
‘রেনকোট’ ছবিটা হয়তো অনেকেই দেখেছে– অজয় দেবগন আর ঐশ্বর্য রাই-এর অভিনয় মনে রেখেছে। কিন্তু এই ছোট্ট দুপুরটা– পালি হিলের সেই ঘর, একটা কবিতা নিয়ে তিনজন মানুষের তর্ক, এক ঘণ্টার মধ্যে জন্ম নেওয়া নতুন লেখা, ‘কিসি মৌসম কা ঝোঁকা থা। যো ইস দিওয়ার পর লটকি হুই তসভির কো তিরছি কর গয়া হ্যায়…’ আর শক্তিদার কবিতা– ‘আনন্দ ভৈরবী’।
৭.
যদিও বৃষ্টি হচ্ছিল না। কিন্তু ‘রেনকোট’ ছবির কাজের সময়টায় আশ্চর্যভাবে একটা বৃষ্টির মতো আবহাওয়া সবসময় লেগে থাকত। যেন বাইরে রোদ থাকলেও ভেতরে কোথাও একটা ছাতা খুলে রাখা আছে। আর আমরা প্রত্যেকে সেই ছাতার নিচে– কেউ শুকনো, কেউ ভেজা, কেউ অর্ধেক।
এমন একটা সময়ে হঠাৎ পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ, ঋতু, আমাকে বলল– ‘দেবু, তুই বম্বে চলে যা, গিয়ে গুলজার ভাইকে এই কবিতার বইটা দে, এই কবিতাটা পড়তে বল।’ আমি চলে গেলাম বম্বে। ঋতু কিছুদিন পরে আসবে বলেছিল। শহরটা আমার চেনা, গুলজার সাহেবের সঙ্গেও আমার দারুণ সম্পর্ক। অনেক কাজ করেছি আমি ওঁর সঙ্গে। যদিও সেই সময়টা একটু আলাদা ছিল। কারণ এই কাজটা শুধু একটা ছবির ছিল না, ছিল একটা অনুভবের ঘর বানানোর চেষ্টা। ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন এমন একজন, যিনি ছবি বানাতেন না, বরং একটা আবহাওয়া তৈরি করতেন। তাঁর ছবিতে গল্প থাকত, চরিত্র থাকত, কিন্তু সবচেয়ে বেশি থাকত– একটা অদ্ভুত নীরবতা। যা কথা বলত, বোধহয় সব থেকে বেশি।

ছবির জন্য আমি দুটো গান তৈরি করছিলাম। তার একটা গাইবেন শুভা মুদ্গল– শুভার কণ্ঠে এক ধরনের গভীরতা আছে, যা শব্দকে ছাপিয়ে যায়। আরেকটা গান গাইবেন হরিহরণ– তাঁর কণ্ঠে যেন স্মৃতি ছুঁয়ে থাকে। এই দুটো গানই যেন ছবির দুটো দিক– একটা ভেতরের কান্না, আরেকটা বাইরের চুপচাপ থাকা।
রেকর্ডিং হচ্ছিল বম্বের স্পেকট্রাল হারমোনি স্টুডিওতে। বিশ্বদীপ চট্টোপাধ্যায়ের স্টুডিও– খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু এক ধরনের নিখুঁত মনোযোগের জায়গা। সেখানে ঢুকলে মনে হত, শব্দগুলো এখানে একটু ধীর লয়ে পা ফেলে।
এই সবকিছুর মাঝখানে হঠাৎ করে এসে পড়ল কবিতা। আমি বেশ কয়েকটা কবিতার বই নিয়ে গিয়েছিলাম। তবে ঋতুর বিশেষ চাওয়া ছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের– ‘আনন্দ ভৈরবী’ কবিতাটা। জানি না কেন, কিন্তু মনে হয়েছিল, এই কবিতাটা এই ছবির ভেতরে কোথাও আছে। যেন ছবির চরিত্ররা না বলেও এই কথাগুলোই বলছে। গুলজার ভাইকে আমি খুব সহজভাবে বলেছিলাম– ‘একবার দেখো তো।’

তিনি বইটা নিলেন, পড়লেন। কিছু বললেন না। শুধু মাথা নেড়ে একটু হেসে বললেন– ‘দেখছি’।
তার মাঝে একদিন গুলজারের ফোন এল ‘এই যে দেবুদা, এই আনন্দ ভৈরবী ব্যাপারটা কী আমাকে একটু বোঝাও তো। আমি তো এর কোন তল খুঁজে পাচ্ছি না।’ আমি আমার মতো করে বোঝালাম।
তারপর কিছুদিন কেটে গেল। আমি তখনও বম্বেতেই, রেকর্ডিংয়ের কাজ এগচ্ছে। এর মধ্যেই ঋতু এল। ঋতুর আসা মানেই একটু আলো বদলে যাওয়া। সে খুব চুপচাপ এসে হাজির হতে পারত, কিন্তু তার উপস্থিতি কখনও চুপচাপ থাকত না। ঘরের মধ্যে ঢুকেই যেন সে ঘরের সব শব্দকে একটু অন্যরকম করে দিত। আমরা একদিন গেলাম পালি হিলে– গুলজার ভাইয়ের বাড়িতে।

ওই বাড়িটার একটা আলাদা গন্ধ আছে– পুরনো বই, কাঠের তাক, আর অনেকদিন ধরে জমে থাকা অনেক শব্দের গন্ধ। সেখানে গিয়ে বসা মানেই একটা অন্য সময়ের মধ্যে ঢুকে পড়া।
গুলজার ভাই এলেন তাঁর সেই সিগনেচার পোশাক সাদা ধপধপে পাজামা আর ফিনফিনে পাঞ্জাবি পরে। আমাদের বসালেন। ঋতু ওঁকে বলল– ‘শোনাও, কী করেছ।’
তিনি তখন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দ ভৈরবী’ কবিতার তাঁর করা সংস্করণটা পড়তে শুরু করলেন।
আমরা শুনছি। ঋতু খুব মন দিয়ে শুনছে। তার চোখের দৃষ্টি একটু কৌতূহলী, একটু সন্দেহভরা– যেন সে খুঁজে খুঁজে দেখছে, কোথায় কোথায় শক্তি রয়ে গেলেন, কোথায় গুলজার এলেন।
পড়া শেষ হল। একটু নীরবতা।

তারপর ঋতু– যে কথাটা শুধু ঋতুই বলতে পারে, সেই ভঙ্গিতে, একটু হেসে, একটু খোঁচা দিয়ে, বাংলাতেই বলল– ‘এটা তুমি কী করলে শক্তিদার সঙ্গে? তুমি তো প্রায় টুকে দিয়েছ!’
ঘরের মধ্যে একটা অদ্ভুত নীরবতা তৈরি হল। তারপর হালকা হাসি। কিন্তু সেই হাসির মধ্যে একটা প্রশ্নও ছিল। গুলজার ভাই চুপ করে রইলেন। তিনি রাগ করলেন না, ব্যাখ্যাও দিলেন না। শুধু একটু তাকিয়ে রইলেন।
ঋতু তখন আরও এগিয়ে বলল– ‘আমি তো চাইনি তুমি এটা অনুবাদ করো। আমি তোমাকে এটা পাঠিয়েছিলাম ইন্সপিরেশনের জন্য। তুমি তো বাংলা ভালোবাসো। বাংলাকে, বাংলা কবিতাকে ভালোবাসো। তোমার মনে রবীন্দ্রনাথ, মাথায় জীবনানন্দ, প্রেমে পড়লে এক বাঙালি কন্যার। আমি চেয়েছিলাম, তুমি এটা নিজের মতো করে লেখো। তোমার নিজের ভাষায়, নিজের অনুভবে।’
এই কথাটা বলা বোধহয় খুব সহজ, বা হয়তো খুব কঠিন। কারণ একজন কবিকে বলা হচ্ছে– ‘তুমি আরেকজন কবিকে অনুসরণ কোরো না, নিজেকে লেখো।’
গুলজার ভাই মাথা নেড়ে বললেন– ‘ঠিক আছে। দেখি।’

তারপর যা হল, সেটা আজও আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগে।
তিনি আমাদের বললেন– ‘এক ঘণ্টা সময় দাও।’
আমরা বসে রইলাম। চা এল, কিছু কথা হল, কিছু চুপচাপ থাকা হল। ঋতু মাঝেমাঝে জানলার দিকে তাকাচ্ছে, যেন বাইরে কিছু খুঁজছে।
এক ঘণ্টা পর গুলজার ভাই ফিরে এলেন। তাঁর হাতে নতুন লেখা। তিনি পড়তে শুরু করলেন।
এইবার শব্দগুলো অন্যরকম। শক্তির ছায়া আছে, কিন্তু এতে গুলজারের আলো আলাদা। যেন একই নদী, কিন্তু স্রোত অন্যদিকে। তিনি পড়ছেন। ঋতু শুনছে।

আমি দেখলাম– ঋতুর চোখ ভিজে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে, চুপচাপ।
পড়া শেষ হল।
গুলজার ভাই একটু হেসে বললেন– ‘এবার খুশি তো, ঋতু? দেখো, আমি এটাই পেরেছি। তোমার ভালো লাগলে রেখো, নয়তো…’ বলে কথাটা শেষ না করে হাতের কাগজটা এগিয়ে দিলেন।
ঋতুর চোখ জুড়ে তখন অঝোর শ্রাবণ। আর মুখে সেই চেনা আবেগ– যখন সে সত্যিই কিছু পায়।
চোখ মুছে বলল– ‘এই কবিতাটা… গানের মধ্যে থাকবে। পুরোটা না, ফাঁকে ফাঁকে। যেন গান আর কবিতা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলছে।’ গুলজারকে বলল– ‘এটা এক্ষুনি মোবাইলে রেকর্ড করে দাও, তোমার গলাতেই থাকবে।’ এই সিদ্ধান্তটা ছিল একেবারে ঋতুর মতো। সে কখনও সরল পথে হাঁটত না। সে সবসময় একটা তির্যক পথ খুঁজত– যেখানে জিনিসগুলো একটু অন্যভাবে এসে মিশে যায়। কিন্তু এখানে আমার মিউজিশিয়ানের কান বিদ্রোহ করল। আমি বললাম, ‘না না, এখানে এত নয়েজ, কিছুতেই এখানে নয়। স্টুডিওয় রেকর্ডিং করতে হবে।’ স্টুডিওর ডেট ঠিক হল। গুলজার ভাই এলেন।

স্পেকট্রাল হারমোনিতে রেকর্ডিং শুরু হল।
শুভা মুদ্গল গাইছেন। তার কণ্ঠে সেই নেশা ধরানো গভীরতা, যা শব্দকে ভারী করে না, বরং হালকা করে দেয়।
তার মাঝে মাঝে গুলজার ভাইয়ের কণ্ঠ ঢুকে পড়ছে– কবিতা পড়ছেন।
এই মিশ্রণটা ছিল খুব সূক্ষ্ম। যেন খুব পাতলা একটা কাঁচ। একটু অসাবধান হলেই ভেঙে যেত। কিন্তু সেদিন সবকিছু একদম ঠিকঠাক বসে গেল।
আমি কনসোলের কাছে বসে শুনছি। বিশ্বদীপ মন দিয়ে লেভেল ঠিক করছে। ঋতু একটু দূরে বসে আছে। হঠাৎ দেখি, সে আবার কাঁদছে। গুলজার ভাই সেটা দেখে রেকর্ডিং রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। খুব ধীরে এসে ঋতুর পাশে দাঁড়ালেন। তারপর খুব আলতো করে তার মাথায় হাত রাখলেন।
বললেন– ‘দেখো ঋতু… আমি কি শক্তিদার মতো পারি? আমি আমারটা করলাম। এটা আমার ট্রিবিউট শক্তিদাকে। আর তোমার জন্য একটা উপহার।’
এই কথাটা বলার মধ্যে কোনও নাটকীয়তা ছিল না। ছিল শুধু এক ধরনের আন্তরিকতা।
ঋতু মাথা নেড়ে কিছু বলল না। কিন্তু তার মুখে যে অভিব্যক্তি ছিল, সেটা বোঝার জন্য ভাষার দরকার হয় না।

সেই মুহূর্তে আমি বুঝেছিলাম– আমরা শুধু একটা গান রেকর্ড করছি না। আমরা একটা সম্পর্ক, একটা সময়, একটা অনুভব ধরে রাখছি।
এই পুরো ঘটনাটা বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ লাগতে পারে– একজন কবি লিখছেন, একজন পরিচালক শুনছেন, একজন সুরকার সুর দিচ্ছেন।
কিন্তু ভেতর থেকে এটা ছিল অন্য কিছু। এটা ছিল একটা পরিবারের মতো। যেখানে কেউ কাউকে ভয় পায় না, কেউ কাউকে খুশি করার জন্য কাজ করে না, সবাই শুধু সত্যিটা খোঁজে। ঋতু ছিল সেই পরিবারের কেন্দ্র। যে প্রশ্ন করতে পারে, খোঁচা দিতে পারে, আবার কাঁদতেও পারে।
গুলজার ভাই ছিলেন সেই জায়গার এক ধরনের নরম ছায়া– যিনি নিজের কাজ নিয়ে নিশ্চিত, তবু অন্যের কথায় বদলাতে পারেন।
আর আমি…
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম মাঝখানে, এই সবকিছু ঘটতে দেখছিলাম, শুনছিলাম, আর মনে মনে ভাবছিলাম– এই মুহূর্তগুলো কি আদৌ ধরা যায়?
আজ এতদিন পর মনে হয়– হয়তো যায় না। শুধু একটু রেশ থেকে যায়– গানের মধ্যে, কবিতার মধ্যে আর কিছু মানুষের স্মৃতিতে।

‘রেনকোট’ ছবিটা হয়তো অনেকেই দেখেছে– অজয় দেবগন আর ঐশ্বর্য রাই-এর অভিনয় মনে রেখেছে। কিন্তু এই ছোট্ট দুপুরটা– পালি হিলের সেই ঘর, একটা কবিতা নিয়ে তিনজন মানুষের তর্ক, এক ঘণ্টার মধ্যে জন্ম নেওয়া নতুন লেখা, ‘কিসি মৌসম কা ঝোঁকা থা। যো ইস দিওয়ার পর লটকি হুই তসভির কো তিরছি কর গয়া হ্যায়…’
আর শক্তিদার কবিতাটা তো সকলে জানেনই–
‘আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি
এমন ছিল না আষাঢ় শেষের বেলা
উদ্যানে ছিল বরষা-পীড়িত ফুল
আনন্দ ভৈরবী’
তারপর স্টুডিওর অন্ধকারে বসে কারও কান্না…
এই গল্পটা কেউ জানে না। হয়তো জানার দরকারও নেই। কারণ কিছু গল্প থাকে– যেগুলো শোনানোর জন্য নয়, শুধু বাঁচার জন্য…
……… পড়ুন অফ দ্য রেকর্ড কলামের অন্যান্য পর্ব ………
৬. সলিল চৌধুরীর সুর বাতিল করতে চেয়েছিলেন রাজ কাপুর!
৫. বাড়ি থেকে পালিয়ে দু’জন, মিশলেন বাড়ি থেকে পালিয়ে ছবিতে
৪. সুজাতা চক্রবর্তীর কণ্ঠে ‘ভুল সবই ভুল’ শ্রোতাদের বুকে আজও বেজে চলেছে
৩. গঙ্গা: সলিলের সংগীত, রাজেনের স্তব্ধতা
২. ‘মেরি গো রাউন্ড’ গানের রেকর্ডিং-এ গায়িকার জন্য সারাদিন অপেক্ষা করেছিলেন সুচিত্রা সেন
১. প্রণব রায় না থাকলে ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’ ইতিহাস হত না
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved