Teaching methods of Nandalal Bose at Kala Bhavana| Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবির ভারতীয় ট্র্যাডিশন ভেঙেছিলেন নন্দলাল

শিক্ষক নন্দলালের মতে প্রকৃত শিল্পীর অন্তরে গভীর ক্ষুধার প্রয়োজন আছে, শিল্পে সেই খিদে চাই। সহজ করে বলতেন– ‘আহারের পূর্বে খিদে হওয়া চাই। তা না হলে খিদে নেই তবু খাচ্ছি তাতে হজম হয় না, স্বাস্থ্যও থাকে না। ছবি আঁকার পূর্বে তার বিষয়ের সঙ্গে ভাব হওয়া চাই। তবে না আনন্দ আঁকায়’। 

শেষ আপডেট: জুন ১৯, ২০২৬, ১৫:৪৪   
Facebook WhatsApp Messenger

৭.

কলাভবনে কীভাবে ক্লাস নিতেন নন্দলাল? তিনি কি ছড়ি-হাতে গুরুমশাইয়ের মতো রাগী ছিলেন, পান থেকে চুন খসলেই রেগে অস্থির? না কি তিনি ছাত্রের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে তাদের ভাবনাকে উসকে দিতে চাইতেন? তাঁর শেখানোর পদ্ধতি কেমন ছিল? বিষয়টা নন্দলালের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া যেতে পারে। আরেকটা কথাও মনে রাখা দরকার, কলাভনের পাঠ্যক্রমে ছাত্রছাত্রীদের বয়সের কোনও নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। আজকেও সেই প্রথাই প্রচলিত। ফলে নন্দলালের ছাত্রদের মধ্যে বয়সে কেউ অনেকটা বড়, কেউ বা যথেষ্ট তরুণ। স্বভাবতই এই অসমবয়সি ছাত্রছাত্রীদের শিল্প-জিজ্ঞাসাও ছিল ভিন্ন ভিন্ন রকমের। এই নানাবয়সি ছাত্রদের বিচিত্রতর ভাবনা আর প্রশ্নমালার সামনে নন্দলাল যেন নিজেও প্রতি মুহূর্তে নিজেকে গড়ে তুলেছেন।

zoom
নন্দলাল বসু

ক্লাসে শিল্পচর্চার কোনও নির্দিষ্ট ধাঁচা ছিল না, তাই প্রত্যেকটি ছাত্রকেই তার শিল্পবোধ অনুসারে পাঠ দিতে হত। নন্দলাল কখনওই ছাঁচে-ঢালা ক্লাসের শিক্ষক ছিলেন না। এমনকী ছাত্রছাত্রীদের কাজে প্রথমেই নিজের মতামত চাপিয়ে দিতেন না। ভিতর থেকে তাদের শিল্পের তাগিদকে উসকে দিতেন, প্রাণিত করার চেষ্টা করতেন। ভুলত্রুটি শুধরে দিতেন তাদের মতো করে। স্মরণে রাখা জরুরি, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ চাইতেন, ছেলেমেয়েরা নিজের মতো করে বেড়ে উঠুক। ছাঁচে-ঢালা রাস্তায় নয়, দাগা-বুলোনো পথের বাইরে বেরিয়ে এসে তারা নিজের মতো করে চলতে শিখুক। তবে নন্দলালের ভাবনার শিকড়ে বহমান ছিল ভারতীয় আদর্শের জয়গান। জীবনের শেষ পর্বেও ভারতীয় আদর্শ থেকে তিনি একচুল সরে দাঁড়াননি। ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি বলতেন– ‘দেখো, আমার ভারতীয় egoism আছে। যাই আঁকি ভারতীয় হওয়া চাই।’ পাশাপাশি একথাও বলতেন যে– ‘নূতন কিছু না হয়ে যদি ভারতীয় ট্র্যাডিশনের নকল হয় তাও ভালো। ট্র্যাডিশন হচ্ছে বীজের ভিতরের নব প্রাণের আবরণ। এই আবরণ না থাকলে ভিতরের নব প্রাণবীজ রক্ষা পায় না, জল, বৃষ্টি, সাময়িক তাপের অভাব বা আতিশয্যজনিত ধ্বংসের থেকে রক্ষা করে’।

zoom
ছবি: নন্দলাল বসু

একইসঙ্গে শিক্ষক নন্দলাল স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেন না যে– ‘আবরণ কঠিন হলেও যথাসময়ে তাকে ফাটিয়ে নূতন ভাবে প্রাণবীজের প্রকাশ চাই। আর্টের বেলাতেও তাই ট্র্যাডিশন ভাঙার শক্তি চাই, তবেই নূতন আর্ট হবে। এখানে ট্র্যাডিশন আর্ট আর নূতন আর্ট অভিনব আর্ট, পরস্পরের মধ্যে বিরোধ নেই– একে অন্যের সহায়ক’। এই হচ্ছেন শিক্ষক নন্দলাল, আপামর ছাত্রকুলের ‘মাস্টারমশাই’– যিনি ভারতীয় পরম্পরার প্রতি ভাবে প্রবল নির্ভর থেকেও ভারতীয় ট্র্যাডিশন ভাঙার শক্তিকে আহ্বান করেন। ‘নূতন আর্ট অভিনব আর্ট’-এর জন্য মনকে সজাগ রাখেন। খুব সহজ ভঙ্গিতে আর্টের গোড়ার কথাটুকু মেলে ধরতে তাঁর জুড়ি ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত শিল্পীর অন্তরে গভীর ক্ষুধার প্রয়োজন আছে, শিল্পে সেই খিদে চাই। সহজ করে বলতেন– ‘আহারের পূর্বে খিদে হওয়া চাই। তা না হলে খিদে নেই তবু খাচ্ছি তাতে হজম হয় না, স্বাস্থ্যও থাকে না। ছবি আঁকার পূর্বে তার বিষয়ের সঙ্গে ভাব হওয়া চাই। তবে না আনন্দ আঁকায়’।

zoom
নন্দলাল বসুর আঁকায় শান্তিনিকেতন

এখানে ‘বিষয়ের সঙ্গে ভাব’ বলতে, ছবির বিষয় নির্বাচনের পর তাকে আঁকার আগে সেই বিষয়টিকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করার কথা বারে বারে বলেছেন। পাশাপাশি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ছবি আঁকার সময়, বিষয় ও ভাবের সামগ্রিক সামঞ্জস্যের দিকটি– আর তা বিশেষ করে নতুন ছাত্রছাত্রীদের কাছে। বিশের দশকের গোড়ার দিকের ছাত্রী অনুকণা জানিয়েছেন– ‘দিনের পর দিন এক আসনে বসে ছবি আঁকাকে মাস্টারমশাই একেবারেই প্রশ্রয় দিতেন না। আশ্রমের চারিদিকে ঘুরে ঘুরে স্কেচ করতে উৎসাহ দিতেন। বার বার বলতেন, “আগে চোখ মেলে দেখো, স্কেচ করে আনো, তারপর তুলি ধরতে পারবে”। সাঁওতাল গ্রামে গিয়ে সাঁওতালদের ছবি আঁকতে মেয়েরাই বেশি ভালোবাসত। পিকনিকে গেলে মাস্টারমশাই বহু স্কেচ করে ফেলতেন, আমরাও সাধ্যমতো চেষ্টা করতাম। মাস্টারমশাই বলতেন– “ক্রমাগত নানা বিষয়ের স্কেচ না করলে বড় ছবি করা দুঃসাধ্য”…’– এমনটাই জানিয়েছেন অনুকণা।

zoom
নন্দলাল বসুর আঁকা সুবিখ্যাত ‘হরিপুরা পোস্টার’ সিরিজের ছবি

তাঁর প্রথম দিনের ক্লাসের অভিজ্ঞতা একটু শুনে নেওয়া যাক। সদ্য কলাভবনে ভর্তি হয়েছেন তিনি। ক্লাসে এসে বসেছেন রং তুলি কাগজ নিয়ে। কিছুক্ষণ পরে নন্দলাল এসে কাছে বসলেন। অনুকণা কখন এসেছেন, এখানে এসে কেমন লাগছে ইত্যাদির খোঁজখবর নিতে নিতে ছবি আঁকার কাগজের ব্লকটা সামনে একটু দিয়ে বললেন, ‘আঁকো’। বলেই আরেক ছাত্রীর কাছে চলে গেলেন। এদিকে অনুকণা পড়েছেন মহা বিপদে, কী আঁকবেন কিছুতেই তা ভেবে উঠতে পারছেন না! স্মৃতিকথায় লিখেছেন– ‘…“আঁকো”– কিন্তু কী আঁকি? মহাসমস্যা। একটু ভাবতেই মনে পড়ল, সুরুলের দিকে যাচ্ছে যে রাঙামাটির পথ, তার কথা। একদিকে শুকনো জমি ও তারই পরে নীচুজমিতে ধানক্ষেত, অন্যদিকে লাল কাঁকড়ের খোয়াই ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে– দূরে তালগাছের সারি। আঁকলাম এক ছবি। বেশি রং দিতে ভয়– লাইনগুলোও কাঁপা কাঁপা, কিন্তু তার পরেও আঁকলাম সেই রাঙামাটির পথ আর তার উপর দিয়ে চলেছে এক মোটরগাড়ি।’ সে যাত্রায় ছাত্রী অনুকণার আঁকা শেষ। এবারে নন্দলালের ছবি দেখার পালা। অনুকণা লিখেছেন– ‘পরদিন মাস্টারমশাই আমার সিটে এসেই জিজ্ঞেস করলেন– “এঁকেছ? দেখি কী এঁকেছ?” ছবিটা সামনে এগিয়ে ধরতেই মুখে স্মিত হাসির রেখা ফুটে উঠল। বললেন, “বেশ হয়েছে, কিন্তু তুমি দেখছি একেবারেই কলকাতার মেয়ে!” মোটা তুলি দিয়ে বেশ খানিকটা রং তাতে তুলে সেই কলকাতার মোটরখানাকে বীরভূমের গরুর গাড়িতে পরিবর্তন করে ফেললেন যেন ম্যাজিকে। এদিক-ওদিক আরও দু-একটা মোটা লাইন দিয়ে আমার সেই মরা ছবিতে প্রাণসঞ্চার করে দিলেন। আমার চোখ খুলল, মন সজাগ হল।’

zoom
নন্দলাল বসুর আঁকায় ছিল খাঁটি ভারতীয় মেজাজ।

এক লহমায় অনুকণা উপলব্ধি করলেন ছবি তৈরির অন্তরের কথা। এই হল ‘মাস্টারমশাই’ নন্দলাল বসুর প্রথম পাঠ। চকিতে বুঝিয়ে দিলেন ছবি আঁকার সঙ্গে বিষয় নির্বাচনের সামগ্রিক ছন্দটিকে বজায় রাখা জরুরি। এখানে মোটরগাড়ি আঁকা হলে ব্যাকরণের দিক থেকে ছবি আঁকার ভুল হত তা নয়। তবে ছবির মেজাজের সঙ্গে মোটরগাড়ি একটু আরোপিত বলে মনে হত। এখানে এই ধানখেত আর দিগন্তে প্রসারিত তালগাছের সারির পাশ দিয়ে যে লালমাটির পথ, সেখানে গরুর গাড়িই মানানসই। তাই ছাত্রীর আঁকা মোটরগাড়িকে গরুর গাড়িতে রূপান্তরিত করে দিতে একটুও দ্বিধা করলেন না নন্দলাল। তাই মুহূর্তে বদলে গেল ছবি। এ কেবল আঙ্গিকের নিপুণ কৌশল নয়, বিষয়-ভাবনার সঙ্গে বিষয় নির্বাচনের সাযুজ্য– যা শিল্পের অন্যতম প্রধান দিক। আরেকটা গল্প, এ-ও অনুকণার কাছে শোনা। তাঁর সহপাঠী বীণা একটি ছবি এঁকেছে, বিষয় হচ্ছে এক রাখাল ছেলে গাছতলায় দাঁড়িয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে। নন্দলাল ছবিটির দিকে তাকিয়ে একটু কপট গাম্ভীর্যের সঙ্গে ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন– ‘কী এঁকেছ?’ এদিকে এমন প্রশ্নে বীণা তো রীতিমতো অবাক! ভারি আশ্চর্য, মাস্টারমশাই কি তবে এই সহজ বিষয়টা বুঝতেই পারছেন না! অবশেষে নন্দলালের কাছে তাকে ব্যাখ্যা করে বলতেই হল। সে বললে– ‘রাখাল ছেলে বাঁশি বাজাচ্ছে।’ স্মিত হেসে নন্দলাল বললেন– ‘ও তাই বলো– আমি তো ভাবছিলাম রাখাল ছেলে আখ খাচ্ছে।’ এই না বলে হেসে উঠলেন, তা দেখে সকলেই হাসতে লাগল।

zoom
শিল্পী: নন্দলাল বসু

এবারে– ‘মাস্টারমশাই তখন তুলি হাতে নিয়ে রাখাল ছেলের বাঁশিটি আড়ভাবে ধরিয়ে দিলেন। তখন আর সে আখ খাচ্ছে না, বাঁশিই বাজাচ্ছে। বীণাকে বললেন, আবার আঁকো, যতক্ষণ না পছন্দ হবে নতুন করে আঁকবে– বাঁশি দিয়ে যেন সুর বের হয়। একটু কাগজ আর রং খরচ হবে, তাতে কী।’ অর্থাৎ হাসি-মশকরা আনন্দের মধ্যেই ক্লাসে ছবির প্রাণপ্রতিষ্ঠা সারা হল।

zoom
কলাভবনে ছাত্রদের সঙ্গে নন্দলাল বসু

শিক্ষক নন্দলালের ক্লাস সর্বদা এমন করে সহজ খোলামেলা সজীব হয়ে উঠত। অনুকণা একবার ছবিতে একটা পাত্র এঁকেছেন। বেশি রঙের ব্যবহার না-করে সামান্য একটু হলুদ রং লাগিয়েই ছেড়ে দিয়েছেন– “মাস্টারমশাই দেখে বললেন, ‘কেন? এমন পাত্র কেন? মণি মুক্তো জহরত লাগিয়ে দাও– তোমার তো শুধু একটু রঙের খরচ।’” অনুকণার সেই পাত্র হয়তো সমগ্র ছবির তুলনায় বেশি ফ্ল্যাট লাগছিল। গল্পচ্ছলে মণিমাণিক্যের উপমার মধ্যে দিয়ে তিনি বুঝি তার গায়ে একটু টেক্সচার দিতে বললেন। নন্দলাল এমন করেই সহজে অনায়াসে ছবি আঁকার মূল ক্ষেত্রটিকে চিহ্নিত করে দিতেন। ছবি আঁকার ক্লাস যেন হয়ে উঠত খেলার আসর, অনাবিল আনন্দের ফোয়ারা।

……………………………………………………………………………………

পড়ুন গল্পকলা কলামের অন্যান্য পর্ব

……………………………………………………………………………………

Bengal School of Art Kala Bhavana Memoir Nandalal Bose painter rabindranath Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shantiniketan visvabharati

Share this article on