দেথাকে কেবল ‘লোক-কথা সংগ্রাহক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা নিয়ে আমার আপত্তি রয়েছে। প্রথমত, ‘লোক’ বা ইংরেজি ‘ফোক’ বর্গটির নির্মাণের মধ্যে একরকম ঔপনিবেশিক রাজনীতি রয়েছে। কোন গানটি শুধুমাত্র গান, আর কোন গানটি ‘লোকগান’ হিসেবে গণ্য হবে, তার মধ্যে ক্ষমতার সমীকরণ সতত ক্রিয়াশীল। কিন্তু সে বিস্তারিত আলোচনার বিষয়, এই লেখায় তার অবকাশ নেই। তার চেয়ে বরং দ্বিতীয় কথাটি একটু লক্ষ করা যাক। দেথা নিজে বারবার এই ‘লোককথাকার’ অভিধাটিকে প্রতিহত করবার চেষ্টা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, গল্পের কাঠামো রাজস্থানের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ভাষিক অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হলেও, গল্পের কথনটি তাঁর নিজস্ব।
বিজয়দান দেথার নাম প্রথম শুনেছিলাম নান্দীকার জাতীয় নাট্যোৎসবে ‘চরণদাস চোর’ দেখতে গিয়ে। বলা ভালো দেখার পর। কারণ, প্রথমবার সে নাটক দেখার পর যে ঘোর লেগেছিল, তার রেশ থাকতে থাকতে কিছু খোঁজখবর করেছিলাম। তখনও তথ্য এত সহজলভ্য হয়নি, ফলে এ নাটকের গল্প যে রাজস্থানি লোককাহিনি এবং তা হাবিব তনভির শুনেছিলেন স্বয়ং গল্পের সংগ্রাহকের মুখে এবং সংগ্রাহকের নাম কি না বিজয়দান দেথা– অন্য কিছু তথ্যের মধ্যে এইটুকুও কানে এসেছিল। জনশ্রুতি যেমন আসে। বা আসত তখনও পর্যন্ত। তারপর বহুবার ‘চরণদাস চোর’ দেখার সুযোগ হয়েছে এবং হাবিব তনভিরের আরও অনেক নাট্যকর্ম। কিন্তু বিজয়দান দেথার নামটা মনের মধ্যে কীভাবে যেন চাপা পড়ে গিয়েছিল।

তখন আমরা আগের দিন সন্ধেবেলা থেকে আকাদেমির কাউন্টারের সামনে রাত জেগে লাইনে দাঁড়াতাম, হালকা শীতের মধ্যে ভোরবেলা নান্দীকারের কেউ কেউ রাতজাগা টিকিট-প্রত্যাশীদের জন্য গরম চা নিয়ে আসতেন, সে বড় সুখের ছিল সময়। যাইহোক, লাইন দেওয়ার উদ্দেশ্য, ক’দিন ধরে যে-নাটকই হোক, তার টিকিট সংগ্রহ ও নির্বিচারে দর্শন এবং তারপর উত্তেজিত বিচার বিমর্ষ। বিচারের ব্যাপারটায় আমি নীরবই থাকতাম কারণ, সদ্য হাফপ্যান্ট থেকে উত্তরণ ঘটেছে। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি, মেডিক্যাল কলেজে ছড়ানো আমার দাদার বিপুল বন্ধুগোষ্ঠীর লেজুড় হিসেবে স্কুলপড়ুয়া আমি যে তাবৎ ক্ষুরধার দাদা-দিদিদের সভা ও সঙ্গে স্থান পেতাম, এখন মনে হয় তার মধ্যে আমার অকালপক্কতাজনিত খানিকটা বিস্ময় ও অনেকটা কৌতুকের উপাদান থেকে থাকবে। সে যাই হোক, নাট্যোৎসবে প্রতিবার মহামহিমদের পাশাপাশি অজ্ঞাত এবং অল্পজ্ঞাত নাট্যকর্মের জন্য বেশ কিছুটা স্থান করে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। বলতে দ্বিধা নেই, ফি-বছর সেইসব পরিচালক, অভিনেতাদের মধ্যে কেউ না কেউ চমকে দিতেন আমাদের দেখবার অভ্যাসকে। হাবিব তনভিরের ‘চরণদাস চোর’ দেখার সেই প্রথম অভিজ্ঞতার দু’-এক বছরের মধ্যেই পীযূষ মিশ্র নামে একজন একটি একক অভিনয় নিয়ে এলেন এবং চমকে দিলেন বললে কম বলা হয়।

যতদূর মনে পড়ছে, এনএসডি-র কিছু একটা যোগসূত্র ছিল তাঁর সঙ্গে। পাস-আউট তো বটেই, প্রযোজনাটির সঙ্গেও কিছু একটা ট্যাগ ছিল বোধহয়। কিন্তু সেরকম তো কতই থাকে! পীযূষ মিশ্র তখন এক্কেবারে আনকোরা লোক, বাংলায় অন্তত কেউ তাঁকে বিশেষ চিনতেন না। কারণ নাটকের লোকেরা সচরাচর যেভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন, সেই ফিল্মের দুনিয়ায় তখনও তাঁর খুব একটা নামডাক হয়নি। শুধুমাত্র একটি হারমোনিয়াম নিয়ে পীযূষ মঞ্চে এলেন এবং গানে-গল্পে-অভিনয়ে একেবারে মাত করে দিলেন। সেদিন আমাদের মনে হয়েছিল, একেই বোধহয় ভারতীয় নাটক বলে। নির্ভার, সরল, অথচ কী তার প্রাণবন্ত ভঙ্গি, কী তার দাপট! আমার মনে আছে স্পষ্ট, ওই শীতেও পীযূষ ঘেমে জল হয়ে যাচ্ছেন, একটি চরিত্র হয়ে অভিনয়ের পরে আবার গানে ফিরছেন যখন, তাঁর গলায় হাঁপ ধরে গিয়েছে বোঝা যাচ্ছে। অবশ্য সেসব কিছুতেই কোনও অসুবিধে হয়নি, কারণ পীযূষ যে-গল্পটি বলছিলেন, তা আমাদের চেতনাকে অভিভূত করে রেখেছে।

সে গল্প ছিল বিজয়দান দেথার, গল্পের নাম ‘দ্বিধা’, বাংলায় বললে অন্তত সেরকমটাই শোনাবে। একটি পুরুষ বিয়ে করে ফিরছে তার নতুন বউকে নিয়ে। পথে এক জায়গায় একটি পুকুরপাড়ে থামে সেই বরযাত্রীরা। নববধূ নেমেছিল সেখানে। পাশেই এক গাছে থাকত একটি ভূত। বউটিকে দেখে ভূত তার প্রেমে পড়ে গেল। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট! দেখুন, ভূত হামেশাই মানুষকে দেখে। তারপর পরিস্থিতি বিচার করে হয় তার ঘাড় মটকে দেয়, কিংবা ঘাড়ে চেপে বসে। কিন্তু এ ভূত তেমন ভূত নয়। সে প্রেমে পড়ে গিয়েছে! মেয়েটির সৌন্দর্যে সে মুগ্ধ। এদিকে মেয়েটির স্বামী ততক্ষণে হিসেবনিকেশ করছে, বিয়েতে খরচাপাতি কেমন হল! বউ তার কাছে লাভ-লোকসানের অঙ্ক ছাড়া বেশি কিছু নয়। তারপর স্বামীটি চলে যায় দূরদেশ, কারণ তাকে আরও টাকা কামাই করতে হবে। সেই ফাঁকে ভূত বাবাজি স্বামীর রূপ ধরে এদের বাড়ি ঢুকে পড়ে। তারপর ভূতকে আর কে পায়! সেও সুখী, আর বউটিও সুখী স্বামীর সোহাগে। যে-সোহাগ সে কোনওদিন পায়নি, আর পাবে বলে আশাও করেনি বোধহয়!

কিন্তু আমাদের ভূত নিতান্ত অসৎ নয়। নতুন বউয়ের সঙ্গে আশনাইয়ের মাঝে সে বলার চেষ্টা করেছিল যে, সে আসলে তার স্বামী নয়, ইম্পস্টার। কিন্তু বউটি ভূতের কথাকে আমলই দেয়নি। সব জেনেশুনে, না কি সরল নিরীহ বলে? কে জানে! মোটকথা স্বামী-স্ত্রীর যা যা ইতিকর্তব্য সে সমস্তই ঘটে যায় এবং ফলস্বরূপ, বউটি এখন সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়ে।
এদের দিন সুখেই কাটছিল, কিন্তু সেই যে আসল স্বামী– যে কি না গিয়েছিল দূরদেশে, এবার সে ফিরে আসে! গন্ডগোলের চূড়ান্ত! কী করে বোঝা যাবে, আসল স্বামী কে, দু’জনকেই তো অবিকল একইরকম দেখতে! সুতরাং দরকার হয় একজন ওঝার। সে এসে নানাভাবে পরীক্ষা করে। আর ভূত যে আসলেই ভূত, ধরা পড়ে যায়। তারপর আর কী! ভূতকে একটি ব্যাগের মধ্যে পুরে ফেলে দূর করে দেওয়া হয়, আসল স্বামী নিজের স্ত্রী-পুত্র ফিরে পায়। কিন্তু এরপর সবাই কি সুখে-শান্তিতে দিন কাটাবে? না কি, একরকমের অস্বস্তি ভিতরে ভিতরে চিরকাল জাগরূক থাকবে? এই তো আসল দ্বিধা।

বিজয়দান দেথার জন্ম বোরুন্দা নামে রাজস্থানের এক গ্রামে। গাঁয়ের ছেলেটি শহরে এল পড়াশোনা করতে এবং ইংরেজিতে সড়গড় নয় বলে খুবই অপ্রস্তুত হল। এই নাগরিক অভিজ্ঞতা বিচিত্রভাবে কাজ করেছে দেথার জীবনে। তিনি দু’টি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ছাত্রাবস্থাতেই। এক, রাজস্থানি ছাড়া আর কোনও ভাষায় কখনও লেখেননি। আর দুই, পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফিরে গেছেন জন্মভূমি বোরুন্দায়। এরপর তাঁর লোককথা সংগ্রহ, কমল কোঠারির সঙ্গে রূপায়ণ সংস্থা তৈরি, ‘বাতাঁ রী ফুলওয়ারি’ নামে ১৪ খণ্ডের বিপুল কাহিনি সম্ভার প্রকাশ– এইসব কাজকর্মই সম্পন্ন হয়েছে বোরুন্দার মাটিতে।
শুনেছি, দেথার এই গ্রামে ফিরে যাবার সিদ্ধান্তের পেছনে খানিকটা ভূমিকা নিয়েছিল তাঁর তলস্তয়ের জীবন পড়বার অভিজ্ঞতা। এইসব টুকরো-টুকরো কথা থেকেই দেথা বিষয়ে আমার মনে একটা ছবি তৈরি হয়েছে। কেননা, একথাটা শুধু তথ্যমাত্র নয় যে, একজন রুশ সাহিত্যিক দেশ-কালের ফারাক পেরিয়ে দেথাকে তাঁর দেশজ সাহিত্য ধারায় মনোনিবেশ করবার জন্য প্ররোচিত করছেন; সাহিত্যের যে আদৌ কোনও বর্ডার নেই, রাজস্থানি ভাষায় লিখেই দেথা যে বিশ্বসাহিত্যের অংশ হয়ে উঠতে পারেন– এই ব্যাপারটার আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। একেবারে প্রাকৃত দৃষ্টিতে দেখলেও দেথার রচনার সংখ্যা ৮০০-র বেশি, তার মধ্যে অনেকটাই হিন্দি, ইংরেজি ও আরও নানা ভাষায় তর্জমা হয়ে গেছে।

আর সেকারণেই, দেথাকে কেবল ‘লোক-কথা সংগ্রাহক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা নিয়ে আমার আপত্তি রয়েছে। প্রথমত, ‘লোক’ বা ইংরেজি ‘ফোক’ বর্গটির নির্মাণের মধ্যে একরকম ঔপনিবেশিক রাজনীতি রয়েছে। কোন গানটি শুধুমাত্র গান, আর কোন গানটি ‘লোকগান’ হিসেবে গণ্য হবে, তার মধ্যে ক্ষমতার সমীকরণ সতত ক্রিয়াশীল। কিন্তু সে বিস্তারিত আলোচনার বিষয়, এই লেখায় তার অবকাশ নেই। তার চেয়ে বরং দ্বিতীয় কথাটি একটু লক্ষ করা যাক। দেথা নিজে বারবার এই ‘লোককথাকার’ অভিধাটিকে প্রতিহত করবার চেষ্টা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, গল্পের কাঠামো রাজস্থানের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ভাষিক অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হলেও, গল্পের কথনটি তাঁর নিজস্ব। সমকালে যেভাবে গল্পগুলিকে তিনি উপস্থাপন করছেন সেটাও তাঁর নিজের। সুতরাং এই সমস্ত কাহিনিই দেথার বলা কাহিনি।
কথাটা জরুরি, কারণ ‘লোক’ বর্গের মধ্যে সেইসবই তো আমরা পুরে দিতে চাই, যাদের সমকাল থেকে সুদূর, আর আমাদের জীবনের সমস্ত জটিলতা থেকে মুক্ত সারল্যের মূর্তি বলে মনে করি। দেথা সেইসব গল্পগুলিকে এনে ফেলেছেন আমাদের সময় আর সমাজের চৌহদ্দির মধ্যে, দেখিয়েছেন কীভাবে তারা ধারণ করতে পারেন আমাদের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সংশয় আর অনিশ্চয়তা। ‘দ্বিধা’ গল্পের নববধূর জীবন কি সত্যিই এবার সুষ্ঠু হয়ে উঠবে? না কি, ‘আসল’ স্বামীর কাছে যা কোনওদিন পায়নি সে, সেই প্রেম-ভালোবাসা, আদর-সোহাগ আবার করে হারাতে হবে তাকে। তথাকথিত লোককাহিনি দেথার বয়ানে আমাদের দ্বিধার প্রতীক হয়ে ওঠে তাই।

এবং সে লেখা কোনওদিন হারায় না। তাকে বারবার বলা যায়। প্রতিটি কথনে সে পুরনো থেকেও নতুন হয়ে ওঠে ফের। রাজস্থানি কোনও গ্রাম থেকে সংগৃহীত কাহিনিকে দেথা নতুন করে বলেন। পীযূষ মিশ্র বা হাবিব তনভিরের নাটকে আরেকরকমভাবে তাদের বলা হয়। কলকাতার কোনও দর্শক সেই বলাটি শুনে ফেলেন। গল্পটি হয়তো পালটে যায় প্রতিটি উপস্থাপনে, যা ধ্রুব হয়ে থেকে যায় তা শুধু ফিরে ফিরে বলা। কথন আর পুনর্কথন। দেশে দেশে আর কালে কালে সাহিত্যের চারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved