a true social worker nana patekar and naam foundation | Robbar
Robbar
  • ২১ আশ্বিন ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৮ অক্টোবর ২০২৬

সাচ্চা দেশপ্রেমী

আজকের এই ক্ষুদ্র স্বার্থ-সর্বস্ব সমাজে পাটেকরের জীবনের কাহিনি ও ভাবনার ধারার প্রতি নতুন করে সকলের মনোযোগ দেওয়া উচিত। ভেবে আশ্চর্য হতে হয়, শুধু চাষি বা নারীদের স্বাবলম্বন নয়, শিক্ষার্থীদের কল্যাণ নয়, পাটেকরের নাম ফাউন্ডেশন খরা-প্রবণ অঞ্চলে জল সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রায় ২০০টি নদী পুনরুজ্জীবিত করেছে। বাঁধ ও জলাশয় থেকে বিপুল পরিমাণ পলি পরিষ্কার করে ওই ফাউন্ডেশন প্রায় ৭৭ লক্ষ কৃষকের চাষাবাদের ক্ষমতা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ৮, ২০২৬, ২০:২৫   
Facebook WhatsApp Messenger

কোথায় গোয়া আর কোথায় ত্রিপুরা! অথচ বিশিষ্ট চলচ্চিত্র তারকা ছাড়াও নানা পাটেকর যে একজন শিক্ষা-অনুরাগী, নিষ্ঠাবান সমাজসেবী ছিলেন– সে ব্যাপারে প্রথম জেনেছিলাম আগরতলায় গিয়ে। তখন আমি মার্কিন দূতাবাসে কর্মরত। ঠিক ১০ বছর আগে ২০১৬ সালের অক্টোবরে কলকাতায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল ক্রেগ হল ও তাঁর রবীন্দ্রসংগীত-শিল্পী কোরিয়ান স্ত্রী মিরিয়াংকে নিয়ে আগরতলা গিয়েছিলাম। কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় আগরতলার রবীন্দ্রভবন প্রেক্ষাগৃহে বিজয়া সম্মিলনীর আদলে মিরিয়াংয়ের রবীন্দ্রসংগীতের সান্ধ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। সে এক ব্যতিক্রমী ব্যাপার। তার আগে পরিবেশিত হয়েছিল ত্রিপুরার ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী নৃত্য হোজাগিরি। আগেরদিন সকালে আগরতলায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এনআইটি) সভাঘরে কনসাল জেনারেল ক্রেগ হলের বক্তৃতা ছিল। তখন এনআইটি-র ডিরেক্টর ছিলেন বিশিষ্ট কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার অধ্যাপক গোপাল মুগারায়া। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ছিল তাঁর পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি। তাঁর বাংলোতে মার্কিন কনসাল জেনারেলের সম্মানে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজের সময় নানা আলাপচারিতায় উঠে এল নানা পাটেকরের কথা। কারণ উনি বলছিলেন ঠিক পরের মাসেই নভেম্বরে পাটেকর আসছেন এনআইটি-তে। একটু চমকে যাওয়ার মতোই ব্যাপার বটে। হঠাৎ তাঁর মতো এক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা আসছেন কেন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রত্যন্ত এক ছোট রাজ্য ত্রিপুরায়? তখনই অধ্যাপক মুগরায়া শোনালেন পাটেকরের গল্প। সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কথা।

zoom
নানা পাটেকর

অধ্যাপক মুগারায়া বলছিলেন, শুনলে আশ্চর্য হবেন, বলিউডের বা অন্যান্য যে কোনও চলচ্চিত্র অভিনেতা-অভিনেত্রী যখন একটু জনপ্রিয় বা ধনী হয়ে উঠলেই বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন, দামি বাড়ি-গাড়ি কেনেন, তখন পাটেকর গোড়া থেকেই বেছে নিয়েছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন। অভিনয় থেকে উপার্জন করা নিজের আয়ের বিপুল অর্থের সিংহভাগ তিনি দান করতেন সামাজিক ও শিক্ষামূলক কাজে। সেই কারণেই পাটেকরের কিংবদন্তি অভিনয় জীবনের পাশাপাশি মানবকল্যাণে বিশাল অবদানের জন্য বিভিন্ন মহলে তিনি এক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। 

zoom
সূত্র: নাম ফাউন্ডেশন

শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, তা পাটেকর সম্পর্কে এনআইটি-র এই ডিরেক্টরই বা এতটা উচ্ছ্বসিত কেন? আর তিনি সেখানে আসছেনই বা কেন? কৌতূহল আঁচ করে অধ্যাপক মুগারায়া বললেন, সমাজ ও চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এনআইটি আগরতলার নবম বার্ষিক সমাবর্তনে নানা পাটেকরকে সাম্মানিক ডি-লিট দেওয়া হচ্ছে। তাই তিনি আসতে রাজি হয়েছেন। আসলে অধ্যাপক মুগারায়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন পাটেকর। তাই তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখার ও জানার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। সেই সূত্রেই বলছিলেন, একবার মহারাষ্ট্রের চূড়ান্ত খরা পরিস্থিতি ও চাষিদের আত্মহত্যার ঘটনা পাটেকরকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। তখন ২০১৫ সালে মরাঠি অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে তিনি যৌথভাবে ‘নাম ফাউন্ডেশন’ (NAAM Foundation) প্রতিষ্ঠা করেন। এই ফাউন্ডেশনের শুরুটা হয়েছিল যখন পাটেকর একটি দেড় কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি কেনার পরিকল্পনা বাতিল করে, সেই টাকাটা সরাসরি অসহায় কৃষক পরিবারগুলিকে রক্ষা করার কাজে লাগান। ওই নাম-কা-ওয়াস্তে এককালীন কোনও দানধ্যান করে মিডিয়ার প্রচারে জায়গা কেনা নয়, এই ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত ৫০ হাজারেরও বেশি চাষি পরিবারকে যেমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় সাহায্য করেছে, তেমনই বহু বিধবা নারীকে আর্থিক সাহায্য করেছে; এবং গ্রামীণ নারীদের বিকল্প আয়ের সুযোগ করে দিতে সেলাই মেশিন, গবাদি পশু ও ময়দা পেষাই করার মেশিন বিতরণ-সহ প্রচুর জনহিতকর কাজ করে চলেছে।

zoom
সূত্র: নাম ফাউন্ডেশন

পাটেকরের সমাজ কল্যাণমূলক কাজের কথা জেনে শ্রদ্ধাসূচক তারিফ করেছিলেন মার্কিন কূটনীতিকও। পরে ওই সমাবর্তন অনুষ্ঠানের খবর সংবাদপত্রে পড়ে জেনেছি, এনআইটি-তে ডি-লিট গ্রহণ করে পাটেকর ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে যা বলেছিলেন– তা আজকের দিনেও সমান প্রাসঙ্গিক। কোনও চলচ্চিত্র তারকার চটকদার মন্তব্য নয়, বরং তাঁর বক্তব্য ছিল যথেষ্ট শিক্ষণীয় এবং গভীর। তিনি বলেছিলেন– কলেজ শুধু আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান দিতে পারে, কিন্তু আসল শিক্ষা অর্জন করতে হবে বাইরের বিরাট জগতে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে। আসল সুখ লুকিয়ে আছে আমাদের চারপাশের মানুষকে সুখী করার মধ্যে। কাউকে আঘাত করে, অসম্মান করে, কারও ক্ষতি করে কখনও কোনও ভালো হতে পারে না। আর শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে, উচ্চতর কৃতিত্বের জন্যে বিদেশে গেলেও দেশে ফিরে এসে সেই জ্ঞানকে নিজের দেশের কল্যাণে ব্যবহার করা উচিত।

zoom
সূত্র: নাম ফাউন্ডেশন

আজকের এই ক্ষুদ্র স্বার্থ-সর্বস্ব সমাজে পাটেকরের জীবনের কাহিনি ও ভাবনার ধারার প্রতি নতুন করে সকলের মনোযোগ দেওয়া উচিত। ভেবে আশ্চর্য হতে হয়, শুধু চাষি বা নারীদের স্বাবলম্বন নয়, শিক্ষার্থীদের কল্যাণ নয়, পাটেকরের নাম ফাউন্ডেশন খরা-প্রবণ অঞ্চলে জল সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রায় ২০০টি নদী পুনরুজ্জীবিত করেছে। বাঁধ ও জলাশয় থেকে বিপুল পরিমাণ পলি পরিষ্কার করে ওই ফাউন্ডেশন প্রায় ৭৭ লক্ষ কৃষকের চাষাবাদের ক্ষমতা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

zoom
সূত্র: নাম ফাউন্ডেশন

পাটেকর ছিলেন একজন গভীর দেশপ্রেমী। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল দেশের আসল উন্নতি আসবে পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার সুযোগ সঠিকভাবে প্রসারিত হলে। তাই নিছক নামমাত্র অনুদানের বদলে অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এক নীতি-নির্ধারকের মতো তিনি কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। আমরা হয়ত অনেকেই খবর রাখি না যে তাঁর ‘নির্মলা গজানন ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে পাটেকর জম্মু ও কাশ্মীরের গোলাবর্ষণ-প্রবণ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বিশেষত রাজৌরি এবং পুঞ্চ এলাকার ৪৮টি স্কুল দত্তক নেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি স্কুলের পরিকাঠামো উন্নত করেন, শিক্ষার সরঞ্জাম আধুনিক করেন এবং বিপন্ন শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সুন্দর পড়াশুনার পরিবেশ তৈরি করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে পাটেকরের এক গভীর ব্যক্তিগত সংযোগ ছিল। তিনি টেরিটোরিয়াল আর্মিতে সাম্মানিক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে তিনি কয়েকশ শহীদ সেনা পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং সীমান্ত সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে বড় ধরনের ত্রাণ সাহায্য পাঠিয়েছিলেন। এছাড়াও মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ গ্রামীণ এলাকায় বর্ষার সময়ে রাস্তাঘাট কাদা হয়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে, যার ফলে অনেক শিশু স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হত। নাম ফাউন্ডেশন ওই সব প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুদের জন্য স্থানীয় হোস্টেল ও ‘স্টাডি মল’ তৈরি করে দেয়, যাতে তারা সেখানে থেকে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে। চাষি পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনার দায়িত্ব গ্রহণ করেও নাম ফাউন্ডেশন বিরল নজির স্থাপন করেছে। অধ্যাপক মুগারায়ার কাছেই শুনেছিলাম, দু’টি রাজ্যের বেশ কয়েকটি গ্রামের শিশুদের জন্যে প্রতিদিন সকালে বিনামূল্যে দুধ সরবরাহ করার ব্যবস্থাও করেছিলেন নানা পাটেকর। 

zoom
সূত্র: নাম ফাউন্ডেশন

পাটেকরের প্রয়াণে যখন নানাভাবে তাঁর অভিনয় কৃতিত্ব ও চলচ্চিত্রশিল্পে তাঁর অবদানের চর্চা এবং নানা স্মৃতিচারণা চলছে, তখন তাঁর জনহিতকর ভূমিকার কথাও নিশ্চয়ই আমাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা উচিত।

naam foundation Nana Patekar Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on