একদিন খুব অভিমান হল যোগেনদার উপর– একবার সরাসরি ওঁকে বললাম যে, আপনি তো আপনার যত স্টুডেন্ট আছে তাদের সবাইকে রেকমেন্ডেশন লিখে লিখে চিঠি দিয়ে এখানে ওখানে পাঠান। অথচ আপনার কোনওদিন মনে হয়নি যে– মিঠু এইরকমভাবে আছে, কষ্ট করছে, মিঠুকেও একটা কোথাও আলাপ করিয়ে দিই বা কিছু? যোগেনদা সব শুনে আমার দিকে একটা অদ্ভুত চোখে তাকালেন এবং বললেন, ‘আমি তোমাকে ভরসা করি। আমি জানি তোমার জন্য আমাকে উপযাচক হয়ে এই ধরনের সাহায্য করার দরকার নেই, তুমি নিজের পথ নিজেই করে নেবে।’
গতকাল স্টুডিওতেই বসে ছিলাম সকাল থেকে। ভাবনাচিন্তা সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। যোগেনদার কথা মনে পড়ছে খুব। উনি তো আমার মাস্টারমশাই। সম্পূর্ণ অন্য ধরনের একজন শিক্ষক। আর দশজনের চেয়ে একেবারেই আলাদা। কলাভবনের ফার্স্ট ইয়ারে ফার্স্ট সেমিস্টারেই ওঁর ক্লাস করার সুযোগ ঘটে। আমি পড়াশোনায় ভালো ছিলাম এবং আমাদের ক্লাসে একমাত্র আমিই হায়ার সেকেন্ডারিতে খুব হাই ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে পাশ করেছিলাম। কলাভবনে চান্স পেয়ে গিয়েছিলাম আগেই। ওখানে ভর্তি হওয়ার দু’-সপ্তাহ পর হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট বেরিয়েছিল, ফলে বাড়ি থেকে জোর করে আমাকে ফেরত আসার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বভারতীতে প্রথম সপ্তাহের কয়েক দিন পর থেকেই মনে হয়েছিল যে, এটাই আমার জায়গা। এখান থেকে আমি কোনও দিন ফিরব না। এদিকে আত্মীয়স্বজন-সহ আমার একাধিক শিক্ষকস্থানীয়রাও সে সময়ে বলছিলেন যে, ‘দেখো, তুমি তো পড়াশোনায় ভালো, এসব রিস্ক নিচ্ছ কেন?’ তখন বোধহয় একটা ধারণা ছিল, যারা পড়াশোনায় অত ভালো নয় তারাই আর্ট পড়তে আসে।
ফার্স্ট ইয়ারে আমি খুবই দিশাহারা। একদিকে কলাভবনের পরিবেশ এত ভালো লাগছে, অন্যদিকে সবাই বলছে যে, পড়াশোনায় ভালো করতে হলে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে লাইন চেঞ্জ করাই উচিত। সেই সময় যোগেনদাই কিন্তু আমায় বিরাট ভরসা দিলেন! সরাসরি আমায় বললেন, ‘তোমার কী মনে হচ্ছে?’ আমি বললাম, ‘আমার এখানে ভীষণ ভালো লাগছে।’ যোগেনদা বললেন, ‘সে তো সাত-দশ দিনে কিছু বুঝবে না, কিন্তু যদি সত্যিই ভালো লেগে থাকে, থেকে যাও।’ এই কথাটা উনি যে-ই না বললেন, সে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল আমার মধ্যে। মনে আছে, তখন আমি হাঁটতে হাঁটতে স্কাল্পচার ডিপার্টমেন্টের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেই থেকে আমিও রয়ে গেলাম। আর তারপরে তো দীর্ঘ পাঁচ-সাত বছরের যাত্রা।

যোগেনদা ওঁর সব ছাত্রছাত্রীর মনোবল বাড়িয়ে তুলতেন এবং সেটার মধ্যে কোনও পক্ষপাত ছিল না। আলাদা আলাদা ডিপার্টমেন্টে শিক্ষকরা হাতে ধরে আঁকা শিখিয়েছেন। তাঁদের প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে; কিন্তু যোগেনদা ঠিক ‘হাতে ধরে আঁকা শেখানো’র মানুষ ছিলেন না। উনি ছিলেন ‘মনে আঁকা শেখানো’র মানুষ। দিল্লিতে যখন থাকা শুরু করি, সে সময় আমি আর শমিত, আমরা দু’জনেই স্কুলে চাকরি নিই। সেই সময়ও কিন্তু যোগেনদা, বউদি, পুপুন ওঁরা আমাদের বাড়িতে একাধিকবার এসেছেন। তখন কিছুই নেই, একটাই ঘর আমাদের ছাদের ওপর। মাটিতে বসে আমরা পাতপেড়ে খাওয়াদাওয়া করেছি, বিভিন্ন সময় ওঁরা যখন খুশি এসেছেন! দিল্লিতে যেহেতু প্রচণ্ড ঠান্ডা, তাই উনি আমাকে বললেন, ‘তোমার শীত করে না, মাটিতে শোও যে বড়?’ তা আমি বললাম, ‘না, দুটো সোয়েটার পরে শুয়ে পড়ি। ভোর রাতে উঠতে হয় তো, চাকরি করতে যেতে আমায় দুটো বাস চেঞ্জ করতে হয়।’ এসব শুনে যোগেনদা তখন হঠাৎই বললেন, ‘তোমাকে কি আমি একটা রুম হিটার কিনে দেব?’ মনে হল, একথা যেন একজন শিক্ষক নয়, বরং একজন বাবা-ই বলতে পারেন! যোগেনদার জায়গা আমার মনে তেমনই। যাকে ‘সো কল্ড’ স্ট্রাগলিং পিরিয়ড বলে, তখনও আমাদের প্রতি যোগেনদার স্নেহে কোনও কার্পণ্য দেখিনি। আমি দিল্লিতে এসে গিয়েছি ১৯৯৮ বা ১৯৯৭-এর শেষে। ১৯৯৯ বা ২০০০-এর গোড়ার দিকে দিল্লিতে তখনও নাকানিচোবানি খাচ্ছি , কোথাও একটা থিতু ঠাঁই পাচ্ছি না– একটু অন্য রকমের কাজ করতাম বলে গ্যালারি বা আর্ট ডিলাররাও আমাকে তেমন গুরুত্ব দিত না, সবাই বলত– পিওর মিডিয়ামের কাজ করো। যাই হোক, বহু বছর লেগেছে বিভিন্ন ধরনের কাজকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে।

যদিও ততদিনে আমি বাইরের স্কলারশিপ পেয়ে পড়তে এসেছি এবং বিভিন্ন গ্যালারিতে আমার এগজিবিশন শুরু হয়েছে। তবুও এই স্ট্রাগলিং পর্যায়েই একদিন খুব অভিমান হল যোগেনদার প্রতি– একবার সরাসরি ওঁকে বললাম যে, আপনি তো আপনার যত স্টুডেন্ট আছে তাদের সবাইকে রেকমেন্ডেশন লিখে লিখে চিঠি দিয়ে এখানে-ওখানে পাঠান। অথচ আপনার কোনও দিন মনে হয়নি যে– মিঠু এইরকমভাবে আছে, কষ্ট করছে, মিঠুকেও একটা কোথাও আলাপ করিয়ে দিই বা কিছু? যোগেনদা সব শুনে আমার দিকে একটা অদ্ভুত চোখে তাকালেন এবং বললেন, ‘আমি তোমাকে ভরসা করি। আমি জানি তোমার জন্য আমাকে উপযাচক হয়ে এই ধরনের সাহায্য করার দরকার নেই, তুমি নিজের পথ নিজেই করে নেবে।’ সেই মুহূর্ত থেকে আজ পর্যন্ত এবং যতদিন বেঁচে থাকব এটা মনে রাখব যে, এর চেয়ে বেশি সম্মান কোনও শিক্ষক তার ছাত্রকে দিতে পারেন না। আমার জীবনে এটাই বোধহয় সবথেকে বড় পাওয়া যোগেনদার মতো একজন শিক্ষকের থেকে।

গুরু শিষ্যের সম্পর্কটা শুধু শ্রদ্ধা নয় বরং একটা মিউচুয়াল রেস্পেক্টের জায়গাও বটে। যোগেনদার প্রতি আমার শ্রদ্ধার জায়গা এটাই যে, উনি আমার কনফিডেন্সটা হাজার গুণ বেশি বাড়িয়ে দিয়েছেন। নিজের কাজ সম্বন্ধে ওঁর থেকে যেমন মতামত চেয়েছি সবসময়, তেমনই উনিও অবস্থানের প্রতি বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে নিজের আঁকা ছবি দেখিয়ে ফিডব্যাক নিতেন। আমার বাবার থেকেও উনি বয়সে বড়। দেখা হলেই যোগেনদা বলতেন, ‘আমার শুভেচ্ছা এবং আশীর্বাদ ছাত্রছাত্রীদের ওপর থাকবেই’, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ওঁর খানিক বাড়তি ভরসা ছিল এই কারণে যে, আমি স্বেচ্ছায়, আনন্দ নিয়ে ছবি আঁকতে এসেছি। আমি সত্যিই চেয়েছি এটা। এমন অদ্ভুত অদ্ভুত কথা যোগেনদা অজস্র বলেছেন। আজ সব ঠিক মনেও পড়ছে না। অজস্র চিঠিও লিখেছেন। আমি যখন প্রথম বিদেশে পড়তে গেলাম ২০০০ সালে, ইমেইল বা স্মার্টফোন তখন সহজলভ্য ছিল না। যেদিন আমার ফ্লাইট, সেদিন হঠাৎই গ্যালারি এসপার্স থেকে একজন এসে খামে করে একটা চিঠি দিয়ে গেল। দেখলাম সেটা ফ্যাক্স-মারফত যোগেনদা পাঠিয়েছেন, একটা লম্বা চিঠি– আমি যাতে ওখানে ভালো করে কাজ করি, মন খারাপ না করি ইত্যাদি, কারণ আমার ছিল ওয়ান ওয়ে টিকিট। মানে একবার যাওয়ার এক বছরের মধ্যে আমি আর আসতে পারব না। তাই যাওয়ার আগে, উনি ওঁর ছাত্রীকে আশীর্বাদস্বরূপ প্লেনের ছবি এঁকে কী সুন্দর করে সাজিয়ে পাঠিয়েছিলেন চিঠিটা! নানা কাগজের ভিড়ে মূল চিঠিটা যে কোথায় হারিয়ে গিয়েছে! কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় এটাই যে, যোগেনদা চিঠিটা ফ্যাক্সে পাঠিয়েছিলেন, যাতে ওঁর ছাত্রী দিনের দিন সেটা পায়! এই টুকরো টুকরো পাওয়াগুলো যে কতখানি… তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এইজন্যই উনি আর পাঁচজনের থেকে আলাদা।

ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সংযোগ রাখার ব্যাপারেও যোগেনদার কোনও তুলনা হয় না। এত বছরে যতবার উনি দিল্লিতে এসেছেন, প্রতিবার ওঁর যতজন স্টুডেন্ট শহরে আছে, তাঁদেরকে একদিন সদলবলে ডেকে রেস্তরাঁয় খাওয়ানো যোগেনদার নিয়ম। হয়তো খোঁজ নিয়ে জানলেন, দিল্লিতে এই মুহূর্তে ওঁর অন্তত জনাদশেক ছাত্রছাত্রী রয়েছে। একজনকে উনি জানালেন, অমনি বাকিরাও জেনে গেল– যোগেনদা এসছেন দিল্লিতে। অমুক দিন অমুক সময় সবাইকে বলো ওবেরয়তে চলে আসতে! মানুষটা সবার সঙ্গে দেখা করলেন, গল্প করলেন, খোঁজ নিলেন প্রত্যেকের। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ক’জন এতটা সময় ব্যয় করেন অন্যের জন্য? অত বড় মানুষ, অত বড় আর্টিস্ট, কিন্তু দু’দিনের জন্য এলেও একটা সন্ধেয় উনি ঠিক সময় বের করে সবাইকে ডেকে পাঠাতেন।
যোগেনদা ওঁর ছোট্ট ঘরটায় বসে সেদিন কতগুলো ছোট ছোট কার্ডে ছবি আঁকছিলেন। আমায় দেখেই বললেন, ‘এর থেকে একটা ছবি বেছে নাও না!’ আমি বললাম, ‘না না, আমি নেব না।’ কারণ সকলেই তো যোগেনদার কাছে যায় ছবির জন্য, আমার তো তেমন উদ্দেশ্য নয়। আমার কথা শুনে যোগেনদা অবাক হয়ে বললেন, ‘কেন? তোমার পছন্দ হল না আমার আঁকা?’ আমি স্পষ্টতই বিব্রত। বললাম, ‘কী বলছেন যোগেনদা!’ তখন শিশুসুলভ সারল্যে বললেন, ‘তাহলে তুমি আর তোমার বোন একটা করে এই ছোট কার্ড আমার কাছ থেকে নাও, আর কীই বা উপহার দেব তোমাদের?’ আমার বিয়েতে যোগেনদা ওঁর আঁকা ছবি আর একটা খুব সুন্দর রঙের শাড়ি উপহার দিয়ে বলেছিলেন, ‘এটা তোমায় খুব মানাবে।’ সেই শাড়িটা আমি আজও পরিনি। সযত্নে রেখে দিয়েছি।

কলাভবনের দিনগুলোয় আমি ছবি আঁকায় তেমন ভালো ছিলাম না, বাকি ছেলেমেয়েরা আমার থেকে অনেক ভালোবেসে আঁকত। এমনিতে আমি পড়াশুনোয় ভালো ছিলাম। ক্লাসে হায়েস্ট মার্কস পাওয়ায় আমার একটা বাঁধা জায়গা ছিল। কিন্তু কলাভবনে যাওয়ার পর দেখলাম, ফার্স্ট গ্রপের ১০ জনের মধ্যে আমি সবথেকে কম নম্বর পেয়েছি! ২২ জন মতো ছিল আমাদের ক্লাসে। আমিই সবথেকে কম পেয়েছি তাদের মধ্যে! মানে ফার্স্ট মার্কস যদি কেউ ৮৫ পেয়ে থাকে, আমি ৬৫ পেয়েছিলাম! সেটা ফার্স্ট ক্লাস মার্কস হলেও লোয়েস্ট ইন দ্য ক্লাস! তো আমি যোগেনদাকে গিয়ে বললাম যে, আমি কী করে ৬৫ পেলাম? উনি শান্তভাবে বললেন, ‘কীসের নম্বর?’ আমি গ্রুপের কথা তোলায় উনি বললেন, নম্বরটা দিয়ে তো কোনও ছবি আঁকার বিচার হয় না। আমি বললাম, ‘দেখুন যোগেনদা, আমি তো সবসময় ভালো মার্কস পাই, এরকম খারাপ নম্বর কখনও হয়নি!’ যোগেনদা আবারও সেই প্রচ্ছন্নভাবে বললেন,‘জানো তো, আজকে তুমি ফার্স্ট ইয়ার, ফিফথ ইয়ারের সময় দেখো কী হয়!’ আশ্চর্য ব্যাপার, সত্যি সত্যি ফিফথ ইয়ারে উঠে আমি ফার্স্ট ক্লাস থার্ড হয়েছিলাম! আমার প্রাথমিক উৎকণ্ঠার কথাটা ওঁর তখনও মনে ছিল, এবং উনি একদিন বললেন– ‘দেখলে তো!’

তারপরেও উনি একাধিকবার আমায় বলেছিলেন, এবং আমিও সেটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে, ছবি আঁকায় ‘মার্কিং’ বলে কিছু হয় না। কেউ যদি সিনসিয়ার হয়, তার যদি ছবির প্রতি ভালোবাসা থাকে, তাহলে সেটাই তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে! যদিও আমাদের ক্লাসে খুব ব্রাইট সম্ভাবনাময় ছাত্রছাত্রীরা ছিল। ইলিনা বণিক, মহুয়া– এঁরা প্রত্যেকেই আমাদের ব্যাচমেট। যোগেনদা বারবার আমাদের বলতেন যে, পাশ করার পরে অনেকেই ছবি আঁকা কন্টিনিউই করে না। ছবি আঁকা নিয়ে কীভাবে কেউ সাসটেইন করছে, কেউ সেটাকে সঠিকভাবে কন্টিনিউ করছে কি না, তার কনভিকশন কতদূর– এই সবটা মিলিয়ে কিন্তু ছবি আঁকার ওপর ডিপেন্ড করে। পরে সেটা সম্যকভাবে বুঝেছি। এখনও পর্যন্ত আমার জীবনে রবিবার বা ছুটির দিন বলে কিছু নেই। ৭ দিন দেশে থাকলে আমি সপ্তাহের সাত দিনই স্টুডিওতে সকালবেলা সাড়ে আটটায় আসি রাত্রি ৯টায় পরে বেরই। এই মনের জোর আমি অনেকটাই পেয়েছি যোগেনদাকে দেখে।
আমার মা কবিতা লিখতেন আর যোগেনদার বোন নমিতাদিও কবিতা লিখতেন। ফলে বাড়িতে যোগেনদা এলেই আবহটা বদলে যেত। সেই সময় আমিও খুব কবিতা লিখতাম। যোগেনদার খুব উৎসাহ ছিল সে ব্যাপারে। পরবর্তী সময়ে আমার বইও ‘নান্দীমুখ’ থেকে বেরিয়েছে। যদিও তারপর নিয়মিত বাংলায় লেখার বিষয়টা অনেকটাই কমে গিয়েছিল। একবার, দোলের আগের দিন যোগেনদার বাড়িতে সন্ধ্যায় একটা অনুষ্ঠান হত, সেখানে অসংখ্য কবি, গায়ক-গায়িকা, সাহিত্যিক সব আসতেন। একবার শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু এঁরা সবাই উপস্থিত, ওঁদের মাঝখানে যোগেনদা হঠাৎই আমার নাম করে বললেন যে, আমাদের একজন স্টুডেন্ট আছে, খুব ভালো লেখে, ও একটা কবিতা পড়বে! ওই অনুষ্ঠানে আমার মা-বাবাও নিমন্ত্রিত ছিলেন। একঘর শ্রোতা এবং দিকপাল কবিদের মাঝে বসে কবিতা পড়তে ভীষণ কুণ্ঠাবোধ হয়েছিল, মনে আছে। সবটাই হয়েছিল যোগেনদার ইচ্ছায়। সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে চলার এক অদ্ভুত মানসিকতা যোগেনদার মধ্যে ছিল, যা সচরাচর দেখা যায় না।

২০০২ সালে আমেরিকার একটি শিল্প আবাসিক কর্মসূচিতে (রেসিডেন্সি) আমি নির্বাচিত হয়েছিলাম। সমগ্র ভারত (সম্ভবত এশিয়া) থেকে একমাত্র আমিই সেই বিরল সুযোগ পেয়েছিলাম। মেয়াদ ছিল এক মাসের। তখন যোগেনদা দিল্লিতে এসেছিলেন। আমাদের তখন একটা মোটরসাইকেল ছিল; শমিতকে সঙ্গে নিয়ে আমি ওঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, সেবার বৌদিও এসেছিলেন। আনন্দ আর উত্তেজনায় লাফাতে লাফাতে আমি যোগেনদাকে বললাম, ‘জানেন তো যোগেন দা, আমি আমেরিকা যাচ্ছি!’ শুনে উনি দারুণ খুশি হয়ে বললেন, ‘দারুণ খবর তো!’ আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একদম বাস্তব প্রশ্নটি করলেন– ‘ভিসা-টিসা করিয়েছ তো?’ আমি একটু চুপসে গেলাম। তখন আমি একটা স্কুলে চাকরি করতাম, মাইনে পেতাম মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, ব্যবস্থা করছি, করতেই হবে।’ উনি বললেন, ‘আমেরিকার ভিসার জন্য তো প্রায় ১০ হাজার টাকা লাগে! পারবে তো ব্যবস্থা করে নিতে?’ আমি তখন জানাই যে, আমি জীবনে কারও কাছে, এমনকী বাবা-মায়ের কাছ থেকেও এক পয়সা নিইনি, নিজেই সব করব। এরপর উনি জানতে চাইলেন আমি এখন কী কাজ করছি। আমি বললাম। তখন আমার কাজ কেউ দেখত না, পাত্তাও দিত না; সবাই আমাকে পাগল ভাবত। আমি সিল্কের কাপড়ের ওপর চুল দিয়ে হেয়ার এমব্রয়ডারি বা সেলাইয়ের কাজ করতাম। শুনে উনি উৎসাহ নিয়ে বললেন, ‘বাহ্! কেমন কাজ? ওগুলো এর মধ্যে একদিন নিয়ে আসতে পারো?’ আমি বললাম, ‘ছোট ছোট রুমালের মতো কাজ। কালকেই এনে দেখাব।’ উনি বললেন, ‘ঠিক আছে, নিয়ে এসো।’

পরের দিন সকালে আমরা সেই মোটরসাইকেলে করেই কনট প্লেসের কাছে ওঁর হোটেলে গেলাম। রুমালের সাইজের, প্রায় ১০ ইঞ্চি বা ১ বাই ১ ফুটের মতো কয়েকটি কাজ ওঁকে দেখালাম। দেখে যোগেনদা মুগ্ধ হয়ে বললেন, ‘বাহ্, এগুলো তো দারুণ সুন্দর! এ ধরনের কাজ তো আগে দেখিনি।’ এর পর উনি বললেন, ‘ঠিক আছে, এই কাজগুলো আমার কাছে রেখে যাও।’ আমি তো ঘাবড়ে গেলাম! কাজগুলো ব্যাগে তুলে রাখার সময় উনি আমার হাতে একটি খাম গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘ভিসাটা করিয়ে নিও।’ এই স্নেহ, এই দরদ যে ঠিক কী তা বোধহয় লিখে বোঝানো যায় না। উনি আমাকে স্রেফ করুণাবশত ১০ বা ২০ হাজার টাকা খামে ভরে দান করেননি; একজন শিল্পী আরেকজন শিল্পীকে যেভাবে সম্মান দিতে পারেন, উনি ঠিক সেই সম্মানই আমায় দিয়েছেন। আমার কাছ থেকে শিল্পকর্ম কিনে তার যথাযথ মূল্য দিয়েছেন– আর সেই মুহূর্তে ওই টাকাটার মূল্য লক্ষ-কোটি টাকার চেয়েও অনেক বেশি ছিল।

উনি জানতেন, আমি কারও কাছে হাত পাতব না, মুখ ফুটে চাইবও না। পরের মাসের মাইনে বা অন্য কোনও টুকটাক কাজ করে কীভাবে ভিসার টাকা জোগাড় করব, আমি সেই কথাই ভাবছিলাম। এমনটাই অসাধারণ মনের মানুষ ছিলেন যোগেনদা। আর এটা যে শুধু আমার একার গল্প তা নয়। অনেক ছাত্রছাত্রী ও তরুণ শিল্পীই বলবেন, কীভাবে তিনি নিঃশব্দে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিভিন্ন প্রদর্শনীতে গিয়ে তিনি তরুণদের যেভাবে সাহায্য করতেন, সেটাই তিনি আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন। আমি আজও মনে মনে সেই শিক্ষাকে বয়ে বেড়াই এবং সাধ্যমতো তরুণ শিল্পীদের পাশে দাঁড়াই। আজ আমার কাছেও যখন কোনও তরুণ শিল্পীর ছোট কাজ আসে, আমি তা সংগ্রহ করি; কারণ আমি জানি, শুরুর সেই কঠিন সময়ে ওইটুকু সাহায্য তিন মাসের বকেয়া বাড়িভাড়া মেটানোর সমতুল্য স্বস্তি নিয়ে আসতে পারে।

যোগেনদার প্রতি বছর নিয়ম করে আমার জন্মদিনে ফোন করেন। গতবছর উনি প্রথম আমার জন্মদিনে ফোন করেননি আর সেই দিনটা হচ্ছে আজ, অর্থাৎ ২৬ অক্টোবর। তো আমি খুব অভিমান করেছিলাম, ওঁকে মেসেজও করলাম যে, এই প্রথম ভুলে গেলেন? তারপরে শুনলাম যে, তখনই ওঁর ক্যান্সার ধরা পড়ে এবং ততদিনে উনি একদম আইসোলেটেড। চিকিৎসাধীন। ভাবতে খারাপ লাগে, যে মানুষটা এত সপ্রতিভ, প্রাণশক্তিতে ভরপুর তিনিই ব্লাড ক্যান্সার হওয়ার পর থেকে অন্যরকম হয়ে গিয়েছিলেন। উনি তো ভীষণ ফর্সা ছিলেন, রোগের প্রকোপে একটা নীলচে ফ্যাকাশে ভাব চলে এসেছিল ওঁর মধ্যে। এ প্রসঙ্গে একটা মজার কথা মনে পড়ছে– আমার গায়ের রং কালো তো, তাই প্রথমদিন আমায় দেখে যোগেনদা রসিকতা করে বলতেন, ‘তুমি কি এখানে পিয়ার্সন পল্লী থেকে পড়তে এসেছ?’ পরবর্তী সময়ে যোগেনদা বহুবার স্টুডিওতে এসেছেন, কাজ দেখেছেন। শেষের দিকে তো আমাদের সঙ্গে ভীষণ ইয়ার্কি মারতেন। ফোন করেই প্রথম যে কথাটা জিজ্ঞেস করতেন, ‘মিঠু, দেশে না বিদেশে?’ এই কথাটা বোধহয় শেষ ক’বছর ধরে উনি প্রতিবারই বলতেন আর আমি ভীষণ রেগে যেতাম। বলতাম, ‘যেখানেই থাকি, আপনি তো আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন! আমি কথা বলতে পারব।’ কিন্তু আজ সকালে যোগেনদার চলে যাওয়ার খবরটা পাওয়ার পর থেকেই বারবার ওঁর গলাটা মনে পড়ছে। এখন যদি আমি যোগেনদাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করি, ‘আপনি কোথায়?’ কী বলবেন উনি?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved