An obituary of Singer Argha Sen। Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

প্রাণে গান না থাকলে গানেও প্রাণ থাকবে না, বলতেন অর্ঘ্য সেন

খাতা দেখে গান গাওয়ার ব্যাপারে প্রচণ্ড বিরোধিতা ছিল অর্ঘ্য সেনের। রবীন্দ্রসংগীত দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে শিখলেও রেকর্ড জগতে ট্রেনিং নেন শুভ গুহঠাকুরতা, সন্তোষ সেনগুপ্ত, শৈলেন মুখোপাধ্যায় ও সুচিত্রা মিত্রের তত্ত্বাবধানে। তাঁর মঞ্চাভিনয়ের পরিচালকরা ছিলেন শম্ভু মিত্র ও ঋত্বিক ঘটক। আমরা অবাক হয়ে শুধু দেখতাম মানুষটি কেবলমাত্র গান গাইছেন না। হাতে, মুখে, হাসিতে, চোখের ভাষায় যেন সেই গানেরই ছোঁয়া।

Published by: Robbar Digital

Posted:January 20, 2026 9:16 pm | Updated:January 20, 2026 9:20 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

এই লেখা লিখতে গিয়ে অনেক বছর পিছনে ফিরে যেতে হল। তাও বছর তিরিশের বেশি তো হবেই। তখনও পড়াশোনার পাশাপাশি মনকে ঘিরে ছিল রবীন্দ্রসংগীত। বিশেষ করে, দেবব্রত বিশ্বাস। শোনার মাধ্যম তিনটি: রেডিওতে ‘অনুরোধের আসর’, প্যানাসনিকের একখানি পুরনো ক্যাসেট প্লেয়ার আর অবশ্যই গ্রামোফোন রেকর্ড। আমার পিতৃদেব মুর্শিদাবাদের লালগোলায় চাকরিসূত্রে থাকতেন আর সপ্তাহান্তে ফিরতেন আসানসোলে। এমনই এক শুক্রবার যখন তিনি বাড়িতে ফিরেছেন, তখন আমি সারাদিনের দুষ্টুমি সেরে গভীর ঘুমে অচেতন। সকালে ঘুম থেকে উঠলে তিনি একখানি ক্যাসেট দিয়ে বললেন, ‘এঁর গান শোনো। ইনি দেবব্রত বিশ্বাসের ছাত্র।’ একথা শুনে মনে মনে ভেবে নিলাম সেই রকমই বুঝি ভরাট কণ্ঠ হবে, ঘর গমগম করে উঠবে। খুব উৎসাহে ক্যাসেট চালানো হল, ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’। শোনামাত্রই চমকে উঠলাম! না তো, এ নকল করা কোনও কণ্ঠ একেবারেই নয় (কারণ সে যুগে বাংলা গানে কিশোর, মান্না, দেবব্রত-কণ্ঠীর গান খুব বেশিই শোনা যেত। হেমন্ত-কণ্ঠী তো এখনও শুনতে পাই)। এ গলা একেবারে অন্যরকম, যাকে বলে স্বতন্ত্র। সানুকম্প আছে, একটু চেরা-চেরা, নিঃশ্বাসে অসম্ভব নিয়ন্ত্রণ (নিজেকেই তখন হেঁপো রুগি বলে মনে হত), কিন্তু সর্বাঙ্গীণভাবে পরিচ্ছন্ন উপস্থাপনা। ভালো করে আবার দেখলাম ক্যাসেটের ছবিখানা। বিশেষ শিল্পীসুলভ গন্ধর্বকান্তি তিনি নন, তবে কণ্ঠ মনে দাগ না-কেটে যায় না।

May be an image of text

বেশ কিছু বছর কেটে গিয়েছে। ২০০০ সাল। সেবার ‘যুগল শ্রীমল স্কলারশিপ’ পেলাম। রবীন্দ্রসদনে আমাদের সম্মানিত করা হবে। মঞ্চে প্রথমে ডাকা হচ্ছে যাঁরা গণ্যমান্য ব্যক্তিরা থাকবেন– বন্দনা সিংহ, সুশীল চট্টোপাধ্যায়, প্রমিতা মল্লিক, অর্ঘ্য সেন! নাম শোনামাত্র সিট ছেড়ে তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে পড়েছি। নামটা ভিতর থেকে কেমন করে যেন নাড়া দিয়ে গেল। একটু আফসোস করে আবার বসেও পড়লাম। মনে হল, ইশ, ওঁর হাত থেকে যদি পুরস্কারটা পেতাম। ভাগ্য সত্যিই সুপ্রসন্ন ছিল। মঞ্চে আমায় ডেকে নেওয়ার পরে সুদীপ শ্রীমল বললেন ‘গৌরব, কার কাছ থেকে পুরস্কার নেবে বলো।’ আমি লজ্জার মাথা খেয়ে বললাম ‘অর্ঘ্য সেন’। দেখলাম হাসিমুখে উনি এগিয়ে এলেন, শংসাপত্র হাতে তুলে দিলেন। প্রণাম করতেই বললেন ‘পা মাটিতে রাখিস বাবা আর মাথা হালকা’। আজ বুঝি এর অর্থ ঠিক কী।

 

অর্ঘ্য সেন প্রথম ‘অর্ঘ্যদা’ হলেন সম্পূর্ণ আরেক পরিবেশে। সেটা এর বছর চারেক পরে– শান্তিনিকেতনে। নববর্ষের উপাসনা হোক, বর্ষামঙ্গল, পৌষমেলা বা বসন্তোৎসব; অর্ঘ্যদা সংগীত-ভবনে আসতেন। গান শুনতেন, মহড়া দেখতেন। আমাদের বুলবুলদির (অধ্যাপিকা বুলবুল বসু, সাহিত্যিক সমরেশ বসুর কন্যা) সঙ্গে অর্ঘ্যদার বন্ধুত্ব ছিল। রঞ্জনদার ক্যান্টিনে বসে কথা বলতেন, আলোচনা করতেন আর পুরনো দিনের গল্প করতেন। আমরাও কাছাকাছির মধ্যে দাঁড়িয়ে-বসে সে সব শুনতাম। আবার আমার সহপাঠী অতনু নাগ ছিলেন ওঁর ছাত্র। অনেক বছর গান শিখেছেন। ওই আমাকে দাদার সঙ্গে আলাপ করাল। রবীন্দ্রনাথের গানের বাইরে দ্বিজেন্দ্রগীতি, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ এমনকী, দিলীপকুমার রায়ের গান করি বলে খুব খুশি হলেন। সেই থেকে মাঝে মাঝে সান্নিধ্য পাই। সে সান্নিধ্য কলকাতার ব্যস্ত জগতের মতো বা এখনকার ‘ট্যুরিস্ট স্পট’ শান্তিনিকেতন নয়। সেটা ভোরের শিশিরের মতো বা বৈশাখের ভোরের হাওয়ার মতোই ছিল শান্ত, মন্থর আর হৃদয়স্পর্শী। আজ খালি মনে হয় কেন যে সে সময় মোবাইল বা অন্যান্য রেকর্ডার সঙ্গে ছিল না। থাকলে রেকর্ড করে রাখতে পারতাম, অন্তত সাক্ষ্যপ্রমাণের জন্য।

যাই হোক, এবার গানে আসি। তিনি যে শুধুই গান গাইতেন– একথা বলা ভুল হবে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় তিনি ছিলেন স্বভাব-শিল্পী। গুরুর কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাকে আত্তীকরণ করে নিজের শৈলীর সঙ্গে শৈল্পিক সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। অনুসরণ করলেও স্বতন্ত্র সত্তাটি অক্ষুণ্ণ থাকত। আমি শুনেছি শিষ্য নির্বাচনেও তিনি কঠোর ছিলেন। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যেত (এখনও যায়) অনুষ্ঠান বা আকাশবাণীর গ্রেডেশনের প্রয়োজনে গান শিখতে আসেন। অর্ঘ্যদা এই মানসিকতার তীব্র বিরুদ্ধে ছিলেন। সেইরকমই আত্মপ্রচার বিমুখতাকে সম্মান করতেন। এমনকী, গুরু-পরিবর্তনের খানিকটা পরিপন্থী ছিলেন। তিনি মনে করতেন এতে শিল্পীর কণ্ঠের চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে না।

zoom
দেবব্রত বিশ্বাস ও অর্ঘ্য সেন

খাতা দেখে গান গাওয়ার ব্যাপারে প্রচণ্ড বিরোধিতা ছিল ওঁর। আজকের যুগে স্মার্ট ফোন, ট্যাব দেখে যাঁরা গান করে থাকেন তাঁদের কী চোখে দেখতেন, তা জানতে না পারলেও আন্দাজ করতে পারি। তাঁকে বলতে শুনেছি ‘কবিপক্ষে রবীন্দ্রসদনে একখানা গান গাইবে, সে আবার দেখার কি আছে হে? গান মনে রেখে গাইতে পার না তো গেয়ো না। আসলে তোমাদের ‘প্রাণে গান নাই’ তাই গানেও প্রাণ নেই।’

গানের লয় অর্ঘ্যদার ভীষণ মূল্যবান বৈশিষ্ট্য। কোনও দিন তাঁর গানে লয়ের বিচ্যুতি বা অনাসক্তি কেউ দেখেছেন বলে তো আমার মনে হয়নি। তাঁর ভাবনাই ছিল লয় যথাযথ না হলে গানের ভাব সঠিকভাবে তুলে ধরা অসম্ভব। স্বরলিপি মেনে সুরের যথার্থতা উপলব্ধ হতে পারে না, যতক্ষণ সঠিক লয়ের অনুষঙ্গ রক্ষা করা যায়। তিনি নিজের গান যে লয়ে রেকর্ড করে গিয়েছেন, প্রতি ক্ষেত্রে শব্দের ওজন এমনকী, স্বরান্তরে যে এন্ডনোট ব্যবহার হয়ে থাকে, সেটিও যথাযথ করেছেন। সেক্ষেত্রে বলা যেতে পারে বুদ্ধিমত্তা ও অনুভবকে সঙ্গে রেখেই গান করেছেন। তাঁর সংগীত ভাবনায় বারেবারে প্রকাশ করেছেন গানের ছবি না-দেখে, গানের রস না-বুঝে গাওয়া উচিত নয়। এমনকী, অনুষ্ঠানে গানের তালিকা সাজানোর মধ্যেও ভাবনাচিন্তা থাকার প্রয়োজন। কারণ সেটা খানিকটা গানের মালা তৈরি করার মতোই। মনে পড়ে, ‘চিরকুমার সভা’ নাটকের একটি সংলাপ– ‘লতায় ফুল আপনি ফোটে, কিন্তু যে লোক মালা গাঁথে সুরুচি ও নৈপুণ্য তারই।’ ঠিক সেইরকম নিজের গানের পরিবেশনায় এই ভাবনাটিই প্রতিবার যেন অনুভব করেছিলাম।

zoom
অর্ঘ্য সেন

গান পরিবেশনায় আমরা জানি মডিউলেশনের প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে দু’টি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন। প্রথমত, ‘দম’ অর্থাৎ শ্বাস ধরে রাখা ও শব্দের ভাব অনুসারে ছাড়া। এখানে উদাহরণ দেওয়া প্রয়োজন। যেমন ‘বিরহ মধুর হল আজি’ গানটি (ECSD 2627, 1981)। স্থায়ীর দ্বিতীয় পংক্তিতে কিভাবে দম নিয়েছেন–

গভীর রাগিণী উঠে বাজি|

বেদনাতে বিরহ মধুর হল আজি। মধুরাতে|

এই অংশের প্রায়োগিক দিকটি একবার দেখা যাক। ‘বেদনাতে’ শব্দ যেখানে শেষ তারপরে শ্বাস নিয়ে ‘বিরহ মধুর’ বলতে গেলেই অফবিট হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯৯ শতাংশ। তাই ছন্দের চ্যুতি না ঘটিয়ে পুরোটা একদমে গাইলেন। ফলে গানের স্নিগ্ধতায় কোনও আঘাত এল না। অন্যদিকে পরিবেশনায় শব্দের উচ্চারণ ও স্ট্যান্ডিং নোট গাওয়ার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতেন। আমরা জানি স্ট্যান্ডিং নোট গান পরিবেশনার ক্ষেত্রে ঋজু মেরুদণ্ড। কারণ, গানের মাঝে এই ন্যাস স্বর রাগিণীর প্রতিনিধি তো বটেই এমনকী, আবহসংগীতের সুর প্রক্ষেপণে মূল অবলম্বন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিল্পীরা এই সমস্ত অংশে ভাইব্রাতো (vibrato) প্রয়োগ করে থাকেন। অর্ঘ্যদাকে কখনও তা করতে শুনিনি। তাই তাঁর গাওয়া এই গানেই যখন শুনি ‘ভরি দিয়া পূর্ণিমানিশা’ তখন নিঃসঙ্গ নিস্তব্ধতায় পূর্ণ পূর্ণিমার ছবি মানস পটে আপনিই আঁকা হয়ে যায়। পার্থিব হয়েও যেন স্বর্গীয় অনুভব। এই গুণ খুবই দুর্লভ।

অর্ঘ্যদার নানা ধরনের গানের প্রতি সমান গ্রহণীয়তা ছিল। তিনি নিজেও নানা ধরনের গান নানা সময়ে শিখেছিলেন। এমনকী, রেকর্ডিংয়ের জন্য ট্রেনিংও বিভিন্ন গুণী শিল্পীদের কাছ থেকে নিয়েছিলেন। যেমন, আধুনিক গান শেখেন কমল দাশগুপ্তের কাছে। দ্বিজেন্দ্রগীতি, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্তের গান শেখেন মঞ্জু গুপ্ত ও দিলীপকুমার রায়ের কাছে, যিনি রজনীকান্ত সেনের দৌহিত্র। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দিলীপকুমার রায়ের ‘দৈলিপী’ গানের ট্রেনিং নেন ড. গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়ের কাছে (‘দ্য মাদার’ নামে লং প্লেয়িং রেকর্ড তৈরির সময়)। নজরুলগীতি শেখেন কমল দাশগুপ্ত ও সুপ্রভা সরকারের কাছে। রবীন্দ্রসংগীত দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে শিখলেও রেকর্ড জগতে ট্রেনিং নেন শুভ গুহঠাকুরতা, সন্তোষ সেনগুপ্ত, শৈলেন মুখোপাধ্যায় ও সুচিত্রা মিত্রের তত্ত্বাবধানে। এমনকী, নাটকের অভিনয়ের শিক্ষা শুধু নয় তিনি মঞ্চে অভিনয়ও করেছিলেন। সেই নাটকের পরিচালকরা ছিলেন স্বনামধন্য শম্ভু মিত্র ও ঋত্বিক ঘটক। এত ঐশ্বর্যের যিনি শরীক হয়েছেন তাঁর গান তো রত্নভাণ্ডার। আমরা অবাক হয়ে শুধু দেখতাম মানুষটি কেবলমাত্র গান গাইছেন না। হাতে, মুখে, হাসিতে, চোখের ভাষায় যেন সেই গানেরই ছোঁয়া। বুঝতে পারতাম গানের মাঝে ডুবে যাওয়া কাকে বলে। নির্বিকার পাথরের মতো নয় আবার লম্ফঝম্প করে বা হস্ত-সঞ্চালন করে নয়। এক সামগ্রিক স্নিগ্ধ ও ছন্দোময় রূপ।

zoom
সুচিত্রা মিত্রর সঙ্গে অর্ঘ্য সেন

রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি নিয়ে তিনি অনেকবার তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। স্বরলিপি যথাযথ মেনে চললেও ছাপানো স্বরলিপিতে ‘অবসান চিহ্ন’ নিয়ে খুবই বিরক্ত হতে দেখেছি। আবার শান্তিনিকেতনে প্রচলিত সুরের প্রামাণ্য স্বরলিপির কোনও প্রকাশ না-থাকায় যথেষ্ট অসন্তুষ্ট হতেন। কারণ খুবই স্বাভাবিক। শিল্পী যে গান গাইবেন, সেখানে প্রচলিত সুর বা সুরান্তর থাকতেই পারে, কিন্তু যথাযথভাবে সেগুলির মধ্যে কোনটি প্রামাণ্য, সেটির লিপিবদ্ধ রূপ যদি না থাকে এবং সকল শিল্পীর কাছে যদি তা না পৌঁছয়, তবে তো গানের ইউনিফর্মিটি বজায় রাখা দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে। নানা জনের কণ্ঠে নানা সুর শুনতে পাওয়া যাবে। ফলে সঠিক সুরের সংরক্ষণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। যেমন ধরুন আমাদের ‘আশ্রম সংগীত’। ‘আমাদের শান্তিনিকেতন’ গানের মুদ্রিত স্বরলিপি যা আছে আর আমরা শান্তিনিকেতনে যেভাবে গেয়ে থাকি– দু’টি একেবারেই এক নয়। বেশ কিছু জায়গায় পার্থক্য আছে। সেক্ষেত্রে রেকর্ড করতে গেলে কোনটা গাওয়া হবে, সে বিষয়ে দ্বিমত হতেই পারে। অন্যদিকে ‘অবসান চিহ্ন (||)’ নিয়েও নান্দনিক পরিবেশনায় সমস্যা হয়ে থাকে। যেমন, ‘অনেক দিনের শূন্যতা মোর’ গানটি। এখানে অবসান চিহ্ন দেওয়া আছে ‘অনেক দিনের’ বলে অর্থাৎ এটুকু বলে অন্তরা বা সঞ্চারী ধরতে হবে। এমনকী, গানও এখানেই শেষ হবে। অর্থাৎ গানের কথার বা পঙক্তির পূর্ণতা এখানে নেই। কেমন যেন অ্যাব্রাপ্টলি শেষ। একই বিষয় ‘নূতন প্রাণ দাও’, ‘আমার মন চেয়ে রয় মনে মনে’ গানের জন্যও প্রযোজ্য। তাই অর্ঘ্যদার ভাবনা ছিল এই যে, একজন গীতিকারের যেমন সুরের মূর্ছনা সম্পর্কে স্পষ্ট বোধ থাকতে হয় তেমনই স্বরলিপি যিনি করবেন তাঁরও গানের উপস্থাপনার দিকে স্পষ্ট ভাবনা থাকা প্রয়োজন। তা না হলে এই সমস্যা গানের পরিবেশনায় হতে বাধ্য। এর থেকে বোঝা যায়, অর্ঘ্যদা নিজে শুধু গান গাওয়ার দিকে নজর দিতেন না, বরং গানের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি কৌতূহলী তো ছিলেনই, তার চেয়েও বেশি ছিল সজাগ দৃষ্টি। তাই ভাবনা চিন্তা দিয়ে সংগীত পরিবেশনার প্রতিই ছিলেন সচেষ্ট।

এত কথা যাকে উদ্দেশ্য করে লিখলাম, ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত শান্তিনিকেতনে নানা অনুষ্ঠানের মাঝে যেমন পেয়েছি, দেখেছি আলোচনা করতে তাই মনের মধ্যে গ্রহণ করেছি। কতটুকু পেরেছি, জানি না। কলকাতায় তার পরেও বেশ কিছু অনুষ্ঠানে গান শুনতে গিয়েছি কিন্তু কাছাকাছি যেতে পারিনি। দেখতাম সবাই ঘিরে গানের প্রশংসা করছেন, কেউ ছবি তুলছেন, প্রণাম করছেন, আবার কেউ-বা অটোগ্রাফ নিচ্ছেন। আমি দূরে দাঁড়িয়ে দেখতাম। শুধু কানে আপনার গাওয়া একটাই লাইন বেজে উঠত অর্ঘ্যদা,

‘প্রসাদ লাগি কতই লোকে আসে ধেয়ে,
আমি কিছু চাইব না তো রইব চেয়ে;…’

………………………

লেখক
প্রাক্তন ছাত্র, সংগীতভবন, বিশ্বভারতী,
রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ও ভারপ্রাপ্ত অবেক্ষক,
কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়

Argha Sen Debabrata Biswas Rabindra Sangeet Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Suchitra Mitra

Share this article on