Aynar Odhare: Returning from Kailashahar to Mukurtila | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ যেন অজানা এক পথ

নিজের মনের চিন্তাগুলোকে গুছোনোর জন্যই লেখা দরকার কি? যেসব ছিন্নস্রোতা চিন্তার প্রবাহ ক্ষণে আসে, ক্ষণে যায়, তার লুপ্তচিহ্ন মানচিত্র লিখে রাখা দরকার? যেভাবে দিনলিপি লেখে মানুষ? বহু বহু বছরের পর ফিরে পড়ে দেখে সেসব অবসিত জার্নাল। নিজেকে খুঁজে পায় হারানো চিন্তার মধ্যে। আমাকে কি অমনই কিছু নির্দেশ দিয়েছিল মনুনদী সেই রাত্রে?

শেষ আপডেট: আগস্ট ১৮, ২০২৬, ০৪:৪৫   
Facebook WhatsApp Messenger

১৭.

অন্ধকারের ভিতর ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘কে-এ?’

উত্তর এল, ‘চিনতে পারছ না? কাল রাতেই এত ভালোবাসাবাসি হল!’

–কিন্তু আজ তোমার এ কী রূপ? কালকের সেই জ্যোৎস্নামাধুর্য কোথায় গেল? এমন দলিত ফণিনীর মতো ভয়ানক হয়ে উঠলে কীভাবে?

–তবে কি তুমিও অন্যদের মতোই? মাধুর্য চাও? ভয়ংকরতা চাও না?

–আমি শুধু বুঝতে চাইছিলাম, মনুনদী। আর কিছু নয়।

–বুঝবে কী? এ কি শুধু বোঝার জিনিস?

–নয়?

–নয়ই তো। বুদ্ধির ওপারে যে-জগৎ, সেখানে সকল প্রেম সমাহিত। প্রকৃতি মানুষকে নির্বোধ বানিয়ে রেখেছে শুধু তাকে মস্তিষ্ক দিয়ে। মস্তিষ্ক চালনা করে সে প্রকৃতির অপার রহস্যকে বুঝতে যায়, ফল শূন্য।

–যাদের মস্তিষ্ক মানুষের মতো শক্তিশালী নয়, সেই অবলা প্রাণীরাই তাহলে বুঝতে পারল তোমাকে?

–না, তারাও পারেনি। বোঝার বিষয়ই নয় এ। একাত্ম প্রত্যয় সার। একাত্মতাকেই তো চিরকাল ভালোবাসা বলে।

–একাত্মতা কবে হবে?

–যেদিন মস্তিষ্কের ব্যায়াম শেষ হবে। যেদিন তোমার ‘আমি’-কে আমাকে নিঃশেষে দিয়ে দিতে পারবে।

–সে বড় কঠিন কথা, মনুনদী। সে একটা মরণঝাঁপ। একটা অতলান্ত খাদ। সেখানে নামার কোনও যুক্তিসিদ্ধ ধাপ নেই।

–যাকে তুমি ‘মরণ’ বলছ, সেই তো প্রকৃত জীবন। মরে গিয়ে তুমি আমার চরে কাশফুল হতে চেয়েছিলে। যারা প্রথাগত জীবনকে ভালোবাসে, তারা মরে যায়। যারা অহংবিনাশী মৃত্যুকে ভালোবাসে, তারা তথাগত হয়। তুমি প্রথাগত, নাকি তথাগত?

–আমি এসব কিছুই নই, মনুনদী। আমি খুবই সাধারণ। তবে প্রথাগত জীবনের আমি কেউ নই, এটুকু জানি। অহং মরে কই?

–অহং মরবে, যেদিন তুমি ঠিক ঠিক সাহসী হবে। সেই সাহস, যা দিয়ে তুমি আমার সুন্দরকে সুন্দর বলেই আলিঙ্গন করবে এবং আমার ভয়ংকরকে ভয়ংকর বলেই জড়িয়ে ধরবে। ভয়ংকর যা, কুৎসিত যা, তার ওপরে সুন্দরের মিথ্যা আবরণ পরাবে না আর। মৃত্যুকে ‘শ্যামসমান’ বলার হাস্যকর প্রয়াস করবে না। যন্ত্রণাকে যন্ত্রণা বলেই স্বীকার করো। দুঃখের ভিতর, হতাশার আগুনের ভিতর বীরদর্পে ঝাঁপ দিয়ে পড়ো। তোমার অহংকার পুড়ে ছাই হয়ে যাক। বলো, তুমি আমার এই কথা শুনবে কি শুনবে না?

–যদি না শুনি?

–তাহলে শুনতে বাধ্য করব আমি তোমাকে। তোমাকে গ্রাস করব আমি নিঃশেষে। তোমার শরীর আমি চূর্ণবিচূর্ণ করে দেব। তোমার মস্তিষ্ক আমি চিবিয়ে খাব। তোমার চিন্তনপ্রক্রিয়াকে আমি স্তম্ভিত করে দেব। এটা হবেই। এই অমোঘ সত্য। কেননা আমিই সময়ের দেবী। এখন স্থির করো, তুমি কী করবে। তুমি কি আমার হাতে তোমাকে নিঃশেষে, নিঃশর্তে, সপ্রেমে তুলে দেবে? না কি আমিই তোমাকে কালক্রমে আত্মসাৎ করব?

zoom
শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

–এই প্রেম?

–হ্যাঁ, এই প্রেম। এই-ই একাত্মতার একমাত্র প্রকরণ। চাইলে তুমি এই প্রকরণের ধাপগুলো লিখে রাখতে পারো কাগজে।

–তাতে কী লাভ হবে, মনু? তুমি তো সেই লেখনকেও গ্রাস করবে একদিন।

–ঠিক। কিন্তু আমার কটিদেশ থেকে যে-উত্তরপুরুষ জন্মাবে, তার জন্যে এই সব লেখনের প্রয়োজন আছে। সেসব তুমি বুঝবে না এখন।

–বুঝব না কেন?

–বুঝবে না, কেননা প্রতিটি মানুষের পার্থিব জীবন সময়ের হাতে শৃঙ্খলিত। তুমি তোমার কালপর্বকে অতিক্রম করতে পারো না। তাই অন্যদের মতো তুমিও দেখতে পাবে না, তোমার এসব লেখন নিয়ে অন্য কালপর্বে কী হচ্ছে।

–সত্যি কথা। অতীতের মানুষেরা জানত না, বর্তমানে আমরা তাদের নিয়ে কী ভাবব। আবার বর্তমানের আমরা জানি না, ভবিষ্যৎ আমাদের কীভাবে বিচার করবে।

–তুমি বুঝি ভাবো, অতীত, বর্তমান, ভাবীকাল এরকম পরপর আসে?

–আসে না কি?

–না, আসে না। কারণ সময়ের মধ্যে এই যাওয়া-আসার ভাবই নেই। যাওয়া-আসা মানবমনের কল্পনা মাত্র।

–তাহলে এই সব যুগবিভাগকে কীভাবে বুঝব আর?

–সমস্থানিক হিসেবে। যাকে তুমি ‘অতীত’ বলছ আর যাকে তুমি ‘বর্তমান’ বলছ আর যাকে তুমি ‘ভাবীকাল’ বলছ, তারা একই সঙ্গে একই স্থানে আছে। ওই দূরের আকাশের মতো।

–আকাশ?

–হ্যাঁ, রাতের তারাভরা আকাশ। দেখো, ওই আকাশে কত অগণিত নক্ষত্র, ছায়াপথ। ওই সব নক্ষত্র সমান দূরত্বে নেই। বিভিন্ন দূরত্বে আছে। ফলে ওদের যে-রূপ আমরা দেখি, তা একই সময়ের রূপ নয়। বিভিন্ন সময়ের নক্ষত্রকে আমরা একই আকাশে দেখি একসঙ্গে। তুমি এই সময়ের কথা লেখো।

কিছুক্ষণ আর কোনও শব্দ নেই। কথাগুলো নিয়ে আমি এত গভীরভাবে ভাবছিলাম যে, চুপ করে গিয়েছিলাম বহুক্ষণ। কিছু পরে খেয়াল হল, কথা থেমে গিয়েছে। সামনে শুধু অন্তহীন জলস্রোত মৃদু শব্দ তুলে বয়ে যাচ্ছে।

বললাম, ‘এভাবে ভাবিনি কখনও। এমনভাবে আমার সঙ্গে সমস্ত জীবনে কথা বলেছিলেন শুধু একজন। সতী-ভৈরবী!’ আবার খানিকক্ষণ থেমে বললাম, ‘আচ্ছা, তুমি কি তবে সতী-ভৈরবীরই অন্য কোনও রূপ? তাঁরই নদী-রূপ?’

কোনও উত্তর এল না। অন্ধকারে থেমে থেকে তারপরও বললাম, ‘এখনও আছ কি?’

নিশ্ছিদ্র নীরবতা। কী জানি কেন, সব চুপ হয়ে আছে। তারাভরা আকাশ নিঃশব্দ, নদীচর নিঃশব্দ, অন্ধকার স্তব্ধবাক্। আমার মনের মধ্যেও যেন সর্বোপপ্লবশান্ত অখণ্ড নীরবতা।

কিন্তু যে-কথাগুলো সেদিন শুনেছিলাম নক্ষত্রদীপিত আকাশের নিচে বসে, কার সেসব কথা, প্রিয়তমা নদীর নাকি আমারই নদী-আবিষ্ট মনের, সেই সংশয় আমাকে পীড়িত করেনি আর। পরিবর্তে সেই কথাগুলোর নির্যাস ভাবিয়ে তুলেছিল ক্রমাগত। আমাকে সময়ের কোন কথা লিখতে বলে চলে গেল নদীর বাতাস? সেসব লিখবই বা কেন? লিখে কী লাভ হয়? কোন মহার্ঘ স্বর্গ এসে ধরা দেয় লেখকের কাছে? আমি কোনও লেখককে চিনতাম না যে, সে-সব কথা জিজ্ঞেস করব। নিজেও লিখিনি কোনওদিন এর আগে। তাহলে এসব অমূলক চিন্তা কেন? চেষ্টা কেন?

নিজের মনের চিন্তাগুলোকে গুছোনোর জন্যই লেখা দরকার কি? যেসব ছিন্নস্রোতা চিন্তার প্রবাহ ক্ষণে আসে, ক্ষণে যায়, তার লুপ্তচিহ্ন মানচিত্র লিখে রাখা দরকার? যেভাবে দিনলিপি লেখে মানুষ? বহু বহু বছরের পর ফিরে পড়ে দেখে সেসব অবসিত জার্নাল। নিজেকে খুঁজে পায় হারানো চিন্তার মধ্যে। আমাকে কি অমনই কিছু নির্দেশ দিয়েছিল মনুনদী সেই রাত্রে?

কৈলাশহর থেকে ফিরে এলাম। ফিরে এলাম আমতলির মুকুরটিলার সেই নিভৃত ঘরটিতে। ঘরটির দাওয়ার নিচে ছাঁচতলায় সেই বৃদ্ধার দ্বারা রোপিত বুনোফুলের গন্ধে সুরভিত হয়ে রয়েছিল সারা ঘর। সেই পুষ্পসুরভির ভিতর ঘুম আসছিল না রাত্রে এই ক’দিনের আশ্চর্য অভিজ্ঞতা মনে করে।

কয়েকমাস কেটে গেল। এক চৈত্রমাসের অপরাহ্ণবেলা। ঘরের মধ্যে বেজায় গরম। দাওয়ায় বসে আছি। নারায়ণ কবিরাজের সহকারী দেবব্রত সরকার ঘরের সামনের ধুলাপথ দিয়ে সাইকেলে করে কোথায় যেন যাচ্ছিল। আমাকে দেখে হাসিমুখে বলল, ‘এভাবে দাওয়ায় জবুথবু হয়ে বসে আছেন যে! শরীর-গতিক ভালো তো?’

আমি যে কবিরাজের কাছে মাঝেমধ্যে ওষুধ আনতে গিয়েছি, দেবব্রত তা জানে। সে এই গ্রামেরই যুবক; বেশ প্রাণচঞ্চল, ছটফটে। এ-গাঁয়ের লোকেরা যেমন স্থবিরভাবযুক্ত, তার তুলনায় দেবব্রত ব্যতিক্রমী।

zoom
শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

আমি বললাম, ‘না-না। যা দমচাপা গরম আজকে, ঘরে তিষ্ঠোনো দায়। দাওয়ায় এসে বসলাম একটু হাওয়ার আশায়। কিন্তু কোথায় কী? গাছের পাতাটি পর্যন্ত নড়ছে না!’

দেবব্রত বলল, ‘তা বটে! বোধহয় রাতের দিকে ঝড়বৃষ্টি আসবে।’

আমি বললাম, ‘ঝড়বৃষ্টি এলে আবার আরেক সমস্যা। মশার কনসার্ট শুনতে হবে সারা রাত। উপরিলাভ রক্তদান শ্রেষ্ঠদান!’

আমার বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেলল দেবব্রত। হাসি সামলে বলে উঠল, ‘বসে থেকে থেকে আরও বেজায় মন খারাপ হবে আপনার। যাবেন না কি আমার সঙ্গে? চলুন, ঘুরে আসবেন।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায়?’

‘গড়ের পুকুর দেখেছেন?’

‘সে কোথা?’

‘আরে, এখান থেকে মাইল তিনেক। বেশ বড় দিঘি। নামেই পুকুর, আসলে দিঘি। বলে না কি রাজার আমলের। তা অতশত জানি না, কোন রাজা, কোন মন্ত্রী। চারিদিকে ঝোপঝাড়। বাঁধানো ঘাট। জলের হাওয়া গায়ে লাগে বেশ। চাইলে চানও করে নিতে পারেন। আজ শুনলাম, অনেক না কি পানিফল তুলে বিক্রি করা চলছে। যাবেন তো চলুন!’

আমি আর দ্বিরুক্তি না-করে ধুতির ওপর কোমরে একটা গামছা জড়িয়ে দেবব্রতর সাইকেলের পিছনে গিয়ে বসলাম।

গড়ের পুকুরের দিকে যাওয়ার পথটি বেশ মনোরম। দু’পাশে বড় বড় গাছ। মাঝখান দিয়ে সরকারি প্রযত্নে নির্মিত লাল মোরাম-ছড়ানো রাস্তা। মাঝেমধ্যে দুয়েকজন মানুষ পায়ে হেঁটে কিংবা সাইকেলে চড়ে আমাদের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। দু’জনে গল্প করতে করতে যাচ্ছিলাম; তাই পথ কখন ফুরিয়ে এল, টের পেলাম না।

কোন পথ, কাকে যে কখন কোথায় নিয়ে যায়, কেনই-বা নিয়ে যায়, সে-সব কথা কে-ই বা নিশ্চিত করে বলতে পেরেছে আজও অবধি?

Ascetic bengal village River River bed Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Travelogue village life

Share this article on