
ঋতুপর্ণ, সম্পর্কের অন্দরের কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারছিলেন, বাইরে, অর্থাৎ রাজপথে কিছু একটা ঘটছে। যার উল্লেখ ছাড়া শেষপর্যন্ত ঘরের কোনও মানে থাকে না। ঠিক সেই কারণেই রবীন্দ্রনাথকে পৌঁছতে হয়েছিল ‘ঘরে-বাইরে’, ‘গোরা’, ‘চতুরঙ্গ’ কিংবা ‘চার অধ্যায়’-এর সমাজপটে, রাজনীতিতে। সম্পর্কের রাজনীতি, তার মাপজোক আর ইকোনমি জড়িয়ে থাকে আরও হাজারও মতাদর্শের রাজনীতির সঙ্গে, আষ্টেপৃষ্ঠে। এই বাইরের উপস্থিতি ঘরের ভিতর থেকে আন্দাজ করতে পেরেছিলেন ঋতুপর্ণ।
গত কয়েকদিন ধরে নানা রকমের বাংলা ছবি দেখছিলাম। ১৯৫০ থেকে ১৯৮০– এই ৩০ বছরের ভিতর তৈরি হয়ে ওঠা সিনেমায় যাঁদের গল্প-উপন্যাসে নতুন ডিরেক্টররা মন দিয়েছিলেন, সেখানে বেশ কয়েকবার নতুন করে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি দেখতে পাই। ‘উপস্থিতি’ কথাটা ইচ্ছে করেই লিখলাম। কারণ সবসময়ই যে গল্প-উপন্যাসের কাহিনি বা সাহিত্যের আধারে ঘটনাটা ঘটছিল, তা নয়। কখনও কবিতা বা গানের রবীন্দ্রনাথ কিংবা নাটকের কিংবা নৃত্যনাট্যের ইন্সক্রিপশন বা অন্তর্লেখ হাজির হয়ে তৈরি করে তুলছিল নতুন নতুন সিনেমাটিক মুহূর্ত। ব্যাপারটা সাধারণ দর্শক হিসেবে আমাদের দিব্যি বোধগম্য ছিল। যেমন সাধারণ একটা উদাহরণ দিই, তরুণ মজুমদারের ‘নিমন্ত্রণ’-এ পূর্ণিমা রাত্রে কাশফুল দেখে নায়কের মত্ততা। অপূর্ব এই মুহূর্ত নির্মাণে নির্দেশক রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেন। আবার সরাসরি কোনও কাহিনিচিত্রে ঋত্বিক ঘটক রবীন্দ্রনাথের গল্প বা উপন্যাস ব্যবহার করেননি। অথচ রবীন্দ্রনাথের চাবি বাদে ঋত্বিকের ছবি পড়া প্রায় অসম্ভব। বাংলা ছবিতে যবে থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে উৎকটাসন শুরু হল, রবীন্দ্রনাথ গায়েব হয়ে গেলেন। গান বাজতে লাগল, ‘আকাশপথে প্রেম করেছি হে বিশ্বনাথ’। শুরু হল বাংলা হরর বা বি-হররের যুগ– মানে নতুন ধরনের হরর, দেখলে ভয় লাগে। সে যুগ শেষ হয়েছে– এমন কথা বুক ঠুকে কেউ বলতে পারবে না।

এই পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছতে চেয়েছিলেন যাঁরা, হাতে-গোনা কয়েকজনের মধ্যে রাজা সেন, অপর্ণা সেন আর অবশ্যই ঋতুপর্ণ ঘোষের কথা কখনও মনে আসে। ঋতুপর্ণ যে-সময়ের মধ্যে কাজ করেছেন আর কোনও বাংলা চলচ্চিত্র-পরিচালক এতখানি জোর দিয়ে রবীন্দ্রনাথের দিকে পৌঁছনোর পথে হাঁটেননি। বলা ভালো, মাঝে মাঝে খান-কয় গান বাদ দিলে, রবীন্দ্রনাথ নতুন ধরনের বাংলা ছবিতে গরহাজির। মধ্যবিত্ত ঘরোয়া টেবিল-টক ভর্তি এইসব ছবিতে, দেওয়ালে টাঙানো একটি-দু’টি কবিচ্ছবি যে চোখে পড়বে না কখনও-সখনও, তা নয়। কিন্তু সে-সব ছবির মোদ্দা বলার কথাটায় রবিঠাকুরের ঠাঁই নেই। থাকার কথাও নয়।

মাত্রা ২০ বছর কাজ করেছিলেন ঋতুপর্ণ। ১৯৯২ থেকে ২০১৩। এই সময়টুকুর মধ্যেই, বিশেষত শেষ পাঁচ-ছয় বছরের কাজে বারবার তাঁর সিনেমা আর লেখায় ঘুরে ঘুরে আসছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শেষপর্যন্ত, ভারত সরকারের সার্ধ্বশতবার্ষিক আয়োজনে, তাঁকে গড়ে তুলতে হল এক তথ্যচিত্র। এমনকী, এক টিভি সিরিয়ালে, চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে কেবল গান দিয়েই এক রবীন্দ্র-আদল তৈরি করতে চাইছিলেন তিনি। অনেক টেলিভিশন-বিমুখ সেদিন চেয়ার টেনে নিয়ে বসেছিলেন। ‘গানের ওপারে’ যখন শেষ হল, তখনও তার ভরা ঘর।

‘চিত্রাঙ্গদা’ খুব স্বাভাবিকভাবেই ঢুকে পড়েছিল তাঁর চিন্তায়। লিঙ্গ বা জেন্ডার নিয়ে, যৌনতা নিয়ে ঋতুপর্ণর নিজস্ব অবস্থান, সোচ্চার কথা বলা ভুলে যাওয়ার নয়। কিন্তু সত্যজিৎ রায় পরবর্তী বাংলা সিনেমায় একমাত্র তাঁকেই পাওয়া যাবে যিনি দু’-দুটো রবীন্দ্র উপন্যাসে ফিরে যাবেন তাঁর নিজের কথা বলার জন্য। ‘চোখের বালি’ আর ‘নৌকাডুবি’– আদত উপন্যাসের রচনা-ক্রম মেনেই বাংলা ছবির দর্শকদের ডাক দিয়েছিল। তবে, সেই ডাক যে কতখানি পৌঁছে ছিল, সে অবশ্য অন্য কথা।

নিজের কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের দিকে এতখানি ঝুঁকে পড়লেন কেন ঋতুপর্ণ? তাঁর বলার বিষয় ঠিক কী ছিল? প্রথম ছবি থেকে আরম্ভ করে শেষ ছবিটি পর্যন্ত, যা বলতে চাইছিলেন তিনি, তাকে বলা যেতে পারে নানা দিক থেকে দেখা নানা কিসিমের মধ্যবিত্ত মানুষের সম্পর্ক। কখনও নারী-পুরুষ, কখনও বা সমলিঙ্গ। তাঁর নিজের সময়েও যেমন, তেমনই কখনও সেইসব সম্পর্ক ধারণার উৎসমূলে, ইতিহাসেও। ‘মধ্যবিত্ত’ কথাটা কিন্তু এখানে নিয়ন্ত্রক। পুরনো দিনের কাহিনিতেও যখন ফিরে গিয়েছেন তিনি, এই শব্দটি তাঁকে বাধ্য করেছে নিজস্ব ঘেরাটোপে বন্দি থাকতে। কাহিনি পুনর্কথনে তিনি জুড়ে দিয়েছেন অনেকখানি উল্টোদিকের টান। তবু শেষপর্যন্ত বেরিয়ে যেতে পারেননি।

‘সম্পর্ক’ জিনিসটা তো সামাজিক। তার দুটো দিক, একদিকে সমাজ, অন্যদিকে মানুষের মন। একদিকে অনেক মানুষ, দীর্ঘদিনের বিধি-নিয়ম-শাসন। অন্যদিকে একা ব্যক্তিমানুষ, সেইসব নিয়ম ভাঙার তীব্র টান। এক একটি সামাজিক সম্পর্ককে তুলে নিয়ে, কখনও সেই সম্পর্কের রাসায়নিক যৌগটিকে বাইরে থেকে ঘা মেরে ভাঙতে চাইতেন ঋতুপর্ণ। ঠিক রাসায়নিক যৌগের মতোই সেই ভাঙাগড়ায় এসে উপস্থিত হত অপরিসীম টেনশন, তাপ-উত্তাপ। ব্যক্তিমানুষ ছিটকে বেরিয়ে পড়তে চাইত সেই ঘিরে রাখা অংশের বাইরে– যাকে বলে ‘সমাজ’। তাই বাইরের দিকটায় নয়, সম্পর্কের ‘অন্তরমহল’ নিয়েই কথা বলতে চাইতেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। প্রশ্নগুলো তৈরি করতেন সেই আদলে। আর আদলটি গড়ে উঠত বাঙালি মধ্যবিত্তের মতাদর্শের ভিতর থেকে। আর এইখানেই রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে নেওয়ার একটি কারণ লুকিয়ে আছে। অন্তত একটি কারণ। ‘চোখের বালি’ আর ‘নৌকাডুবি’, পরপর লেখা এই দুই উপন্যাসে নিজের কোন কথা খুঁজে পাচ্ছিলেন ঋতুপর্ণ? জীবনের প্রায় শেষ বছরগুলোয়, রচনাবলির ভূমিকা লিখে দিচ্ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। উপন্যাস লেখার বহু বছর পরে ‘চোখের বালি’-র ভূমিকায় তিনি লিখলেন:

‘এর পূর্বে মহাকায় গল্প সৃষ্টিতে হাত দিইনি।… ঠিক করতে হল এবারকার গল্প বানাতে হবে এ-যুগের কারখানা ঘরে।… তখন নামতে হল মনের সংসারের সেই কারখানা-ঘরে যেখানে আগুনের জ্বলুনি হাতুড়ির পিটুনি থেকে দৃঢ় ধাতুর মূর্তি জেগে উঠতে থাকে।’
‘চোখের বালি’-র চার বছর পরে প্রকাশিত হয় ‘নৌকাডুবি’। উপন্যাসটির সূচনাকথায় রবীন্দ্রনাথ ‘চোখের বালি’র-ই মতো ধরিয়ে দিতে চাইলেন মূল সুতো:
‘সময়ের দাবি বদলে গিয়েছে। একালে গল্পের কৌতূহলটা হয়ে উঠেছে মনোবিকলনমূলক। ঘটনা গ্রন্থন হয়ে পড়েছে গৌণ। তাই অস্বাভাবিক অবস্থায় নায়ক-নায়িকার জীবনে প্রকাণ্ড একটা ভুলের দম লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল– অত্যন্ত নিষ্ঠুর কিন্তু উৎসুক্যজনক। এর চরম সাইকোলজির প্রশ্নটা হচ্ছে এই যে, স্বামীর সম্বন্ধের নিত্যতা যে সংস্কার আমাদের দেশের সাধারণ মেয়েদের মনে আছে তার মূল এত গভীর কি না যাতে অজ্ঞান-জনিত প্রথম ভালবাসার জালকে ধিক্কারের সঙ্গে সে ছিন্ন করতে পারে।’


সাত বছরের ব্যবধানে উপন্যাস দু’টি নিয়ে ছবি বানিয়ে ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। মানুষের মনের, সম্পর্কের ওই ‘অন্তরমহল’-এর কথা বলতে। ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে স্বামী-স্ত্রী, মা-ছেলে, বন্ধু-সই– এইরকম নানা প্রতিষ্ঠিত সামাজিক যৌগ ভেবেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, বাইরে থেকে এই ‘সাংঘাতিক’ বহিরাগতকে প্রবেশাধিকার দিয়ে। উপন্যাস যখন শেষ হল, সে তখন যতই হাসিখুশি গ্রুপ-ফোটো তোলা হোক-না কেন– পাঠকের মনে যা হওয়ার, তা হয়ে গিয়েছে। এতরকমের জট পড়ে গিয়েছে সুতোয় যে, তাকে আর গুটিয়ে নেওয়া সম্ভবই না।
‘নৌকাডুবি’ উপন্যাসে আঘাত এসেছিল অন্যভাবে। জন্ম-জন্মান্তর থেকে নির্দিষ্ট বলে খ্যাত স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কে যদি ঢুকে পড়ে এক মারাত্মক প্রমাদ, কত কী হতে পারে তখন– নিজস্ব ল্যাবরেটারিতে পরীক্ষা করে দেখছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ফল শেষ পর্যন্ত যা-ই দাঁড়াক না কেন, প্রশ্নটাকে সমাজ-জীবন থেকে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না আর।
এইসব প্রশ্নের সূত্র ধরেই ঋতুপর্ণ পৌঁছেছিলেন রবীন্দ্রনাথে। হয়তো খানিকটা এই কারণেও যে, কোথাও একটা প্রান্তিক অবস্থান তাঁকেও ছুঁয়ে যেত– যৌনতা বিষয়ে, লিঙ্গ বিষয়ে। কিন্তু রাস্তায় বড় একটা ফাঁক যেন টের পাওয়া যায়। একটা চ্যুতি।

‘চোখের বালি’ উপন্যাসের যে-পাঠ তিনি নিলেন, সেই পাঠে উপন্যাসে স্থান-কাল খানিকটা এগিয়ে নিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ। সময়টা ঘোষিত ভাবেই দাঁড়াল ১৯০২ থেকে ১৯০৫! অবিভক্ত বাংলায়! মূল উপন্যাসের সময় ছিল শতাব্দী শেষের মুহূর্ত। বিবেকানন্দের মৃত্যু, জগদীশচন্দ্রের আবিষ্কার, চা কিংবা শিক্ষা-বিতর্ক, আর শেষপর্যন্ত বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের পটভূমি। তৈরি করতে হল তাঁকে এলোমেলোভাবে। খানিকটা জোর করেই। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের তুঙ্গ মুহূর্ত হয়ে দাঁড়াল পোস্টার হাতে কয়েকজন যুবকের আনাগোনা, রাজপথে ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি। এই জোর করে গেঁথে দেওয়া সময়-চিহ্নগুলো মূল প্রশ্ন থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল ‘চোখের বালি’-কে। বস্তুত, প্রশ্নটিকে পুনর্বার হাজির করতে গিয়ে ঋতুপর্ণ জড়িয়ে গেলেন নতুন সমস্যায়।

কেন এমন হল? ছবির শুরুতেই কালনির্দেশ দিয়েছিলেন পরিচালক। আর একেবারে শেষে উদ্ধার করলেন রবীন্দ্রনাথের সুবিখ্যাত আক্ষেপ, ভুলবশত করা, যেখানে তিনি বলছেন, ‘চোখের বালি’র শেষ অংশ তিনি কোনওদিন মেনে নিতে পারেননি!

এই আক্ষেপেরই এক পরিণতি দিতে চাইছেন ঋতুপর্ণ। তাঁর বিনোদিনী সমস্ত প্রাণশক্তি নিয়ে ঝাঁপ দিচ্ছে সমাজ-কাজে। বাহিরমহলে। আর ছবির শেষে ভেসে আসা আজান ধ্বনির মধ্য দিয়ে পরিচালক জানাচ্ছেন– সেবারের মতো বঙ্গভঙ্গ ঠেকানো গেলেও, এর ৪২ বছর পরে– আর তা ঠেকানো গেল না।
বাইরের ইতিহাসকে যদি অনেকক্ষণ বাইরে রেখে হঠাৎ করে ঘরের মাঝখানে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে আসা হয়, তখন বিপদ বাধে। ঋতুপর্ণ ঘোষের সেই মারাত্মক প্রমাদ নিয়ে হাসাহাসি করা আমাদের কাজ নয়। কথা হল, বঙ্গভঙ্গ তো হয়েই ছিল ১৯০৫-এ। আর সেই ভাঙা বাংলা আবার জুড়েও গিয়েছিল ১৯১১ সালে। অর্থাৎ, সিনেমায় তাকে ঠেকানো গেলেও ইতিহাস তাকে ঠেকাতে পারেনি। কিন্তু প্রশ্ন এখানে অন্য। কেন আনতে হল এই ‘বঙ্গভঙ্গ’ প্রসঙ্গ, আর কেনই বা এত অমনোযোগে হাজির হল তা?

ঋতুপর্ণ, সম্পর্কের অন্দরের কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারছিলেন, বাইরে, অর্থাৎ রাজপথে কিছু একটা ঘটছে। যার উল্লেখ ছাড়া শেষপর্যন্ত ঘরের কোনও মানে থাকে না। ঠিক সেই কারণেই রবীন্দ্রনাথকে পৌঁছতে হয়েছিল ‘ঘরে-বাইরে’, ‘গোরা’, ‘চতুরঙ্গ’ কিংবা ‘চার অধ্যায়’-এর সমাজপটে, রাজনীতিতে।

সম্পর্কের রাজনীতি, তার মাপজোক আর ইকোনমি জড়িয়ে থাকে আরও হাজারও মতাদর্শের রাজনীতির সঙ্গে, আষ্টেপৃষ্ঠে। এই বাইরের উপস্থিতি ঘরের ভিতর থেকে আন্দাজ করতে পেরেছিলেন ঋতুপর্ণ। আর তাই এক মনগড়া দিবাস্বপ্ন তাকে সাজিয়ে তুলতে হল ‘চোখের বালি’-র কথা বলতে গিয়ে। মস্ত বড় এক ফাঁক থেকে গেল সেইখানে।
একই ঘটনা ঘটবে ‘নৌকাডুবি’-র ক্ষেত্রে। সেখানও হাজির হবে কুণ্ঠিত এক বাহির, গায়ে নানা জোড়াতালি লাগানো সময়চিহ্ন! কখনও ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা, কখনও বা মৃণালিনীর মৃত্যু। শেষপর্যন্ত বলার কথাটুকু এমনভাবে বানানো হয়ে উঠল যে, মনে হবে, এই অকারণ মিথ্যের জন্য কী দরকার ছিল রবীন্দ্রনাথে পৌঁছনোর?
‘নৌকাডুবি’ সিনেমায় রবীন্দ্রনাথ নিজেই এক চরিত্র। হেমনলিনীর মুখে বারবার এসে পড়ে তাঁর নাম, বিয়ের প্রসঙ্গে ঠাট্টা করে সে জানায়, রবিঠাকুরই তার পাত্র। বিশ বছর তো পার হল, তাঁর স্ত্রী চলে গিয়েছেন। কিন্তু কেন এই রবীন্দ্রনাথকে ডেকে আনতে হল সিনেমায়? এ কোন রবীন্দ্রনাথ?
বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাড়ির আইকন? নাকি জটিল, সমাজভাঙা, হাজারও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ানো আগ্নেয় এক রবীন্দ্রনাথ– যিনি সত্যিই বদ্ধমূল অন্ধকার থেকে আলোর দিকে উঠছেন?
ঋতুপর্ণ পৌঁছতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথে। দ্বিতীয় রবীন্দ্রনাথে। যে-রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষায় লিখে রেখেছিলেন নানা অনুভূতির অন্তর্ঘাত। পাল্টে দিতে চেয়েছিলেন আমাদের অনেক অনুভূতি। যেমন ‘ভয়’। যেমন কালো, অন্ধকার আর নানা দুঃসহকে সহ্য করার অনুভূতি। নানা নিষেধকে পেরিয়ে যাওয়ার অনুভূতি। নিজের শরীরকে ওই দিগন্ত অবধি বাড়িয়ে নেওয়ার অনুভূতি। ঋতুপর্ণ সেই টান জেনেছিলেন তাঁর শরীর-মনে। নিজের শরীর, মন আর এই সমাজ নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল তাঁর। সেইখানে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কার হাতই বা ধরবেন তিনি? কিন্তু তাঁর সিনেমায় এসে হাজির হলেন প্রথম রবীন্দ্রনাথ। অপঠিত বাঙালি আইকন। মধ্যবিত্ত বাঙালির খাটো অনুভব পরিধির রবীন্দ্রনাথ। এই দ্বিধার মূল কোথায় লুকিয়ে আছে, সে প্রশ্ন একা ঋতুপর্ণর জন্য নয়। এ প্রশ্ন আমাদের নিজেদের।

মতাদর্শ, শেষপর্যন্ত যা জগৎ চালায়, তা খানিকটা কুয়াশার মতো। আপাদমস্তক জড়িয়ে থাকে। যা করতে চাই, বুঝতে চাই, তাকেও হঠাৎ পাল্টে দিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ সেই জাল ছিঁড়তে পেরেছিলেন। আমরা পারি না। ঋতুপর্ণ ঘোষও পারেননি। কিন্তু তিনি টের পেয়েছিলেন সেই অনুপস্থিত পায়ের শব্দ। সে, যে আসে, আসে, আসে। আর হয়তো ছুঁয়েও ফেলতেন তাঁকে। যেমন স্পর্শ করেছিল ‘গানের ওপারে’। সে সুযোগ রইল তাঁর পরবর্তীদের জন্য। সেই দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত রইল আমাদের জন্য।
… এক, দুই, আড়াই-এর অন্যান্য পর্ব …
১৪. জয় এখন শেষজীবনের বুদ্ধদেব বসুর মতোই প্রশ্নাতুর
১৩. নকশাল পর্বের হত্যা-প্রতিহত্যার পরিবেশে কলকাতায় এসেছিল মারি ফারার
১২. এমনও হাসি আছে বেদনা মনে হয়
১১. গুরুদত্ত চেয়েছিলেন, বিজয়ের চলে যাওয়া দিয়ে শেষ হবে ‘পিয়াসা’
১০. কবির বিশ্রাম
৯. গত ২০ বছরে নস্টালজিয়ার এত বাড়বাড়ন্ত কেন?
৮. কলকাতার মূর্তি-আবর্জনা কি বাড়ছে?
৭. ভাবা প্র্যাকটিস করা, কঠিন এখন
৬. লেখার অত্যাচার, লেখার বাঁচা-মরা
৫. বিশ্বকর্মা পুজোর সন্ধেবেলাটার মতো বিষাদ আর হয় না
৪. কথা শেষ হতে পারে, ‘শেষ কথা’ বলে কিছু হয় না
৩. দেখা হলে বলে দিও, আজও বেঁচে আছি
২. ফুলের রং শেষ পর্যন্ত মিশে যায় নন্দিনীর বুকের রক্তের ইমেজে
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved