Robbar

সফদরের শিশুসাহিত্য: খোলা ছাদে নিশ্চিন্ত ঘুড়ি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 11, 2026 8:10 pm
  • Updated:April 11, 2026 8:16 pm  

সফদর হাশমির সৃজনশীলতার সবচেয়ে মিষ্টি অথচ সবচেয়ে অবহেলিত দিকটি হল তাঁর শিশুসাহিত্য। একজন কট্টর মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, যিনি সারাদিন শ্রমিকদের অধিকার, মজুরি আর ধর্মঘট নিয়ে লড়ছেন, তিনি বাড়ি ফিরে বাচ্চাদের জন্য লিখছেন চমৎকার সব কবিতা আর নাটক! ভাবলে অবাক লাগে না? কিন্তু সফদর খুব ভালো করেই বুঝতেন, শুধু বড়দের কানে অধিকারের ভারি ভারি তত্ত্ব ঢাললে সমাজ কোনওদিন বদলাবে না। নবজাতকের বাসযোগ্য একটা বৈষম্যহীন, সুন্দর পৃথিবী গড়তে গেলে সবার আগে ওই একরত্তি বাচ্চাদের মগজের জানলা দরজা খুলে দিতে হবে।

নীলাঞ্জন হালদার

এই লেখাটা অনেকভাবেই শুরু করা যায়। শুরু করা যায় পূর্ণেন্দু পত্রীর বিখ্যাত কবিতা দিয়ে–

হিংসা কোনো নতুন শব্দ নয়।
নতুন শব্দ-সফদর হাসমি।
সফদর হাসমি মানে জাগা, জেগে থাকা, জাগানো।

সফদর হাশমি মানে জাগা, জেগে থাকা, জাগানো।

আরও নানাভাবেই নিশ্চয়ই শুরু করা যায়, কিন্তু আমি সেভাবে শুরু করতে চাই না। আসলে আমরা বাঙালিরা বড্ড বেশি ট্র্যাজেডি-বিলাসী জাত! কোনও শিল্পীর কপালে একবার ঘটনাক্রমে ‘শহিদ’ তকমা জুটলে, তাঁর ওই রক্তমাখা শার্টটা নিয়েই দিনের পর দিন চলে মাতামাতি। সফদর হাশমি নামটা শুনলেই তাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৯৮৯ সালের ১ জানুয়ারি। দিল্লির উপকণ্ঠে সাহেবাবাদের ঝান্ডাপুর, ‘হাল্লা বোল’ নাটকের মাঝপথে আচমকা ছুটে আসা কিছু রাজনৈতিক গুন্ডা, এলোপাথাড়ি লাঠির ঘা, আর মাত্র ৩৪ বছর বয়সে এক তরতাজা তরুণের মাথা থেঁতলে যাওয়া অকালমৃত্যু।

কিন্তু আমার সঙ্গে আসলে সফদারের একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। আমি তখন সবে থিয়েটার করা শুরু করেছি, একটা শো এসেছে ডানকুনিতে। সেখানে গিয়ে দেখি, সফদর হাশমির জন্মদিন পালন হচ্ছে। আমি তখনও জানতাম না, কে সফদর! তারপর বাড়ি ফিরে শুরু করলাম ওঁকে নিয়ে পড়াশোনা। ঠিক করলাম অন্তত একবার দিল্লিতে গিয়ে ওঁর নামাঙ্কিত সফদর হাশমি মার্গে একটা পথনাটক করব, আর করতে গিয়ে পুলিশের অন্তত একটু তাড়া খেলে তো সোনায় সোহাগা! সেসব কথা এই ৩৩ বছর পেরনো জীবনে আর রাখা হয়নি! যাই হোক, সফদর আমাকে আমার থিয়েটার জীবনে পড়াশোনা আর অ্যাক্টিভিজমের গুরুত্ব বুঝতে শিখিয়েছিল।

ওই মুষ্টিবদ্ধ হাত আর স্লোগান-মুখর কালো টি-শার্টের সেই লোকটা শুধু কারখানার গেটে দাঁড়িয়ে পুঁজিবাদের মুন্ডুপাত করতেন– এমনটা ভাবলে বড্ড ভুল হবে। ওঁর নুক্কড়-নাট্যকর্মী সত্তার আড়ালে একজন শিশু-সাহিত্যিক লুকিয়ে ছিল, সেই খবরটা আর কেউ রাখি না। হ্যাঁ, সফদর হাশমির সৃজনশীলতার সবচেয়ে মিষ্টি অথচ সবচেয়ে অবহেলিত দিকটি হল তাঁর শিশুসাহিত্য। একজন কট্টর মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, যিনি সারাদিন শ্রমিকদের অধিকার, মজুরি আর ধর্মঘট নিয়ে লড়ছেন, তিনি বাড়ি ফিরে বাচ্চাদের জন্য লিখছেন চমৎকার সব কবিতা আর নাটক! ভাবলে অবাক লাগে না? কিন্তু সফদর খুব ভালো করেই বুঝতেন, শুধু বড়দের কানে অধিকারের ভারি ভারি তত্ত্ব ঢাললে সমাজ কোনও দিন বদলাবে না। নবজাতকের বাসযোগ্য একটা বৈষম্যহীন, সুন্দর পৃথিবী গড়তে গেলে সবার আগে ওই একরত্তি বাচ্চাদের মগজের জানলা দরজা খুলে দিতে হবে।

মুষ্টিবদ্ধ হাত আর স্লোগান-মুখর কালো টি-শার্ট

তবে মুশকিল হল, বাচ্চাদের হাতে পুঁজিবাদের তত্ত্ব ধরিয়ে দিলে তারা সেটা দিয়ে কাগজের প্লেন বানাবে, সেটাই তো স্বাভাবিক! তাই সফদর হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন বাচ্চাদের খেলার সাথী। তাঁর লেখা ‘দুনিয়া সবকি’ কবিতার বইটার কথাই ধরুন না। একটা কবিতায় সম্রাট আকবর বুক ফুলিয়ে বলছেন–

‘জাঁহা তক দেখা হমনে, সব পর আপনা রাজ
ইস দুনিয়াঁ কে হর কোনে কে হম হ্যায় রাজধিরাজ’

[যতদূর দেখেছি আমরা, সবকিছুর ওপর আমাদের রাজত্ব
এই দুনিয়ার প্রতিটি কোণের আমরাই তো মহারাজ]

আর বীরবল এক্কেবারে পিন দিয়ে বেলুন ফুটো করার মতো সম্রাটের সেই দম্ভ চুপসে দিচ্ছেন। কোনও কঠিন রাজনৈতিক শব্দ ছাড়াই, একেবারে রূপকথার মেজাজে তিনি বাচ্চাদের শিখিয়ে দিলেন যে, ক্ষমতা আর দম্ভ আসলে কতটা ফাঁপা।

বাচ্চাদের চিন্তাশক্তিকে উসকে দেওয়ার জন্য তিনি লিখেছিলেন ‘গড়বড় ঘোটালা’ নামের আস্ত একটা ননসেন্স ছড়ার বই। সুকুমার রায়ের ‘হজবরল’-এর মতো এখানে সব কিছু উলটপালট। সফদর লিখছেন–

‘য়হ ক্যায়সা হ্যায় ঘোটালা
কি চাবি মে হ্যায় তালা
কমরে কে অন্দর ঘর হ্যায়
ঔর গায় মে হ্যায় গোশালা’।

আপাতদৃষ্টিতে এটা নিছকই হাসির ছড়া মনে হতে পারে, কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলে বুঝবেন, তিনি আসলে বাচ্চাদের শেখাচ্ছেন চারপাশের ধরা-বাঁধা নিয়মগুলোকে প্রশ্ন করতে। সমাজ আমাদের যা শেখায়, সেটাই যে ধ্রুব সত্য নয়, কখনও কখনও রীতিনীতিগুলোকে উলটে-পালটে দেখতে হয়– এই গভীর দর্শনটা তিনি কী অনায়াসেই না বাচ্চাদের মাথার ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন একগাল হাসির মোড়কে!

সফদর কেবল ছড়া লিখেই থেমে থাকেননি, বাচ্চাদের জন্য আস্ত বই লিখেছেন, যাতে তারা বাইরের পৃথিবীর দিকে চোখ মেলে তাকায়। তাঁর ‘কিতাবেঁ’ বইয়ের শুরুতেই তিনি বাচ্চাদের ডাক দিয়ে বলছেন–

‘কিতাবেঁ করতি হ্যায় বাতেঁ
বীতে জমানো কি
দুনিয়া কি
ইনসানো কি’

[বইগুলো কথা বলে
পুরনো জমানার
এই দুনিয়ার
মানুষদের]

আবার ‘সারে মৌসম অচ্ছে’ বইতে ‘পহেলি বারিশ’ (প্রথম বৃষ্টি) কবিতায় সেই বিপ্লবী সফদরই হয়ে উঠলেন আদ্যোপান্ত এক নরম মনের কবি, যিনি লিখছেন–

‘রস্‌সি পর লটকে কপড়ো কো
সুখা রহি থি ধূপ’

[দড়িতে ঝোলা কাপড়গুলোকে
শুকোচ্ছিল রোদ]

শুধু কবিতাই নয়, বাচ্চাদের জন্য লেখা তাঁর ছোট ছোট নাটকগুলোর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে সাংঘাতিক সব রাজনৈতিক স্যাটায়ার। ‘নাটক কি দুনিয়া’ বইটিতে তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি শিশুতোষ নাটক রয়েছে। এর মধ্যে একটি নাটকের নাম ‘গোপী গাওয়াইয়া-বাঘা বাজাইয়া’। সেই নাটকে দেখা যায়, একটা দেশের সব মানুষ হঠাৎ করে কথা বলা ভুলে গিয়েছে। কেন? কারণ এক দুষ্টু জাদুকর এসে জাদুর হাওয়া চালিয়ে সবার মুখের ভাষা কেড়ে নিয়েছে। রাজা দুঃখ করে গোপী আর বাঘাকে বলছেন, ‘পহলে সব বোলতে থে, হঁসতে থে, বড়িয়া গাতে ভি থে। পর অব সব গুঙ্গে হো গয়ে হ্যায়’ [আগে সবাই কথা বলত, হাসত, সুন্দর গানও গাইত। কিন্তু এখন সবাই বোবা হয়ে গিয়েছে]। একবার ভেবে দেখুন তো রূপকটা! ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র বা স্বৈরাচারী শাসকরা তো ঠিক এইভাবেই সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা কেড়ে নিয়ে তাদের ‘বোবা’ বানিয়ে দেয়! সত্যজিৎ-ভক্ত বাঙালি জানেন, সেই বোবা শহরের মানুষের ভাষা ফেরায় কে? কোনও সেনাপতি বা জাদুকর নয়, ভাষা ফেরায় দুই সামান্য গায়ক-বাদক– গুপী আর বাঘা। শিল্পের মাধ্যমেই যে স্বৈরাচারের জাদু ভাঙা যায়, এই চরম রাজনৈতিক পাঠটা তিনি বাচ্চাদের একটা রূপকথার নাটকে ঢুকিয়ে দিলেন!

একই বইয়ের আরেকটা নাটক ‘রাজা কি খোঁজ’-এ পাখির দলের কোরাস গানটা শুনলে তো রীতিমতো চমকে উঠতে হয়। পাখিরা গাইছে–

‘রাজা কে পাজি দরবারি
খুব মজে মে রহতে হ্যায়
জঙ্গল কে বাকি সব জন্তু
উনকে জুল্ম কো সহতে হ্যায়’

[রাজার দুষ্টু পারিষদেরা
দারুণ মজায় থাকে
জঙ্গলের বাকি সব জন্তুরা
তাদের জুলুম সহ্য করে]

বাচ্চাদের নাটকে বন্যজন্তুর রূপকে অবলীলায় তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন সমাজের শ্রেণি-শোষণের কাঠামোটা।

আর তাঁর সবচেয়ে সাড়া-জাগানো শিশুতোষ লেখাটা সম্ভবত ‘বাঁশুরিওয়ালা’। বিখ্যাত হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার গল্পটা তো আমরা জানিই। কিন্তু সফদর সেই বিদেশি গল্পের শেষে জুড়ে দিলেন এক দারুণ দেশি রাজনৈতিক টুইস্ট। ইঁদুর তাড়ানোর পর রাজা যখন বাঁশিওয়ালাকে টাকা দিতে অস্বীকার করল এবং বাঁশিওয়ালা শহরের সব বাচ্চাকে নিয়ে চলে গেল, তখন আসল গল্পের শহরের লোক শুধু কেঁদেকেটে ভাসিয়েছিল। কিন্তু সফদারের গল্পের হ্যামলিনের জনতা অত বোকা নয়! তারা বুঝল আসল দোষীটা কে। সফদর লিখছেন–

‘রাজা সে গদ্দি ছিনি
দে ডালা দেশনিকালা
ঔর হ্যামলিন কা রাজ পাট
খুদ, জনতা নে হি সামভালা।’

[রাজার থেকে গদি কাড়ল
দিয়ে দিল নির্বাসন
আর হ্যামলিনের রাজপাট
নিজে, জনতাই সামলাল]

একবার ভাবুন তো কাণ্ডটা! একটা রূপকথার গল্প বলতে বলতে তিনি বাচ্চাদের মগজে একেবারে নিখুঁত একটা গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বীজ পুঁতে দিলেন! রাজা দুর্নীতিগ্রস্ত হলে যে তাকে ঘাড় ধরে গদি থেকে নামিয়ে ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নিতে হয়, সেই চরম রাজনৈতিক পাঠটা তিনি দিয়ে দিলেন একটা ঘুমপাড়ানি গল্পে!

আর ঠিক এই জায়গাটাতেই– এই যে আনন্দ দিয়ে, হাসিয়ে, সহজ করে কঠিন কথা বলার স্টাইল– দুই ভিন্ন মহাদেশ, আলাদা ভাষা, সম্পূর্ণ আলাদা ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও ইতালির দারিও ফো’র সঙ্গে পাওয়া যায় তাঁর অদ্ভুত মিল। কী সেই অদ্ভুত মিল? দু’জনেই একটা খুব সোজা কথায় বিশ্বাস করতেন– দর্শকদের ঘুম পাড়িয়ে বা বোর করে কোনও দিন বিপ্লব হয় না। মানুষকে যদি তোমার কথা শোনাতে হয়, তবে আগে তাদের হাসাতে হবে।

ফো যেমন ইতালির রাস্তায় দাঁড়িয়ে চার্চ, পুলিশ আর রাষ্ট্রযন্ত্রের ভণ্ডামি নিয়ে চরম হাসাহাসি করতেন, সফদরও ঠিক সেটাই করতেন দিল্লির রাস্তায়, কারখানার গেটে বা শ্রমিক বস্তিতে। সফদরের ভাই সোহেল হাশমি একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, সফদর আর মলয়শ্রী মোটেও আকাশকুসুম আদর্শবাদী বা খামখেয়ালি শিল্পী ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন চূড়ান্ত বাস্তববাদী। এই বাস্তববোধই তাঁদের শিখিয়েছিল যে, একজন ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত শ্রমিক যখন সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর আপনার নাটক দেখতে দাঁড়িয়েছে, তখন তাকে যদি আপনি আবার থিওরির লেকচার শোনান, সে পালাবে। তাকে বোঝাতে হবে যে রাজা আসলে উলঙ্গ, আর সেটা বলতে হবে হাসতে হাসতেই। শিল্পের কাজ হল আমাদের আরামের ঘুমটাকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া, মনের মধ্যে একটা বুদ্ধিবৃত্তিক অস্বস্তি বা ‘ইনটেলেকচুয়াল ডিস্টার্বেন্স’ তৈরি করা। আর মানুষকে সেই ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেওয়ার সেরা অস্ত্র হল কৌতুক। ব্যঙ্গ আর বিদ্রুপের চেয়ে ধারালো তলোয়ার পৃথিবীতে আর কী হতে পারে!

দারিও ফো

সফদর আর ফো– দু’জনেই এই কৌতুক বা ফার্সকে বানিয়েছিলেন নিজেদের সবচেয়ে বড় ঢাল। প্রথাগত মঞ্চের ওই মায়াবী আলো-আঁধারি, ঘোরানো সিঁড়ি, দামি টিকিট আর নিটোল মেকআপের মায়া তাঁরা দু’জনেই সচেতনভাবে ত্যাগ করেছিলেন। তাঁরা নেমে এসেছিলেন রাস্তায়। যেখানে শিল্পের কোনও মেদ নেই, কোনও আড়াল নেই, আছে কেবল কাঁচা, অমসৃণ আর জ্যান্ত একটা রূপ। দু’জনেই বিশ্বাস করতেন, মার্কসবাদ মানেই মুখ গোমড়া করে বসে থাকা নয়। তাঁরা দু’জনেই প্রাচীনকালের ‘বিদূষক’ বা ‘ভাঁড়’-এর ট্র্যাডিশনটাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। রাজসভায় বিদূষকই একমাত্র লোক, যে-রাজার মুখের ওপর তার ভুল ধরিয়ে দিয়েও পার পেয়ে যায়, কারণ সে কথাটা বলে হাসতে হাসতে।

ফো-এর ‘অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ অফ অ্যান অ্যানার্কিস্ট’ আর সফদারের ‘মেশিন’– প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও, দুটোই যেন একই সুতোর দুই প্রান্ত। দিল্লির হেরিগ ইন্ডিয়া কারখানায় যখন শ্রমিকরা শুধু একটু সাইকেল রাখার জায়গা আর এককাপ চায়ের ক্যান্টিন চাওয়ার অপরাধে পুলিশের গুলিতে মারা গেল, সফদর তখন শুধু কান্নাকাটি বা শোকপালন করেননি। তিনি লিখলেন ‘মেশিন’। কালো শার্ট-প্যান্ট পরা কয়েকজন অভিনেতা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত সব যান্ত্রিক শব্দ করে নিজেদের শরীরটাকেই একটা বিশাল কারখানার মেশিনে পরিণত করলেন। সেই মেশিনের মালিক, রক্ষী আর শ্রমিকের দ্বন্দ্বটা তিনি তুলে ধরলেন তীব্র শ্লেষের মাধ্যমে। পুঁজিপতি মালিকের লোভী, কিম্ভূতকিমাকার চেহারাটা দেখে শ্রমিকরা যখন হাসিতে ফেটে পড়ছে, ঠিক সেই হাসির মুহূর্তেই তারা নিজেদের শেকলগুলোকেও চিনতে শিখছে। ফো ঠিক এই কাজটাই করেছিলেন ইতালিতে। পুলিশ বা বিচারব্যবস্থার কর্তাদের তিনি নাটকের মঞ্চে এমন ভাঁড় বা ক্লাউন হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন, যে মানুষ হাসতে হাসতেই রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী রূপটা ধরে ফেলত।

তাই, আজ যখন সফদর হাশমির কথা ভাববেন, শুধু ওই জানুয়ারি মাসের কনকনে শীতের সকালে একটা লাঠির ঘা, আর রক্তাক্ত রাজপথের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন না। বরং ভাববেন এমন এক প্রাণোচ্ছ্বল মানুষের কথা, যিনি জানতেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হল মানুষের হাসি। যিনি বিশ্বাস করতেন, যে-দেশে শিশুরা খোলা ছাদে নিশ্চিন্তে ঘুড়ি ওড়াতে পারে না, যে দেশে একজন শ্রমিক তার মালিকের মুখের ওপর প্রশ্ন করতে পারে না, সে দেশে ‘বিপ্লব’ নিছকই একটা ফাঁকা, কেতাবি শব্দ। লাঠির ঘায়ে একটা ৩৪ বছরের তরতাজা শরীরকে হয়তো চুপ করিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু যে-মানুষটা মৃত্যুর চোখে চোখ রেখেও সমাজকে হাসতে শেখায়, বাচ্চাদের মজার গল্প শোনায়, তাঁকে কি আর অত সহজে মারা যায়?

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন নীলাঞ্জন হালদার-এর অন্যান্য লেখা

……………………