queen victoria's death and the massive mourning in kolkata। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভিক্টোরিয়ার শ্রাদ্ধে কলকাতায় কাঙালিভোজন!

১৯০১ সালের ২২ জানুয়ারি ইংল্যান্ড থেকে এক টেলিগ্রামে রানি ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুসংবাদ কলকাতায় পৌঁছনোর অল্পক্ষণের মধ্যেই সেই শোকসংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে। এরপর থেকেই ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষণায় দেশের অভিজাত সম্প্রদায় ইংল্যান্ডের মহারানির মৃত্যুতে শোকপালনের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিল। তাঁর মৃত্যুর ১২ দিন পরে কলকাতায় অসংখ্য মানুষ মাতৃবিয়োগের শোকচিহ্ন ধুতি ও সাদা উত্তরীয় পরে, নগ্নপদে গড়ের মাঠে কীর্তন অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিল। পরের দিন অর্থাৎ ৩রা ফেব্রুয়ারি কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট ও বিডন স্ট্রিটের সংযোগস্থল থেকে মেছুয়াবাজার স্ট্রিট পর্যন্ত দীর্ঘ রাস্তার ওপর ফুটপাথ ধরে চারটি সারিতে কাঙালি-ভোজন বা দরিদ্রনারায়ণ সেবা করানো হয়েছিল। ভোজ্যতালিকায় ছিল– খিচুড়ি, কপির তরকারি, দই, বোঁদে এবং ভীম নাগের সন্দেশ!

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬, ১৯:১৯   
Facebook WhatsApp Messenger

বছর চারেক আগে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর ভারত সরকারের রাষ্ট্রীয় শোকপালনের ঘোষণা নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমে বিচিত্র ধরনের নানা প্রতিক্রিয়ার কথা আমাদের হয়তো মনে আছে। কেউ কেউ ভারত সরকারের এই কূটনৈতিক সৌজন্যের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন দাস-মনোবৃত্তি! এইসব হট্টগোলের সূত্রে মনে করা যায়, রানি এলিজাবেথের এক বিস্মৃত ও বিশ্রুত পূর্বসূরির কথা। তিনি মহারানি ভিক্টোরিয়া, যাঁর মৃত্যু হয়েছিল আজ থেকে ১২৫ বছর আগে। ব্রিটিশজাতির সেই দাপটের যুগে, যখন তাদের সাম্রাজ্যে ‘সূর্য অস্ত যেত না’, পরাধীন ভারতের স্কুলপাঠ্য বইপত্র থেকে শুরু করে পত্রপত্রিকায় সর্বত্র ভিক্টোরিয়ার বিশেষণ ছিল ‘সাম্রাজ্যেশ্বরী’ বা ‘ভারতেশ্বরী’। তিনি ‘ইংলন্ডেশ্বরী’ ছিলেন সুদীর্ঘ ৬৪ বছর (১৮৩৭- ১৯০১)।

zoom
অন্তিম শয়ানে রানি ভিক্টোরিয়া

১৮৭৬ সালে তাঁকে সরকারিভাবে ‘ভারত-সম্রাজ্ঞী’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়। তাঁর রাজ্যাভিষেকের হীরকজয়ন্তী ১৮৯৭ সালে ভারতবর্ষে সমারোহ সহকারে পালিত হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পরেও স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ ভারতের রাজভক্ত প্রজাদের মধ্যে শোকপ্লাবন বয়ে গিয়েছিল। চার বছর আগে ফেসবুকে যখন কেউ মশকরা করে লিখেছিল, লর্ডসের মাঠে রানি এলিজাবেথের শ্রাদ্ধভোজে লুচি-বোঁদে খাওয়ানো হবে, তখন অনেকেরই জানা ছিল না যে, কলকাতার রাস্তায় ভিক্টোরিয়ার ‘শ্রাদ্ধ’ উপলক্ষে সত্যিই ওরকম দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল। ১৯০১ সালের ২২ জানুয়ারি ইংল্যান্ড থেকে এক টেলিগ্রামে রানি ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুসংবাদ কলকাতায় পৌঁছনোর অল্পক্ষণের মধ্যেই সেই শোকসংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে। এরপর থেকেই ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের অভিজাত সম্প্রদায় ইংল্যান্ডের মহারানির মৃত্যুতে শোকপালনের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিল।

একটি বিবরণে পাওয়া যাচ্ছে, ভারতের গর্ভনর জেনারেল লর্ড কার্জন বঙ্গীয় ব্যবস্থাপরিষদের সদস্য ও পাথুরিয়াঘাটার মহারাজা স্যর যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরকে মহারানির মৃত্যুতে শোক-অনুষ্ঠানের আয়োজন করার ভার দিয়েছিলেন। যতীন্দ্রমোহনের প্রযোজনায় ‘ভারত সঙ্গীত সমাজ’ নামে এক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে হিন্দু পারলৌকিক বিধি অনুযায়ী এই শোক পালন হয়েছিল। মৃত্যুর ১২ দিন পরে অসংখ্য মানুষ মাতৃবিয়োগের শোকচিহ্ন ধুতি ও সাদা উত্তরীয় পরে, নগ্নপদে গড়ের মাঠে কীর্তন অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিল। পরের দিন অর্থাৎ, ৩ ফেব্রুয়ারি কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট ও বিডন স্ট্রিটের সংযোগস্থল থেকে মেছুয়াবাজার স্ট্রিট পর্যন্ত দীর্ঘ রাস্তার ওপর ফুটপাথ ধরে চারটি সারিতে কাঙালি-ভোজন বা দরিদ্রনারায়ণ সেবা করানো হয়েছিল। ভোজ্যতালিকায় ছিল– খিচুড়ি, কপির তরকারি, দই, বোঁদে এবং ভীম নাগের সন্দেশ! অবিশ্বাস্য শোনালেও ‘রানিমার শ্রাদ্ধভোজে’ খিচুড়ি তৈরি করতে লেগেছিল সাড়ে চার টাকা মণ দামের ১৫০ মণ বালাম চাল, সেই পরিমাণ ডাল, ১২ মণ ঘি ইত্যাদি।

zoom
যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর

রবিজীবনী-লেখক প্রশান্তকুমার পাল জানিয়েছেন, ২ ফেব্রুয়ারি গড়ের মাঠে এই শোকপালন ও কীর্তন ইত্যাদি আর সেদিন বিকেলে রাস্তায় ওই দরিদ্রভোজন হয়েছিল। তিনি আরও জানিয়েছেন, ২৬ জানুয়ারি ভারত সঙ্গীত সমাজের বার্ষিক উৎসব মহারানির মৃত্যুতে বাতিল করা হয়েছিল। ‘ভারতী’ পত্রিকায় (বৈশাখ ১৩০৮) ‘মহারানীর অন্ত্যেষ্টি সমারোহ’ শিরোনামে প্রকাশিত বিবরণে সম্পাদিকা সরলা দেবী গড়ের মাঠের ওই অনুষ্ঠানে বিপুল জনসমাবেশের ‘অপূর্ব দৃশ্য’কে ‘বাঙ্গালীর জাতীয় ঐক্যের একখানি জীবন্ত চিত্র’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

zoom
ভিক্টোরিয়ার শবযাত্রা

শ্রাদ্ধভোজের এই সমারোহ ছাড়াও পত্রপত্রিকার প্রবল শোকোচ্ছ্বাস তো ছিলই। শঙ্করীপ্রসাদ বসু লিখেছেন, ভিক্টোরিয়া তাঁর নানা ব্যক্তিগত গুণের কারণটি ছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে পরাধীন আত্মবিশ্বাসহীন ভারতবাসীর রাজানুগত্যের অর্ঘ্যও পেয়েছিলেন, তারা তাঁকে ঈশ্বরের দূত বা অংশ (অর্থাৎ, স্বয়ং এক দেবী) ভাবতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। (মনে করিয়ে দেওয়া যায়, হিন্দি ‘পাঞ্চ’ পত্রিকার একটি কার্টুনে ভারতবাসীর এই ‘মহামাতা-মহাদেবী’ ভিক্টোরিয়ার আরাধনার দৃশ্য আঁকা হয়েছিল।) তাঁর নাম উচ্চারণেই ভারতীয় প্রজাবৃন্দের মুখে উঠত ব্যাকুল ‘মা মা’ ধ্বনি! তাই তাঁর প্রয়াণে মাতৃহারা ভারতীয়দের অনাথবৎ ক্রন্দন ও অশ্রু যেভাবে ভারতের অগুনতি সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাগুলিকে কম্পিত ও সিক্ত করেছিল, বহু বছর পর সেগুলি দেখতে বসে করুণ রসের চেয়ে হাস্যরসের উদ্রেক বেশি হয়।

zoom
রানি ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ এবং বিবেকানন্দের প্রতিক্রিয়া ছিল আলাদা মেরুর

 এ তো গেল সাধারণ বাঙালির কথা। সত্যিই দেশের শিক্ষিত মানুষের মনে যখন সবে রাজনৈতিক চেতনার সঞ্চার হয়েছে, ব্রিটিশ প্রভুর কাছে আবেদন নিবেদন করে দেশীয়দের জন্য সামান্য কিছু সুবিধা পাওয়ার প্রয়াসেই যখন রাজনীতিকেরা ব্যস্ত, তখন শাসকজাতির রানিকে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের সামাজিক সৌজন্য প্রকাশের দায়িত্বের অতিরিক্ত তাদের অনুগ্রহ অর্জনের তাগিদ থাকাটাও সেদিন অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে, সেদিনকার আলোকিত বঙ্গসমাজের যেসব মানুষ ছিলেন আর পাঁচজনের তুলনায় বিশিষ্ট  অথবা পেশাগতভাবে অ-রাজনীতিক, তাঁরাও কি ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুতে অনুরূপ আবেগের অংশীদার হয়েছিলেন?

zoom
রানি ভিক্টোরিয়া

এই সূত্রে প্রথমেই আমাদের মনে আসে রবীন্দ্রনাথের নাম। আদি ব্রাহ্মসমাজের সাম্বৎসরিক মাঘোৎসবে (১১ মাঘ ১৩০৭) রানি ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুতে যে শোকপ্রস্তাবটি পাঠ করা হয়েছিল, সেটি ছিল রবীন্দ্রনাথ রচিত। এই প্রস্তাবের শুরুতেই দেখা যায়, তখনকার রাজভক্ত গড়পড়তা ভারতীয়দের মতোই রবীন্দ্রনাথও প্রথমেই ব্রিটিশ মহারানিকে শুধু ভারতসম্রাজ্ঞীর আসনেই নয়, ভারতীয় প্রজাদের মাতৃপদেও অভিষিক্ত করেছিলেন! এই শোকপ্রস্তাবটির কিছুটা দেখা যাক‘ভারতসম্রাজ্ঞী মহারানী ভিক্টোরিয়া– যিনি সুদীর্ঘকাল তাঁহার বিপুল সাম্রাজ্যের জননীপদে অধিষ্ঠিতা ছিলেন, যিনি তাঁহার রাজশক্তিকে মাতৃস্নেহের দ্বারা সুধাসিক্ত করিয়া তাঁহার অগণ্য প্রজাবৃন্দের নত মস্তকের উপরে প্রসারিত করিয়া রাখিয়াছিলেন, ক্ষমা শান্তি এবং কল্যাণ যাঁহার অকলঙ্ক রাজদণ্ডকে পরিবেষ্টন করিয়াছিল, সেই ভারতেশ্বরী মহারানী যে পরমপুরুষের নিয়োগে এই পার্থিব রাজ্যভার গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং যাঁহার প্রসাদে সুচিরকাল জীবিত থাকিয়া আনন্দিতা রাজশ্রীকে দেশে কালে এবং প্রকৃতিবর্গের হৃদয়ের মধ্যে সুদৃঢ়তররূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন, অদ্য সমস্ত রাজসম্পদ পরিহারপূর্বক ললাটের মাণিক্যমণ্ডিত মুকুট অবতারণ করিয়া একাকিনী সেই রাজরাজের মহাসভায় গমন করিয়াছেন। পরমপিতা তাঁহার মঙ্গলবিধান করুন।’

zoom
সংবাদপত্রে প্রকাশিত অবিচুয়ারি

 এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ সেসময় ইংরেজ-শাসনের মধ্যে শুধু ভিক্টোরিয়ার মাতৃস্নেহই দেখতে পাননি, তাঁর চোখে সেই রাজপদে তিনি স্বয়ং ঈশ্বরের নিয়োগেই অভিষিক্ত হয়েছিলেন! পরবর্তীকালে আমরা ভারতে ব্রিটিশ শাসকদের বিভিন্ন অপকাণ্ডের প্রতিবাদে সোচ্চার যে রবীন্দ্রনাথকে দেখেছি, তার সঙ্গে যেন এই রবীন্দ্রনাথের কোনও মিলই নেই! তাঁর চোখে এতদিনকার ব্রিটিশ-শাসন শুধুই শান্তি, ক্ষমা, কল্যাণ আর আনন্দে পরিপূর্ণ আর তা ‘অকলঙ্ক’-ও বটে!

এর পাশাপাশি আমরা ইতিমধ্যেই বিশ্ববিখ্যাত যে-আর একজন ভারতীয় প্রজার ভিক্টোরিয়া বিষয়ক অভিমত দেখে নিতে পারি, তিনি রবীন্দ্রনাথেরই সমবয়সি, স্বামী বিবেকানন্দ। ভিক্টোরিয়ার প্রয়াণের মাত্র চার বছর আগে তাঁর রাজ্যাভিষেকের হীরকজয়ন্তী উপলক্ষে ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষের নানা সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাবার আনুষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা উপস্থিত হয়েছিল। সেই সূত্রে রামকৃষ্ণ মিশনের পক্ষ থেকে কীভাবে অভিনন্দনপত্রটি লিখতে হবে, ওই সংস্থার সভাপতি স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর গুরুভ্রাতা স্বামী ব্রহ্মানন্দের কাছে সে ব্যাপারে লিখিত নির্দেশ পাঠান। এই নির্দেশাবলির কিছু অংশ ছিল এরকম :

“মহারানীকে যে Address দেওয়া হইবে, তাহাতে এই কথাগুলি থাকা উচিত :

  ১| অতিরঞ্জিত না হয় অর্থাৎ ‘তুমি ঈশ্বরের প্রতিনিধি’ ইত্যাদি nonsense, যাহা আমাদের nation-এর স্বভাব।

 ২| তাঁহার রাজত্বকালে সকল ধর্মের প্রতিপালন হওয়ার জন্য ভারতবর্ষে ও ইংলণ্ডে আমরা নির্ভয়ে আমাদের বেদান্ত মত প্রচার করিতে সক্ষম হইয়াছি।

 ৩| তাঁহার দরিদ্র ভারতবাসীর প্রতি দয়া, যথা — দুর্ভিক্ষে স্বয়ং দান দ্বারা ইংরেজদিগকে অপূর্ব দানে উৎসাহিত করা।…” ইত্যাদি।

zoom
‘প্রবুদ্ধ ভারত’ ফেব্রুয়ারি, ১৯০১ সংখ্যায় প্রকাশিত শোক সংবাদ

১৪ জুন, ১৮৯৭ তারিখে লেখা এই চিঠির নির্দেশগুলি থেকে বোঝা যায় যে, বিবেকানন্দ ভিক্টোরিয়াকে বা তাঁর শাসনকে ঢালাও ভাবে প্রশংসা করতে প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি কয়েকটি সীমিত ক্ষেত্রে ব্যক্তি ভিক্টোরিয়ার দানশীলতা ইত্যাদি গুণ এবং ব্রিটিশ ভারতের শাসকদের ধর্মীয় সহিষ্ণুতাকেই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। উদ্ধৃত অংশটি থেকে শাসক জাতির রাজা বা রানিকে ঈশ্বরের প্রতিভূ হিসেবে প্রশস্তি করার প্রচলিত ভারতীয় অভ্যাস সম্পর্কে বিবেকানন্দের তীব্র আপত্তিও বুঝতে অসুবিধা হয় না। অবশ্য  বিবেকানন্দের ওই চিঠিটির উদ্ধৃত অংশটুকু থেকে এমনটা মনে করাও সম্ভব যে, দুর্ভিক্ষের সময় ব্রিটিশ মহারানির দানশীলতার প্রশস্তির ছলে বিবেকানন্দ প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের সেই অর্থনৈতিক দুর্দশার দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন, যা ভারতবাসীকে দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।

zoom
ভারতবাসীর দেবী ভিক্টোরিয়া পূজা: হিন্দি ‘পাঞ্চ’ পত্রিকার কার্টুন

উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথম কয়েক বছর জুড়ে ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে দুর্ভিক্ষ ও মহামারী ইত্যাদির প্রকোপে গণমৃত্যুর সাক্ষী হবার অভিজ্ঞতা রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ– দু’জনেরই হয়েছিল। এই সূত্রে আমাদের মনে না পড়ে পারে না যে, ১৮৭৬ সালে ভিক্টোরিয়াকে যখন ‘ভারতসম্রাজ্ঞী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয় ও ঘটা করে সেই উপলক্ষটি উদযাপনের জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়, তখন বিখ্যাত ‘পাঞ্চ’ পত্রিকা একটি কার্টুন ছেপেছিল, যার নিচে লেখা ছিল ‘Disputed Empire’! সেই সঙ্গে পত্রিকাটি ব্যঙ্গভরে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল যে, এই অর্থ এসেছে দুর্ভিক্ষপীড়িত ভারতের মানুষের থেকে সংগৃহীত রাজস্বের মাধ্যমে।

ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পর শুধু শ্রাদ্ধভোজ খাইয়েই ক্ষান্ত না হয়ে ব্রিটিশ প্রভুরা যখন ভারতীয় প্রজাদের থেকে কলকাতায় তাঁর স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য চাঁদা তোলার উদ্যোগ শুরু করেন, তখন স্বামীজি প্রতিষ্ঠিত ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ পত্রিকাতেও (মার্চ ১৯০১) দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজাদের থেকে  রাজারাজড়ার স্মৃতিরক্ষার জন্য অর্থসংগ্রহের প্রবৃত্তিকে কটাক্ষ করা হয়েছিল। (সত্যিই ১৫ বছর ধরে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল তৈরি করতে খরচ হয়েছিল ১ কোটি ৫ লক্ষ ভারতীয় মুদ্রা, যা এসেছিল ভারতের রাজা-মহারাজা থেকে সাধারণ মানুষ– সবার কাছ থেকেই।)

zoom
ভিক্টোরিয়ার ‘ভারতসম্রাজ্ঞী’ উপাধিলাভ প্রসঙ্গে ‘পাঞ্চ’ পত্রিকার ব্যঙ্গচিত্র

সবশেষে ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর এক বছর আগে তাঁর পরিচালনাধীন ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সম্পর্কে স্বামীজির একটি অকপট অভিমতের উল্লেখ করা যায়। ১৯০০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ‘ক্রনিকল’ পত্রিকার সাংবাদিকের ওই বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় স্বামীজি অঙ্গভঙ্গি করে কোমর ঝুঁকিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি ভারতের মহারানীর এক অনুগত প্রজা!’ সেলাম করার জন্য তিনি এতটাই নুয়ে পড়েছিলেন যে, সাংবাদিকটির বুঝতে অসুবিধা হয়নি, তিনি বিদ্রুপ করছেন। এতে বিস্মিত হয়ে তিনি যখন বলেন, ‘কিন্তু উনি তো স্বাধীনতার দূতী’, তখন স্বামীজির জবাব ছিল: ‘বিধবা হওয়ার পরেও বহু বছর পুনর্বিবাহ না করার জন্য তিনি ভারতের শ্রদ্ধার পাত্রী। আর স্বাধীনতা? হ্যাঁ, স্বাধীনতা ও আইন-শৃঙ্খলা সব উন্নয়নের লক্ষ্য বটে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আইনশৃঙ্খলা বিরাজ করে শ্মশানে।’ এই বক্র-মন্তব্যটি ভিক্টোরিয়া ও তাঁর শাসন সম্পর্কে বিবেকানন্দের প্রকৃত মনোভাবটিকে চিনিয়ে দেয়। কাজেই ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুতে বিবেকানন্দ পরিচালিত রামকৃষ্ণ সংঘের মুখপত্র ‘প্রবুদ্ধ ভারত’-এ মাত্র পাঁচ-ছ’টি বাক্যে সীমাবদ্ধ যে-শোকমন্তব্য ছাপা হয়েছিল, তা ছিল অন্যান্য পত্রিকার তুলনায় সংক্ষিপ্ত ও সংযত। এই শোকলিখনে ভিক্টোরিয়াকে ‘এই যুগের শ্রেষ্ঠ রাজন্য’ ও ‘স্মরণকালের দীর্ঘতম সময়ের শাসনকর্ত্রী’ রূপে উল্লেখ করে তাঁর আত্মার শান্তিকামনা ও নতুন সম্রাটের প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করা হয়েছিল।

Brahma Samaj Colonial Bengal Feast Funeral Mourning obituary Punch Magazine Queen of England Queen Victoria Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Swami Vivekananda

Share this article on