ঋতুপর্ণ ঘোষ বেঁচে থাকলে ৩১ আগস্ট ৬৩-এ পা দিতেন এ বছর। তাঁর অকালপ্রয়াণ বাঙালি জীবনের এক সত্যিকারের অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি যে শুধু দিকপাল চিত্রপরিচালক ছিলেন তা নয়, তাঁর বহুধাবিস্তৃত প্রতিভার স্বাক্ষর রয়ে গিয়েছে পত্রিকা-সম্পাদনা, সাক্ষাৎকার-গ্রহণ, সাহিত্য, অঙ্কনশিল্প, গান-লেখা এবং আরও নানা কর্মকাণ্ডে। সিনেমাতে, বিশেষত বাংলা সিনেমাতে, তিনি এক বিশেষ ধরনের ছবির জগৎ তৈরি করেছিলেন। সে জগৎ নারীর জগৎ। তাঁর আগে নারী-চরিত্রকে প্রধান করে কেউ সিনেমা নির্মাণ করেননি তা নয়; ভারতের অন্যান্য পরিচালকের কথা বাদ দিয়ে কেবল বাংলার সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের কথা ধরলেও দেখি তাঁরা বিশ্বখ্যাত সিনেমা তৈরি করেছেন নারী-চরিত্রকে মূল বানিয়ে, কিন্তু ঋতুপর্ণের মতো এমন ক্রমাগত কেবল নারীর-ভুবনের ছবি এঁকেছেন তেমন তথাকথিত মহিলা-পরিচালকও ভারতে বিরল। এই একটি গুণে ঋতুপর্ণ স্পেনের পেদ্রো আলমাদোভার, আমেরিকার জন ওয়াটার্স এবং জার্মানির আর. ডব্লিউ ফ্যাসবিন্ডারের সঙ্গে একাসনে বসতে পারেন। তবে ঋতুপর্ণের নারী সেই প্রথম ছবি থেকে স্পষ্ট সামাজিকতায় উচ্চবিত্ত শ্রেণির নারী। নিম্নবিত্ত কিংবা প্রান্তিক নারীরা কখনও ঋতুপর্ণের ছবিতে দেখা দেননি কেবল ‘কাজের মাসি’ বা ‘কাজের মেয়ে’-এর পার্শ্বচরিত্র ছাড়া। বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী, সিনেমার নায়িকা, জমিদার বাড়ির কন্যা, বিরাট চাকুরে পুরুষের স্ত্রী, প্রখ্যাত ফিল্ম-করিয়ের স্ত্রী কিংবা কর্পোরেট বসের থিয়েটারকর্মী স্ত্রী; এঁরাই মূলত ঋতুপর্ণের নারী। এঁরা প্রত্যেকে সমাজের ‘প্রিভিলেজড’ শ্রেণি বলতে আমরা যা বুঝি– সেই শ্রেণির নারী। তবে শ্রেণি যাই হোক, সেই নারী-জীবনেরও যে নানা ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উতরাই থাকে, তা ঋতুপর্ণের সিনেমা শুধু বাংলা বা ভারতকে নয় সমগ্র বিশ্বকে সুচারুরূপে দেখিয়েছে।

এইসব নির্মাণ ঋতুপর্ণ তথা বাংলাকে এনে দিয়েছে নানা স্বীকৃতি। ঋতুপর্ণ বা তাঁর সিনেমা যে প্রচুর আন্তর্জাতিক সম্মান পেয়েছে নয়। সেই তুলনায় সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, এমনকী, অপর্ণা সেন পর্যন্ত ঋতুপর্ণের থেকে এগিয়ে থাকবেন। কিন্তু ঋতুপর্ণের যে দেশীয় স্বীকৃতি, তা অনেক পরিচালকেরই নেই। ঋতুপর্ণ ও তাঁর ছবি জাতীয় পুরস্কার জিতে নিয়েছে বারবার। তার আগে বাংলায় জাতীয় পুরস্কার এলেও, এই পুরস্কার নিয়ে যেন তেমন হইচই ছিল না। ঋতুপর্ণ সেই দরজা খুলে দিয়েছিলেন। সব থেকে বড় কথা ঋতুপর্ণের নারী-চরিত্ররা সেই ‘উনিশে এপ্রিল’ থেকে সেরা অভিনয়ের জাতীয় পুরস্কার পেতে পেতে বাংলার মেয়েদের অভিনয়-শিল্পকে একটা অন্য মাত্রায় তুলে ধরেছে। ঋতুপর্ণের সিনেমার একটি বিশেষ দিক তথাকথিত বাণিজ্যিক ছবির শিল্পীদের দিয়ে কাজ করানো এবং সে-কারণে মূলত বাণিজ্যিক ছবির নায়িকারা তাঁর ছবির মাধ্যমে জাতীয় পুরস্কারের স্বীকৃতি পেতে শুরু করেন। শুধু কলকাতার অভিনেতারা নন, হিন্দি ছবির অভিনেতারাও ঋতুপর্ণের ছবিতে অভিনয় করে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন। ঋতুপর্ণের আগে বাংলা ছবির নায়কদের জানত দেশের বাকি অংশ আর খুব বেশি হলে সুচিত্রা সেনকে, কিন্তু ঋতুপর্ণের ছবি অভিনয়ের বিশেষত সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার একের পর এক পেতে শুরু করলে বাংলার নায়িকাদের অভিনয়ের কথাও ভারতে সুবিদিত হয়। আজ জাতীয় পুরস্কারের ইতিহাস দেখলে চোখে পড়ে একমাত্র কল্পনা লাজমি ছাড়া ভারতে কোনও ফিল্মপরিচালকের ছবি সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার এতবার জেতেনি।

সিনেমায় নারীচরিত্রের চিত্রণ, সেই চরিত্রাভিনয়ের জন্য অভিনয়-শিল্পে জাতীয় পুরস্কার আদায়ের পাশাপাশি ঋতুপর্ণের ছবি আরেকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিল। তা হল ভারতীয় সিনেমায় সমকামী-রূপান্তরকামী চরিত্রের একটা অন্য ভুবন গড়ে তোলা। ঋতুপর্ণের আগে খুব বিক্ষিপ্তভাবে সে কাজ হয়েছিল, কিন্তু ঋতুপর্ণ, বিশেষত ২০০৯ সালে দিল্লি হাইকোর্ট কর্তৃক প্রথম ধারা ৩৭৭ অবলুপ্ত হওয়ার প্রাক্কালে পরের পর বছরে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ (২০১০), ‘মেমোরিজ ইন মার্চ’ (২০১১) এবং ‘চিত্রাঙ্গদা’ (২০১২) তৈরি করলে, সমগ্র ভারতে সাড়া পড়ে যায় এবং ভারতীয় সিনেমায় সমকামী-রূপান্তরকামী মানুষদের স্থানাঙ্ক ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করে। আজ দেশের তথাকথিত ‘সমকামী-রূপান্তরকামী সিনেমা’ সংক্রান্ত যে-কোনও উৎসব, আলোচনা– সবেতে ঋতুপর্ণের এই ছবিগুলির পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, তিনি যে শুধু সিনেমা তৈরি করে ক্ষান্ত ছিলেন, তা তো নয়। বাঙালি জনমানসে সমকামী-রূপান্তরকামী মানুষের দৃশ্যমানতা তিনি একার হাতে তুলে ধরেছিলেন, তাঁর জীবনধারা মারফত। তাঁকে ঘিরে আলোচনা হতে হতে এই ভিন্ন যৌনতার আলোচনা যে কখন বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির ড্রয়িংরুমের প্রধান আলোচনা হয়ে গিয়েছিল, তা ধরা যায়নি। এমন নিঃশব্দ আন্দোলন পরবর্তীকালে বাংলার সমকামী-রূপান্তরকামী সামাজিক আন্দোলনকে নিঃসন্দেহে গতি দিয়েছিল। সিনেমা মারফত তো বটেই, অনেক সাক্ষাৎকারেও সমকামী-রূপান্তরকামী আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক তিনি তথাকথিত সাধারণ বাঙালি জনতাকে বুঝিয়েছিলেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি’-তে জনৈক কৌতুকাভিনেতাকে আন্তঃসামাজিকতা (‘ইন্টারসেকশনালিটি’) সম্বন্ধে উপলব্ধি করানো। কৌতুকাভিনেতা বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে ঋতুপর্ণ ঘোষকে ‘নকল’ করতেন কৌতুকের ছলে, কিন্তু সেই কৌতুক ‘ঋতুপর্ণের মতো’ অর্থাৎ আমাদের সমাজে নারীসুলভ পুরুষদের কতটা ক্ষতি করতে পারে, অপমানিত করতে পারে, সে সম্বন্ধে তিনি উদাসীন ছিলেন। ঋতুপর্ণ তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন ধর্মাচরণে সেই কৌতুকাভিনেতা সংখ্যালঘু হলেও, যৌন সংখ্যালঘু মানুষের প্রতি তাঁর কোনও সংবেদনশীলতা না-থাকা শুধু আশ্চর্যের নয়, অন্যায়েরও। তবে কৌতুকাভিনেতা কোনও ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ নয়। আমাদের মতো পিতৃতান্ত্রিক দেশের ভবিতব্যও এমনই। এখানে মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষ অনেক সময় সমকামী মানুষের ব্যথা বোঝে না, সমকামী দলিতের কথা বোঝে না, দলিত নারীর মান উপলব্ধি করে না, নারী রূপান্তরকামিতাকে কখনও অবজ্ঞা করে। আসলে যে তাঁরা প্রত্যেকে অবমাননার একই স্তরে রয়েছেন এবং সকলের মুক্তি মানে প্রত্যেকের মুক্তি, তা তাঁরা উপলব্ধি করে উঠতে পারেন না। জোটবদ্ধ হয়ে যেসব শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই তা অধরাই থেকে যায়। ঋতুপর্ণ ঘোষ বহু বছর আগে এসব বলে গিয়েছিলেন। আমাদের উপলব্ধি করতে বড্ড দেরি হয়ে গেল। বা উপলব্ধি কি আদৌ হয়েছে? এখনও?