করে মাঠের বাইরে তাদের আচরণ মন জিতেছে। বিশেষ করে যে চিঠি তারা দ্বিতীয় ম্যাচের পরে রেখে গিয়েছে, সেখানে সম্প্রীতির বার্তা যেন একটা অন্য ছবি ফুটিয়ে তুলছে। ইরানকে ঘিরে বিশ্বরাজনীতিতে বিতর্ক, নিষেধাজ্ঞা, সংঘাত কম নেই। আমেরিকা বারবার আঙুল তুলেছে তাদের দিকে। তার ভিতরে রাজনীতি রয়েছে, রয়েছে একধরনের আগ্রাসন। সেই সব সংঘাতের সমান্তরালে সবুজ মাঠ ও মাঠের ভিতরে গড়াতে থাকা বল! সেখানে মন জিতে নিয়েছে ইরান।

শেষ আপডেট: জুন ২৮, ২০২৬, ১৮:৪৬   
Facebook WhatsApp Messenger

খেলার মাঠ। বল ছুটছে। চিৎকার। হর্ষধ্বনি। ড্রাম বাজানোর শব্দ।

জাম্প কাট!

যুদ্ধ। ক্ষেপণাস্ত্র। জনপদের মাঝখানে ধোঁয়ার প্রকাণ্ড কুণ্ডলী।

এরই মাঝখানে… সারা পৃথিবীর আমরা। বসে আছি। দেখছি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে থাকা অবস্থাতেই আমেরিকার মাটিতে বিশ্বকাপের আসর। কিন্তু যুদ্ধ কি কেবল পশ্চিম এশিয়ায়? সেই যুদ্ধের এক টুকরো বীভৎসতা কি মার্কিন মুলুকেও ঝাপটা মারছে না?

zoom
বিশ্বকাপ আবহে যুদ্ধের আঁচ আমেরিকায়

আমাদের চোখের সামনে একটা চিঠি। তাতে লেখা ‘বিশ্বের সমস্ত দেশের মধ্যে শান্তি, সম্মান ও বন্ধুত্ব বজায় থাকুক।’ বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের পর লকার-রুমে রেখে যাওয়া এই চিঠি এখন ভেসে রয়েছে আমেরিকা ও ইরানের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার মাঝখানে।

zoom
ড্রেসিংরুমে যে খোলা চিঠি রেখে গিয়েছে ইরানের ফুটবল টিম

যে দেশের সঙ্গে যুদ্ধ, সেই দেশেই খেলতে গিয়েছে ইরান। ব্যবহারও তেমনই মিলছে। মেক্সিকো-আমেরিকা ‘ডেলি প্যাসেঞ্জারি’ করতে হচ্ছে। তার ওপরে ভিসা সমস্যা। আসলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর গলায় গলায় বন্ধুত্ব। তাই খেলা-টেলার বিষয়ে ফিফা কোনওরকম সহযোগিতাই করতে রাজি ‌নয় যেন! ইরানের অধিনায়ক মেহদি তারেমি তো প্রশ্নই তুলে দিয়েছেন তাঁদের দেশের প্রতি ফিফার মনোভাব নিয়ে।

zoom
আমেরিকায় দর্শকদের অভিবাদন জানিয়ে মাঠ ছাড়ছেন ইরানের ফুটবলাররা

আসলে সবার জানা, যুদ্ধ বাঁধাতে ওস্তাদ ট্রাম্পকেই কি না ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ দেওয়া হয়েছে গত ডিসেম্বরে! মার্কিন সংবাদমাধ্যম আবার বুক ঠুকে বলছে– এটা না কি ‘ট্রাম্পের বিশ্বকাপ’! তা ভুল খুব একটা বলেওনি অবশ্য। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ট্রাম্প তাঁর ‘খেল’ দেখাচ্ছেন। ইরানিদের না কি সুযোগ দেওয়া যাবে না। তারা সুযোগ পেলেই সন্ত্রাসবাদীদের ঢোকাবে মার্কিনভূমে! তবে কেবল ইরান নয়, সোমালিয়ার রেফারিকেও অপদস্থ করা হয়েছে। আরও আছে। তবে নানা বৈষম্যের মধ্যে ইরানকে যে একটু ‘স্পেশাল’ খাতির করা হবে, সেটাই স্বাভাবিক। একেবারে প্রত্যক্ষ শত্রু যে!

এই যে আবহ, তা তেতো… এই কটু স্বাদের মধ্যেও মাঠে চমৎকার ফুটবল খেলেছে ইরান। কিন্তু তার চেয়েও বেশি করে মাঠের বাইরে তাদের আচরণ মন জিতেছে। বিশেষ করে যে চিঠি তারা দ্বিতীয় ম্যাচের পরে রেখে গিয়েছে, সেখানে সম্প্রীতির বার্তা যেন একটা অন্য ছবি ফুটিয়ে তুলছে। ইরানকে ঘিরে বিশ্বরাজনীতিতে বিতর্ক, নিষেধাজ্ঞা, সংঘাত কম নেই। আমেরিকা বারবার আঙুল তুলেছে তাদের দিকে। তার ভিতরে রাজনীতি রয়েছে, রয়েছে একধরনের আগ্রাসন। ইরানও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। মার্কিন হামলার জবাবে তারাও আশপাশের দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এইসব সংঘাতের সমান্তরালে সবুজ মাঠ ও মাঠের ভিতরে গড়াতে থাকা বল! সেখানে মন জিতে নিয়েছে ইরান। মনে করিয়ে দিয়েছে– খেলার মাঠ বৈষম্যের জায়গা নয়। তা আসলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও কাঁধে কাঁধ মেলানোর জায়গা। খেলার শেষে কেবল জার্সি বদল হয় না। পরস্পরের সঙ্গে বদলে নেওয়া হয় অবস্থানও। তুমি জিতেছ। আমি হেরেছি। অথবা উল্টোটা। কিন্তু খেলার শেষে এসে সেটা গৌণ। আসল একসঙ্গে দৌড়ে যাওয়া। এই একত্রিত থাকাটাই আসল।

ইরানের খেলোয়াড়রা যে চিঠি ‌লিখেছেন, তাতে আরও লেখা– ‘হাজার বছরের প্রাচীন পারস্য থেকে আজকের আধুনিক ইরান, ইরানের চেত‌না একই রকম জীবিত ও অবিচল। আমরা গর্বের সঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলসে এসেছিলাম। সম্মানের সঙ্গেই লড়েছি। এবার মর্যাদার সঙ্গেই ফিরছি।’ সেই সঙ্গেই লস অ্যাঞ্জেলসকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানানো হয়েছে আতিথেয়তার জন্য। পাশাপাশি দর্শকাসনে থেকে সমর্থনের জন্য সমস্ত ইরানি সমর্থকদের জন্যও জানানো হয়েছে ধন্যবাদ। যাঁরা ১৮০ মিনিট (তখনও পর্যন্ত দু’টিই ম্যাচ খেলেছে ইরান) প্রিয় দলের জন্য নিংড়ে দিয়েছেন নিজেদের হৃদয়, কণ্ঠ ও আত্মাকে!

zoom
মিশর ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে রেখে যাওয়া ইরান টিমের বার্তা

তবে সেই সঙ্গেই আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় গুঁড়িয়ে যাওয়া মিনাব অঞ্চলের একটি মেয়েদের স্কুলের কথাও বলছে ওই চিঠি। যে হামলায় অন্তত ১৬৮টি শিশু প্রাণ হারিয়েছিল। সেইসব মৃত্যুর দগদগে ক্ষতকে ইরানের মানুষ ভোলেনি। ভোলা যায় না। তবু জীবনে ফিরতে হয়। খেলার পবিত্রতায় স্নান করে শোক ফেলে এগিয়ে যেতে হয়। এবং গ্যালারিতে থাকা ইরানের সমর্থকরা। লস অ্যাঞ্জেলসে বহু ইরানির বাস। বলা হয়, ইরানের বাইরে অন্যতম বৃহত্তম ইরানি জনগোষ্ঠী এই শহরেই বাস করে। সেই সমস্ত সমর্থকদের মধ্যে কিন্তু মতপার্থক্য ছিল। কারও হাতে ইরানের বর্তমান জাতীয় পতাকা। কারও হাতে বিরোধী গোষ্ঠীর ‘সিংহ-সূর্য’ খচিত পতাকা! কিন্তু দলের জয় প্রার্থনায় সকলেই একবগ্গা। ইরান অবশ্য জয় পায়নি। আবার হারেওনি। প্রথম দু’টি ম্যাচ লস অ্যাঞ্জেলসে ড্র করার পর সিয়াটলে মিশরের সঙ্গে নাটকীয় ড্র। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত জয় হাতের মুঠোয় এসেওছিল এক মুহূর্তের জন্য। শোজায়ে খলিলজাদেহ গোল করে উল্লাসও শুরু করেছিলেন। কিন্তু ভার-এর সিদ্ধান্তে অফসাইডের ঘোষণা… সব আশা শেষ। আমরা দেখলাম যেন মিলিমিটারের ফারাকে গোলটা বাতিল হয়ে গেল! তবে সেখানেও সমর্থন‌ কম ছিল না।

zoom
ইরানের শোজায়ে খলিলজাদেহ গোল-উল্লাস, যা নিয়ে বিশ্বকাপে বিতর্ক তুঙ্গে

খেলায় হার-জিত থাকে। প্রথমবারের জন্য ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তারা যেতে না পারলেও হৃদয় জয় করল। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে তারা জেতেনি। হারেওনি। কিন্তু স্রেফ হার-জিতের খেলা খেলতে বোধহয় ইরান আসেনি। হ্যাঁ, আমেরিকা ও ফিফার রক্তচক্ষুতে ক্রুদ্ধ হয়ে গোল করে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে ইরানের মিডফিল্ডার মহম্মদ মোহেবি দু’হাত দিয়ে বন্দুকের ভঙ্গি করে দর্শকদের দিকে অঙ্গভঙ্গি করেছেন বটে। তবু খেলার মাঠের তাৎক্ষণিক উত্তেজনার সেই মুহূর্তকে সরিয়ে রাখাই যায় হাতে লেখা চিঠির আশ্চর্য প্রার্থনার দিকে তাকিয়ে। কেউ কেউ নাক সিঁটকে বলতেই পারেন, লোকদেখানো! কিন্তু আমরা জানি, বিশ্রী শত্রুতার বলয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে শান্তির বার্তা উচ্চারণ করতে কলজে লাগে। ইরানের বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ বটে। কিন্তু বিশ্বের, সব দেশের মধ্যে সম্প্রীতির এই শান্তির বার্তা দিয়ে তারা হৃদয় জিতে নিয়েছে।

এই বন্ধুত্বের নিবিড় আহ্বানের সামনে ফিফার ট্রাম্পকে দেওয়া ‘পিস প্রাইজ’ সত্যিই কেমন হাস্যকর ঠেকে!

……………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন বিশ্বদীপ দে-র অন্যান্য লেখা

……………………….

FIFAWorldCup2026 Harmony Iran Football Team Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Unity USA-Iran War

Share this article on