review of Desher Nam Bijaygar by Rangan Chakraborty। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাঙালের কলোনি জীবন, বাঙালির ‘আনস্মার্ট’ স্মৃতি

উভয় বাংলায় দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সংক্রান্ত আখ্যান কম নেই। ঋত্বিকের সিনেমা থেকে বিজন ভট্টচার্যের নাটক, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে হাসান আজিজুল হকের গভীর রচনা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থেকে প্রফুল্ল রায়ের উপন্যাসে ছিন্নমূল মানুষের হাহাকার, কলোনি জীবন, অস্তিত্বের সংকট ও লড়াই ফুটে উঠেছে। তথাপি রংগন চক্রবর্তী লিখিত ‘দেশের নাম বিজয়গড়’ একটি অপর সংযোজন। কারণ, উপন্যাস রচনায় কিংবা গবেষণাধর্মী লেখায় বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক দলিল হয়ে ওঠার যে দায় থাকে, রংগনের স্মৃতিকথা সে-ভারমুক্ত।

শেষ আপডেট: মার্চ ২৫, ২০২৬, ১৫:৫৬   
Facebook WhatsApp Messenger
review of Desher Nam Bijaygar by Rangan Chakraborty

জিবির (GB) দিন প্রয়াত। স্মার্টফোন থেকে ল্য়াপটপ, এখন ১০২৪ গুণ বড় টিবিতে (TB) স্মৃতি ধরে রাখছে। ইমেলের মেমোরিও এভাবে কয়েক গুণ বেড়েছে। আমরা গুগল ড্রাইভে পারিবারিক ফটো, ভিডিও স্টোর করছি, হার্ডকপির দিন ফুরিয়েছে। সবার ওপরে রয়েছে প্রকাণ্ড সার্ভার নিয়ন্ত্রিত ‘ক্লাউড স্টোরেজ’। ইদানীং, সেখানেই জমা হচ্ছে মানবসভ্যতার স্মৃতির সরণি। আশ্চর্যের কথা, যত স্মৃতিধর হচ্ছে প্রযুক্তি, ততই ব্যক্তি মানুষের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে উঠছে অতীত! তিন দশক আগের স্মৃতিকেও মনে হচ্ছে পোড়োবাড়ি, কেমন যেন আনস্মার্ট ফ্যাকাশে মার্কা, গাছ বড় হতে না হতে ডিলিট করছে শিকড়! এই অবস্থায় ‘১৯৬০-১৯৭০-এর দশকের এক উদ্বাস্তুপল্লিতে একটি ছেলের (লেখক রংগন চক্রবর্তী) বড় হয়ে উঠতে উঠতে তার চারপাশকে দেখা, চেনা, বোঝার গল্প’– ‘দেশের নাম বিজয়গড়’, বড্ড গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।

এমনিতে উভয় বাংলায় দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সংক্রান্ত আখ্যান কম নেই। ঋত্বিকের সিনেমা থেকে বিজন ভট্টচার্যের নাটক, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে হাসান আজিজুল হকের গভীর রচনা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থেকে প্রফুল্ল রায়ের উপন্যাসে ছিন্নমূল মানুষের হাহাকার, কলোনি জীবন, অস্তিত্বের সংকট ও লড়াই ফুটে উঠেছে। তথাপি রংগন চক্রবর্তী লিখিত ‘দেশের নাম বিজয়গড়’ একটি অপর সংযোজন। কারণ, উপন্যাস রচনায় কিংবা গবেষণাধর্মী লেখায় বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক দলিল হয়ে ওঠার যে দায় থাকে, রংগনের স্মৃতিকথা সে-ভারমুক্ত। বরং, প্রটাগনিস্ট খোকা (লেখক নিজেই) তার কলোনি জীবনে গোপন সিসি ক্যামেরার মতো ঘুরেফিরে বড় হচ্ছিল! সেই ক্যামেরার ‘মানবিক মেমোরি’তে জমা হচ্ছিল গত শতাব্দীর পাঁচের দশক থেকে আজ পর্যন্ত এক লম্বা সময়ের কাহিনি। আজকে যে বিশ্বব্যাপী নৈকট্য, তার থেকে অনেক আলাদা ছিল তখনকার বিজয়গড়, তখনকার উদ্বাস্তু কলোনি, তখনকার ভারত। ১০টি পর্বে সেই কাহিনির মালা গেঁথেছেন রংগন।

‘১৯৪৭ সালে দেশভাগ হওয়ার পরে যে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুরা ওপার বাংলা থেকে চলে এসেছিলেন, তাঁরা সারা বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁদেরই একটা অংশ পুবে যাদবপুর থেকে আর পশ্চিমে টালিগঞ্জ থেকে গড়িয়া যাওয়ার দুটো রাস্তা, উত্তরে আনওয়ার শাহ রোড আর দক্ষিণে গড়িয়া দিয়ে চিহ্নিত এক বড়সড় এলাকায় বসত গড়েন। বলা হয় এই কলোনিগুলোর মধ্যে বিজয়গড়ই প্রথম কলোনি।’

………………………..

গত আড়াই দশকে বাকি পৃথিবীর মতোই ‘পুঁজিবাদ’ ও ‘ভোগবাদ’-এ ভেসে যাওয়া বাঙালি যখন নিজের অতীতকে আর্থিক সাফল্যের ঝকঝকে পৃথিবী থেকে ছুড়ে ফেলছে, দুঃখের সেই মৌচাকে দরদি ঢিল ছুড়লেন এই গ্রন্থের লেখক। প্রযুক্তির দুনিয়া যে স্মৃতির, আবেগের পরোয়া করে না, গোঁয়ার বাঙালের মতো তাকেই লিপিবদ্ধ করলেন তিনি।

………………………..

এখানকার নানা খুচরো ঘটনা, ‘খোকা’কে পেঁচিয়ে ওঠা আটপৌরে জীবনের আখ্যান বাঙালির ‘কলোনি মানসকিতা’কে চিহ্নিত করছিল। ‘কলোনির ভাষা’ (ইতর শব্দ-সহ), ‘কলোনির রাগ’, যা আদতে দেশ-গ্রাম-ভিটেহারা শরণার্থীর রাগ, যেখানে আবিষ্কৃত হয় ‘চতুর্থ বিশ্ব’! ‘বাস্তুহারা’ থেকে ‘সর্বহারা’ অবধি বিস্তৃত বেদনা। কলোনির রাজনীতি প্রসঙ্গে এসে পড়ে রাজনৈতিক ভাগাভাগি– ‘ওগো আমেরিকা, আমাগো রাশিয়া’, সিপিআই, সিপিএম, কংগ্রেস, নকশাল। হিংসা, বোমা, পাইপগান, খুনোখুনি, তৎসহ মস্তান সংস্কৃতি। কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে শুরু করে কামিয়ে নেওয়ার বিবর্তন। লড়াইয়ে ক্ষতবিক্ষত এই পৃথিবীতে জীবনের নিয়ম মেনে এসে পড়ে ‘হলুদ মলাটের নীল বই’। ‘খোকা’ আর খোকাটি থাকে না। সে যেমন পাড়ার মস্তানকে সরস্বতী পুজোর ঘটে রিভালভার রাখতে দেখে, তেমনই তার চোখের সামনে একে একে তৈরি হয় এলাকার সিনেমা হলগুলি। সিপিএম-কংগ্রেসের মতোই উত্তম-সৌমিত্র নিয়ে দ্বন্দ্বের সাক্ষী হয় আমাদের ‘সিসি ক্যামেরা’ খোকা!

তার মেমোরিতে লোড হতে থাকে রুশ মহাযাত্রী থেকে চিনের চেয়ারম্যান। আমেরিকান আর্মির সময়কার ভাঙা হলে যাত্রা করছেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, রাস্তার নিরীহ মারামারিতে দর্শকরা হাততালি দিয়ে বলছে, ‘কোনো মিউচুয়াল নাই’। আবার সত্তর দশকে সেই রাস্তা আর মাঠ ভেসে গিয়েছে রক্তের বন্যায়। কিন্তু ম্যাজিক– কখন যেন পুরনো পাড়া ভেঙেচুরে তৈরি হয়েছে জি প্লাস ফোর সভ্যতা! নতুন ফ্ল্যাটের আগন্তুকরা বদলে দিয়েছে পুরনো মানচিত্র। তথাপি বর্তমান রচনায় লেখকের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ গুণে থেকে গেল বাঙালির কলোনি জীবনের এক নিবিড় কথকতা। ‘জেন জি’-র কাছে যা গ্রহান্তরের মনে হতে পারে।

বিশেষত গত আড়াই দশকে বাকি পৃথিবীর মতোই ‘পুঁজিবাদ’ ও ‘ভোগবাদ’-এ ভেসে যাওয়া বাঙালি যখন নিজের অতীতকে আর্থিক সাফল্যের ঝকঝকে পৃথিবী থেকে ছুড়ে ফেলছে, দুঃখের সেই মৌচাকে দরদি ঢিল ছুড়লেন এই গ্রন্থের লেখক। প্রযুক্তির দুনিয়া যে স্মৃতির, আবেগের পরোয়া করে না, গোঁয়ার বাঙালের মতো তাকেই লিপিবদ্ধ করলেন তিনি। সম্ভবত নিজেকেই প্রশ্ন করলেন, ‘তোমাগো দ্যাশ কুনহানে আসিল খোকা?’ উত্তরও দিলেন নিজেই– ‘আমার বাবার দেশ ফরিদপুর। আমার মায়ের দেশ ঢাকা। আমার দেশ বিজয়গড়।’

দেশের নাম বিজয়গড়
রংগন চক্রবর্তী
দে’জ
৪৫০ টাকা

Book Review partition partition history Refugee Issue Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar দেশের নাম বিজয়গড়

Share this article on