
নিজস্ব জীবন-দুনিয়ার খুঁটিনাটি চিন্তা-চেতনার রঙিন অধ্যায় লিখতে লিখতে, বিশৃঙ্খলার সৌন্দর্যে সহবাস করতে করতে এই সুদীর্ঘ জবানবন্দিতে বারবার এসে পড়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয়! বেশ কয়েক বছর গ্রামস্কুলে পাঠ শেষে ‘আমি পুরুলিয়া শহরে এসে নিজেকে হারাতে থাকি’, ‘জুতো পরলেই মনে হত, যদি হারিয়ে যায়!’ এবং ‘হাওড়া স্টেশনে নেমে ভয় পাছে হারিয়ে যাই!’… যে জীবনকে হারাতে চেয়ে কবিতা রচনা, তাকেই কি হারানোর ভয় পান কবি?
২০০৩। নভেম্বর। এই বাংলার এক রোগা পত্রিকা ‘শিরিন’ বাঙালির বিলুপ্তপ্রায় অভ্যাস ‘চিঠি’ নিয়ে একটি সংখ্যা করবে। সীমিত সাধ্য। কিন্তু তখনই চিঠির মৃত্যুঘণ্টা শোনা যাচ্ছে। ‘পৃথিবীটা ছোট হতে হতে’… দূরত্ব বাড়াচ্ছে। চিঠি মরছে মানে অপেক্ষাও…! ইমেল-ফ্লপি-সিডি-অরকুট-কেবল টিভি-মোবাইল ফোন ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলছে পত্র সংস্কৃতিকে। হাতে সময় কম। দ্রুত জিনিসের দাম বাড়ছে, জীবনের দাম কমছে। পুরুলিয়ার ‘চিঠি সম্রাট’কে আবদার পাঠালাম– লেখা চাই। কিছুদিন পরেই এসসি সিনহা রোড থেকে ভেসে এল একটি পোস্টকার্ড। যেখানে বাংলা কবিতার ‘আটপৌরে রাজপুত্র’ লিখেছেন– ‘এলোমেলো গদ্য একটা পাঠালাম। পছন্দ না হলে বাতাসে উড়িয়ে দিও।’ চিঠি সংক্রান্ত গদ্যটি আলাদা করে বেয়ারিং ডাকে এসেছিল। সে আসল কথা নয়, আসল কথা তবে কী?
এই যে গদ্যভঙ্গি– ‘পছন্দ না হলে বাতাসে উড়িয়ে দিও।’ এই যে ‘উদাসীন দাপট’, ‘অভিমানী স্পষ্টবাদিতা’– এ একমাত্র ‘অস্ত্রের নীরবতা’র কবি নির্মল হালদারের পক্ষেই সম্ভব। আমাদের মনে রাখা উচিত, কবির লিখনভঙ্গি আসলে তাঁর হৃদয়ভঙ্গি। ‘দশমিক’ থেকে প্রকাশিত নির্মল হালদার রচিত আত্মকথা ‘আমার কথা, আপনাকে’ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। মণীন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত ‘পরমা’-র শীত-বসন্ত ১৩৮৬ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘আমার কথা, আপনাকে’। মণিমুক্তের মতো এই রচনাটির গ্রন্থবদ্ধ হতে সময় লেগে গেল ৪৫ বছর (প্রায় অর্ধশতক)। একে কী বলব, মঞ্চ থেকে দূরে থাকা প্রান্তিক বাংলা কবিতার মন্দ কপাল! উল্লেখ্য, কাছাকাছি সময়ে ‘পরমা’য় প্রকাশিত হয়েছিল আরও দুই অবিষ্মরণীয় জীবনস্মৃতি। গ্রীষ্ম-বর্ষা ১৩৮৫ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল দেবদাস আচার্য-র ‘আত্মকথা’– ‘দেবদাসের জীবনপ্রভাত’; এবং শরৎ ১৩৮৮ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল মণীন্দ্র গুপ্তের ‘অক্ষয় মালবেরি’। বলা বাহুল্য, রচনাকারদের সাহস ও সততার গুণে প্রতিটি রচনা বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের জন্যে আলাদা আলাদা জানলা খুলে দিয়েছিল। নির্মল যেমন তাঁর শৈশবের কথা লিখতে গিয়ে মায়াবী গদ্যের আড়ালে এক দীর্ঘ কবিতাই বুনে ফেলেন! যার নাম হতে পারে ‘বাড়ি’!

‘বাড়িটার রং সাদা। নীচে একটা ঘর, রান্নাঘর। ওপরে তিনটে ঘর। ঘরের জানলা-দরজায় পর্দা ঝোলে না। আমাদের কুয়ো নেই, বাথরুম নেই, খাটা পায়খানা আছে। জলখরচের জলটা পাড়ার কারুর কুয়ো থেকে, খাবার জলটা রাস্তার কল থেকে ধরে নিয়ে আসা হয়। আমাদের একটা দোকান আছে। একটা দোকানেই তিন দাদার চালের কারবার। আমাদের বাড়ির একটুখানি ছাদে গোটা চারেক ভাঙা টবে ফুল গাছ। কোনো গাছ মরো-মরো, কোনো গাছে ফুল ফোটে।’
এভাবেই ‘সত্যসুন্দর’ বর্ণনায় শুরু হয় ‘আমার কথা, আপনাকে’। এই একটি অনুচ্ছেদেই রয়েছে সমগ্র রচনার মূলগত স্বাদ। তন্নিষ্ঠ পাঠক অনুভব করেন– এই গদ্য যেমন ‘স্পষ্ট, সরল এবং অকৃত্রিম’, তেমনই ‘মায়াবী অথচ স্বাধীন এক দুঃসাহস’। ছোট এক গদ্যাংশে পাশাপাশি এসে পড়েছে ‘চালের কারবার’, ‘রান্নাঘর’, ‘খাটা পায়খানা’ এবং ‘ভাঙা ফুলের টব’। ঠিক যেমনটা বাস্তবের পৃথিবীতে তাদের সহাবস্থান। ‘সভ্য’ মানুষ যাকে আলাদা আলাদা রাখতে ‘সামাজিক স্বাচ্ছন্দ’ বোধ করে। কিন্তু কবির সে দায় নেই। গদ্য রচনাকালেও নেই।

‘আমার কথা, আপনাকে’-র অন্যতম শক্তির কথা ব্লার্বে প্রকাশক পৃথ্বী বসু উল্লেখ করেছেন– নানা সামাজিক সংস্কারকে অগ্রাহ্য করে নির্মল হালদার এই গদ্য লিখেছেন। লেখক অকপটে জানিয়েছেন, বাবা-মায়ের আঠারোতম সন্তান তিনি, পারিবারিক ‘অশিক্ষা’র বিপরীতমুখী ধাক্কা, চূড়ান্ত দারিদ্রের বিষ, কুটিল কলকাতার প্রতি ভয় এবং কবির সমকামী আত্মপরিচয়– ‘সরস্বতী পুজোর রাত্রে নাটক করতে গিয়ে বন্ধুর সঙ্গে শুয়েছি। গা শিরশির করেছে। পরস্পরকে জড়িয়ে কী যেন করেছি। এখন জানি, ওর নাম সমকাম। এবং ধীরে-ধীরে বুঝেছি, আমি একটি সমকামী যুবক।’ কিন্তু এখানেই ৪৪ পাতার এই মহাগ্রন্থ ফুরোয় না। বরং শুরু হয়।
নুন-আনতে পান্তা ফুরয় সংসারে ‘সেজদি বইয়ের পোকা ছিল’। কবিতাপাগল বেকার ছেলেকে মা বলেছিলেন– কবিতা লিখতে লিখতে একদিন ঠুঁটো হবি, তিনিই কুড়িয়ে-বাড়িয়ে উপহার দেন একটি কলম। আসলে নির্মলের আশ্চর্য এই কলমেই মা-বাবা-দাদা-দিদি-প্রতিবেশী-বন্ধু-প্রেমিকের মতোই শৈশবের গাছ-পাখি-নদী-মন্দির-স্কুল-চায়ের দোকানও হয়ে উঠেছে এক-একটি জ্যান্ত চরিত্র। ছত্রে ছত্রে কবির দ্বীধাহীন জীবনপাঠে মুগ্ধ হন পাঠক। কবিতা লেখার ‘ব্যারাম’ই একদিন সৈকত রক্ষিতের সঙ্গে বন্ধুত্বের ‘শুশ্রূষা’ দেয় নির্মল হালদারকে। জন্ম হয় ‘আমরা সত্তরের যীশু’ পত্রিকার। আত্মজিজ্ঞাসায় ভরা একটা জীবনে কেবলই কবিতায় ডুবতে থাকেন কবি– ‘একটা চামড়ার সুটকেসের ওপর শূন্য-সাদা কাগজ, আমি ঝুঁকে পড়ছি। এবং প্রকাশিত হয় একটা রক্তমাংসের কবিতা। কার উপকারে লাগে? কেবলই আত্মগৌরব? কবিতা কি কেবলই ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের, কলহের?’

নিজস্ব জীবন-দুনিয়ার খুঁটিনাটি চিন্তা-চেতনার রঙিন অধ্যায় লিখতে লিখতে, বিশৃঙ্খলার সৌন্দর্যে সহবাস করতে করতে এই সুদীর্ঘ জবানবন্দিতে বারবার এসে পড়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয়! বেশ কয়েক বছর গ্রামস্কুলে পাঠ শেষে ‘আমি পুরুলিয়া শহরে এসে নিজেকে হারাতে থাকি’, ‘জুতো পরলেই মনে হত, যদি হারিয়ে যায়!’ এবং ‘হাওড়া স্টেশনে নেমে ভয় পাছে হারিয়ে যাই!’… যে জীবনকে হারাতে চেয়ে কবিতা রচনা, তাকেই কি হারানোর ভয় পান কবি?
আসলে জাদুবাস্তব এক গৃহনির্মাণ করতে থাকেন একজন কবি। ঠিক কেমন হবে সেই জীবনগৃহ? ‘আমার কথা, আপনাকে’-র শেষাংশে সেকথা উচ্চারণ করেছেন নির্মল–
‘আমি গাছে ফল দেখতে ভালোবাসি। উপচে পড়া ফসলের ওপর শুয়ে পড়তে ভালোবাসি। আমার সঙ্গে গরু-বাগাল, কাড়া-বাগালকেও দেখতে পাবেন। আমি কাঁদতে ভালোবাসি। কান্নার মতো সুখ কীসে আর আছে। স্বপ্ন একটা আছে– সারাজীবন রবীন্দ্রগান শুনে, কবিতা পড়ে কাটিয়ে দেব। স্বপ্ন আছে, একটা ক্যামেরা কিনে ছবি তুলে বেড়াব। স্বপ্ন আছে, একটা সাধাসিধে বাড়ি তৈরি করে ইচ্ছেমতো বেরোব, ঢুকব।’
মনে করুন, শুরুতেও ছিল বাড়িরই বর্ণনা। ‘খাটা পায়খানা’ থেকে যার শুরু, রবীন্দ্রগানে যার চরিতার্থতা! ‘আমার কথা, আপনাকে’ আসলে একটি বাড়ির কথা। কবির বেড়ে ওঠার বাড়ি! সেখানেই তো ‘জন্ম’। তিনিই তো লিখেছেন–
পাতাল থেকে মাটি নিয়ে এলো
কেঁচো রাজা
মাটিতে মাটিতে ভরে উঠলো সোনার থালা
মাটিতে মাটিতে তৈরি হলো
পৃথিবীলোক।
আমার কথা, আপনাকে
নির্মল হালদার
দশমিক
১৩০ টাকা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved