shankars impact on middle-class Bengali society। Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

শংকরের আয়নায় চাকরিজীবী বাঙালি মুখ দেখত নিজেদের

বাঙালির সামাজিক ইতিহাসের বিচিত্র দলিলের রচয়িতা শংকর অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক ছিলেন। জনপ্রিয়দের অতি-বুদ্ধিমান বাঙালি সমালোচকরা সন্দেহ করেন। সাধারণ যাঁকে গ্রহণ করেছেন অসাধারণ বাঙালি তাঁকে নিতে চান না। বাঙালির ইন্টালেকচুয়াল বাবু-বিবিদের কাছে শরৎচন্দ্র দানা-পানি পাননি। শংকরের বই বিক্রি হয়েছে, কিন্তু শংকর জাতে ওঠেননি। তাতে অবশ্য শংকরের কিছু যায়-আসে না। তাঁর গদ্য ছিল, দেখার চোখ ছিল, পর্যবেক্ষণ শক্তি ছিল। বাঙালির দিকে তাকিয়ে তিনি অনেক কথা বলতে পারতেন। সেই আয়নায় বাঙালি আপনার মুখ আপনি দেখতে পারেন।

Published by: Robbar Digital

Posted:February 21, 2026 5:10 pm | Updated:February 21, 2026 9:03 pm  
Facebook WhatsApp Messenger
shankars impact on middle-class Bengali society। Robbar

মণিশংকর মুখোপাধ্যায় চলে গেলেন, বাঙালির ‘শংকর’ চলে গেল। ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসে বিভূতিভূষণ যে শঙ্করের কথা লিখেছিলেন, সেই শঙ্কর অভিযাত্রী। বিভূতিভূষণ তাঁর আখ্যানে ১৯০৯ সালের কথা লিখেছিলেন। ‘তখন চাকুরীর বাজার এতটা খারাপ ছিল না।’ তবে শঙ্কর চেনা চাকরিতে ঘরের কাছে নৈহাটির পাটকলের চাকরিতে যোগ দেয়নি। তার জীবনে অন্য কাজের ডাক এসেছিল। আফ্রিকার মোম্বাসা থেকে প্রসাদদাস মুখোপাধ্যায়ের চিঠি এল। ‘এখানে নতুন রেল তৈরী হচ্ছে, আরও লোক নেবে। তোমার কাজ জুটিয়ে দেবার ভার আমি নিচ্চি।’ চাকরির ডাকে বাঙালি শঙ্করের চাঁদের পাহাড়ের দেশে যাত্রা, এক সময় কিশোর বাঙালি, যুবক বাঙালি চাঁদের পাহাড়ের দেশে চাকরির স্বপ্ন দেখত।

বিভূতিভূষণ যখন তাঁর শঙ্করের কথা লিখছেন, সেই ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ ইংরেজির ১৯৩৮, তখন মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের বছর পাঁচেক বয়স। তাঁর প্রথম বই ‘কত অজানারে’ প্রকাশ পাবে ১৯৫৫ সালে। সে বইও শুরু হয়েছিল চাকরির কথায়। মণিশংকর, যিনি তাঁর নামের আদি ও অন্ত বর্জন করে নামের মধ্যাংশটিকে লেখক-নাম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, তাঁর পক্ষে ভাঙা স্বাধীন ভারতের অর্থনীতিতে বসবাস করে বলা সম্ভব ছিল না– ‘চাকুরীর বাজার … খারাপ’ নয়।

zoom
মণিশংকর মুখোপাধ্যায়, নামের আদি-অন্ত বর্জন করে যিনি ‘শংকর’

পূর্ববঙ্গ তাঁর জন্মস্থান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাবা চলে এসেছিলেন হাওড়ায়। হাওড়ায় বড় হয়ে ওঠা ছেলেটি অনেক রকম চাকরি করেছে, ফেরিওয়ালা, টাইপরাইটার ক্লিনার, প্রাইভেট টিউশনি, কনিষ্ঠ কেরানি। পরে যখন লেখক হিসেবে বেশ প্রতিষ্ঠিত তখন কৌতুক করে বলতেন, মাছখেকো রসিক বাঙালি মাছের মুড়ো-লেজা খেতে চায় না। মাছের পেটিই তাদের কাছে শ্রেষ্ঠ খাদ্য। সেই সেরা খাবারের আদর জানেন বলেই তিনি নাকি তাঁর নামের মধ্যাংশটিকে, অর্থাৎ সেরা অংশটিকে, লেখক নাম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এ প্রতিষ্ঠিত লেখকের রসিকতা।

‘কত অজানারে’ যখন লিখছেন, তখন চাকরি প্রত্যাশী ও চাকরি থাকা ও না-থাকার দোলাচলে ভোগা মনের কথা ফুটে উঠছে। ‘এর নাম হাইকোর্ট! বিভূতিদার মুখের দিকে তাকালাম। বিভূতিদার হাত ধরেই এখানে এসেছি। চাকরি হবে, যা-তা চাকরি নয়। সাহেব ব্যারিস্টার, তাঁর কাছে চাকরি।’

শংকরের উপন্যাসে চাকরির আখ্যান নানাভাবে আবর্তিত হয়। চাকরি-কেন্দ্রিক অর্থনীতি, চাকরির রাজনীতি ও চাকরিকে ঘিরে বাঙালি পুরুষের শ্রেণি-সচেতনতা কত ভাবে যে ফিরে আসে তাঁর লেখায়। ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরী ভদ্রলোক বাঙালির ইতিহাস লিখতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই জনগোষ্ঠীটি ইংরেজি জানা ও চাকরি পাওয়ার সূত্রে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাপনায় যে তুলনামূলক সুবিধের অধিকারী হয়েছিল, তাই অনেক দিন পর্যন্ত বাঙালি ভদ্রলোকের সাংস্কৃতিক জীবনকে নির্ধারণ করেছে। শংকরের লেখায় নানা কিসিমের চাকরি ও চাকরির সংকট উঠে আসছে। চাকরি-কেন্দ্রিক বাঙালি জীবনের নিদারুণ ট্র্যাজেডিকে তাঁর লেখা উপন্যাস ভেঙে সত্যজিৎ ছবিতে ধরেছিলেন। ‘সীমাবদ্ধ’ (১৯৭১), ‘জন-অরণ্য’ (১৯৭৬)– শংকরের উপন্যাস থেকে নির্মিত সত্যজিতের ছবিতে যথাক্রমে অফিসের ম্যানেজমেন্টের পলিটিক্স আর ভাগ্যাহত যুবকের জীবিকার জন্য দালাল বনে যাওয়ার আখ্যান ধরা পড়েছে। চাকরি চাকরি চাকরি! বাঙালির, বাঙালি ভদ্রলোকের হাতের পাঁচ হিসেবে আর কিছু যে নেই!

বাঙালির যে ঠাকুরকে শংকর ভক্তি করতেন, সেই রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কাছে আসতেন চাকরি করা শিক্ষিত বাঙালিরা। তাঁরা চাকরির অশান্তি থেকে ঠাকুরের কাছে এসে যেন মুক্তি পেতেন। এমনকী, বড় চাকুরেরাও কি চাকরির দাহের কথা এসে বলতেন না! বঙ্কিমচন্দ্র ঠাকুরের কাছে এসেছেন। ঠাকুর জিজ্ঞাসা করছেন, তিনি কার ভাবে বঙ্কিম! ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, সাহেবের চাকরির চাপে তিনি বঙ্কিম। বলেন বটে, কিন্তু এও জানেন চাকরি বড়ো বালাই! ভ্রাতুষ্পুত্রকে ব্যক্তিগত পত্রে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘উপরওয়ালাদের আজ্ঞাকারিতা। তাঁহাদের নিকট বিনীত ভাব। চাকরী রাখার এবং উন্নতির পক্ষে ইহা নিতান্ত প্রয়োজনীয়। তর্ক করিও না।’ জ্যোতিশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে লেখা বঙ্কিমের চিঠিতে এই যে চাকরির আরাধনা, তা তো উনিশ শতক বেয়ে বিশ শতকে স্বাধীনতার পরে শংকরের লেখায় নতুন করে ফিরে এল। সত্যজিৎ শংকরের দু’টি উপন্যাসকে ছবিতে রূপ দেওয়ার সময় এই চাকরিতত্ত্বের বিষয়টি ভোলেননি বলেই মনে হয়।

এই যে কথক চরিত্রের চাকরির বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও কখনও কখনও চাকরি না-থাকার অসহায়তা তাকে ছুঁয়ে শংকর চাকরিকেন্দ্রিক বঙ্গজীবনের নানা অঙ্গকে স্পর্শ করতেন। ‘ঘরের মধ্যে ঘর’ উপন্যাসে কথক তার আত্মপরিচয় দিচ্ছে চাকরির সূত্রে। ‘আমাকে মনে পড়ে কি? সেই কতদিন আগে কলকাতা হাইকোর্টের ছায়ায় ওল্ড পোস্টাপিস স্ট্রীটের আদালতী কর্মক্ষেত্রে এক কৃশকায় বালকের সঙ্গে আপনাদের প্রথম পরিচয় হয়েছিল। … তারপর আবার দেখা হয়েছিল আলোয় আলোকিত চৌরঙ্গীর শাজাহান হোটেলে। … কিন্তু ভাগ্যের এমনই পরিহাস … হোটেলের চাকরি হারিয়ে মধ্যরাতে জনহীন কলকাতার রাজপথে নেমে এসে সহায়সম্বলহীন নিরাশ্রয় শংকর আপনাদের শেষ নমস্কার জানিয়েছিল।’ মানুষের পরিচয় রূপে নয়, গুণে নয়, মানুষের পরিচয় চাকরিতে। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাপনা বাঙালির ললাটে যে নিয়তির দাগ চাকরির মাধ্যমে লিখে দিয়েছিল, তার আলো-অন্ধকার থেকে বাঙালি বাইরে আসতে পারেনি। শংকর সেই বাঙালির কথাকার।

চাকরির বাজার সহজ নয়, নির্মলও নয়। পৃথিবীতে বিশুদ্ধ চাকরি বলে কিছু হয় না। শংকর জীবনানন্দের মতো আস্তিত্বিক সংকটের পদ রচনা করেন না, লেখেন কথা ও কাহিনি। তাঁর ভাষা গূঢ় নয়। সহজ ও টানটান। সেখানে বাঙালির মুখের কথা বড় যত্ন নিয়ে বুনে দেন। বাস্তবতা টাল খায় না। আর চোখে পড়ে অকৃতজ্ঞ ও কৃতজ্ঞ নানা কিসিমের বাঙালি। কেউ আত্মীয় কেউ অনাত্মীয়, কেউ উচ্চবর্ণ কেউ নিম্নবর্ণ। এ এক আশ্চর্য চালচিত্র। চাকরিকে ঘিরে কত রকমের ব্যবসা। বাঙালির বিত্তবাসনার কত যে রূপ! অবসরের পর চাকরি বিক্রির কত কৌশল। বাঙালির ট্রেড ইউনিয়ন এই দাবি প্রতিষ্ঠা করে অন্তত বেসরকারি ক্ষেত্রে অবসরের পর নিকটজনের চাকরি হবে সেই পদে। যাঁদের নিকটজন নেই, তাঁরা অনাত্মীয়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাঁকে নিকটজন সাজিয়ে চাকরিতে বহাল করেন। এক বছর বাদে আদালতে গিয়ে নাম বদলে চাকরি কেনা মানুষটি পুনরায় নিজের নাম ফিরে পান।

……………………..

শংকর-কে নিয়ে দেবাশিস মুখোপাধ্যায়-এর স্মৃতিচারণ: জটায়ুর স্টাইলে সত্যজিৎ রায়কে প্রশ্ন করেছিলেন শংকর

……………………..

বাঙালির সামাজিক ইতিহাসের বিচিত্র দলিলের রচয়িতা শংকর অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক ছিলেন। জনপ্রিয়দের অতি-বুদ্ধিমান বাঙালি সমালোচকরা সন্দেহ করেন। সাধারণ যাঁকে গ্রহণ করেছেন অসাধারণ বাঙালি তাঁকে নিতে চান না। বাঙালির ইন্টালেকচুয়াল বাবু-বিবিদের কাছে শরৎচন্দ্র দানা-পানি পাননি। শংকরের বই বিক্রি হয়েছে, কিন্তু শংকর জাতে ওঠেননি। তাতে অবশ্য শংকরের কিছু যায়-আসে না। তাঁর গদ্য ছিল, দেখার চোখ ছিল, পর্যবেক্ষণ শক্তি ছিল। বাঙালির দিকে তাকিয়ে তিনি অনেক কথা বলতে পারতেন। সেই আয়নায় বাঙালি আপনার মুখ আপনি দেখতে পারেন।

শংকর চলে গেলেন। রেখে গেলেন বাঙালির, চাকরিজীবী বাঙালির ও চাকরিকেন্দ্রিক বাঙালির মুখ দেখার সাহিত্য দর্পণ। এবার একবার নিজেদের দেখুন।

……………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন বিশ্বজিৎ রায়-এর অন্যান্য লেখা

……………………….

Bengali Society Bibhutibhushan Bandyopadhyay Chander Pahar Job crisis mani shankar mukherjee middle class society Robbar Digital Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Satyajit Ray Shankar কত অজানারে ঘরের মধ্যে ঘর জন-অরণ্যে সীমাবদ্ধ

Share this article on