India’s Identity: Patriotism Without Hatred। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশের নামে দ্বেষ নয়

আমরা যদি আমাদের জাতীয় সংগীত ‘জনগণমন’-এর পরের অংশে নজর দিই, তাহলে সেখানে পাব– ‘অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত, শুনি তব উদার বাণী/ হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খৃস্টানী’। এই উদার বাণীর দেশই তো আমার ভারতবর্ষ। এক ভাষা, এক ধর্ম, এক সংস্কৃতির ইউরোপীয় ‘নেশন-স্টেট’ তো এ-দেশ নয়। এই দেশ হল– ‘নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান’-এর। এ-দেশের যে আত্মা, তা তো রয়েছে এর বহুত্ববাদী চরিত্রের মধ্যে।

শেষ আপডেট: আগস্ট ১৮, ২০২৬, ০৪:৫৩   
Facebook WhatsApp Messenger

একজনের কলমের খোঁচায় দেশের সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল। যাঁর কলমের খোঁচায় তা হয়েছিল, সেই বিদেশির পক্ষে কতটা জানা সম্ভব ছিল এ-দেশের ইতিহাস, ভূগোল বা সংস্কৃতি? ভেবে দেখুন, আজ যে নদিয়া জেলা, তার বেশিরভাগ অংশই, ভারতের স্বাধীনতার দিন এদেশে ছিল না। ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট দেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হচ্ছিল অথচ নদিয়া জেলাজুড়ে তা হচ্ছিল না। কারণ, একমাত্র নবদ্বীপই ১৫ আগস্ট থেকে ভারতে ছিল। নদিয়ার বাকি সব অঞ্চল অর্থাৎ, কৃষ্ণনগর, চাপড়া, নাকাশিপাড়া, কালীগঞ্জ, শান্তিপুর, রানাঘাট, চাকদহ, হরিণঘাটা, হাঁসখালি, করিমপুর, তেহট্ট, কৃষ্ণগঞ্জ সবই ছিল পাকিস্তানে। এই জায়গাগুলো ১৭ আগস্ট ভারতভুক্ত হয়।

zoom
দেশভাগের ক্ষতরেখা

র‍্যাডক্লিফ লাইন অনুযায়ী এই দেশভাগ ঠিক হয়েছিল। সিরিল র‍্যাডক্লিফকে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যেকার সীমান্ত নির্ধারণের ভার দেওয়া হয়েছিল। সেই সম্পর্কিত প্রতিবেদন সরকারিভাবে প্রকাশিত হয় ১৭ আগস্ট। তবে এইসব জায়গায় ভারতের পতাকা উত্তোলিত হয় ১৮ আগস্ট। কারণ ১৭ তারিখ বিকেল বা সন্ধ্যার পর ভারতভুক্তির খবরটা এসেছিল। তাহলে দেশভাগ, নিজের দেশকে কীভাবে গুলিয়ে দিয়েছিল, বুঝতে পারছেন তো?

zoom
ভারত-ভাগের রূপরেখা, মধ্যমণি সিরিল র‍্যাডক্লিফ

দেশের প্রতি ভালোবাসা আবহমান। এই স্বদেশপ্রেম আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে উদ্বুদ্ধ করেছে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন এ-দেশের মানুষ। শাসকের অত্যাচারের বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছেন দেশের মানুষ। সেই জোট যে সবসময় একরকম ছিল, তা নয়। প্রতিবাদী আন্দোলনের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন ব্রিটিশের সঙ্গে জোট বাঁধা এদেশের অত্যাচারীরাও, জমিদার-মহাজনদের দল। কাজেই শেষ অবধি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দেশের ‘দুশমন’দের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।

‘দেশ’ মানে কি শুধুই একটা ভৌগোলিক মানচিত্র? ‘দেশ’ মানে কি দ্বেষ জাগিয়ে অন্যদেশকে শত্রু ভাবা? দেশ কি তার নাগরিককে জাতিবিদ্বেষে উৎসাহিত করে সকলের সঙ্গে বৈরীভাব জাগিয়ে তোলে? রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদজনিত উগ্র দেশপ্রেম সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদ-বিরোধী। জোর দিয়েছিলেন স্বদেশপ্রেমে। রবীন্দ্রনাথ ‘জাতীয়তাবাদ’ কথাটাই ব্যবহার করতেন না। তিনি ‘নেশন’ শব্দটিকেই বাংলা ভাষায় ব্যবহার করতেন। ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’ প্রবন্ধে তিনি স্পষ্ট করে লিখছেন, “ ‘নেশন’ শব্দ আমাদের ভাষায় নাই, আমাদের দেশে ছিল না।” আবার ‘নেশন কী’ প্রবন্ধে লিখছেন, “নেশন একটি সজীব সত্তা, একটি মানস পদার্থ। দুইটি জিনিস এই পদার্থের অন্তঃপ্রকৃতি গঠিত করিয়াছে। সেই দুটি জিনিস বস্তুত একই। তাহার মধ্যে একটি অতীতে অবস্থিত, আর একটি বর্তমানে। একটি হইতেছে সর্বসাধারণের প্রাচীন স্মৃতিসম্পদ, আর একটি পরস্পর সম্মতি, একত্রে বাস করিবার ইচ্ছা – যে অখণ্ড উত্তরাধিকার হস্তগত হইয়াছে তাহাকে উপযুক্তভাবে রক্ষা করিবার ইচ্ছা।”

রবীন্দ্রনাথ জোর দিয়েছিলেন সামাজিক শক্তিতে। তাঁর মতে, ইউরোপে রাষ্ট্রশক্তি গুরুত্বপূর্ণ আর ভারতের জোরের জায়গা তার সামাজিক ঐক্য। একেবারে ছোটবেলায় সহজ পাঠ পড়ার সময়ই আমাদের পরিচয় ঘটে সামাজিক শক্তির সঙ্গে, যখন রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘আজ মঙ্গলবার। পাড়ার জঙ্গল সাফ করার দিন। সব ছেলেরা দঙ্গল বেঁধে যাবে।’ এই সামাজিক ঐক্যকেই রবীন্দ্রনাথ ভারতের ইতিহাসের মূল সুর বলে মনে করতেন।

স্বদেশপ্রেম রাষ্ট্রবাদী হতেও পারে, নাও হতে পারে কিন্তু জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রবাদী হতেই হবে। স্বদেশপ্রেম কৌমের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে, কৌমগুলোকে যথাযথ মর্যাদা দেয়। স্বদেশি সমাজের আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ বারবার যে-কথা বলেছেন, তা হল– আমাদের দেশে নেশন নয়, সমাজ গঠন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ঐক্য নয়, সামাজিক ঐক্যসাধনই মূল কাজ। বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের প্রধান পুরোধা হিসেবে রবীন্দ্রনাথ যখন ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গান বাঁধছেন, তখন তাঁর মধ্যে প্রধান হয়ে উঠছে স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা, দেশের হৃদয়কে এক করা, মানুষ বাঁধা। পরে যখন তিনি ‘ঘরে বাইরে’ (১৯১৬) উপন্যাস লিখছেন, সেখানে জোর দিচ্ছেন, মানুষকে মানুষ বলে শ্রদ্ধা করে, তার সেবা করার ওপর। নিখিলেশের বয়ানে লিখছেন, ‘কোনো-একটা উত্তেজনার কড়া মদ খেয়ে উন্মত্তের মতো দেশের কাজে লাগব না।’ দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকলে উন্মত্তের মতো কোনও নেশার সম্মোহনের প্রয়োজন হয় না।

zoom
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-মহাত্মা গান্ধী

১৯১৬-১৭ সালে রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদ নিয়ে কয়েকটি বক্তৃতা দেন। পরবর্তীকালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় তাঁর ভাবনা, ইংরেজিতে ‘ন্যাশানালিজম’ নামে। এই বক্তৃতাগুলো তিনি প্রদান করেছিলেন জাপানে এবং আমেরিকায়। বক্তৃতার বিষয় ছিল– জাপানে, পশ্চিমে এবং ভারতে জাতীয়তাবাদ। রবীন্দ্রনাথের মূল বক্তব্য হল, নেশন-স্টেট দাঁড়িয়ে থাকে এক ধরনের সঙ্ঘবদ্ধ স্বার্থপরতার ওপর, যা কখনও-ই মানবসভ্যতার আদর্শ হতে পারে না। বস্তুত জাতীয় গর্ববোধ দিয়ে শুরু নেশন-স্টেট শেষ পর্যন্ত জাতিগত বিরোধ, ভেদাভেদ ও হানাহানিতে পর্যবসিত হয়।

সেই হানাহানিই যেন ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। দেশের প্রতি ভালোবাসাকে এমনভাবে চিত্রিত করা হচ্ছে যেখানে সব সময়ই একজন শত্রু হাজির। সেই শত্রু কখনও প্রতিবেশী দেশ, আবার কখনও দেশেই আমাদের প্রতিবেশীরা। সেই প্রতিবেশীরা হয়তো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মের থেকে আলাদা ধর্মের লোক, কেউ হয়তো-বা সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। তাদের প্রতি বিদ্বেষ এমন জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে যে, মনে হচ্ছে দেশের শত্রু যেন দেশেরই মানুষ!

ভেবে দেখুন, কবি নবারুণ ভট্টাচার্য যখন লিখছেন, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ তখন তিনি কি দেশের বিরোধিতা করছেন? তা নয়। তিনি এক আদর্শ দেশের কথা ভাবছেন, যে দেশে সব মানুষের সুরক্ষা সুনিশ্চিত, যেখানে দিনবদলের স্বপ্ন দেখা কাউকে লাশ হতে হয় না। কিন্তু বাস্তবে তার বিচ্যুতি দেখে তাঁর কবিসত্তা সোচ্চার হয়ে বলছে, এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়। আমার দেশ তাহলে কেমন?

আর এক কবির কথা বলি। তিনি হয়তো প্রাথমিকভাবে বাংলার কথা বলছেন, কিন্তু আদতে বলছেন তো দেশের কথা। ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা, তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা, ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা।’ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের এই কথা তো আমরা রবীন্দ্রনাথের লেখাতে একটু আগেই লক্ষ করেছি; প্রাচীন স্মৃতিসম্পদ আমাদের ঐক্যবদ্ধ করে। দেশের প্রতি এই ভালোবাসা তো জন্মভূমির প্রতি আবেগ; ভারতে যা দেশমাতা, ইউরোপে তাই পিতৃভূমি। আপনার মনে হতেই পারে, দ্বিজেন্দ্রলাল যাকে ‘সকল দেশের রাণী’ বলছেন, তা তো বাংলা, কিন্তু ভেবে দেখুন স্বদেশি যুগে অবনীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ছবি ‘ভারতমাতা’ তো গোড়ায় ছিল ‘বঙ্গমাতা’। রবীন্দ্রনাথ যখন লিখেছিলেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ তখন তা কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ছিল না, যা লেখা হয়েছিল আমাদেরই বাংলাকে উদ্দেশ করে ১৯০৫-এ, স্বদেশি আন্দোলনের সময়। দেশপ্রেমের নামে এ-গানকে যদি আমরা ‘বিজাতীয়’ বলে চিহ্নিত করি, তাতে কি এক ধরনের বিদ্বেষেরই দেখা মেলে না? এই গানেই তো দেশমাতৃকার উদ্দেশে গাওয়া হয়েছে, ‘ও মা, তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে’। আবার অন্য গানেও রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “ও আমার দেশের মাটি, তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা”।

zoom
অবন ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’

দেশমাতাকে বন্দনা করা হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’-এ। ১৫০ বছর উদযাপন হচ্ছে তার। জাতীয় স্তোত্র বন্দেমাতরমকে সম্মান জানাতে নতুন আইনও প্রণীত হয়েছে। এখন আমরা পুরো স্তোত্র উচ্চারণ করছি। একই সঙ্গে যদি আমরা আমাদের জাতীয় সংগীত ‘জনগণমন’-এর পরের অংশে নজর দিই, তাহলে সেখানে পাব– ‘অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত, শুনি তব উদার বাণী/ হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খৃস্টানী’। এই উদার বাণীর দেশই তো আমার ভারতবর্ষ। এক ভাষা, এক ধর্ম, এক সংস্কৃতির ইউরোপীয় ‘নেশন-স্টেট’ তো এ-দেশ নয়। এই দেশ হল– ‘নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান’-এর। এ-দেশের যে আত্মা, তা তো রয়েছে এর বহুত্ববাদী চরিত্রের মধ্যে।

ছোটবেলায় স্কুলপাঠ্য ইতিহাসে আমরা যে ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’-এর কথা পড়তাম, তাই তো আমার দেশের ঐতিহ্য। দেশের স্বাধীনতা দিবস সেই ঐতিহ্যকে স্মরণ করার দিন। আর কী আশ্চর্য, ১৫ আগস্ট যে বিপ্লবীর জন্মদিন, সেই ঋষি অরবিন্দের উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথ নমস্কার জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘স্বদেশ-আত্মার বাণী মূর্তি তুমি’। বিদ্বেষ নয়, স্বদেশপ্রেমই তো আমার দেশের আদর্শ।

…………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা

…………………….

Bankim Chandra Chattopadhyay bharatmata Cyril Radcliffe Dwijendralal Roy Independence Day Janaganamana Nabarun Bhattacharya national anthem nationalism partition partition history Partition of Bengal patriotism Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Vande Mataram

Share this article on