‘তরুর শ্বশুরবাড়ি’র বইয়ের নির্মাণ উল্লেখযোগ্য, নজরকাড়া। অসম্পূর্ণ আখ্যান শেষ হতেই, বইয়ে জায়গা করে নেয় এক দিনখরচের হিসেবের খাতা! বাড়ি বদলের সময় নানা বইখাতার মধ্যে মিলেছিল এই দুই-ই। হিসেবের খাতা যেন সম্পূরক হিসেবে কাজ করে এক্ষেত্রে। যে মেয়ে এক সময় সবার অলক্ষ্যে খানিক হলেও বাঁচিয়ে রেখেছিল গল্প বলার প্রয়াস, ইচ্ছে, জীবনের অভিঘাতে সে-ও যে এক সময় যান্ত্রিক হয়ে যায়, কেজো কথাতেই ভরে যায় তার জীবনের সবটুকু, বিচক্ষণ পাঠকমাত্রেই তা বুঝতে পারে।
বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে যেতে এসেছে দুই ভাই, মা বড় অসুস্থ। আকস্মিক নয়, মা যে সত্যিই অসুস্থ, তা জানিয়ে বাপের বাড়ি থেকে চিঠি এসেছিল আগেই। কিন্তু কিশোরী বধূটি বাড়ি যাওয়ার অনুমতি কোনওভাবেই সে-দফা আদায় করতে পারেনি শাশুড়ি মায়ের কাছ থেকে। ভাইয়েরা নিতে চলে আসায় তো আর তেমন বারণ সম্ভব নয়। শাশুড়ি তবু বউমাকে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার আগে সাত-পাঁচ ভাবেন। যাওয়ার আগে কোন কোন কাজ না-করলেই নয়, তার লম্বা ফিরিস্তি শোনান। এমনকী, যাত্রার আগে যাতে বাড়িতে পর্যাপ্ত জল মজুত থাকে, তা নিশ্চিত করতে, বারেবারে ঘাটে গিয়ে কলসি ভরে আনতে হবে। তারপরই শ্বশুরবাড়ির দায়দায়িত্ব থেকে ছুটি মিলবে আপাততর মতো, অল্পবয়সি বউমাটিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় তা।
১৩-১৪ বছরের কিশোরী বধূটি যে-ডালই রান্না করে, তা মনোমতো হয় না শাশুড়ির। যত সকালেই উঠুক না কেন, সারাদিনে হাত চালিয়ে যতই ধান ভানুক, নাড়ু পাকাক না কেন সময়ের মধ্যে, শাশুড়ির মন গলে না কিছুতেই। পাড়ায় কাদের সঙ্গে মেশা যাবে, কোন পদ রান্না হবে বাড়িতে, এমনকী, বাপের বাড়ি যাওয়ার সময় গায়ে কোন শাড়ি থাকবে বউমার– শাশুড়ির কুঁচকানো ভ্রু নির্ধারণ করে দেয় সে-সব। এ গল্প তরু নাম্নী গৃহবধূর, তবে হতে পারত অন্য যে কোনও সদ্যবিবাহিতা মেয়েরই। সে মেয়ে চাকুরিরতা হতে পারে। হতে পারে একেবারে হালের আধুনিকা। ‘তরুর শ্বশুরবাড়ি’তে যে আখ্যান লিখেছেন জ্যোৎস্না দেবী, তা যে আজও প্রাসঙ্গিক, তা তো সংবাদমাধ্যমের হেডলাইন প্রায়শই জানিয়ে যায়।

বোধহয় পেরয়নি এক সপ্তাহও– পছন্দসই জলখাবার দিতে না-পারার অপরাধে বাংলাদেশের জনৈক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূটি প্রাণ হারাল শাশুড়ির পিটুনিতে! এই মেয়েটির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নশ্রেণির, আর্থিক অবস্থাপন্ন ঘরে মাসখানেক আগে মারা গিয়েছেন তিশা শর্মা, শাশুড়ি তার মৃত্যুর পরেও ‘মেয়েটি একেবারেই গুছানো-সংসারি নয়’ মর্মে বয়ান দিয়েছে সংবাদমাধ্যমের সামনে।
হয়তো এমন চূড়ান্ত উদাহরণ কার্যকর নয় সবক্ষেত্রে। তবে বিয়ের পর যে এক বিরাট পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে হয় যে কোনও মেয়েকেই, স্বামীর পাশাপাশি শাশুড়ির মন জুগিয়ে চলার পন্থা আয়ত্ত করতে হয় টিকে থাকতে চাইলে, তা বুঝি আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই তো তরুর শ্বশুরবাড়ির গল্প জুড়ে স্বামী মানুষটি একবারের জন্যও এসে দাঁড়ায় না সরাসরি। কিশোরী গৃহবধূ ও তার দাপুটে শাশুড়ির মাঝে তার ভূমিকা বুঝি কেবল এক লড়ঝড়ে সেতুর মতো– দুই পারকে যা কেবল জুড়েই রেখেছে, মানসিকভাবে সমন্বয় সাধনের কোনও প্রচেষ্টা করেনি।
তবে শাশুড়ি ও বউমার মাঝে এ যেন ঠিক যুদ্ধ পরিস্থিতি নয়। যেন মানিয়ে নেওয়ার এক আশ্চর্য খেলা চলতে থাকে সর্বক্ষণ। বউমাটি ভেবে চলে, শাশুড়ির দেওয়া কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চমকে দেবে। ওদিকে শাশুড়ি ভেবে চলে, কোন নতুন পরীক্ষার প্যাঁচে ফেলে ধরাশায়ী করে ফেলা যায় বধূটিকে। অদ্ভুত এক টানাপোড়েন চলতে থাকে সম্পর্কের আয়ুষ্কাল জুড়ে। নৌকো চেপে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়ি ফেরার পথে, নৌকোর মাঝি, দীর্ঘকালের পরিচিত অভয়দা যখন তরুর শাশুড়ির নিন্দে করে বসে, তখন তা শুনতে যেন ঠিক ভালো লাগে না তরুর। এমন সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করার জন্য ‘ট্রমা বন্ডিং’য়ের মতো জটিল শব্দবন্ধ তো আর জনপ্রিয় হয়নি সেকালে!

এই বইয়ের রচয়িতা জ্যোৎস্না দেবী যে ‘পোক্ত লেখিকা’ নন, তরুর জীবনের যে-কথা নিজের ব্যক্তিগত খাতায় লিখেছিলেন, তা যে আদৌ ছাপানোর উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, পাঠক তা বুঝতে পারেন সহজেই। খানিকটা যেন আত্মপক্ষ সমর্থনের ঢঙে বইয়ের শুরুর অংশেই তা জানিয়েও দেন লেখিকার পুত্র, প্রখ্যাত সাহিত্যিক হিমানীশ গোস্বামী।
“…মা কলকাতার ‘বাসা’য় থাকাকালীন অবসর সময়ে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষের দিকে, ‘তরু’কে প্রধান চরিত্র করে একটি লেখা শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ করেননি। তিনি লেখিকা বলতে যা বোঝায় তা ছিলেন না। কখনো হওয়ার কথাও মনে হয়নি। এটি তিনি নিজের জন্যই লিখেছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন পরে কোনো একসময়ে এটি পড়ে তাঁর পুরনো কথাগুলো মনে পড়বে, অথবা হয়তো এটাও ভেবেছিলেন তিনি আমাদের পড়ে শোনাবেন।’’
তবে জানতে ইচ্ছে করে, জ্যোৎস্না দেবীর পক্ষে সম্ভব হলে, এ সম্পর্কে কী বলতে চাইতেন তিনি। কখনওই কি লেখিকা হওয়ার স্বপ্ন দেখার দুঃসাহস হয়নি তাঁর? না-ই যদি হয়ে থাকে, তবে কেন জীবনের কঠিন সময়টির ছবি ধরে রাখতে তরুকে প্রয়োজন পড়ল তাঁর?

তরুকে গল্পের প্রোটাগনিস্ট বলা যায় না ঠিক, চরিত্রটির উদ্ভাবন কেবল পর্দার মতো জ্যোৎস্না দেবীকে আড়াল করে রাখার জন্যই। নিজের জীবনের সম্পর্কে সরাসরি যে কথা বলতে ওঁর অস্বস্তি হয়েছে, তা তরুর গল্প বলে দাগিয়ে দেওয়ায় ততটা বাধা অনুভব হয়নি। তবে তরুর গল্প ঠিক শেষ হয় না। সংলাপ চলতে চলতে থমকে দাঁড়ায় আচমকাই। বাস্তবে কী ঘটে এই ‘অসম্পূর্ণ’ কাহিনির পর? বাপের বাড়ি থেকে একবুক সারল্য সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরের ঘরে পা-রাখা কিশোরীটি কি এতটাই ব্যস্ত হয়ে যায় সংসারের কাজে, যে, গল্প লেখার অছিলায় যতটুকু হাওয়া সে ভরে নিত ফুসফুসে, বাধা পড়ে যায় তাতেও? অজ্ঞতা থেকে অভিজ্ঞতার পথের ধাক্কা সামলাতে যে কাল্পনিক চরিত্রটি ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার, বাধ্য হয়েই সরে যায় লেখিকাকে জীবন যুদ্ধে একাই লড়ে নেওয়ার নিদান জানিয়ে?
এ বইয়ের নির্মাণ উল্লেখযোগ্য, নজরকাড়া। ‘তরুর শ্বশুরবাড়ি’র অসম্পূর্ণ আখ্যান শেষ হতেই, বইয়ে জায়গা করে নেয় এক দিনখরচের হিসেবের খাতা! বাড়ি বদলের সময় নানা বইখাতার মধ্যে মিলেছিল এই দুই-ই। হিসেবের খাতা যেন সম্পূরক হিসেবে কাজ করে এক্ষেত্রে। যে মেয়ে এক সময় সবার অলক্ষ্যে খানিক হলেও বাঁচিয়ে রেখেছিল গল্প বলার প্রয়াস, ইচ্ছে, জীবনের অভিঘাতে সে-ও যে এক সময় যান্ত্রিক হয়ে যায়, কেজো কথাতেই ভরে যায় তার জীবনের সবটুকু, বিচক্ষণ পাঠকমাত্রেই তা বুঝতে পারে।
তবে ওঁর রোজের খরচনামা দেখতে গেলে চোখ আটকায় বইকি! দিনের পর দিন, মাসের পর মাস প্রত্যেকটি ছোট বড় হিসেবের উল্লেখ পাওয়া যায় সেখানে। কোন জিনিসের দাম বাড়ল, দৈনন্দিন খরচের মধ্যে জুড়ল আর কী কী, সন্তানদের কোন খুদে চাহিদাও মিটিয়ে ফেলা গেল এসবের মাঝেই– অবাক হয়ে দেখতে হয় তা। ইতিহাসের কোনও এক সময়কালকে বুঝতে, সে সময়ের স্থাপত্য, জীবনজীবিকা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, রাজনীতি যতখানি জরুরি, ঠিক ততখানিই জরুরি মধ্যবিত্তের হিসেবের খাতা। জ্যোৎস্না দেবীর হিসেবের খাতাটি শিলমোহর লাগায় এ ধারণায়।

তবে যা বুঝে হতাশ হতেই হয়, তা হল, অধিকাংশ মেয়ের ব্যক্তিগত গল্প লেখার খাতার ক্ষেত্রেই বোধহয় হিসেবের খাতায় তার উত্তরণ হওয়া বাদে অন্য কোনও ভবিষ্যৎ থাকে না। হয়তো জীবনের এক পর্যায়ে লেখিকার মনে পড়ে তরুর কথা। যে জীবন আদতে এড়ানো অসম্ভব, তার সঙ্গে যুঝতে কল্পনার আশ্রয় যে যথেষ্ট নয়, অনুধাবন করেন তা। তবু কঠোরহৃদয় সংসারি নারীর বুকের আবাস ছেড়ে তরু আসলে যায় না কোনওদিনই। বারবার বেঁচে উঠতে চায়, ফিরে এসে শেষ করতে চায় তার গল্পখানি। তাই খাতা জুড়ে ট্রামের ভাড়া, দোক্তাপাতা, চায়ের দুধ বাবদ খরচ হওয়া টাকার ফাঁকে-ফোকরে লেখিকা গুঁজে দেন রোজনামচার টুকরো-টাকরা। ‘আজ পরিমলবাবু ভাগলপুর থেকে ফিরলেন’, ‘আজ শত শান্তিপুর বেড়াতে গেল’, ‘বড়দা আজ কলেরার ইনজেকশন নিল’– প্রভৃতি। সংসারের নিশ্ছিদ্র দায়দায়িত্বের মধ্যে থেকে আর অল্প খানিক সময় পেলেই যে, এই খুচরো ঘটনা বুনে উপন্যাস গেঁথে ফেলা যেতে পারত, সে সম্ভাবনার আভাস পাওয়া যায়।
এই হিসেবের খাতার অংশখানি শেষ হলে, বইয়ে জায়গা করে নেয় লেখিকার স্বামী পরিমল গোস্বামীর লেখা দুটি ছোট গল্প। বইয়ের নতুন সংস্করণটিতে আবার, বইয়ের একেবারে শেষে জুড়ে দেওয়া হয়েছে জ্যোৎস্না দেবীরই লেখা ‘ভাদুর মা’ নামের গল্পখানি। একই সংসারের বাসিন্দা এক পুরুষ ও এক নারীর লেখা গল্প পরপর পড়লে অবাক হয়ে ভাবতে হয়, জীবনকে দেখার দৃষ্টিকোণ লিঙ্গপরিচয়ভেদে কতখানি পৃথক হতে পারে, সে কথা।

এ লেখার একেবারে শেষে, ফিরে আসি বইয়ের একেবারে শুরুর কথায়। ‘তরুর শ্বশুরবাড়ি’ অংশের দ্বিতীয় বাক্যটিতেই লেখিকা বলছেন, ‘সে (তরু) যখন শ্বশুরবাড়ি চলে গেল তখন তার সমস্ত স্বাধীনতা ছেড়ে বন্দী এবং অসহায় মনে হলো।’ এই বাক্যের পর বোধহয় আর যাই বলা হোক না কেন, তা বাড়তি, অপ্রয়োজনীয়। মেয়েকে আবার ফেরত পাঠাতে হবে ভেবে মায়ের হাপুস কান্নাটুকুও।
বইটির ‘রূপকথার শেষ’ অংশে হিমানীশ গোস্বামী লিখছেন, ‘শাশুড়ি দ্বারা বহু অসহায় বধূর প্রতি অত্যাচারের অনেক কাহিনি লেখা হয়েছে কিন্তু বধূর নিজস্ব দৃষ্টিতে দেখা এবং নিজস্ব কলমে লেখা আর-কোনো আখ্যান আছে কি না তা আমার জানা নেই।’ নিরপেক্ষ দর্শক নয়, খোদ ভুক্তভোগীই লিখছে নিজের কথা, তাই হয়তো ‘অসম্পূর্ণ’ থেকে যায় বলা। ‘পুঁইমাচা’র ক্ষেন্তি অথবা ‘দেনাপাওনা’র নিরুপমার মতো তরুর সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কী ঘটে, তা আর জানা হয় না পাঠকের।
তরুর শ্বশুরবাড়ি
জ্যোৎস্না দেবী
থীমা
১৫০্
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved