remembering indian freedom fighter bina das | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অগ্নিবীণা

ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ছাত্রদের প্রিয় উপন্যাসের ওপরে একটি প্রবন্ধ লিখতে বলা হয়েছিল। বীণা দাস লিখেছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের কথা। ইতিমধ্যে ব্রিটিশ সরকার উপন্যাসটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল, কারণ এর মূল কাহিনি ছিল ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে স্বদেশি আন্দোলন নিয়ে। এই প্রবন্ধ লেখার জন্য বীণা কোনও নম্বর পাননি– একথা যখন তাঁকে তাঁর শিক্ষিকা জানালেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘এ নম্বর আমার দেশপ্রেমের খাতাতে তোলা থাকবে’।

শেষ আপডেট: আগস্ট ১৪, ২০২৬, ১৯:০৯   
Facebook WhatsApp Messenger

১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট হলে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বার্ষিক সমাবর্তন অনুষ্ঠান। গভর্নর তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য স্ট্যানলি জ্যাকসন অন্যান্য মান্য অতিথিদের সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত রয়েছেন। সে বছরই ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হয়েছেন বীণা দাস। সেদিন আচার্যর হাত থেকে স্নাতক ডিগ্রির প্রশংসাপত্র গ্রহণ করবেন কৃতি ছাত্রছাত্রীরা। সমাবর্তন অনুষ্ঠান ঘণ্টাখানেক নির্বিঘ্নে চলার পরে আচার্য সবে সমাবর্তন অভিভাষণ পাঠ শুরু করেছেন। সমাবর্তন গাউন পরিহিত বীণা দাস দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে এলেন মঞ্চের দিকে। বিস্মিত চোখে সকলে দেখলেন, ২০-২১ বর্ষীয়া এক তরুণী রিভলবার তাক করে দাঁড়িয়ে। ইতিহাসের এক সূত্র থেকে জানা যায় যে, বীণা তাঁর খোঁপার মধ্যে গুলি-ভর্তি আগ্নেয়াস্ত্রটি লুকিয়ে রেখে সেদিন সমাবর্তন কক্ষে ঢুকেছিলেন সকলের অজ্ঞাতসারে। জ্যাকসনকে লক্ষ্য করে গুলি চালান বীণা। অল্পের জন্য তাঁর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। সাহসিনী বীণা পরপর ৫টি গুলি চালিয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি গুলি জ্যাকসনের কান ঘেঁষে চলে যায়। কোনওরকমে জ্যাকসন ও তাঁর সঙ্গীরা মঞ্চ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করেন। উপাচার্য সোহরাওয়ার্দি সেই সময়ে বীণাকে ধরে ফেলেন এবং পুলিশের হাতে তুলে দেন।

এই অতি-সাহসী বীণা দাসের জন্ম হয়েছিল ১৯১১ সালের ২৪ আগস্ট, নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে। তিনি ছিলেন বাড়ির সকলের বড় আদরের। আদর করে সকলে তাঁকে ‘মনু’ বলে ডাকতেন। বীণার পিতা বেণীমাধব দাস ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ বাঙালি শিক্ষক এবং দেশপ্রেমিক। শরৎচন্দ্র বসু, সুভাষচন্দ্র-সহ আরও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির শিক্ষাগুরু ছিলেন তিনি। তাঁর প্রিয় ছাত্র হিসেবে সুভাষ তাঁকে একাধিক চিঠি লিখেছিলেন। এরকমই একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আপনার সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক তা এ জীবনে যাবে না। নইলে নিদ্রায় আপনাকে স্বপ্নে দেখি কেন? জাগ্রত অবস্থায় আপনার মূর্তি ধ্যান করি কেন?’ এই কথাগুলি প্রমাণ করে বেণীমাধব সুভাষচন্দ্রের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, বিশেষ করে বিপ্লবী আদর্শ ও দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে।। বীণার জীবনেও তাঁর পিতার প্রভাব ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বীণার মা সরলা দাস ছিলেন গান্ধীবাদী নীতিতে বিশ্বাসী, সমাজসেবায় নিয়োজিত প্রাণ। দিদি কল্যাণী দাস ছিলেন আর এক বিপ্লবী। দুই বোনই পিতামাতার স্বদেশী ভাবনা চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। স্কুলজীবন থেকে বীণা এবং কল্যাণী ব্রিটিশ-বিরোধী মিছিলে পা মিলিয়েছেন। মা সরলা দেবীর উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল অনাথ মহিলাদের জন্য ‘পুণ্যাশ্রম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ছোটবেলায় একদিন বীণা মায়ের সঙ্গে মহিলাদের এক সভায় গিয়েছিলেন। সেখানে গান্ধীজি মহিলাদের কাছে আন্দোলনে অর্থদান করার প্রস্তাব রাখেন। ছোট্ট বীণা তখন তাঁর হাতের সোনার বালা খুলে দিয়েছিলেন।

zoom
বীণা দাস

স্কুলে থাকতেই বীণা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ছাত্রদের প্রিয় উপন্যাসের ওপরে একটি প্রবন্ধ লিখতে বলা হয়েছিল। বীণা দাস লিখেছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের কথা। ইতিমধ্যে ব্রিটিশ সরকার উপন্যাসটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল, কারণ এর মূল কাহিনি ছিল ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে স্বদেশি আন্দোলন নিয়ে। এই প্রবন্ধ লেখার জন্য বীণা কোনও নম্বর পাননি– একথা যখন তাঁকে তাঁর শিক্ষিকা জানালেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘এ নম্বর আমার দেশপ্রেমের খাতাতে তোলা থাকবে’। পরবর্তীকালে বীণা বেথুন ও সেন্ট জন ডায়োসেশন কলেজে পড়াশুনো করেছিলেন।

বীণা দাসদের বাড়িতে স্বাদেশিকতার প্রথম ঢেউ এসে যখন লাগে, তখন তিনি নিতান্তই কিশোরী। ১৯২১ সালের আন্দোলনে বীণার মেজদাদা পড়াশুনো ছেড়ে সত্যাগ্রহ করে জেলে গিয়েছিলেন। সেই প্রথম ওঁদের বাড়িতে চরকা ঢুকল। চটের চেয়েও মোটা লাল খদ্দরের শাড়ি দিয়ে বীণার পদোন্নতি ঘটল ফ্রক থেকে শাড়িতে। তখন থেকেই বীণার পরিচিতি হল সুভাষচন্দ্র বসুর নামের সঙ্গে। একবার সুভাষ তাঁর শিক্ষকের আমন্ত্রণে বাড়িতে খেতে এসেছেন। ‘সুভাষ, এই আমার ছোট মেয়েটি যে আবার তোমার মস্ত বড়ো ভক্ত।’ বীণার মা সেদিন এই বলে সুভাষের সঙ্গে বীণার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এসব কথা বীণা লিখে গেছেন তাঁর আত্মজীবনী ‘শৃঙ্খল ঝঙ্কার’ গ্রন্থে। এইরকম স্বাদেশিকতার আবহে বড় হয়ে ওঠা তাঁর।

স্কুলের পাঠ শেষ করে বেথুন কলেজে ঢুকলেন বীণা। ১৯২৮ সালে সে সময়কার মহিলা ইউনিয়ন বা ছাত্রী সংঘে যোগ দিয়েছিলেন বীণা। কলকাতার প্রায় সবক’টি স্কুল, কলেজের মেয়েদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল এই ইউনিয়ন। ১০০ সদস্যের এই ইউনিয়ন হয়ে উঠেছিল বিপ্লবীদের আখড়াও। এখানে লাঠি ও তলোয়ার চালানো থেকে শুরু করে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হত সদস্যদের। মেয়েদের মধ্যে অনেকে আবার এইসব বিপ্লবী কাজকর্মের সুবিধের জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে সরলা দাসের পুণ্যাশ্রমে আশ্রয় নিতেন। শোনা যায়, এই আশ্রমের গুদাম ঘরে জমা থাকত বিপ্লবীদের অস্ত্রশস্ত্র।

কিছুদিন বাদে সুভাষচন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল ভলান্টিয়ার কর্পসে নাম লেখালেন বীণা। আর এক সহযোগী বিপ্লবী সুহাসিনী গাঙ্গুলির উৎসাহে বেঙ্গল রেভ্যুলিউশনারি পার্টির সদস্যপদও গ্রহণ করেছিলেন তিনি। সেই সময়ে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে যুক্ত করে দেশ থেকে ব্রিটিশদের নির্মূল করার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।

বেথুন কলেজে পড়াকালীন বীণা দাস ব্রিটিশ-বিরোধী সশ্রস্ত বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে বীণা প্রথম ছাত্রবিক্ষোভ সংগঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বীণা দাসের নেতৃত্বে সাইমন কমিশন বয়কট ও বেথুন কলেজে পিকেটিং করতে সামিল হন কলেজের আবাসিক ছাত্রীরা। এই অপরাধে অধ্যক্ষ পিকেটিং-এ অংশগ্রহণকারী কলেজের ছাত্রীদের ক্ষমা চাইতে নির্দেশ দিলে, ছাত্রীরা কেউ ক্ষমা চাইতে রাজি হন না। অধ্যক্ষ তখন নিজেই ইস্তফা দিয়ে চলে যান। ছাত্রীদের এই জয়ে অ্যালবার্ট হলে বিরাট এক সভার আয়োজন করা হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন আরেক সহমতাবলম্বী জননেত্রী সরলাদেবী চৌধুরানী।

zoom
সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

বীণার বৈপ্লবিক চিন্তার ফলস্বরূপ তিনি তৎকালীন বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। একথা বীণা জানিয়েছিলেন তাঁর দিদি কল্যাণীর সহপাঠী এবং যুগান্তর দলের বিপ্লবী কমলা দাশগুপ্তকে। একটি রিভলভারও সংগ্রহ করেছিলেন তাঁর কাছ থেকে। কমলা অবশ্য এই বৈপ্লবিক কাজের ফলাফল কী হতে পারে সে সম্বন্ধে বীণাকে অবহিত করেছিলেন। বলেছিলেন ধরা পড়ে গেলে ফাঁসি পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। এ বাদ দিয়ে কালাপানি পার, জেলে অমানুষিক অত্যাচার ইত্যাদি সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছিলেন। বীণা কিন্তু এসব গ্রাহ্য না করে নিজ সিদ্ধান্তে অটল থেকেছিলেন। গুলি চালানোর অনভিজ্ঞতার কারণে সেদিন তাঁর গুলি লক্ষ্যচ্যুত হয়েছিল।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত পুলিশ বীণাকে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নেয়। শুরু হয় চিরাচরিত প্রশ্নবাণ। ‘কোথায় পেলে অস্ত্র? কে দিল?’ টানা ৪৮ ঘণ্টা বিরতিহীনভাবে চলল জিজ্ঞাসাবাদ এবং শারীরিক নির্যাতন। শত অত্যাচারেও মুখ খুললেন না বীণা। উপায়ান্তর না দেখে পুলিশ-লকআপে হাজির করা হল পিতা সর্বজন-শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ বেণীমাধব ও মা সরলা দাসকে। বেণীমাধবকে বলা হল মেয়েকে বুঝিয়ে মুখ খুলতে রাজি করাতে। তেজস্বিনী বীণা বললেন, ‘আমার বাবাকে আপনারা চেনেন না, আমার বাবা মেয়েকে বিশ্বাসঘাতক হতে শেখান না।’

‘…আইবিরা চুপ করে গেল। বাবা শুধুই কাঁদতে লাগলেন। মা সামনে যাকে পেলেন তারই হাত ধরে ব্যাকুল প্রার্থনা করতে লাগলেন, “ওকে একটু দেখবেন, একটু দয়া করবেন, ও আমার বড়ো আদরের মেয়ে।” স্নেহের বেদনা যেন মানুষকে ভিখারীর চেয়েও দীনহীন করে তোলে।’

এইসব কথা বীণা দাস তাঁর আত্মজীবনীতে লিখে গেছেন।

zoom
বীণা দাসের পিতা শিক্ষাবিদ বেণীমাধব দাস

বীণার বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৭ ধারা (খুনের চেষ্টা) এবং অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করা হল। বীণা শুধু যে একজন বিপ্লবী ছিলেন তাই নয়। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ কবি এবং লেখক। সহবিপ্লবী কমলা দাশগুপ্তর পত্রিকা ‘মন্দিরা’তে তিনি নিয়মিত লিখতেন। জেলে গিয়েই বীণা তাঁর মা-বাবাকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। তার অংশ বিশেষ এখানে উদ্ধৃত করা যায়:

 

‘পরিপূর্ণ স্বর্গসুখে হানি তীব্র বাজ
অরক্ষিত ক্ষুদ্র নীড়টুকু
দোলাইয়া প্রচণ্ড আঘাতে সারি সর্ব কাজ
হেথা এসে দাঁড়িয়েছি আমি।

এখানেও কেন আসে ভাসি
চারিদিক হতে শত পরিচিত কণ্ঠস্বর?
পিতার উদ্যত বাহু, জননীর কাতর অন্তর
ঠেলি সর্ব বাধা কেন চাহে হরিবারে
বিশ্রদ্ধ বক্ষের মাঝে গৃহছাড়া অশান্ত কন্যারে।’

জেলে থাকাকালীন মনের কথা প্রকাশ করতে বারবার কবিতা লিখেছেন বীণা। একবার তো জেলের দেয়ালের গায়ে লিখে রাখলেন– 

‘শুধু বড়ো ক্লান্ত লাগে,
আলো বড়ো রূঢ় লাগে চোখে।’

বিচারালয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বীণা দাস দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি গভর্নরকে হত্যার চেষ্টা করেছিলাম। দুর্ভাগ্য, আমি ব্যর্থ হয়েছি। স্ট্যানলি জ্যাকসনের প্রতি আমার কোনও ব্যক্তিগত আক্রোশ নেই। কিন্তু তিনি এমন এক সরকারের প্রতিনিধি, এমন এক শাসনব্যবস্থার প্রতীক, যা আমার দেশকে দমনপীড়নের মাধ্যমে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রেখেছে। আমি সেই অত্যাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আঘাত হানতে চেয়েছিলাম।’ বীণা দাসের এই সাহসী ভাষণে সারা দেশে এমনকী ইংল্যান্ডেও হইচই পড়ে যায়। দেশ-বিদেশের খবরের কাগজের শিরোনামে এসেছিল এই ঘটনা এবং বিপ্লবী বীণা দাসের নাম। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার বিস্মিত হয়েছিল ২১ বছরের এক সাধারণ মেয়ের সাহস এবং মানসিক দৃঢ়তায়। অভিযোগ স্বীকার করে নেওয়ার জন্য মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে বীণার শাস্তি হল ন’ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। ব্রিটিশ আইনে ন’ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেও, পুরো সাত বছর সাজাভোগের পরে মহাত্মা গান্ধীর হস্তক্ষেপে ১৯৩৯ সালে মুক্তি পান বীণা।

ইতোমধ্যে গান্ধী এবং অন্যান্য কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৯ সালের এপ্রিল মাসে কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর কিছুকাল পরেই তিনি ফরোয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময়ে বীণা দাসের মতো কিছু তরুণ কংগ্রেস পার্টির পক্ষ গ্রহণ করেছিলেন। বীণা তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, ‘ব্যক্তিগত কারণে আমার নিজের পক্ষে এ-কাজটা ছিল আরও কঠিন। আমাদের বাড়ির সঙ্গে বরাবরই সুভাষবাবুর অতি নিকট সম্বন্ধ, সেখানে আমার এভাবে তাঁর বিপক্ষ দলে যোগ দেওয়া আমার বাড়ির কারও ভালো লাগেনি। আমার নিজেরও সময় সময় নিজের কাছেই নিজেকে অপরাধী লাগত; বিশেষ করে যখন আমাদের পার্টিতে অত্যন্ত কঠোরভাবে সুভাষবাবুর সমালোচনা করা হত।’ এর কিছুকাল পরে সুভাষবাবুর সঙ্গে বীণার দেখা হয়েছিল। সেটা ছিল ১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাস। একদিন খবর পাঠালেন তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য। তখন সুভাষ বেশ অসুস্থ ছিলেন। বীণা গেলেন তাঁর ঘরে। খাটের উপর শুয়েছিলেন। মুখে দাঁড়িগোঁফ বলেই হয়তো বীণার সেদিন বেশ রোগা মনে হয়েছিল তাঁকে। সুভাষ জানতে চাইলেন বীণা কী করছেন, কী ভাবছেন ইত্যাদি। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে কথা হয়েছিল সেদিন। বীণা সেদিন তর্কও করেছিলেন তাঁর কংগ্রেস ছাড়া নিয়ে। উনিও উত্তর দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনও মীমাংসাই হল না সেদিন। এরই চার-পাঁচদিন বাদে বীণা কাগজে দেখলেন সুভাষচন্দ্রের আকস্মিক অন্তর্ধানের খবর।

zoom
সুভাষচন্দ্র বসুর শেষ প্রাপ্ত ফোটোগ্রাফ

এর পরে বীণা কংগ্রেসের সদস্যপদ গ্রহণ করেন। ১৯৪২ সালে আগস্ট মাসে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ শুরু হলে তিনি এই আন্দোলনে যোগ দেন। তাঁর নেতৃত্বে হাজরা পার্কে বীণা একটি সভা ডাকেন। বে-আইনি সভা ডাকার অভিযোগে বীণা এবং তাঁর সহযোগীদের পুলিশ জোর করে গ্রেপ্তার করে। এই সময়ে তিনি দক্ষিণ কলকাতা কংগ্রেসের সম্পাদিকা ছিলেন। প্রায় তিন বছর বীণাকে কারারুদ্ধ থাকতে হয়।

জেল থেকে মুক্তির পরে বীণার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতেই থাকল। অমৃতবাজার পত্রিকার প্রেস-কর্মচারী ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বীণা। সে সময়ে খুবই গোলমাল চলছিল মালিক এবং প্রেস-কর্মীদের মধ্যে। ধর্মঘটের পথে হেঁটেছিলেন শ্রমিকরা। বীণা কর্মীদের স্বার্থে এক অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে ধর্মঘট পরিচালনা করেছিলেন। কংগ্রেসের সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষদের অকৃপণ দানে পূর্ণ হয়ে উঠল ধর্মঘটকারীদের সাহায্য ভাণ্ডার। অবশেষে বীণা এবং তাঁর সহযোগীদের আন্তরিক চেষ্টা, পরামর্শ এবং শ্রমিকদের সঙ্গে একজোট হয়ে আন্দোলন করায় শেষ পর্যন্ত ধর্মঘট সাফল্য লাভ করল। এর মধ্যে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে গিয়েছিল। কলকাতার দাঙ্গায় প্রচুর লোকের মৃত্যু হল। সেই ট্রাজেডির দু’মাসের মধ্যে নোয়াখালি থেকে টেলিগ্রাম এল যে, ওখানকার অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন; যার তুলনায় কলকাতার দাঙ্গার ঘটনা তুচ্ছতায় মিলিয়ে যাবে। খবর আসতেই বীণা ও তাঁর সঙ্গীরা অকুস্থলে পৌঁছে গেলেন। ইতিমধ্যে সেখানে কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন আর এক কংগ্রেস নেত্রী সুচেতা কৃপালিনী। এই সময়ে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনকালে গান্ধীজির নির্দেশে বীণা দাঙ্গা-পীড়িতদের মধ্যে ত্রাণের কাজ শুরু করে দিলেন। এ বাদ দিয়ে তাঁদের কাজ ছিল গ্রামের ভয়কাতর লোকদের মনে সাহস সঞ্চার করা, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা।

zoom
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সমাবর্তনে উপস্থিত বীণা দাস

১৯৪৭ সালে আর এক স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং সহ-বিপ্লবী যতীশ ভৌমিকের সঙ্গে বীণা দাস বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। স্বাধীনতা লাভের পরে তিনি বিধায়ক নির্বাচিত হন। মরিচঝাঁপি গণহত্যার সময়েও তিনি শরণাগতদের ওপরে পুলিশি অত্যাচারের তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। উদ্বাস্তু মেয়েদের পুনর্বাসনের কাজে তাঁর সফলতা লাভের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬০ সালে তিনি ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কার লাভ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়েও বীণা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য ভারত সরকার যখন ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন, তখন বীণা সেই ভাতা প্রত্যখ্যান করেছিলেন। বলেছিলেন, দেশসেবার বিনিময়ে ভাতা গ্রহণ তাঁর কাছে অন্যায্য বলে মনে হয়েছে।

স্বাধীনতা-উত্তর জীবনে হতাশা ও প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা বীণাকে ঘিরে ফেলেছিল। তিনি হারালেন তাঁর স্বামী ‘যুগান্তর’ দলের সদস্য যতীশ ভৌমিককে। যে আশা নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিলেন, সে আশাও পূর্ণ হয়নি। সেই সার্বিক হতাশা এবং স্বামীর মৃত্যুর কারণে একাকিত্ব তাঁকে এতটাই বিপর্যস্ত করে তুলেছিল যে তিনি বাংলা ত্যাগ করে হৃষিকেশে চলে গিয়েছিলেন। সেখানেই নির্বান্ধব অবস্থায় সকলের অজ্ঞাতে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের কারণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বীণা দাসকে তাঁর স্নাতক ডিগ্রি দিতে অস্বীকার করেছিল। প্রায় আট দশক পরে ২০১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ১৯৩১ সালের জন্য ইংরেজিতে দ্বিতীয় শ্রেণির সম্মান-সহ মরণোত্তর স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করে। শুধু একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী বা কারাজীবন-কাহিনি রচয়িতা হিসেবে নয়, একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমী, আত্মত্যাগী, সৎ এবং সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে বীণা দাসকে আজও স্মরণে রাখার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে।

তথ্যসূত্র:

১. শৃঙ্খল ঝঙ্কার, বীণা দাস
২. অগ্নিযুগের বীরাঙ্গনা বিপ্লবী বীণা দাস, প্রসেনজিৎ সিকদার
৩. স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী, কমলা দাশগুপ্ত

Bina Das Indian freedom fighter Indian freedom movement\ jugantar Netaji Subhas Chandra Bose Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on