মানুষ হয়তো সবসময় যন্ত্রকে হারাতে পারবে না। সময়কেও থামাতে পারবে না। পৃথিবীর গতি নিজের ইচ্ছেমতো কমাতেও পারবে না। কিন্তু তার নিজের একটি ছন্দ থাকে। সেই ছন্দে একটু থামা থাকে, একটু ভুল থাকে, একটু স্বপ্ন থাকে, আর থাকে অন্য একজন মানুষের পাশে হাঁটার ইচ্ছা। ১৯৩৬-এর চ্যাপলিন সেই ছন্দটুকুর কথাই হয়তো মনে করিয়ে দেন।
‘A story of industry, of individual enterprise– humanity crusading in the pursuit of happiness.’
সুখের সন্ধানে মানুষের এক মহাযাত্রার কথা দিয়ে ‘Modern Times’ শুরু হয়। অথচ পর্দায় তার পরেই যে পৃথিবীটি খুলে যায়, সেখানে মানুষের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে যন্ত্র, সময় আর গতি। একটি বিশাল ঘড়ি। তার কাঁটার নির্দয় চলন। তারপর অসংখ্য মানুষ– একসঙ্গে এগিয়ে চলেছে, যেন প্রত্যেকের আলাদা কোনও গন্তব্য নেই। তাদের গন্তব্য একটাই: কাজ। আর সেই কাজের ভিতরেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে মানুষটি।

চার্লি চ্যাপলিনের ‘Modern Times’ দেখতে বসলে প্রথমে হাসি পায়। তারপর সেই হাসির মধ্যেই কোথা থেকে যেন একটা অস্বস্তি এসে বসে। মানুষটি পড়ে যাচ্ছে, উঠে দাঁড়াচ্ছে, আবার একই কাজ করছে– দৃশ্যগুলো মজার। কিন্তু একটু থেমে দেখলে বোঝা যায়, এই মজার মানুষটির নিজের মতো করে থামার অধিকারটুকুও যেন নেই।
কারখানার conveyor belt শুধু একটি যন্ত্র নয়; সেটি একটি ছন্দ। সেই ছন্দ একবার শুরু হলে মানুষকে তার সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলতে হবে। স্ক্রু ঘোরাতে হবে, হাত চালাতে হবে, আবার হাত চালাতে হবে। একটুখানি দেরি হলেই পিছিয়ে পড়া। সামান্য ভুল হলেই বিপদ। চ্যাপলিনের শরীর ধীরে ধীরে সেই যান্ত্রিক ছন্দের অংশ হয়ে ওঠে। তাঁর হাত যেন আর নিজের ইচ্ছায় নড়ছে না; একটি অদৃশ্য নির্দেশ তাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এখানেই Modern Times-এর ব্যঙ্গটি সবচেয়ে তীক্ষ্ণ। যন্ত্রের– মানুষের কাজকে সহজ করার কথা ছিল। অথচ যন্ত্রের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মানুষটির জীবনই কঠিন হয়ে উঠছে। মানুষ যন্ত্র তৈরি করেছিল নিজের সময় বাঁচানোর জন্য। অথচ সেই যন্ত্রই একসময় মানুষের সময়ের মালিক হয়ে দাঁড়াল।
চ্যাপলিন এই কথাটা কোনও বক্তৃতায় বলেননি। কাউকে দাঁড় করিয়ে সমাজতত্ত্ব বোঝাননি। তিনি শুধু একজন মানুষকে একটি conveyor belt-এর সামনে দাঁড় করিয়েছেন। তারপর সেই মানুষটির হাতকে এত দ্রুত চালিয়েছেন যে দর্শক নিজেই প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়– কাজটা কি মানুষ করছে, না কি মানুষটাই কাজের অংশ হয়ে গেছে?
আরও অদ্ভুত হয়ে ওঠে feeding machine-এর দৃশ্যটি। শ্রমিকের খাওয়ার সময়টুকুও যেন নষ্ট না হয়– এই মহান উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে এমন একটি যন্ত্র, যা মানুষের মুখে খাবার পৌঁছে দেবে। মানুষকে খাওয়ার জন্যও আর কাজ থামাতে হবে না। দৃশ্যটি হাস্যকর। চ্যাপলিনের মুখ, যন্ত্রের অদ্ভুত গতি, একের পর এক বিপত্তি– সব মিলিয়ে দর্শক হাসে। কিন্তু হাসির পরেই প্রশ্নটা এসে দাঁড়ায়: খাওয়ার সময়টুকুও যদি উৎপাদনের পথে নষ্ট হয়ে যাওয়া সময় বলে মনে হয়, তবে মানুষের জীবনে কোন সময়টা সত্যিই তার নিজের?

খাওয়া তো শুধু শরীরের প্রয়োজন নয়। তার মধ্যে একটু থামা আছে, বিশ্রাম আছে, অন্য একজন মানুষের সঙ্গে বসে থাকার অবকাশ আছে। জীবনের এমন কিছু মুহূর্ত আছে যার কোনও উৎপাদনমূল্য নেই, অথচ সেই মুহূর্তগুলিই হয়তো জীবনকে অর্থ দেয়।
চ্যাপলিনের machine সেই ‘অপ্রয়োজনীয়’ সময়টুকুও কেড়ে নিতে চায়। এইখানেই তাঁর কমেডি এত তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। আমরা হাসি, কিন্তু হাসির ভিতরে একটা অস্বস্তি থেকে যায়। কারণ চ্যাপলিন জানেন, সরাসরি যে সত্যি বললে আমরা হয়তো চোখ সরিয়ে নেব, সেটাই যদি হাসির মধ্যে দেখানো যায়, আমরা বরং আরও মন দিয়ে তাকাব।
কারখানায় কাজের গতি বাড়তে থাকে। মানুষের হাত দ্রুততর হয়। সময়ের মূল্য বাড়তে থাকে। কিন্তু সেই বাড়তে থাকা গতির মধ্যে মানুষটির নিজের সময় কোথায়?
একসময় চ্যাপলিনের শরীরই যেন সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে ওঠে। কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও তাঁর হাতের movement থামে না। সামনে যে জিনিস পাচ্ছেন, সেটাকেই যেন screw করে দিতে চাইছেন। কারখানার যন্ত্র তখন আর শুধু কারখানায় নেই; তার ছন্দ তাঁর শরীরের ভিতরেও ঢুকে পড়েছে।

একজন মানুষ যখন নিজের শরীরের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন সেই দৃশ্যকে আমরা হাস্যকর বলে দেখি কেন?
সম্ভবত চ্যাপলিনের comedy-র শক্তি এখানেই। তিনি মানুষটিকে করুণ করে দেখান না; হাস্যকর করে দেখান। কিন্তু সেই হাস্যকরতার ভিতরেই তার অসহায়ত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে বড় কেউ নয়। তার হাতে কোনও ক্ষমতা নেই। তার কোনও বড় বক্তৃতা নেই। সে শুধু কাজ করতে চায়, একটু বাঁচতে চায়, আর কখনও নিজের মতো করে হাসতে চায়।
আর এই সাধারণ মানুষটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে বিশাল machine।

যন্ত্রের কোনও খিদে নেই। তার ক্লান্তি নেই। তার কোনও স্বপ্নও নেই। মানুষের আছে। সম্ভবত এই কারণেই চ্যাপলিনের মানুষটি যন্ত্রের সঙ্গে বারবার হেরে গিয়েও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। তার জীবনে এমন কিছু আছে, যা কোনও যন্ত্র মাপতে পারে না।
কারখানার বাইরে তার জীবন আরও অনিশ্চিত। সেখানে কাজ নেই, নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যৎ নিশ্চিত নয়। কিন্তু সেখানেই তার দেখা হয় গামিন-এর সঙ্গে। গামিনের উপস্থিতি ‘Modern Times’-কে অন্য এক জায়গায় নিয়ে যায়। এতক্ষণ যে মানুষটিকে machine-এর সঙ্গে লড়তে দেখছিলাম, এবার তাকে দেখা যায় আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে।
তাদের কাছে খুব বেশি কিছু নেই। অথচ তাদের একটি স্বপ্ন আছে– একটি ছোট্ট ঘর। সেখানে খাবার থাকবে, একটু নিশ্চিন্তে থাকা যাবে, হয়তো জানালার ধারে বসে বাইরে তাকানো যাবে। স্বপ্নটি খুব বড় নয়।

কিন্তু Modern Times-এর পৃথিবীতে ছোট স্বপ্নই হয়তো সবচেয়ে বড় মানবিক দাবি। কারণ যন্ত্র মানুষকে শেখায় কীভাবে দ্রুত হতে হয়। কারখানা শেখায় কীভাবে একই কাজ বারবার করতে হয়। ঘড়ি শেখায় কখন চলতে হবে, কখন থামতে হবে। কিন্তু একটি ছোট ঘরের স্বপ্নের কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই। সেখানে কোনও সুপারভাইজার নেই। কোনও conveyor belt নেই। সেখানে দু’জন মানুষ নিজেদের মতো করে ভবিষ্যৎ কল্পনা করছে।
এই মুহূর্তে সিনেমাটি যেন খুব নিঃশব্দে তার গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলে ফেলে– মানুষের জীবন শুধু উৎপাদন দিয়ে তৈরি নয়। একটি বাড়ির স্বপ্ন, একসঙ্গে খাওয়ার ইচ্ছা, ক্লান্তির পর একটু বিশ্রাম, কারও পাশে বসে থাকা– এসবের কোনওটাই হয়তো অর্থনীতির ভাষায় বড় কিছু নয়। কিন্তু মানুষের জীবনের ভাষায় এগুলিই মূল্যবান। তাই ‘Modern Times’ কেবল শিল্পায়নের সমালোচনা নয়। এটি মানুষের নিজের জীবনের উপর নিজের সামান্য অধিকার ফিরে পাওয়ার গল্পও।
চ্যাপলিনের চরিত্রটি কখনও যন্ত্রকে পরাজিত করে না। সে কোনও বিপ্লবের নেতা নয়। সে শুধু বারবার সেই যান্ত্রিক ছন্দের বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। কখনও সে ভুল করে। কখনও পড়ে যায়। কখনও পরিস্থিতিকে আরও বিশৃঙ্খল করে তোলে। কিন্তু তার এই ভুল করার ক্ষমতাটুকুই তাকে যন্ত্রের থেকে আলাদা করে।
যন্ত্র ভুল করে না। মানুষ করে। আর হয়তো সেই ভুল করার অধিকারটুকুই মানুষের স্বাধীনতার একটি ছোট্ট চিহ্ন।

সিনেমার শেষে তাই কোনও বড় বিজয় নেই। চ্যাপলিন আর গামিন রাস্তার দিকে হাঁটছে। সামনে তাদের জন্য কোনও নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নেই। পেছনে যা ছিল, তা খুব সুখেরও নয়। তবু তারা হাঁটছে। এই হাঁটার মধ্যে কোনও heroic pose নেই। আছে শুধু এগিয়ে যাওয়ার একরকম জেদ।
সম্ভবত এ কারণেই শেষ দৃশ্যটি এত মনে থাকে। সেখানে কোনও পুরস্কার নেই, কোনও নিশ্চিত ঘর নেই, কোনও সাফল্যের ঘোষণা নেই। আছে শুধু একটি রাস্তা এবং পাশাপাশি হাঁটা দু’জন মানুষ। কারখানা তাকে কাজ দিয়েছিল, কিন্তু জীবন দেয়নি। রাস্তা তাকে নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু নিজের মতো করে হাঁটার স্বাধীনতা দেয়।
আর এইখানেই ‘Modern Times’ তার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যটি রেখে যায়।

মানুষ হয়তো সবসময় যন্ত্রকে হারাতে পারবে না। সময়কেও থামাতে পারবে না। পৃথিবীর গতি নিজের ইচ্ছেমতো কমাতেও পারবে না। কিন্তু তার নিজের একটি ছন্দ থাকে। সেই ছন্দে একটু থামা থাকে, একটু ভুল থাকে, একটু স্বপ্ন থাকে, আর থাকে অন্য একজন মানুষের পাশে হাঁটার ইচ্ছা। ১৯৩৬-এর চ্যাপলিন সেই ছন্দটুকুর কথাই হয়তো মনে করিয়ে দেন।
হয়তো মানুষ হওয়ার অর্থ যন্ত্রকে ধ্বংস করে দেওয়া নয়। হয়তো মানুষ হওয়ার অর্থ– যন্ত্রের সমস্ত শব্দের মধ্যেও নিজের হৃদয়ের শব্দটুকু শুনতে পারা।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved