


অনীকের সঙ্গে যতবার কথা হয়েছে আমার, সিনেমা নিয়ে নয়, জীবনবোধ নিয়ে, মনে হয়েছে আমার, সে বেছে নিয়েছে কার্নিশ দিয়ে চলার পথ। উপনিষদ যাকে বলেছে, ক্ষুরের ধার দিয়ে চলা। সমারসেট মম বলেছেন, “rezor’s edge” চলন। অনীক করল সবথেকে কঠিন কাজটি। তার উপলব্ধ সত্যে পৌঁছতে সে পা রাখল সরু ধারালো রক্তাক্ত পথে। কেমন করে অল্প কিছুদিনের আলাপ আমাকে দিল এই নিগূঢ় বার্তা?
‘অনীক’ মানে যুদ্ধ। কে জানত, অনীককে বহু বছর, প্রায় আজীবন বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য যুদ্ধ করতে হবে! কে জানত, অনীকের যত বাড়বে বয়স, আরও কঠিন হবে তার শ্বাসযুদ্ধ! তার ফুসফুস থাকবে অহরহ বাতাসউপসী ও আর্ত! এবং সে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট পাবে। সেই কষ্ট বাড়তেই থাকবে। তার পাশে বসে আমার তার শেষ ছবি ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। অন্ধকারে পাশের আসনে অনীক শ্বাস নিচ্ছে। কী কষ্টের সেই বাতাস আহরণ। কী নিদারুণ তার সিওপিডি-সংকট, কীভাবে নিতে হয় তাকে নেবুলাইজারের সাহায্য, অনুভব করেছিলাম আমি। এবং দেখেছিলাম সেই নিরন্তর কষ্টের মধ্যে তার অভিজাত সৌজন্যবোধ, তার হাসিমুখ।

আরও একটা যুদ্ধ দেখেছি অনীকের। বুকে এমন অ্যাকিউট উদান-সংকট নিয়ে চেন স্মোকিং থেকে বেরিয়ে আসার অভিযান, দ্বৈরথ এবং পরাজয়। আমি বারবার ভেবেছি, অনীক সুইসাইড করছে। তবে, ইদানীং কমিয়ে ছিল স্মোকিং। হয়তো ছেড়েও দিয়েছিল, ফুসফুসের তলানিতে পৌঁছে। কিন্তু অনীকের সঙ্গে যতবার কথা হয়েছে আমার, সিনেমা নিয়ে নয়, জীবনবোধ নিয়ে, মনে হয়েছে আমার, সে বেছে নিয়েছে কার্নিশ দিয়ে চলার পথ। উপনিষদ যাকে বলেছে, ক্ষুরের ধার দিয়ে চলা। সমারসেট মম বলেছেন, “rezor’s edge” চলন। অনীক করল সবথেকে কঠিন কাজটি। তার উপলব্ধ সত্যে পৌঁছতে সে পা রাখল সরু ধারালো রক্তাক্ত পথে। কেমন করে অল্প কিছুদিনের আলাপ আমাকে দিল এই নিগূঢ় বার্তা? সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। এখন তার প্রথম ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এ আসি।

ধরা যাক, আমরা আছি ২০১২-তে। মুক্তি পেয়েছে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’। ছবির গল্প, চিত্রনাট্য, পরিচালনা– সব অনীক দত্তর। এবং ছবিটা দেখে এই মাত্র বেরিয়েছি। প্রথম দিনের প্রথম শো। এবং বেরিয়েই পরের দিনের শোয়ের টিকিট কেটেছি। ২০১২-এ আমার বয়স ৭১। এমন ছবি আগে দেখিনি! যে-ছবির নাম, ভূতের, অর্থাৎ অতীতের, ভূতের অর্থাৎ, মৃতের ভবিষ্যৎ! সাহিত্যে অ্যাবসার্ডের মারপ্যাঁচের হরেক স্বাদ গ্রহণ করেছি। নাটকে স্যামুয়েল বেকেট, হ্যারল্ড পিন্টার, এদের হ য ব র ল তো মাথা ঘুরিয়ে দেয়। কিন্তু অনীক দত্ত তো অতীতের ভবিষ্যতের এই বিপুল বিরোধাভাসে যে তির্যক তিক্ত আদিরসের ধাক্কা মেরেছেন, আমি অন্তত কেঁপে গিয়েছি!

ভূতের ভবিষ্যৎ দেখে যে অবাক শিহরন জেগেছিল মনে, সেটা এই: এই ছবি এক বিরল মৌলিক প্রতিভার প্যারাশুটে ওপর থেকে নেমে এসেছে, কোনও এক অচেনা অলীক অনীকের সৌজন্যে। বাঙালি এই প্রথম পেল বাংলা সিনেমায় এমন শহুরে সেরিব্রাল তীর্যকতা। এমন নিহিত আদিরসের নিরত সুধা। এমন তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক শ্লেষ। এমন বক্র সামাজিক ব্যঙ্গ। এমন তীব্র অর্থনৈতিক বিদ্রুপ। এমন কটু সাংস্কৃতিক কটাক্ষ। আমি নিশ্চিত হলাম, বহু বছরের অপেক্ষার পরে, বাংলা সিনেমার বাণিজ্যিক আদিখ্যেতাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে, এক অতীব বুদ্ধিমান, বিদগ্ধ, বিতর্কিত পরিচালক এলেন। এবং আলাপ করতেই হবে তাঁর সঙ্গে। আর কিছু না-হোক, শুধুমাত্র আড্ডা মারার সুখের জন্য। ৭০ পেরনোর পর থেকে আমি ক্রমে উপলব্ধি করতে থাকি, লেখাপড়ার চালবাজি আছে বটে চারপাশে, কিন্তু আমার মন হাত-পা ছড়িয়ে ঘরোয়া আরাম পায় না সেই বৌদ্ধিক চালিয়াতির আবহে।
দেখা হল আমাদের, প্রথম দেখা, অনেকটা রূপকথার মতো, লন্ডনে। রাস্তায় নয়। পার্কে নয়। নয় কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। দেখা হল লন্ডনের পাবে! কী ভাগ্য আমার, আমাদের একসঙ্গে সুরাতেষ্টা জেগেছিল! এবং যেহেতু লন্ডনের পাবে আমি সেদিন পরে ছিলাম লাল ধুতি, আমার পানে মুহূর্তে দৃষ্টিপাত ঘটেছিল অনীকের। কিছুক্ষণ আলাপের পরে হঠাৎ আমাদের মধ্যে ঘনিয়ে এলেন টমাস হার্ডি।

আলোচনা হচ্ছিল বাঙালির ‘রবীন্দ্র-ন্যাকামি’ নিয়ে। সেখান থেকে রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি। কেননা, সে-বছর হার্ডি-ই নাকি নোবেল পেতেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ হার্ডিকে ডিঙিয়ে বাজিমাত করলেন। যাই হোক, হার্ডি আসতেই আমি ‘জুড দ্য অবসকিওর’-এর প্রসঙ্গ নিয়ে এলাম। যত দিন যাচ্ছে, হার্ডির এই উপন্যাসটিকে আমি আরও আরও ভালোবেসে ফেলছি। আমি বোধহয় শুধু এইটুকু বলেছিলাম। বাকিটুকু অনীকের সংলাপ এবং উন্মোচন ও ব্যাখ্যা। আর আমার কেবল মুগ্ধ শোনা! এবং ধীরে ধীরে বুঝতে পারা এই সত্য– অনীক মৌলিক চিন্তক। তার বোধের গভীরতা এবং তার ইন্টেলেকশনের ঝলক আমাকে আচ্ছন্ন করেছিল।

সেদিন অন্ধকারাচ্ছন্ন জুডের কথা বলতে বলতে লন্ডনের পাবে ওর চোখ ছলছল করেছিল। আমার মধ্যের জুডকে অনীক স্পর্শ করেছিল। সে নিজের মধ্যে থেকে নিঃসঙ্গ নিরুপায় নিয়তি নির্যাতিত জুডকেও বের করে এনেছিল। ‘যে জুড জীবনটাকে নিজের মতো করে চালাতে পারেনি কিছুতেই। আবার সমাজের আর পাঁচজন যেভাবে থাকে, সেভাবেও থাকতে পারেনি। ভালোবাসা চেয়েছে। ভালো বেসেছে। কিন্তু পেয়েছে কি ভালোবাসা? একাধিকবার বিয়ে করল। কিন্তু একাকিত্ব গেল না। এবং জুডের মৃত্যুটা ভাবো রঞ্জনদা, গ্রিক লাতিন জানা একজন ইন্টেলেকচুয়াল, সেলফমেড স্কলার, অথচ এস্ট্যাবলিশমেন্ট তাকে গ্রহণ করেনি। কারণ সে বিদ্রোহী। কনফরমিস্ট নয়। থিঙ্ক অফ হিজ মিজারেবল ডেথ।’ অনীকের এই কথাগুলো স্মৃতিতে লেগে আছে। অনীকের শেষ বাক্যটিও কানে থাকবে, হারাবে না: ‘অ্যাবসোলিউট অনেস্টি পৃথিবী সহ্য করতে শেখেনি। ‘দিস ইজ হোয়াট জুড দ্য অবসকিওর গেটস অ্যাক্সস্ টু মি।’

একটা কথা, অনীক যে খুব গুছিয়ে কথা বলত, তা নয়। খেই হারাত। ছেঁড়া ছেঁড়া বাক্যও হত। যেভাবে ভাবত, সেভাবেই বলত। সাজানো কথা নয়। কিন্তু নেপথ্যে আছে একটা ব্রিলিয়ান্ট মন। সেটা ভীষণ টানত আমাকে। ও যখন সরকার-বিরোধী কথা বলেছে , টালিগঞ্জে কেউ তেমনভাবে বলার সাহস দেখায়নি। চমকে দিয়েছে ওর দুঃসাহস! আর আমি ভেবেছি, এই মানুষটি যখন গভীর রাত্রে একলা তার লেখার টেবিলে বসে ভাবত, লিখত, আর শ্বাস টানতে তার বুক ফাটত, তখন কি তার ওই টেবিলের কাছ থেকেই পেত সে ভাবনা, ভাষা, প্রকাশের বন্ধুতা।

দু’-তিনবার অনীক চেয়েছিল দীর্ঘ আড্ডা দিতে। কিন্তু শরীর এতটাই খারাপ হয়ে পড়ছিল অনীকের, বিষণ্ণতাও ছিল নিশ্চয়, সম্ভব হয়নি আর মুখোমুখি বসা। চলে যাওয়ার আগে অনীক লিখে গিয়েছে তার বিদায়পত্র। তার লেখার টেবিল কী জানে, কী তারে দহিত?
অনীক কি জানিয়ে গিয়েছে তার দহন, তার তিতিক্ষা?
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved