কোন এক উপলক্ষে সবাই গিয়েছি কলকাতায়, আছি জোড়াসাঁকোর বিচিত্রায়। একদিন ভোরবেলায় ঘুম ভাঙল গান-পাগল সাবিত্রীর গানে, প্রভাতী সুরে সে গাইছে মারাঠি ভজন। রবীন্দ্রনাথও থাকেন বিচিত্রার কোণের একটি ছোট ঘরে। ঘরে থাকতে পারলেন না তিনি, বেরিয়ে এসে সাবিত্রীর সুরে সুর মিলিয়ে রচনা করলেন গান। ‘শুভ্র প্রভাতে পূর্ব গগনে উদিল কল্যাণী শুকতারা’।
৬.
আশ্রম থাকবে, আশ্রমকন্যারা থাকবেন, মাথার ওপর তানসেন-তুল্য সংগীতপ্রতিভা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ থাকবেন– অথচ সেখানে আশ্রমকন্যাদের গানের কথা থাকবে না, তা কি হয়! গানের ক্ষেত্রে কাকে ছেড়ে কার কথা বলি! শান্তিনিকেতনের সবার গলায় গান, সবার কানে সুর। আমি হাতে গোনা কয়েকজন সাধিকার কথা বলব– যাঁরা গুরুদেবের গান কেবল সুকণ্ঠে নেননি, সেটিকে বহন করেছেন, তাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বিশ্বময়। যেখানে গানই মুখ্য হয়ে উঠেছে, গায়িকা নয়।
প্রথমে বলা যাক নুটুর কথা– যিনি রবীন্দ্রনাথের বন্ধু শ্রীশ মজুমদারের মেয়ে, সন্তোষচন্দ্র মজুমদারের বোন। যে সন্তোষচন্দ্র রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইলিনয়ে পড়তে গিয়েছিলেন, যাঁর অকালমৃত্যু আশ্রমকে খানিকটা নাড়িয়ে দিয়েছিল। এখনকার ছোটদের জন্য বলা যায়– যাঁর নামে শান্তিনিকেতনে ‘সন্তোষ পাঠশালা’ বা ‘সন্তোষালয়’, তাঁরই ছোট বোন হলেন নুটু, ভালো নাম রমা। পরে শিল্পী সুরেন করের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর নাম হয়েছিল রমা কর।
প্রথমদিকে আশ্রম-বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের গান শেখাতেন নুটু। রাণী চন্দ তাঁর ঘুরে ঘুরে ছাত্র সংগ্রহ করে শেখানোর ধরনটি যেমন তুলে ধরেছেন– ‘নুটুদি গানের ক্লাস নিতেন। শ্রীভবনে এসে এঘর ওঘর ঘুরে গাইয়ে মেয়ে কয়টিকে ডেকে জোগাড় করে মেঝেতে বসে গান শিখিয়ে দিতেন। এক একদিন কলাভবনেও চলে আসতেন। মিউজিয়ামের যে কোনো একটি ঘরে মেয়ে কয়টিকে জড়ো করে গান শিখিয়ে যেতেন।… রাত্রের খাবার পর নুটুদি এসে দাঁড়ালেন শ্রীভবনের গেটের সামনে। মেয়েরা এল। ছেলেরা এল। নুটুদির সঙ্গে সবাই গান ধরল। আমার ভাঙা পথের রাঙা ধুলোয় পড়েছে কার পায়ের চিহ্ন। বৈতালিকের দল শ্রীভবনের সামনের লম্বা পথটি ঘুরে গুরুপল্লী হয়ে, মাধবীবিতান-এর গেটের ভেতর দিয়ে, পুরাতন গেস্টহাউস ডাইনে রেখে উত্তরায়ন পরিক্রমা করে ছাতিমতলা দিয়ে এসে শ্রীভবনের সামনে থামল। বারে বারে ফিরে ফিরে এই একটি গানই গাইতে গাইতে গানটি সবার কণ্ঠে লেগে রইল। মেয়েরা শ্রীভবনের ভিতরে ঢুকল। নুটুদি বাড়ি ফিরে গেলেন। ছেলেরাও নিজ নিজ আবাসে চলে গেল।’
আট বছর বয়সে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন নুটু। শান্তিনিকেতনেই গান, পড়াশোনা। গুরুদেবের ছোট মেয়ে মীরা দেবীর অসমবয়সি সঙ্গিনী তিনি। পণ্ডিত ভীমরাও শাস্ত্রী আর দিনেন্দ্রনাথ তাঁর সংগীতগুরু। নুটু বা রমা নাচে বা অভিনয়ে যোগ দিলেও তাঁর যথার্থ আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রটি ছিল গান। শান্তিনিকেতনে বারো মাসে তেরো পার্বণ– বর্ষবরণ, বর্ষবিদায় থেকে শুরু করে দিনে-রাত্রে গানের সর্বক্ষেত্রটিকে ধরেছিলেন নুটু।
রবীন্দ্রনাথের গানের ভাণ্ডারী ছিলেন দিনেন্দ্রনাথ। গানটি রচনা করে দিনেন্দ্রনাথের কাছে সুরটি সঁপে দিয়ে তিনি ভারমুক্ত হতেন। গানের ব্যাপারে দিনেন্দ্রনাথ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের পরম আশ্বাসের মতো, যাঁর সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন–
‘রবির সম্পদ হত নিরর্থক, তুমি যদি তারে
না লইতে আপনার করি, যদি না দিতে সবারে।’
তবু তাঁদের পরস্পরের ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন একদিন এই দান এবং গ্রহণকে ব্যাহত করেছিল। তখন নুটুই ছিল রবীন্দ্রনাথের কাছে অনেকখানি ভরসার জায়গা। ১৯২৬ সালের ১৯ মে তারিখে সন্তোষচন্দ্রকে চিঠিতে নুটুর প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন–
‘এক-একবার নুটুর কথা মনে করে মন উদ্বিগ্ন হয়। সে কোন একদিন বিয়ে করে বসবে আর আমাদের আশ্রম থেকে গানের আলো একেবারে নিবে যাবে। বহুকাল দিনুর ওপর নির্ভর করেছিলাম, সে আজ সমস্ত ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি টাকা দিয়েও এখন তাকে স্বরলিপি পর্যন্ত লেখানো যায় না। যাক, আজ একমাত্র নুটু ছাড়া গানের সঞ্চয় আর কারো কাছেই নেই। আমার নিজের কাছে তো নয়ই।’
শুধু সংগীত-শিক্ষকই নন, শ্রীভবনের ভালোমন্দের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। আশ্রমের জীবনে তিনি অভিভাবিকার মতোই ছিলেন। অমিতা সেন ও মৈত্রেয়ী দেবী লিখে গিয়েছেন কীভাবে গুরুদেব নুটুকে নিজের গান শিখিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এক লাইন করে গাইছেন আর নুটু তার অনুবর্তন করে চলেছে। সম্পূর্ণ নিখুঁত না-হলে তিনি ছাড়বেন না।
অমিতা এক দোলপূর্ণিমার গল্প বলেছেন। দোলের দিনের ভোরের বৈতালিক। সকলে ‘বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’ গানটি গাইতে গাইতে আশ্রম প্রদক্ষিণ করে রবীন্দ্রনাথের পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম করতে চলেছে। প্রণাম শেষে সকলে ফিরবে এমন সময় গুরুদেব নুটুকে ডাকলেন। ‘ওই শুনি যেন চরণধ্বনি রে’ গানটি শেখালেন। সেদিনের উৎসব-সভায় সেই গান গাওয়া হল।
এই নুটু ভালোবেসে বিয়ে করলেন আশ্রমের গুণী শিল্পী, স্থপতি সুরেন করকে। নুটুরা বৈদ্য, সুরেন কর কায়স্থ– এই নিয়ে সমস্যা তৈরি হলে সেদিন সব সামলেছিলেন গুরুদেব। কারণ দুইজনেই ছিলেন আশ্রমের প্রাণ। নুটুকে এতই ভালোবাসতেন গুরুদেব যে, তাঁকে নিজের একটি পাণ্ডুলিপি উপহার দেন। সেই পাণ্ডুলিপির প্রথম পৃষ্ঠায় তিনি রমার উদ্দেশ্যে লেখেন,
কল্যাণীয়া শ্রীমতি রমা,
‘বীণাপাণি দিলা তাঁর বীণাখানি তোর কণ্ঠস্বরে
রমা যেন ক্ষমা করে, ঈর্ষা নাহি রাখে তোর পরে।’ – ২৯ বৈশাখ ১৩৩৩
আর এক সুগায়িকা আশ্রমে অল্প কিছুদিনের জন্য এসেছিলেন। তিনি অমিতা সেন, ডাকনাম খুকু। এই পৃথিবীতে তিনি ছিলেন স্বল্পস্থায়ী। ক্ষিতিমোহন সেনের কন্যা, একই নামের মেয়ে, অমিতার স্মৃতিচারণ পাই তাঁর সহপাঠী এই খুকু সম্পর্কে। তিনি নাকি লেখাপড়াতেও ছিলেন খুব ভালো। খুব অল্প বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে কিছুদিন শান্তিনিকেতনের আশ্রমে তিনি বাস করে যান।
“সেই সময়ে সকাল সন্ধ্যায় গুরুদেবকে সে গান শোনাতে যেত। গুরুদেব ওর গান শুনতে ভালোবাসতেন। আগ্রহে ওর জন্য অপেক্ষা করে থাকতেন। অমিতা এলেই যেসব গান তাঁর শুনতে ইচ্ছে হত, সেসব গান ওকে ফরমাস দিয়ে করাতেন। অমিতা একটার পর একটা গেয়ে যেত।
এই সময়ে তিনি একদিন ‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরের বাঁধনে’ গানটি শুনতে চান। খুকু গানটি তাকে শোনালে তিনি হেসে তাকে বললেন, ‘কীরে গানটি শুনে তোর কি কিছু মনে পড়ছে ?’ উচ্চস্বরে হেসে উঠলো খুকু। প্রাণখোলা হাসি তো ছিল তার স্বভাব। রবীন্দ্রনাথ সেদিন বলেছিলেন, ‘ওকে উদ্দেশ করে এই গানটি আমি বেঁধেছিলাম।’
সেখানে তখন যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা পরে অমিতাকে বলেছিলেন, ‘পরম সৌভাগ্যের এমন দামী কথাটা তুমি মনের মধ্যে চেপে রাখলে। আমরা হলে উচ্চকণ্ঠে এই কথাটা বলে বেড়াতাম।’ উত্তরে অমিতা বলেছিল, ‘ও কথা গুরুদেব মুখে বললেও আমি কি বুঝি না, এই গানের কি গভীর অর্থ? ওই গভীর অনুভূতি কি কোনো ছোট আধার ধারণ করতে পারে? ওঁর ওই ভাব কোন গভীরে কোন পরমার দিকে বয়ে যাচ্ছে, আমি তো উপলক্ষ মাত্র।”
এই উক্তির মধ্য দিয়ে চিনে নেওয়া যায় অমিতা খুকুর চিত্তের সারবস্তুটিকে। সাবিত্রী কৃষ্ণাণ-এর কথা তো বলতেই হবে। সে-সময় সাবিত্রীর গানে অনেকেই মোহিত ছিলেন। আশ্রমের স্মৃতিকথার অন্যতম কথক রাণী চন্দের কাছে শুনি ‘…যেদিন সাবিত্রী গান ধরে সেদিন সময়ের হিসাব থাকে না কারো মনে। গানের পর গান গেয়ে যেতে থাকে সাবিত্রী। বড় সুমধুর গলার অধিকারিণী সে। কলাভবনে সে-ও একটা সিট নিয়ে বসত, আঁকত। কোন কোন দিন নন্দদা তার ছবি দেখতে এসে সেখানে বসে পড়তেন। সাবিত্রী বুঝত। সে গান ধরত। তার সেই সুরের টানে ছেলে-মেয়ে আমরা সবাই যে যার কাজ ফেলে এসে মেঝে জুড়ে ঘিরে বসতাম। অপূর্ব সে গান।’
সাবিত্রী নামের ছোট মেয়েটিকে রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন মাদ্রাজে, ১৯২৮ সালে, যখন তিনি অ্যানি বেসান্তের আমন্ত্রণে সেখানকার আডেয়ারে যান। সাবিত্রীর স্মৃতিচারণে শুনি, বাল্যকালে একরকম বাধ্য হয়েই তিনি গান শুনিয়েছিলেন সেদিন কবিকে। না, কারওর কাছে গান শেখেননি কখনও বালিকা সাবিত্রী। রবীন্দ্রনাথ এই দক্ষিণী মেয়েটিকে তাঁর অভিভাবকদের কাছ থেকে চেয়ে এনেছিলেন।
আশ্রমে সাবিত্রীর ভাষা সমস্যা ছিল, ছিল খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা। কিন্তু সে-সব একদিন পুরোপুরি ঠিকঠাক হয়ে গেল। তিনি গান শিখতে শুরু করলেন রবীন্দ্রনাথ এবং দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। রবীন্দ্রনাথ প্রায়ই তাঁকে উত্তরায়ণে ডেকে পাঠাতেন। বউঠানকে দিয়ে দক্ষিণ ভারতীয় খাবার খাইয়ে তাঁর কাছ থেকে গান শুনতে চাইতেন। সাবিত্রীও বিভোরভাবে গাইতেন মীরার ভজন, নানান ভক্তিগীতি। রবীন্দ্রনাথ সেই সুরে সুর মিলিয়ে বাংলায় গান বাঁধলেন। এইভাবে সাতটি গান গুরুদেব রচনা করেন। ‘তুমি কিছু দিয়ে যাও মোর প্রাণে গোপনে গো’, ‘কখন দিলে পড়া এই স্বপনে বরণমালা’– এই দু’টি গান তিনি রচনা করলেন মীরার ভজন থেকে। রচনা করলেন ত্যাগরাজ সাধুর তেলুগু কৃতি থেকে তিনটি গান ‘বাজে করুণ সুরে হায় দূরে’, ‘বেদনা কি ভাষায় রে’, ‘আর নীলাঞ্জনছায়া’।
দক্ষিণ ভারতীয় কবি মুৎসুর স্বামী দীক্ষিতের লেখা মাদুরাই-এর ‘মীনাক্ষী দেবীর বন্দনা-গান’ সাবিত্রী গাইতেন সংস্কৃত ভাষায়। সেই গান সাবিত্রীর কণ্ঠে শুনে রবীন্দ্রনাথ গাইলেন ‘বাসন্তী হে ভুবনমোহিনী’। অমিতা সেন লিখেছেন, “কোন এক উপলক্ষে সবাই গিয়েছি কলকাতায়, আছি জোড়াসাঁকোর বিচিত্রায়। একদিন ভোরবেলায় ঘুম ভাঙল গান-পাগল সাবিত্রীর গানে, প্রভাতী সুরে সে গাইছে মারাঠি ভজন। রবীন্দ্রনাথও থাকেন বিচিত্রার কোণের একটি ছোট ঘরে। ঘরে থাকতে পারলেন না তিনি, বেরিয়ে এসে সাবিত্রীর সুরে সুর মিলিয়ে রচনা করলেন গান। ‘শুভ্র প্রভাতে পূর্ব গগনে উদিল কল্যাণী শুকতারা’।”
দিনেন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সাবিত্রীকে প্রথমে পূরবী রাগের গান শেখাতে, কেননা কবির মনে হয়েছিল সাবিত্রীর গলায় ওই বিশেষ রাগের গান সঠিক রূপ পাবে। ‘অশ্রুনদীর সুদূর পারে’ গানটি শান্তিনিকেতনে তাঁর প্রথম শিক্ষা। প্রথম দিকে ভাষা সমস্যা থাকলেও সাবিত্রী বাংলাভাষা এমন ভালো করে রপ্ত করেছিলেন যে শান্তিনিকেতন, জোড়াসাঁকো, কলকাতা সর্বত্র তাঁর অনুষ্ঠান করতে কোনও অসুবিধা হত না। শুধু তাই নয়, ১৯৩২ সালে ‘হিন্দুস্থান রেকর্ড’ কোম্পানি থেকে বের হল তাঁর প্রথম ডিস্ক। রবীন্দ্রনাথের সামনে বসে তিনি গান রেকর্ড করেন। অমিতা সেন ‘শান্তিনিকেতনে আশ্রমকন্যা’ গ্রন্থে সাবিত্রীর জাদুকণ্ঠের কথা গভীর অনুভবের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। এই প্রসঙ্গে বলা দরকার যে, অমিতা সেনের মতো আশ্রমকন্যা না-থাকলে সেদিনের সুধাভরা দিনগুলি মূর্ত হত না। অমিতা লিখেছেন,
“ওর গাইবার ঢংটি ছিল অনুকরণীয় । সেইজন্যে যখন সে আশ্রম ছেড়ে নিজের দেশে ফিরে গেল, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর সাবিত্রীকে চিঠিতে লিখলেন, ‘তুমি চলে যাবার পর ‘নীলাঞ্জনছায়া’ গানটি গাইতে পারে এমন কাউকে আর খুঁজে পাচ্ছি না’।’’
আশ্রমের সব অনুষ্ঠানে এই আশ্রমকন্যা সাবিত্রী কৃষ্ণাণ গান গেয়েছেন। কলকাতাতেও একাধিক অনুষ্ঠানে, ‘তপতী’ ‘নবীন’ ইত্যাদি অভিনয়ে তিনি সংগীত পরিবেশন করেছেন। এমনকী, রবীন্দ্রনাথের ৭০তম জন্মজয়ন্তীতে দিনেন্দ্রনাথ এবং ইন্দিরা দেবীর পরিচালনায় হওয়া অনুষ্ঠানেও তিনি প্রধান গায়িকা ছিলেন। গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ সাবিত্রীর অটোগ্রাফ খাতায় লিখে দেন–
‘তব কণ্ঠে বাসা যদি পায় মোর গান
আমার সে দান কিংবা তোমারই সে দান?’
শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রসংগীতের আর একজন প্রসিদ্ধ গায়িকা-শিক্ষিকা ছিলেন ‘বিবিদি’– মানে ইন্দিরা দেবী। মানে ইনি রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি, সত্যেন্দ্রনাথ-জ্ঞানদানন্দিনীর কন্যা।
ছিন্নপত্রাবলির সব চিঠি রবীন্দ্রনাথ যাঁকে লিখেছিলেন, সেই গুণবতী ভাইঝিটি পড়ন্ত বেলায় শান্তিনিকেতনে এসে রবীন্দ্রনাথের গানের ভার নিলেন। ‘সব হতে আপন’ বইয়ের পাতায় রাণী চন্দ স্মৃতিচারণ করেছেন–
‘পুনশ্চতেই থাকতেন বিবিদি। উত্তর দিকের ঘরখানাতেই প্রায় সারাদিন কাটাতেন। একটার পর একটা গানের ক্লাস নিতেন। সংগীত ভবনের সিনিয়র ছাত্রদের শুধু গান শেখাতেন না। যে আসত গান শিখতে, তাকেই গান শেখাতেন। গিন্নিরা আসতেন, শিক্ষকরা আসতেন– পুরোনো দিনের গান শিখতে। শৈলজাবাবু দিনের পর দিন এসে বসে বসে গান শিখতেন। গান শেখাতে বিবিদির আলস্য বা অনুৎসাহ দেখিনি কখনো। গলা ছিল মাজা তারের মত– কোন মরচে পড়েনি কোনদিন ।
সময় ধরে গান শেখাতেন না বিবিদি। যতক্ষণ না গাইয়েদের গলায় ঠিকমতো উঠেছে, ততক্ষণ অবধি সমানে গেয়ে যেতেন। খালি গলায় গাইতেন, কোন বাজনা থাকত না ক্লাসে। সজাগ কান ছিল তাঁর– সুরের মৃদু খাঁজখোঁজটুকুও এদিক ওদিক হতে পারত না। কোনো-কোনোদিন গান শেখাতে শেখাতে বেলা বেড়ে যেত, বলতেন– আমি স্নানটা সেরে আসি, তোমরা ততক্ষণে ওই জায়গাটা গাইতে থাকো।
ছাত্ররা এ ঘরে বসে গান গাইছে, বিবিদি স্নানের ঘরে স্নান করছেন– কান আছে এইদিকে। মগ ভরা জল গায়ে ঢালতে ঢালতে বলে উঠছেন– উহুঁ হল না এইরকম হবে।
বলে স্নান ঘর থেকে সুর ধরে দিতেন।’
এই হলেন একজন শিক্ষক। এই হল ‘রবিকাকা’-র গানকে ছড়িয়ে দেওয়ার আজীবনের অঙ্গীকার। তিনি বই লিখেছেন ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতের ত্রিবেণীসঙ্গম’। কত যে লুপ্তপ্রায় রবীন্দ্রসংগীত তিনি তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তির সাহায্যে উদ্ধার করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন, তার অন্ত নেই। রবীন্দ্রসংগীতের সুরের বহু স্বরলিপি তৈরি করে তিনি অবলুপ্তির হাত থেকে গানগুলি বাঁচিয়ে দিয়েছেন। ভানুসিংহের পদাবলির গানগুলি রবীন্দ্রনাথের নিতান্ত অল্প বয়সের লেখা। সেই গানগুলি ফের একত্রিত করে প্রকাশ করেছেন তিনি। ‘কালমৃগয়া’র মতো নাটক তাঁরই প্রেরণায় আবার ফিরে আসে নাট্যমঞ্চে। ‘মায়ার খেলা’, ‘ভানুসিংহ’-সহ বহু রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপি তিনি করেছেন । রবীন্দ্র সংগীতের বহু স্বরলিপি-গ্রন্থ তিনি সম্পাদনা করেন। আশ্রমের আলাপিনী মহিলা সমিতির উজ্জীবনও তাঁর কাজ। তিনি ‘ঘরোয়া’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। রবীন্দ্রনাথের জন্য, আশ্রমের জন্য আজীবন কাজ তিনি করেই গেছেন।
ছোটবেলায় রবিকাকার কাছ থেকে খুবই স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছেন বিবি। তাঁর এক জন্মদিনে রবিকাকা একটি সুন্দর পিয়ানোর গড়নের দোয়াতদানি উপহার দেন। তার সঙ্গে লিখে দেন কয়েক ছত্র।
‘স্নেহ যদি কাছে রেখে দেওয়া যেত
চোখে যদি দেখা যেত রে ,
বাজারে জিনিস কিনে নিয়ে এসে
বল দেখি দিত কে তোরে ।…’
রবীন্দ্রসংগীত সঠিকভাবে শিখিয়ে, তার সুরটি যথাযথভাবে ধরে রেখে ইন্দিরা দেবী রবিকাকার স্নেহঋণ শোধ করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি শান্তিনিকেতনে পড়েননি, পড়ার কথাও তাঁর নয়। তবুও তাঁকে আশ্রমকন্যা ছাড়া আর কী বলি!
কত বিদুষী, কত সুকণ্ঠী আশ্রমকন্যা যে রবীন্দ্রগানকে নিজেদের কণ্ঠে নিয়ে নিজেরা ধন্য হয়েছেন, শ্রোতাদের ধন্য করেছেন, তার অবধি নেই। ক’জনেরই বা নাম লিখতে পারি। পুরনোদের মধ্যে আমি রমা চক্রবর্তীর কথা একটু উল্লেখ করি। বয়সে একটু বড় অর্থাৎ ১৯৩০ সালে শান্তিনিকেতনে পড়তে এসেছিলেন তিনি। ছোটবেলায় ভাগলপুরে বড় ওস্তাদের কাছে তালিম পেয়েছিলেন; পরে গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে গান ও সেতার শিখেছিলেন; আর শান্তিনিকেতনে পেয়েছিলেন দিনেন্দ্রনাথকে গানে, আর নাচে প্রতিমা দেবীকে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও তাঁকে নাচ দেখিয়ে দিতেন। অমিতা সেন অর্থাৎ খুকুর সঙ্গে বসে তিনিও রবীন্দ্রনাথের কাছে শিখেছেন,
‘যদি হায় জীবন পূরণ নাই হল মম
তব অকৃপণ করে ।’
রমা চক্রবর্তীর কথা বলতে ইচ্ছে হল, কারণ তিনি যখনই সুযোগ পেয়েছেন– তখনই রবীন্দ্রগান, রবীন্দ্র-আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন শান্তিনিকেতনের ভূগোলের বাইরে। যুক্ত থেকেছেন আশ্রমিক সংঘের সঙ্গে, শৈলজানন্দ মজুমদার প্রতিষ্ঠিত ‘সুরঙ্গমা’য়, দীর্ঘদিন গান শিখিয়েছেন সাউথ পয়েন্ট স্কুলের ছেলেমেয়েদের।
এভাবে বাংলাদেশের সনজিদা খাতুনের কথাও বলা যায়। ১৯৫৪ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে ছাত্রী হয়ে যোগ দেন। তারপর তিনি পাঠশেষে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রসংগীতকে গ্রামে-গঞ্জে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক পরিসরে পৌঁছে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গিয়েছেন। রাজনৈতিক আগ্রাসনের সামনে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রসংগীতকে বাংলাদেশের জন্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছেন সনজিদা। তৈরি করেছেন ‘ছায়ানট’, ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ’। শুধু হাততালি পাওয়ার জন্য বা টাকা রোজগারের জন্য নাচ-গান নয়, বিশেষত রবীন্দ্রসংগীত– একথা যেন তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন। রবীন্দ্রসংগীত যে শুধুমাত্র সুরসাধনার জন্য নয়, সমাজবোধ ও আত্মচেতনা জাগানোর জন্যও, সে-কথা তিনি নানাভাবে বললেন। আসলে তিনি সারাজীবন গানের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক লড়াই লড়ে গেছেন। দেশের আত্মপরিচয় খুঁজছেন রবীন্দ্রনাথের গানে। আর তারপর সেটাই হয়ে উঠেছে তাঁর নিজেরও আত্মপরিচয়।
………………………………………
ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেজ: রোববার ডিজিটাল
………………………………………
সনজিদার মতো, যিনি শান্তিনিকেতনের আশ্রমে থেকেছেন শুধু নয়, যিনি আশ্রমকে সম্প্রসারিত করেছেন– তাঁকে তো বিশিষ্ট আশ্রমকন্যার মুকুট পরতেই হয়। শেষে সর্বমান্য মোহর বা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা বলে গানের গল্পের ঝুলি নামিয়ে রাখি। আশ্রমেই তাঁর বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া, সংগীতশিক্ষা। তাঁর কথা কে না জানে! তাঁর অসামান্য কণ্ঠস্বর, তাঁর গায়কী রেডিওতে, রেকর্ডে, দূরদর্শন-বাহিত হয়ে রবীন্দ্রসংগীতকে যে মহিমাময় প্রসার দিয়েছে তার গুরুত্ব অপরিসীম।
রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে আরও অনেক আশ্রমকন্যার নাম আসে । যেমন রাজেশ্বরী দত্ত, সুচিত্রা মিত্র, অরুন্ধতী দেবী, নীলিমা সেন, মঞ্জু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। তাঁদের অনেকের কথাই আপনারা জানেন । স্বল্প পরিসরে আমি কয়েকজন প্রতিনিধির কথা বললাম মাত্র।
… আশ্রমকন্যা-র অন্যান্য পর্ব …
পর্ব ৫: জাপান-বিরোধী ব্রিটিশ সরকার যখন ইতেকো-কে সন্দেহ করেছিল, তখন রথীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ও আমার ঘরের মেয়ে
পর্ব ৩: নটীর পূজায় গৌরী ভঞ্জের নৃত্যে মুগ্ধ অবনীন্দ্রনাথ বকশিস দিয়েছিলেন পরনের জোব্বা
পর্ব ১: সৌন্দর্য, সুরুচি এবং আনন্দ একমাত্র অর্থের ওপর নির্ভরশীল নয়, প্রমাণ করেছিলেন আশ্রমকন্যা সুধীরা দেবী
৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, উদাত্ত ঘোষণা ট্রাম্প বাহাদুরের: গাজ়ার অধিবাসীরা ভালোমানুষের মতো নতশিরে মানলে তো ভালো, নইলে, সমরাস্ত্রমণ্ডিত যুক্তরাষ্ট্রই সবলে তাদের। ততঃপর, ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ নিজ পতাকা গাড়বে গাজ়ায়; অন্তে, ম্যারিকার শান্তিময় পূর্ণ-দখলদারিতে– নিশ্চয়ই, ‘রিয়েল এস্টেট’-বিশেষজ্ঞ ট্রাম্পের দক্ষ পরিচালনায় ও বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তি ইলন মাস্ক জ্যায়সা অর্বুদ-নিযুতপতিদের সুখবিধায়, সুস্বাস্থ্যবিধায়– ভূমধ্যসাগরীয় গাজ়াকে রূপান্তরিত করা হবে রম্য পর্যটনকেন্দ্রে।