


গন্তব্যে পৌঁছে ঈষৎ বিস্মিত হলাম আমি। এ যেন গতকাল রাত্রে দেখা নদীচরটি নয়। সমস্ত পরিপার্শ্ব কেমন যেন বদলে গিয়েছে। কুয়াশা অত্যধিক; ফলে দেড়হাত দূরের জিনিস অস্পষ্ট হয়ে রয়েছে। কাশফুলের জঙ্গল কেমন দলিত মথিত হয়ে পড়ে আছে। নদী থেকে উঠে এসে কোনও বৃহৎ জলজন্তু যেন নদীতীরে সমস্ত ঘেঁটে দিয়ে গিয়েছে।
১৬.
আয়নার এধারে আর আয়নার ওধারে। আয়নার এধারের ভাষা দিনের ভাষা। আয়নার ওধারের ভাষা রাতের। এধারের ভাষা ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের, খানিকটা যুক্তিরও। ওধারের ভাষা শ্রুতির এবং অনুভূতির। এধারে জাগরণ, ওধারে স্বপ্ন, আরও গভীরে গেলে সুষুপ্তি বা স্বপ্নহীন সুখময় নিদ্রা। আয়নার এদিকে সচেতন মনের রাজত্ব; আয়নার ওদিকে অসচেতন, অচেতন এবং অতিচেতন মনের রাজপাট। ওদিকের দেখা এদিকের দেখার সঙ্গে মেলে না। এদিকের বোধ ওদিকে কাজে লাগে না। এপারে যখন মুখর হয়ে ওঠে জাগরিতাবস্থার কেকা, ওপারে তখন নীরব হয়ে যায় স্বপ্নের আর সুষুপ্তির কুহু। ওদিকে যখন ডাকতে আরম্ভ করে কল্পভুবনের কুহক, এদিকে নীরব হয়ে যায় তীক্ষ্ণ চিন্তার পারঙ্গমতা। এই যে ঋতুর দু’ধারে, আয়নার দু’পাশে দু’জন– এপারের ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান ও যুক্তির কলকাকলির সঙ্গে মেলে না ওপারের কল্পনা ও স্বজ্ঞার কূজন; এই চিরবিচ্ছেদ ও চিরবিরহের বেদনায় হু-হু করে ওঠে প্রাণের আকাশ; এ দুই বিরুদ্ধকে একত্রে মেলাবে কে? এধারের ভাষা তথ্যের আর চিন্তার, ওধারের ভাষা ভাবের আর কল্পনার, কিন্তু সাহিত্যের ভাষা? শিল্পের ভাষা? সে তবে কোন ভাষা?
সাহিত্যের কিংবা শিল্পের ভাষা কেবল এপারেরও নয়, কেবল ওপারেরও নয়। শিল্পের বা সাহিত্যের ভাষা শুধু দিনেরও নয় কিংবা কেবল রাতেরও নয়। রাত চলে যাচ্ছে, দিন আসছে, তরল অন্ধকারের মধ্যে ফুটে উঠছে ভোরের আলো। অথবা দিন চলে গেল, রাত আসছে, ফিকে হয়ে আসা একতিল আলোর ভিতর অন্ধকারের কালো কুঁড়িটি ফুটে উঠছে ক্রমশ– এই আধো-আলো, আধো-অন্ধকারের ভাষাই সমূহ শিল্পের ভাষা, সংগীতের ভাষা, সাহিত্যের ভাষা। সে শুধু জেগে ওঠার ভাষা নয়। নয় সে শুধু ঘুমিয়ে পড়ার ভাষা। জাগর-তন্দ্রার সীমালগ্ন দেশ– যেখানে ‘আধেক ঘুমে নয়ন চুমে স্বপন দিয়ে যায়’ অথবা যখন সদ্য ভোরবেলায় জায়মান জীবনের দানাশস্যে পেট ভরাবে বলে স্বপ্নের কালো ডানার পাখিগুলো জাগরণের তটরেখায় আলগোছে নেমে এসেছে, ঠিক সেই তন্ময় মুহূর্তেই জেগে ওঠে যে সংবেদনা– শব্দে তার প্রকাশ সাহিত্যে, বর্ণরেখায় তার প্রকাশ ছবিতে, মুদ্রাবিভঙ্গে তার প্রকাশ নৃত্যে এবং সুরেতালে তার প্রকাশ সংগীতে।

যে বিশিষ্ট রাতটির কথা আমি আগের অধ্যায়ে লিখেছি, যে-রাতে প্রথম আমার সঙ্গে মনুর আলাপ হয়, সেই রাত চলে গেল ভোরের আলোয়। ধীরে ধীরে প্রখর হয়ে উঠল রোদ। স্পষ্ট, তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল বাচনিক পৃথিবী। যে-কুয়াশা-শিশিরমাখা স্বপ্নভুবন আমার মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলিকে সারা রাত্রি আবিষ্ট করে রেখেছিল, প্রত্যক্ষগ্রাহ্য পৃথিবীর অনুভব এসে সেই স্বপ্নাবেশকে আপাতত সরিয়ে দিল। তখন তথ্যের দাবি ঝাঁকুনি দিতে লাগল আমাকে। আমি স্বর্গ থেকে বিচ্যুত হয়ে এসে পড়লাম ধরণীতে একটি সুগন্ধি ছাতিমফুলের মতই। মনে হল, মনু-নামক জলধারার উৎস ও গতি নিয়ে কিছু তথ্য আমাকে জানতে হবে।
ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নদী এই মনু। শাখানটাং পাহাড়ের কাহোসিব চূড়া থেকে বেরিয়ে এসে মনু চলেছে উত্তর ত্রিপুরার কুমারঘাট ও কৈলাশহরের পাশ দিয়ে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে মনুতটিনী মৌলবি-বাজারের মধ্য দিয়ে শ্রীহট্টে। তারপর ধলাই নদীর সঙ্গে মিলেমিশে কত পথ দিনে রাত্রে পেরতে পেরতে, কত গ্রাম কত হাট মাঠ ছুঁয়ে ছুঁয়ে সমুদ্রে পৌঁছেছে মনু… সে অনেক দূরের অজানা অদেখা পথ।
ভারতীয়রা কখনও এই সব ভৌগোলিক তথ্যে সন্তুষ্ট হতে পারেন না। তাঁরা একটি নদীর উৎস খোঁজেন তাঁদের ঐতিহ্যের মধ্যে, তাঁদের ইতিহাস-পুরাণের মধ্যে। ভারতীয়দের দৃষ্টিতে ভূগোল কখনও ঐতিহ্যবিবিক্ত নয়। সত্যকে খণ্ড খণ্ড করে বোঝার সীমায়িত বিশ্লেষণ ভারতীয়দের উদ্বুদ্ধ করে না। ভারতীয় দৃষ্টি সংশ্লেষণী দৃষ্টি। নদী তাই ভারতবর্ষে শুধু মাটির উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া জলরেখামাত্র নয়, ভারতীয় দৃষ্টিতে যে কোনও নদীই যুগাতিযুগের জাতীয় স্মৃতির কাজলরেখাও।
মনু নদীও সেই দৃষ্টিতে বহু প্রাচীন, বহু স্মৃতির ঐশ্বর্যে স্বর্ণিল। সুপ্রাচীন বায়ুপুরাণে না কি এর উল্লেখ রয়েছে:
‘সমুদ্রস্যোত্তরে দেশে ততো মনুনদী স্মৃতঃ।
যং গত্বাপি মহারাজন্ পীত্বা পানীয়মুত্তমম্।।
মনুনদ্যাং মহারাজ বরবক্রেণ সঙ্গমম্।
তত্র স্নাত্বা নরো যাতি চন্দ্রলোকমনুত্তমম্ ।।
এখন এই শ্লোকটি নিয়ে আমি পড়েছি বেজায় মুশকিলে। শ্লোকটির উল্লেখ করেছেন কৈলাশচন্দ্র তাঁর ‘রাজমালা’-র টীকায়। তিনিই লিখেছেন যে, এই শ্লোক বায়ুপুরাণে আছে। অথচ আমি অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেও শ্লোকটিকে বায়ুপুরাণে দেখতে পেলাম না। এমন হতে পারে যে, কৈলাশচন্দ্র বায়ুপুরাণের যে-সংস্করণ দেখেছেন, তার মধ্যে এটি ছিল। পরবর্তীকালে শ্লোকটি বর্জিত হয়েছে। এমন অনেক সময়েই অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। তাতে অবশ্য শ্লোকটির মর্যাদা কিছু ক্ষুণ্ন হচ্ছে না।
শ্লোকটির দিকে তাকানো যাক। প্রথমেই ‘সমুদ্রস্যোত্তরে দেশে’। সমুদ্রের উত্তরদিকে এক দেশ, সেখানে। কোন সমুদ্র? পূর্ব সমুদ্র। অর্থাৎ আজকের বঙ্গোপসাগর। সেই বঙ্গোপসাগরের উত্তরদিকে একটি স্থান। সেই স্থান থেকে বেরিয়ে এসেছে প্রখ্যাত মনুনদী। ‘ততো মনুনদী স্মৃতঃ’। সেখানে গিয়ে কোনও এক মহারাজ অর্থাৎ সম্রাট উত্তম পানীয় জল পান করে… ‘যং গত্বাপি মহারাজন্ পীত্বা পানীয়মুত্তমম্’ ইত্যাদি। জল পান করে কী করলেন? সুকঠিন তপস্যা করেছিলেন। এখানে সেই কথাটি অনুক্ত। মহারাজের নামও অনুক্ত। আসলে সেই সম্রাটের নামও ছিল মনু। তা সেই মনুমহারাজের তপস্যার স্থানটি কোথায়? ‘বরবক্রেণ সঙ্গমম্’। অর্থাৎ বরবক্র নদের সঙ্গে মনুনদীর মিলন হয়েছে যেখানে, সেই পুণ্য সঙ্গমস্থলে মনুনদীর জলে স্নানপান সেরে নিয়ে নরপতি মনু দীর্ঘ তপস্যা করেছিলেন। তপস্যার স্থান, অতএব তা অতিশয় পবিত্র স্থান। সেই স্থানমাহাত্ম্য ও নদীমহিমাকে সূচিত করার জন্যে লেখা হল– ‘তত্র স্নাত্বা নরো যাতি চন্দ্রলোকমনুত্তমম্’। সেই স্থানে মনুনদীতে স্নান করলে মানুষ চন্দ্রলোক নামক স্বর্গে যায়। কেমন সে-চন্দ্রলোক? না, অনুত্তমম্। উত্তম নয়, উত্তমেরও অধিক। শ্রেষ্ঠ।
বেশ। এখন কে এই তপোপরায়ণ রাজাধিরাজ মনু? ভারতীয় পুরাণে ‘মনু’ অনেকজন। একেক কল্পে একেকজন মনু। আবার স্মৃতিশাস্ত্র-প্রণেতা মনুও আছেন। এখানে এই সব ভজকট-র মধ্যে ঢোকার দরকার নেই। এক তপস্বী সম্রাট, যিনি যেন আদি মানব, বরবক্র বা বরাক নদ এবং মনুনদীর সঙ্গমস্থলে কোনও সুমহান অভীষ্টসিদ্ধির জন্য তপস্যা করেছিলেন। সম্ভবত সেই রাজার নামেই নামকরণ হয়েছে এই নদীর। এই পর্যন্ত প্রশস্ত।
ভৌগোলিক তথ্যটিও নির্বিবাদ। সত্যিই বাংলাদেশের মৌলবি-বাজারের কাছে মনুনদী বরাকের শাখা কুশিয়ারা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
এই হচ্ছে দিনের ভাষা। তথ্যের ভাষা। কিন্তু যে নদীর সঙ্গে আমার বিগত নিশীথে দেখা হয়েছিল, যার সঙ্গে মন দেওয়া-নেওয়া হয়েছিল, কত কথা হয়েছিল, সে এক চিন্ময়ী সত্তা। তার সম্পর্কে এসব ভৌগোলিক ও পৌরাণিক তথ্য জেনে আমার কী-ই বা লাভ? সে তো তথ্যের নদী নয়, সে চেতনার নদী।
দিন গেল, রাত এল। সমস্ত দিন ধরে যা যা জানলাম, পড়াশোনা করলাম, রাতের অন্ধকারে বসে মনে হল, সেসব অমূলক, অবাস্তব। যাঁদের সঙ্গে কৈলাশহরে গেছিলাম, যাঁদের সঙ্গে ছিলাম ওখানে, আটপৌরে গপ্পোগাছা করছি, খাওয়াদাওয়াও করলাম একসঙ্গে বসে, কিন্তু আমার ভেতরে এমন একটা আলোড়ন; যাকে আমি প্রকাশিত হতে দিইনি, নিজের ভেতরেই নাড়াচাড়া করে চলেছি অবিরত।
আমার পাশে বসে খেতে খেতে জনৈক সঙ্গী একবার শুধু আমাকে অন্যমনস্ক দেখে প্রশ্ন করলেন, ‘কোনও কিছু নিয়ে কি ভাবছেন খুব?’
আমি অবাক হওয়ার ভান করে বললাম, ‘কই, না তো!’
ধীরে ধীরে রাত গাঢ় হল। সেই আগের রাতের ঘরেই সবাই শুয়েছি। কথাবার্তা চালাচালি ধীরে ধীরে কমে এল। ক্রমশ ঘুমন্ত মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যেতে লাগল। আজ একটু ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। ঘরের জানালা বন্ধ। তাই কালকের মতো জোনাকি এসে সেঁধোয়নি ঘরের ভেতরে। রাত্রির অন্ধকার যেন আমার খোলা চোখের উপর নিকষ, নিরেট পাথরের ঢাকনার মতো উপুড় হয়ে আছে।
যখন নিশ্চিন্ত হলাম, আমি ছাড়া এ ঘরে আর কেউ অণুমাত্রও জেগে নেই, তখন পূর্বরাত্রির মতই পা টিপে টিপে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। আজকের জ্যোৎস্না তেমন স্বচ্ছ নয়। কুয়াশা রয়েছে বেশ। চাদরে মুখ-মাথা ঢেকে কালকের পথ ধরেই আমি হাঁটতে লাগলাম নদীচরের দিকে।

গন্তব্যে পৌঁছে ঈষৎ বিস্মিত হলাম আমি। এ যেন গতকাল রাত্রে দেখা নদীচরটি নয়। সমস্ত পরিপার্শ্ব কেমন যেন বদলে গিয়েছে। কুয়াশা অত্যধিক; ফলে দেড়হাত দূরের জিনিস অস্পষ্ট হয়ে রয়েছে। কাশফুলের জঙ্গল কেমন দলিত মথিত হয়ে পড়ে আছে। নদী থেকে উঠে এসে কোনও বৃহৎ জলজন্তু যেন নদীতীরে সমস্ত ঘেঁটে দিয়ে গিয়েছে। কাল যা ছিল ‘কাশ ইব প্রফুল্ল’ সদ্যোযুবতীর শুচিশুভ্র রূপ, আজ তা কেমন যেন সকল শ্রী-বিগর্হিত অকাল বৈধব্যের মূর্তি। সমস্তই কেমন অস্থিসার, হিম, ঘনীভূত মৃত্যুর মতো নীরক্ত, শীতল! নদী বইছে এত ধীর গতিতে যে, মনে হয়, বইছে না। সন্ধ্যার দিকে যেরকম মুহুর্মুহু হাওয়া দিচ্ছিল, এ মুহূর্তে তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মনটা কেমন যেন আমার দমে গেল। তা সত্ত্বেও কালকের মতো কেউ কথা বলে ওঠে কি না, তারই জন্যে অলীক অপেক্ষা করতে লাগলাম।
সেই জলকাদা-পরিপূর্ণ কাশের জঙ্গল, ঘোলাটে চাঁদের আলো, কুয়াশার অস্পষ্টতার মধ্যে বসে বসে ঘুম আসছিল। একবার মনে হল, এই সবই আমার মাথার খেয়াল, এখান থেকে উঠে ঘরে চলে যাওয়াই ভালো। এই সব সাত-পাঁচ ভাবনার মধ্যে কখন যেন ঘুমের ঘোর এসে গিয়েছিল, বলতে পারি না।
নদীচরে কাশের ঝোপের উপর ঠেস দিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছি। এমন সময় কে যেন হঠাৎ আমার মুখের উপর তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল। চাপাস্বরে কে যেন ডাকল, ‘মনু–’
চমকে জেগে উঠে সোজা হয়ে বসলাম। নিদ্রারুণ চোখদুটি মেলে তাকালাম চারপাশে। কে ডাকল?
নাহ্, কেউ কোথাও নেই! চারিদিকে শ্মশানের নিস্তব্ধতা। সেই ফ্যাকাসে কাশবনের উপর শেষ রাতের পাণ্ডুর চাঁদ পাঙাশ দৃষ্টি মেলে নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় শুধু চেয়ে আছে।
তন্দ্রাজড়িমার ভিতর কে আমাকে নাম ধরে ডাকল হঠাৎ? কিন্তু আমার নাম ধরেই কী? আমার নাম কী? আমার নাম আসলে কী? আমার নাম তো ‘মনু’ নয়…
……………………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন আয়নার ওধারে-র অন্যান্য পর্ব
……………………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved