Robbar

আপামর জনতার ভিড়ে তিনি শুধু ‘আশা’

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 12, 2026 8:44 pm
  • Updated:April 12, 2026 8:44 pm  

একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি: সলিলদার ঘরে। সলিল চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করার সময়– আমি দেখেছি তাঁকে। কীভাবে তিনি গানটি তুলে নেন– না কোনও অহংকার, না কোনও দূরত্ব– শুধু এক অদ্ভুত মনোযোগ, যেন এই গানটাই তাঁর প্রথম গান। ‘তৃষাগ্নি’ ছবির কাজ চলছিল। প্রযোজকেরা পারিশ্রমিক নিয়ে একটু দুশ্চিন্তায়। তিনি হেসে বলেছিলেন– ‘সলিলদার গান গাইতে পারছি– এটাই তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। টাকার কথা ভাববেন না।’ এই বাক্য– আজও কানে বাজে।

দেবজ্যোতি মিশ্র

একটা সময় আসে, যখন মানুষ আর শুধু মানুষ থাকে না। সে ধীরে ধীরে মাটি ছেড়ে উঠে যায়– এই মানবজমিন পেরিয়ে, আরেক জীবনের দিকে। আশা ভোঁসলেও আজ যেন সেই পথেই হাঁটলেন– নিঃশব্দে, নিজের মতো করে। আজ থেকে শুরু হল তাঁর অমরত্বের দিন। মহারাষ্ট্রের ঘরে ঘরে তিনি ‘আশা’– একটি আপন নাম, যেখানে আদর আছে, অভিমান আছে, মায়ের মতো এক ছায়া আছে। সভ্য, সংস্কৃতির আভিজাত্যে, তিনি হয়তো আশাজি– একটি সম্মান, একটি দূরত্ব, একটি নীরব প্রণাম। আর এই আপামর জনতার ভিড়ে তিনি শুধু আশা– একটা গান, একটা ভরসা, একটা সন্ধের আলো।

আশা ভোঁসলে

তার আগে, তারও অনেক আগে, একটি নাম দাঁড়িয়ে থাকে– লতা মঙ্গেশকর। লতা– সরস্বতীর মতো এক নির্মল সুর; যার ছায়া এতটাই দীর্ঘ, যে তার নীচে দাঁড়িয়ে থাকা মানেই একটা চিরস্থায়ী তুলনা। কেউ বলে– লতা মানে আকাশ, আর আশা মানে মাটি। কেউ বলে– লতা মানে পূজা, আর আশা মানে জীবন। কেউ আবার ফিসফিস করে: ‘লতা-আশা– দুই বোন, কিন্তু দুই দিক।’ কিন্তু সত্যি কি এত সহজ? একটি পরিবার মানেই একটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতা, যেখানে ভালোবাসা আর ঈর্ষা একই থালায় পরিবেশিত হয়।

সিলভিয়া প্লাথ, তিনি হয়তো দেখতেন এই দুই কণ্ঠের ভেতরে দুই আলাদা আগুন– একটি নীরব, একটি জ্বলন্ত। আশা ভোঁসলে সেই জ্বলন্ত আগুন। তিনি কখনও আড়ালে থাকেননি– তিনি আলোয় এসেছেন, নিজের মতো করে, নিজের শরীর, নিজের কণ্ঠ, নিজের ক্ষুধা নিয়ে। ছয়ের দশক পেরিয়ে– সত্তরের দহন, আশির ঝলক, নব্বইয়ের নতুনত্ব– তিনি বারবার নিজেকে ভেঙেছেন, আবার গড়েছেন। একজন নারী, যিনি কখনও একই থাকেননি। কেউ তাঁকে লতা-আশা বলেছে, কেউ আশা-লতা– কিন্তু তাঁর কাছে এই নামের বিন্যাসের কোনও মানে ছিল না। কারণ তিনি জানতেন– তাঁর পথ আলাদা। তিনি ছায়া ছিলেন না– ছিলেন ছায়ার ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া আলো। আজ যখন তিনি এই পৃথিবীর সীমানা ছুঁয়ে, আরেক জীবনের দিকে এগচ্ছেন, তখন মনে হয়, এই দীর্ঘ জীবনের প্রতিটি দশক ছিল এক একটি সুর, এক একটি অনুচ্ছেদ, একটি অসমাপ্ত উপন্যাসের পৃষ্ঠা। তিনি কি চলে যাচ্ছেন? না– তিনি কেবল রূপ বদলাচ্ছেন। একটি কণ্ঠ থেকে, একটি প্রতিধ্বনি– একটি শরীর থেকে, একটি বাতাস– একটি নাম থেকে, একটি অনুভূতি। আজ থেকে, যখন কোনও রাতজাগা মানুষ হঠাৎ করে গুনগুন করে উঠবে– ‘আজা আজা…’ অথবা ‘চোখে চোখে কথা বলো…’, তখন সে জানবে না– কোথা থেকে এল এই সুর। কিন্তু আমরা জানব– আশা ভোঁসলে, এখন আর শুধুই একজন শিল্পী নন– তিনি এই পৃথিবীর বাইরে গিয়েও এই পৃথিবীর ভেতরে রয়ে যাওয়া একটি অমর সংগীত।

লতা ও আশা

রাত নামলে, শহর যেন একটু অন্যরকম হয়ে যায়– কোলকাতার জানলার কাচে কাচে জমে ওঠে ধোঁয়াটে আলো, দূরের ট্রামের ঘণ্টা আর ভেজা রাস্তায় হেলে থাকা বাতিস্তম্ভের নীচে কেউ একজন গুনগুন করে, সেই গুনগুনে, অদ্ভুতভাবে, থেকে যায় এক নারীর কণ্ঠ। আশা ভোঁসলে– না, তিনি শুধু একজন শিল্পী নন। তিনি যেন রাতের নিজস্ব শ্বাসপ্রশ্বাস। রাতের অদৃশ্য সুরের ভিতরে রাত যত গভীর হয়, তাঁর গলার সুর যেন ততটাই খোলে– যেন কোনও দরজা, যেটা দিনের বেলা বন্ধ থাকে, শুধু নিশুতি রাত জানে তার চাবি কোথায়। ‘পিয়া তু…’, ‘দম মারো দম…’– এই গানগুলো কি কেবল গান? না, তারা যেন শরীরের ভেতরে ঢুকে থাকা কোনও গোপন স্পন্দন, যেখানে প্রেম আর বিপদ– একই সুরে বাঁধা। এখানেই তাঁর অন্ধকার জ্যাজ-রাতের জন্ম– ক্যাবারে, ধোঁয়া, আধখানা আলো, আর এক অদ্ভুত নারীত্ব– যা কখনও ভাঙে না, শুধু বদলে যায়। সেসব গানে নিষিদ্ধ গান শোনার মতো উত্তেজনা। যে গানে হলদে বই গোপনে পড়ার মতোই আকর্ষণ ছিল, অথচ গান তো গোপনে শোনা যেত না, মাইকে বাজছে বাবার জন্য মায়ের জন্য, বাজছে দিদিদের জন্য, বাজছে আমার প্রেমিকার জন্য, আমার বয়সি বন্ধুবান্ধবদের জন্যও। সে গানের ভেতরে নারীর আরেক জীবন। গুলজার যখন শব্দ লিখতেন– সেগুলো কেবল কথা ছিল না, ছিল স্মৃতির ভাঙা আয়না। আর সেই আয়নায় আশা ভোঁসলে নিজের কণ্ঠ রেখে তৈরি করতেন অন্য এক নারী– যে প্রেমে পড়ে, আবার উঠে দাঁড়ায়, যে ভেঙে যায়, কিন্তু ভাঙার শব্দ কাউকে শোনায় না। ‘মেরা কুছ সামান…’– এ গান কি আদৌ শেষ হয়? না, এ গান যেন থেমে থাকা এক শ্বাস, যা এখনও ঝুলে আছে সময়ের মধ্যে।

প্রেমিকদের গোপন ভাষা, প্রেমিকরা যখন কথা খুঁজে পায় না– তারা আশা-রাহুল দেব বর্মনের গান ধার নেয়। একটি প্রস্তাব, একটি প্রত্যাখ্যান, একটি নিঃশব্দ ক্ষমা– সবকিছুই তিনি আগেই গেয়ে রেখেছেন। তাঁর কণ্ঠে প্রেম কখনও সরল নয়, তা সবসময় একটু তির্যক, একটু গোপন, যেন চোখের কোণে জমে থাকা একফোঁটা জল, যা পড়েও না, শুকিয়েও যায় না।  আগুন পেরিয়ে যাওয়া এক নারী, তিনি শুধু গান করেননি– তিনি টিকে ছিলেন। সময়ের ভিতর দিয়ে, অপমানের ভিতর দিয়ে, ভালোবাসার অভাবের ভিতর দিয়ে– একটি অদ্ভুত, ধারালো ইচ্ছাশক্তি নিয়ে। নতুন সুরকারদের জন্য তাঁর ক্ষুধা– এ যেন এক অন্তহীন তৃষ্ণা। তিনি থামেননি, কখনও না– বরং প্রতিটি নতুন কণ্ঠকে, প্রতিটি নতুন সুরকে নিজের ভেতরে ঢুকতে দিয়েছেন, তারপর তাকে নিজের মতো করে জন্ম দিয়েছেন। এ এক ধরনের ‘কিলার ইনস্টিংক্ট’– কিন্তু তা ধ্বংসের নয়, তা সৃষ্টির। শেষ নয়, কখনও নয়।

কিশোর কুমার ও আশা ভোঁসলে, একটি গানের মহড়ায়

আশা ভোঁসলে একটি নাম নয়– একটি সময়, একটি আবহাওয়া। যখন রাত গভীর হয়, আর শহর নিঃশব্দে নিজের কথা শোনে– তখনও কোথাও না কোথাও একটি পুরোনো ক্যাসেট বাজে, একটি গলা ভেসে আসে– ‘কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে’, সুধীন দাসগুপ্তের সেই চিরকালীন গান। একটু ধোঁয়া, একটু প্রেম, একটু বিপদ নিয়ে। এবং আমরা বুঝতে পারি– কিছু শিল্পী জন্মান না, তাঁরা তৈরি হন আগুনে পুড়ে। আর তারপর– হেসে যান। রাতের ভেতর যখন আরেকটা রাত খুলে যায়– যখন জানলার বাইরে শহরটা নিজের ছায়ার সঙ্গে কথা বলে– তখন মনে হয়, কেউ একজন এখনও গাইছে, ‘রাত এখনও অনেক বাকি’, না, গাইছে নয়– বেঁচে আছে গানের ভিতরে।

আশা ভোঁসলে– এই নামটি উচ্চারণ করলেই যেন শব্দের আগে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস আসে। যেন কেউ গভীর জল থেকে উঠে এসে বলে– ‘শোনো, আমি এখনও আছি’… ‘জীবন গান গাহে কে যে…’, এক গানের ভিতরে বহু জীবন ‘আজা আজা…’, ‘জীবন কে দিন…’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো…’, ‘আও হুযুর তুমকো…’, ‘চোখে চোখে কথা বলো…’। এই গানগুলো– এগুলো কি আলাদা আলাদা সময়ের, আলাদা আলাদা ছবির? না, এগুলো যেন এক নারীর বহু জন্ম, বহু শরীর, বহু ছায়া। একবার তিনি আহ্বান, একবার তিনি প্রলোভন, একবার তিনি নিঃশব্দ প্রেম, একবার তিনি আগুনে দাঁড়িয়ে থাকা একলা বৃক্ষ। ‘একজন নারী কখনও একা থাকে না, তার ভিতরে থাকে অসংখ্য কণ্ঠ, যারা একে অপরকে ডাকে।’, ‘তবু, সেইসব কণ্ঠের নীচে থাকে এক শূন্যতা, যেখানে কেবল প্রতিধ্বনি।’ আশা ভোঁসলে সেই প্রতিধ্বনিকে সুরে পরিণত করেছিলেন।

রেকর্ডিং-এ, রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গে

বিতর্ক পেরিয়ে অমরত্বের দিকে তিনি কি কেবল গান গেয়েছেন? না– তিনি বেঁচে ছিলেন আগুনের ভেতর দিয়ে। বিতর্ক, সম্পর্কের ভাঙন, অসংখ্য মৃত্যু, অসংখ্য অসমাপ্ত কথা– সবকিছুকে তিনি যেন নদীর মতো পার হয়েছেন। একেকটা কষ্ট যেন একেকটা ঘাট, যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি একটু থেমেছেন, তারপর আবার গেয়েছেন। আজ, এই মুহূর্তে, মনে হয়– তিনি মৃত্যুকে পেরিয়ে গেছেন অনেক আগেই। আজ নয়, অনেক আগেই তাঁর অমর জীবন শুরু হয়েছিল– যখন প্রথম কোনও রাতজাগা মানুষ একলা বসে তাঁর গান শুনে বলেছিল– ‘এ গানটা আমার।’

হেলেন– এক দেহ পেল আত্মা, স্ক্রিনে তাঁর নাচ, তাঁর চোখের খেলা– কিন্তু সেই শরীরে প্রাণ কে ঢেলেছিল? সেই কণ্ঠ– ‘পিয়া তু অব তো আজা’ যা শরীরকে ছুঁয়ে যায়, যা মদির আলোয় গলে যায়, যা ধোঁয়ার ভিতরেও স্পষ্ট থাকে। আশা ভোঁসলে, হেলেনকে শুধু জনপ্রিয় করেননি, তাঁকে কিংবদন্তি করে তুলেছেন। ক্যাবারে সিঙ্গাররা, বারের রাত-জাগা গায়িকারা– তাদের প্রতিটি হিটের পেছনে ছিল এই এক কণ্ঠের ছায়া। রাতের শেষে, যখন শেষ গ্লাসটা টেবিলে পড়ে থাকে– কেউ একজন গুনগুন করে– ‘দম মারো দম, মিট যায় গম’ আর সেই গুনগুনে তিনি ফিরে আসেন।

অভিনেত্রী হেলেন

সুরের শরীরে যন্ত্রের ভাষা একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে– আমি অনুভব করি, তিনি কেবল গান গাইতেন না, তিনি যন্ত্রগুলোকেও বাঁচতে দিতেন। বেস প্লেয়ার– যে হয়তো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে, শুধু তাল ধরে রাখছে– তাকেও তিনি জায়গা দিয়েছেন। ব্রাস, হর্ন– যারা কখনও কখনও কেবল পটভূমি– তাদেরও তিনি গল্পের অংশ করেছেন। সাহির লুধিয়ানভি, মজরুহ সুলতানপুরী, আনন্দবকসী, জয়দেব, গুলজার– তাদের শব্দে তিনি শরীর দিয়েছেন, শ্বাস দিয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন। শব্দ তখন আর কাগজে থাকে না– তা হয়ে ওঠে মাংস, তা হয়ে ওঠে স্পন্দন।

একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি: সলিলদার ঘরে। সলিল চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করার সময়– আমি দেখেছি তাঁকে। কীভাবে তিনি গানটি তুলে নেন– না কোনও অহংকার, না কোনও দূরত্ব– শুধু এক অদ্ভুত মনোযোগ, যেন এই গানটাই তাঁর প্রথম গান। ‘তৃষাগ্নি’ ছবির কাজ চলছিল। প্রযোজকেরা পারিশ্রমিক নিয়ে একটু দুশ্চিন্তায়। তিনি হেসে বলেছিলেন– ‘সলিলদার গান গাইতে পারছি– এটাই তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। টাকার কথা ভাববেন না।’ এই বাক্য– আজও কানে বাজে।

আর একটি স্মৃতি: আমার নিজের। একবার, আমি একটি গান করেছিলাম। অর্ঘ্যকমল মিত্রর জন্য। তিনি সেই টাইটেল ট্র্যাকটি গাইলেন। আমি ভেবেছিলাম– হাজার হাজার হিট গাওয়া একজন শিল্পী– আমার এই ছোট্ট গানটিকে হয়তো তেমন গুরুত্ব দেবেন না। কিন্তু তিনি আমাকে এমনভাবে গ্রহণ করলেন– যেন আমি তাঁর প্রথম সুরকার। না কোনও তুলনা, না কোনও দূরত্ব– শুধু সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। একজন নতুন সুরকারের প্রতি এমন বিশ্বাস– এ যেন অলৌকিক।

তিনি ইতিহাস তৈরি করেননি– তিনি নিজেই ইতিহাস হয়ে উঠেছেন। তিনি কোনও লিগ্যাসি বানাননি– তিনি সময়ের ভেতর দিয়ে ভেসে গেছেন, যেন এক নদী– যার কোনও শেষ নেই। প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ, অভিমান, হারিয়ে যাওয়া– সবকিছুকে সঙ্গে নিয়ে তিনি উড়ে গেছেন এক অনন্তের দিকে। শেষ নয়– এক অবিরাম প্রবাহ। আজ যখন রাত নামে, আর শহরটা একটু নরম হয়ে আসে, তখন মনে হয়– তিনি কোথাও আছেন। কোনও স্টুডিওর অন্ধকারে, কোনও পুরোনো ক্যাসেটের শব্দে, কোনও প্রেমিকের নিঃশ্বাসে– তিনি গাইছেন। না, গাইছেন না– তিনি বেঁচে আছেন।

আশা ভোঁসলে একটি কণ্ঠ নয়– একটি অনন্ত নদী। যেখানে আমরা সবাই একদিন না একদিন ডুবে যাই, আর উঠে এসে বলি: ‘এই গানটা– আমারও ছিল’।