Robbar

সলিল চৌধুরীর সুর বাতিল করতে চেয়েছিলেন রাজ কাপুর!

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 5, 2026 7:29 pm
  • Updated:February 5, 2026 7:29 pm  

‘মধুমতী’-তে বিমল রায়ের ভরসায় সংগীত পরিচালনা করেছিলেন সলিল চৌধুরী। গান হয়ে গেল। সলিলদা পরে বলেছিলেন যে, “জানিস, এমন ঘটনা ঘটেছিল যে, ছবির গানগুলোর অস্তিত্বই প্রায় মুছে যাওয়ার অবস্থা! একটা প্রাইভেট স্ক্রিনিংয়ে ডাকা হয়েছিল ইন্ডাস্ট্রির সমস্ত তাবড় তাবড় মানুষজন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাজ কাপুরও। রাজ কাপুর ততদিনে গান শুনেই বলতে শুরু করেছেন যে, কোনও গান চলবে, কোনও গান চলবে না।” ‘মধুমতী’ ছবি সবাই দেখলেন সেই প্রাইভেট স্ক্রিনিংয়ে। হঠাৎ বেঁকে বসলেন রাজ কাপুর।  শেষমেশ শচীন দেববর্মণের হস্তক্ষেপে রইল সেইসব গান। বাকিটা ইতিহাস। 

দেবজ্যোতি মিশ্র

এই বিনোদনের দুনিয়ায় কতশত ঘটনাই না ঘটে। নানা রঙের সেই সব ঘটনা। যে ঘটনাগুলো কোনওটা নেপথ্যে চলে যায়। কোনওটা আবার সামনে এগিয়ে আসে। তবে সাফল্যের গল্পই সামনে এগিয়ে আসে। সেই সব ঘটনাই আলো পায়। কিন্তু তার নেপথ্যে পড়ে থাকে আরও অনেক অনেক ঘটনা। বিশেষত চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে। কোনও কাস্টিং– যা হওয়ার ছিল, হয়নি। কারওর রেকর্ডিং করার কথা ছিল। তিনি করেননি। অন্য গায়ক এসেছেন। কোনও ছবিতে কোনও সংগীত পরিচালকের জায়গায় অন্য সংগীত পরিচালক এসেছেন। মানে, যে-গল্প দর্শক পর্দায় সামনে দেখেন তার হয়ে ওঠার নেপথ্যে পরতে পরতে আরও অনেক অনেক গল্প জন্মায়।

একটা গল্প বলি। সলিল চৌধুরীর কাছে শোনা। ঘটনাটা শোনার পর সবাই চমকে উঠবেন। এমনই এক ঘটনা। মধুমতী– যে সিনেমার কথা উঠলেই মাথার মধ্যে ‘আজা রে’-র ওই টান আমাদের চেতনা মন সব কিছুকে টেনে গানে নিয়ে আসে। ‘সুহানা সফর’ বা ‘বিছুয়া’-র ওই সুর আমাদের এখনও মুগ্ধ করে এবং চিরকাল করে যাবে। এই গানগুলো আজ এপিক্যাল গান। কিন্তু জানেন, এগুলো মানুষের শোনারই কথা ছিল না! প্রথমত, সলিল চৌধুরীর সংগীত পরিচালনা করার কথা ছিল না। দিলীপকুমার প্রাথমিকভাবে রাজি হননি। কিন্তু বিমল রায় ছিলেন এর পরিচালক। বিমল রায়ের সঙ্গে ওই ‘দো বিঘা জমিন’ ছবির সূত্রেই সলিল চৌধুরীর যোগাযোগ হয়েছিল। মূল গল্প সলিল চৌধুরীর ‘রিকশাওয়ালা’।

দো বিঘা জমিন (১৯৫৩) ছবির দৃশ্য

গল্প শুনে ঋষিকেশ মুখার্জী সেই গল্পকে হাজির করলেন বিমল রায়ের কাছে। বিমল রায়ের ভীষণ ভালো লাগল। উনি বলেছিলেন, ‘বাহ, আমাদের সময়ের একটা নিও-রিয়েলিস্টিক ছবি হবে।’ এবং সত্যিই সেই ছবি সারা পৃথিবীতে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। পরে ‘মধুমতী’তে বিমল রায়ের ভরসায় সংগীত পরিচালনা করেছিলেন সলিল চৌধুরী। গান হয়ে গেল। সলিলদা পরে বলেছিলেন যে, “জানিস, এমন ঘটনা ঘটেছিল যে, ছবির গানগুলোর অস্তিত্বই প্রায় মুছে যাওয়ার অবস্থা! একটা প্রাইভেট স্ক্রিনিংয়ে ডাকা হয়েছিল ইন্ডাস্ট্রির সমস্ত তাবড় তাবড় মানুষজন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাজ কাপুরও। রাজ কাপুর ততদিনে গান শুনেই বলতে শুরু করেছেন যে, কোনও গান চলবে, কোনও গান চলবে না। ‘মধুমতী’ ছবি সবাই দেখলেন সেই প্রাইভেট স্ক্রিনিংয়ে। দেখার পরে সবাই সবার ভালোলাগা তাঁদের মতো করে বলছিলেন। হঠাৎ বিমল রায়কে ডেকে রাজ কাপুর বললেন, ‘এই গানগুলো চলবে না। গানগুলো আবার নতুন করে শুট করা হোক। নতুন করে কম্পোজ করা হোক এবং যদি শঙ্কর জয়কিষণ গানগুলো করে’।”


সলিলদা বলেছিলেন, “আমি ভাবতেই পারিনি বুঝলি রাজ এরকমভাবে এই ঘটনাটা ঘটাতে পারে। এই রাজের সঙ্গেই কাজ করেছিলেন ‘একদিন রাত্রে’, মানে ‘জাগতে রহো’ ছবিতে। রাজ আমার এত ভালো বন্ধু। সে যে এরকম কথা বলতে পারবে, আমি ভাবতেও পারিনি! আমি তো তখনই পাততাড়ি গুটিয়ে কলকাতায় ফিরে আসার কথাও ভাবতে আরম্ভ করে দিয়েছি। সেই সন্ধেবেলাটা ছিল আমার কাছে একটা মলিন বিষণ্ণ সন্ধে। বিমলদা এসে বললেন, ‘সলিলবাবু, রাজ কাপুরের এই গানগুলো পছন্দ হয়নি।’

ঠিক এই সময় শচীন দেববর্মন এগিয়ে এলেন। তিনি সবটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন। এগিয়ে এসে বললেন, ‘তা হইল কী কথা? যে রাজের পসোন্দো হয় নাই গান। আমি আপনারে কইয়া দিলাম বিমল বাবু এই গান ইতিহাস অইয়া যাইবো। আপনি আমার কথায় বিশ্বাস রাখেন’।” আসলে ঘটনা তখন এইরকমই চলছিল। যে বিমল রায় প্রোডাকশনে দুটো ছবি শচীন দেববর্মণ করেন, তো দুটো ছবি করেন সলিল চৌধুরী। এর কিছুদিন আগেই ‘পরখ’ ছবি হয়ে গিয়েছে। ছবি না চললেও পরখের ‘ও সাজনা’ গান মুগ্ধ করেছে শ্রোতাদের। সারা ভারতবর্ষে ভীষণ ভাবে চর্চা চলছে ‘ও সজনা’-র। সবাই মুগ্ধ। সে গান আজও আমাদের ভালো লাগে। এসব মাথায় রেখে বিমল রায়ের মনে হল শচীন দেববর্মণ-এর কথাটা শোনা দরকার। এই গানগুলো নিয়েই ছবি রিলিজ হোক । দুরু দুরু বুকে বিমল রায় ছবিতে গানগুলি রাখলেন। তারপর…। বাকিটা ইতিহাস।

মধুমতী(১৯৫৮) ছবির পোস্টার

সলিলদা শচীন দেব বর্মণের এই বিশাল হৃদয়ের কথাটা সবসময় বলতেন। বলেছিলেন, ‘শচীনদা ছিলেন সেদিন আমার রক্ষাকর্তা। দেবদূতের মতো এসেছিলেন তিনি। ভাগ্যিস সেখানে তিনি হাজির ছিলেন। আর সেই কারণেই আমার গানগুলো হল এবং রয়ে গেল।’ লতা মঙ্গেশকর অবশ্য পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন যে, এই ছবির এই গান যদি না হত আমি রাজ কাপুরের ছবির কোনও প্রোডাকশনের কোনও ছবির গান গাইতাম না। কী হলে কী হত সে আমরা কেউ জানি না, কিন্তু এই সমস্ত ঘটনা তো ঘটেই। এই ঘটনার মধ্য থেকেই আমরা জানি যে আসলে কী কী ঘটনা সমস্ত ঘটতে পারে, ঠিক যেরকমভাবে ‘সুহানা সফর’-এর গান গাওয়ার কথা ছিল শ্যামল মিত্রের। কিন্তু গাওয়া হল না। যদিও দিলীপ কুমারের খুব ভালো লেগেছিল শ্যামল মিত্রের গলা, কিন্তু তাও গাওয়া হয়নি। তার বদলে গেয়েছিলেন মুকেশ। সেও অসাধারণ একটা গান হয়েছিল। এই গল্পগুলো আসলে অজানা থেকে যায়। এরকম কত গানের পিছনে কত গল্প রয়েছে। এই সব মহারথীদের সেই গল্পগুলোয় অনেক বেদনা, অনেক আনন্দ সব জড়ো হয় একসঙ্গে।

মস্কোতে বিমল রায়ের সঙ্গে হৃষীকেশ মুখপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, রাজ কাপুর, নার্গিস ও রাধু কর্মকার (১৯৫৯)

গান, কবিতা, শিল্পের এমন একটা ফর্ম যে, কারওর সে গান ভালো লেগেছে, আবার তা কারওর ভালো লাগেনি। এরকমটা হতেই পারে। সেদিন রাজ কাপুরের হয়তো সত্যি গানগুলি ভালো লাগেনি। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে রাজ কাপুর তাহলে বললেন কেন শংকর জয়কিষণকে দিয়ে গানগুলো করিয়ে আবার নতুন করে শুট করতে? গান ভালো না লাগতেই পারে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে শংকর জয়কিষণকে সাজেস্ট করার কারণটা কী ছিল? সলিলদা বলতেন যে এরকমই ছিল বম্বে এবং এই অবস্থার মধ্য দিয়েই কাজ করে যেতে হয়েছে।

মধুমতী (১৯৫৮) ছবির দৃশ্য

এই প্রসঙ্গে বার বার বলতেন যে ঋষির মতো আমার বন্ধু কেউ ছিল না। ঋষি, মানে হৃষিকেশ মুখার্জী এবং মৃণাল সেন। তারা ছিলেন অসম্ভব বন্ধু। সেদিন আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল। ঋত্বিক ঘটক ছিলেন পার্টিতে। ঋত্বিকের গল্পই ‘মধুমতী’। এ আমরা সবাই জানি। তিনি এই কথা শুনে রাজ কাপুরের সঙ্গে প্রায় ঝগড়া মারামারি করার মতো অবস্থা! এই গানগুলো ভালো লাগেনি! এটা হয় কী করে? রাজ কাপুর কী বুঝেছিলেন জানি না। তবে আমরা জানি পরবর্তী সময় এই ছবি পেয়েছিল অসাধারণ স্বীকৃতি। যদিও সেই স্বীকৃতি নিয়েও ঋত্বিক ঘটক বম্বেতে আর কাজ করেননি। ফিরে এসেছিলেন কলকাতায়। বললাম না, একটা গল্পের মধ্যে, গল্পের পেছনে বহু বহু অজানা গল্প থেকে যায়।

……………… পড়ুন অফ দ্য রেকর্ড কলামের অন্যান্য পর্ব ………………

৫. বাড়ি থেকে পালিয়ে দু’জন, মিশলেন বাড়ি থেকে পালিয়ে ছবিতে

৪. সুজাতা চক্রবর্তীর কণ্ঠে ‘ভুল সবই ভুল’ শ্রোতাদের বুকে আজও বেজে চলেছে

৩. গঙ্গা: সলিলের সংগীত, রাজেনের স্তব্ধতা

২. ‘মেরি গো রাউন্ড’ গানের রেকর্ডিং-এ গায়িকার জন্য সারাদিন অপেক্ষা করেছিলেন সুচিত্রা সেন

১. প্রণব রায় না থাকলে ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’ ইতিহাস হত না