

১৯৮০-৮১ সালে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির মোট অভ্যন্তরীণ পুঞ্জিভূত ঋণের পরিমাণ ছিল জিডিপির ৪১ শতাংশ, যা বাড়তে বাড়তে ১৯৮৮-৮৯-এ দাঁড়াল ৫৫ শতাংশে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ রফতানির শতাংশ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। ওই একই সময়কালে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১৩৬ শতাংশ থেকে ২৬৫ শতাংশ!
১৯৮৩-র ১৪ ডিসেম্বর যখন মারুতি ৮০০-র প্রথম গাড়িটির চাবি তার গর্বিত মালিকের হাতে তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, একটি নতুন যুগের সূচনা হল যেন। উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্তের আয়ত্তের মধ্যে এল স্বপ্নপূরণের চাবিকাঠি। ৪৫ হাজার টাকা দামের গাড়ি কেনার জন্য প্রথম দু’মাসেই এগিয়ে এল ১ লক্ষ ৩৫ হাজার সম্ভাব্য মালিক। তারপর ৩০ বছরের ওপর মারুতি ৮০০ মধ্যবিত্তের স্বপ্নপূরণের চিহ্ন হয়ে রইল। এক অর্থে মারুতিকে গোটা দশকের অর্থনীতির রূপক হিসেবেও দেখা যায়– ঋণং কৃত্বা। ওপরে ওঠার আকাঙ্ক্ষা আর প্রয়োজনীয় সামর্থ্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়েন থেকে সঙ্কটে পিছলে পড়া।

আশির দশক শুরু হয়েছিল শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর প্রত্যাবর্তন দিয়ে। সাতাত্তরে যখন তিনি ক্ষমতা হারালেন জনতা দলের কাছে, স্বাধীনতার পর সেই প্রথম আপামর ভারতবাসী দেখল একটি অ-কংগ্রেসি সরকারকে। কিন্তু দু’বছর ঘুরতে-না-ঘুরতেই সেই পাঁচমিশেলি জনতা পার্টির সরকার প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্বে আর নেতাদের ইগোর লড়াইয়ে নড়বড়ে হয়ে গেল। ১৯৭৮-এর জুনে প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই চরণ সিং-কে ক্যাবিনেট থেকে বের করে দিলেন। ১৯৭৯-এর জানুয়ারিতে আবার তাঁকে উপপ্রধানমন্ত্রী করে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলেন। সে বছরের জুলাইয়ে আবার খোদ মোরারজিকে হঠিয়ে চরণ সিং নিজেই প্রধানমন্ত্রী হলেন। শেষমেশ যা হওয়ার তাই হল, জনতা দলটিই ছত্রখান হয়ে পড়ল। ইতিমধ্যে ইন্দিরা উপনির্বাচনে জিতে সাংসদ হয়েছেন। চরণ সিং ইন্দিরার সমর্থন চাইলেন। ইন্দিরা দিলেন সমর্থন, আবার ২৮ দিন পর তা তুলেও নিলেন। তারপর আর সরকারের টিকে থাকার উপায় রইল না। জনতা সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ সমাপ্তির ঢের আগে তার সমাপ্তি ঘটল। তিতিবিরক্ত মানুষ ভোট দিয়ে আবার ইন্দিরাকে তথা ইন্দিরা কংগ্রেসকে বিপুল গরিষ্ঠতা-সহ (দুই-তৃতীয়াংশ আসন)ফিরিয়ে আনল। নির্বাচনী প্রচারে কংগ্রেস তুলে ধরেছিল আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের দুর্দশা (পিঁয়াজের দাম হয়ে ওঠে নির্বাচনের ইস্যু) এবং জনতা দলের সার্বিক প্রশাসনিক ব্যর্থতা। তখন থেকে ১৯৮৪-র ৩১ অক্টোবর– যেদিন তিনি নিজেরই দেহরক্ষীর গুলিতে প্রাণ হারালেন– প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী।

কেমন ছিল দেশের অর্থনীতি সেই সময়ে, আশির শুরুতে? এক কথায় বলতে গেলে, ভাল নয়। ১৯৭৯-৮০ সালটি একটি বিশেষ কারণে উল্লেখযোগ্য। সেই বছরটিতেই শেষবারের মতো ভারতের জিডিপি বা জাতীয় আয় কমেছিল। সামান্য নয় সে পতন। সাম্প্রতিককালে এসে শুধু একবারই জাতীয় আয় কমতে দেখা গেল, অতিমারির পর। জনতা পার্টির আমলের প্রথম দু’বছর জাতীয় আয় মোটামুটি ভালই বেড়েছিল, কিন্তু শেষ বছরটিতে এক ধাক্কায় প্রায় তিন শতাংশ কমে গেল। কারণ? একদিকে যেমন অনাবৃষ্টির ফলে কৃষি উৎপাদন কমেছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প উৎপাদনও কমেছিল, অল্প হলেও। কৃষি উৎপাদনের এত খারাপ অবস্থা স্বাধীনতার পর আর কোনও বছরে হয়নি। আবার ইরাক-ইরান যুদ্ধের কারণে পেট্রল-ডিজেলের জোগানে ঘাটতি; একইসঙ্গে আসাম আন্দোলনের ফলে তেলের অভ্যন্তরীণ জোগানেও সমস্যা। ফলে তেলের দাম অত্যন্ত চড়া। তার সঙ্গে কৃষি উৎপাদনের অভূতপূর্ব হ্রাস এবং ফলত কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির হার পৌঁছে গেল কুড়ি শতাংশের কাছাকাছি। এদিকে আমদানির খরচ মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যাচ্ছে জলের মতো। তবে তারই মধ্যে খানিক স্বস্তি দিয়েছিল সরকারি গুদামে রক্ষিত খাদ্যশস্যের ভাণ্ডার। ফলে খাদ্যাভাব হয়নি। আর বৈদেশিক মুদ্রা-ভাণ্ডারে কিছুটা সঙ্কোচন হলেও জমার পরিমাণ যথেষ্ট থাকাতে সে বাবদেও সঙ্কটে পড়তে হয়নি, যেরকম সঙ্কট হয়েছিল আশির একেবারে শেষে গিয়ে। সে কথায় পরে আসব।

জনতা সরকারের দু’বছরকে খরচের দিক থেকে মোটামুটি রক্ষণশীলই বলা যায়। ১৯৭৯-৮০-তে যা ঘটল– অনাবৃষ্টির ফলে ফসল নষ্ট কিংবা বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, অর্থনীতির ভাষায় তাদের ‘শক’ বলা হয়। যুগপৎ শক, যা সরকারের কোনও কৃতকর্মের ফল নয়। কিন্তু সেই শকের ফলে চাপ পড়ল সরকারের আর্থিক স্বাস্থ্যের উপর। বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি অনেকটা বেড়ে গেল, অভ্যন্তরীণ সরকারি বাজেট ঘাটতিও বেড়ে গেল। এমতাবস্থায় সাধারণত সরকারি ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণের দিকে নীতির অভিমুখ দেখা যায়। কিন্তু কংগ্রেস (ই) সরকার সেদিকে গেল না। সরকারের নীতি হল নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রসারণের মধ্যে দিয়ে বৃদ্ধি। বিনিয়োগের বৃদ্ধি, বিনিয়োগের কাঠামো পরিকাঠামোমুখী করা, রফতানি বাড়ানো। এসব করতে গেলে রসদ লাগে, আর তার জন্যে আইএমএফ থেকে ঋণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত হল। ১৯৮০-তেই নেওয়া হল প্রায় ৮০ কোটি ডলার। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কাঠামোগত সমন্বয় নিয়ে এক বড়সড় প্রকল্প ভাবা হল, যার জন্য এই ঋণ। আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়া তখনই যুক্তিযুক্ত যখন তা দেশের অর্থনীতির সরাসরি প্রসারণের লক্ষ্যে নেওয়া হয়, যা বৃদ্ধিমুখী। বিরোধীরা অবশ্য ঋণের প্রবল বিরোধিতা করতে লাগলেন। শর্ত চাপানো এতো বড় অঙ্কের ঋণ দেশকে শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলছে, উন্নয়নের নীতি প্রণয়নে নিজস্ব অগ্রাধিকার স্থাপনের পরিসর কমে যাচ্ছে– এইসব যুক্তি আসতে থাকল বিরোধীদের থেকে। মজার ব্যাপার হল, আইএমএফ-এর ভেতর থেকেই ঋণের বিরোধিতা করল আমেরিকা সম্পূর্ণ উলটো কারণ দেখিয়ে। তাদের মতে, এত বড় মাপের ঋণে যতটা কঠিন এবং স্পষ্ট শর্ত চাপানো উচিত, শর্তগুলি তেমন নয়। শেষমেশ অবশ্য আমেরিকার ভিন্নমত অগ্রাহ্য করেই ঋণ অনুমোদন করে আইএমএফ। ঋণ তো হল, কিন্তু এই সময়কালটায় বিনিয়োগ কেমন হল? দেখা যাচ্ছে, সরকারি বিনিয়োগ যদিও দ্রুততার সঙ্গে বেড়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগ বস্তুত কমেছে।

ধারের বোঝার একটু আন্দাজ দেওয়া যাক। ১৯৮০-৮১ সালে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির মোট অভ্যন্তরীণ পুঞ্জিভূত ঋণের পরিমাণ ছিল জিডিপির ৪১ শতাংশ, যা বাড়তে বাড়তে ১৯৮৮-৮৯-এ দাঁড়াল ৫৫ শতাংশে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ রফতানির শতাংশ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। ওই একই সময়কালে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১৩৬ শতাংশ থেকে ২৬৫ শতাংশ! এই ঋণের অনেকটাই চলে যাচ্ছিল বহির্বাণিজ্যে ঘাটতি মেটাতে। কিন্তু মোটের উপর সুসংবাদটি হল আশির দশকে জিডিপি বেড়েছিল বার্ষিক ৫.৬ শতাংশ হারে, যা স্বাধীনতা পরবর্তী তিন দশকের বৃদ্ধির থেকে বেশ খানিকটা বেশি। আশির দশক প্রমাণ দিয়েছে গোটা অর্থনীতির দিক থেকে দেখতে গেলে ধার করা ব্যাপারটি আপাদমস্তক খারাপ নয়। মনে রাখতে হবে, তা যেন সুস্থিতি নষ্ট না করে। কিন্তু আমরা জানি দশকের শেষে এসে সেই সুস্থিতি বেশ টলে যাচ্ছিল। এবার সেই গল্পে ফিরি।

ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফেরার পরের চার বছর নানান রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতে থাকল– বিশেষত পাঞ্জাব ও আসামের আন্দোলন। পাঞ্জাবের আন্দোলন দমনে স্বর্ণমন্দিরে সেনাবাহিনীর প্রবেশ এই সময়েই হয়েছিল, যার পরিণতিতে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড। রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই নির্বাচন ঘোষণা করলেন। যে ইন্দিরা কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা ছিল ক্রমশই নিম্নমুখী, ইন্দিরা হত্যার পর হাওয়া ঘুরে গেল। কংগ্রেস (ই) প্রায় চার-পঞ্চমাংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে এল। ১৯৮৫ শুরু হল নতুন সরকারের শপথ দিয়ে। রাজীব হলেন প্রধানমন্ত্রী আর ভি পি সিং অর্থমন্ত্রী। সে বছরেই রাজ্যেগুলির বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস (ই) ভাল ফল করলেও কয়েকটি রাজ্যে, যেমন অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক এবং পশ্চিমবঙ্গে, তারা সুবিধা করতে পারল না।

রাজীব গান্ধীর ছিল বেশ আধুনিক ম্যানেজার-সুলভ স্টাইল। দ্রুত অনেকগুলি সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। পাঞ্জাব ও আসামে চুক্তি হল। ১৯৮৫-র বাজেটে শিল্প ও বহির্বাণিজ্য ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি নীতির ঘোষণা হল যা উদারীকরণের দিকে প্রথম পদক্ষেপ বলা যায়। প্রত্যক্ষ করের হারও কমানো হল। তবে সমালোচকদের মতে এগুলি যতটা বিশেষ ব্যবসায়ী শ্রেণির দিকে তাকিয়ে করা হল, ততটা উদার অর্থনীতির কথা ভেবে নয়। একদিকে কর হ্রাস অন্যদিকে ব্যয় বৃদ্ধি (বিশেষত চতুর্থ বেতন কমিশন অনুসারে মাইনে দিতে গিয়ে) যেভাবে বেড়ে চলল তাতে বাজেট ঘাটতি বাড়তেই থাকল। তেলের দাম খানিক নিম্নমুখী এবং রফতানি বৃদ্ধির হার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও, আমদানি বৃদ্ধির কারণে বহির্বাণিজ্যে ঘাটতিও বাড়তে থাকল।

রাজীব গান্ধীর উপর রাজনৈতিক আস্থাও কমতে শুরু করেছিল, ১৯৮৭-৮৮-তে এসে যা তলানিতে ঠেকে গেল যখন ‘বোফর্স কেলেঙ্কারি’ নিয়ে রাজনীতি উত্তাল হল। ভি পি সিং পদত্যাগ করলেন। ১৯৮৮-র অগস্টে ভি পি সিং-কে আহ্বায়ক করে ন্যাশনাল ফ্রন্ট তৈরি হল সাতটি দল নিয়ে। উত্তর পূর্বাঞ্চল ও কাশ্মীরে অস্থিরতা বাড়তে থাকল। মন্দির-মসজিদ নিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা মাথা চাড়া দিতে থাকল ভারতীয় জনতা পার্টির উস্কানিতে। ওদিকে ভারতীয় সেনা শ্রীলঙ্কার সমস্যায় জড়িয়ে পড়ল। রাজীব গান্ধি সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনে যাবেন ঠিক করলেন। ন্যাশনাল ফ্রন্টের সঙ্গে বিজেপি ও কম্যুনিস্ট পার্টিগুলিও যোগ দিল। কংগ্রেস (ই) হারল। ১৯৮৯-এর ২ ডিসেম্বর বিজেপি ও কমিউনিস্টদের সমর্থন নিয়ে সরকার গড়লেন ভি পি সিং। কিন্তু বিজেপির উদ্দেশ্য অন্য। আদবানি হাজার হাজার হিন্দু সমর্থক নিয়ে বাবরি মসজিদ অভিযান করলেন, প্রেপ্তার হলেন। সরকারের উপর থেকে সমর্থন তুলে নিল বিজেপি। সরকার পড়ে গেল।

এইসব গোলমালে উদারীকরণের অগ্রগতি শ্লথ হতে বাধ্য। কিন্তু যেটুকু হয়েছিল তার ফলেই কি না জানি না, শিল্প উৎপাদনে বৃদ্ধি মন্দ হল না। ১৯৮৮ থেকে ৯০ এই দু’বছরে চাষবাসও ভাল হল। এতদসত্ত্বেও দুই ঘাটতির চাপ কমানো যাচ্ছিল না। শেষমেশ ১৯৯০-এর আগস্টে ইরাকের কুয়েত আক্রমণের ফলে তেলের জোগানের অনিশ্চয়তা ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ আর সামলানো গেল না। ফলে সঙ্কট, আইএমএফ-এর সঙ্গে ১৮০ কোটি ডলারের ঋণ-চুক্তি, ইত্যাদি। কিন্তু সেটি নব্বইয়ের গল্প। আশির দশক শেষ।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved