rituparno ghosh and making of cinema 19she epril | Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

১৯শে এপ্রিল ঋতুপর্ণকে মনে করায়

বাঙালি জীবনে ও বাংলা সিনেমা-শিল্পে ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘১৯শে এপ্রিল’ ছবির প্রভাব অপরিসীম ও সুদূরপ্রসারী। প্রথমত, ঋতুপর্ণের কথাবিশ্ব। ঋতুপর্ণের মতো এমন সাধারণ অথচ ভীষণ রকম ব্যঞ্জনাময় সংলাপ লিখতে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে খুব কম পরিচালক পেরেছেন। অনেকে তর্ক জুড়তে পারেন কেবল সংলাপ কখনও সিনেমাশিল্পের পরাকাষ্ঠা হতে পারে না। হক কথা। সিনেমা সংলাপ, দৃশ্য, সম্পাদনা ও সংগীত নিয়ে গড়ে ওঠে। কিন্তু যে শিল্পীর যে শৈলীতে প্রতিভার প্রস্ফুরণ তা তো উল্লেখ করতেই হবে। কেবল এক ‘থ্যাঙ্কস’ নিয়ে কতরকম কথা আর চরিত্রচিত্রণ যে এই ‘১৯শে এপ্রিল’ ছবিতেই বিধৃত হয়েছে– তা যাঁরা এ-ছবি দেখেছেন তাঁরা জানেন।

Published by: Robbar Digital

Posted:April 19, 2026 11:13 am | Updated:April 19, 2026 11:13 am  
Facebook WhatsApp Messenger

বুবু ট্রাঙ্ক-কল করেছিল মাদ্রাজে (চেন্নাই) যে, মণীশ সেন (বোধিসত্ত্ব মজুমদার) ভোররাত্রে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে গত হয়েছেন। আবার এই বুবুই পিসেমশাইয়ের অনুরোধে ৫০ শব্দের মধ্যে খবরের কাগজের জন্য কলামটা লিখেছিল– ‘সারভাইভড বাই হিজ ওয়াইফ, সরোজিনী গুপ্ত, দ্য ফেমাস ডান্সার’। সবটা ৪৬ শব্দের মধ্যে হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পিসেমশাইয়ের আপত্তি ছিল ওই ‘ফেমাস ডান্সার’ শব্দে। কেন? কারণ, ‘ভালো দেখায় না’।

১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘১৯শে এপ্রিল’ ছবিতে পরিচালক-চিত্রনাট্যকার ঋতুপর্ণ ঘোষ খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রধান চরিত্র সরোজিনী গুপ্ত (অপর্ণা সেন)-এর পেশা হিসেবে নৃত্যশিল্পকে বেছে নিয়েছিলেন। ওই পেশা মেয়েদের জন্য আজও, এই ৩২ বছর পার করেও, খুব সম্মানজনক পেশা নয়। ছবির শুরুতে স্বামী মৃত এবং মেয়ে মিঠু যে বাড়িতে একা এবং সরোজিনী অনুপস্থিত– এই তিনটি দিক শ্লেষাত্মক হয়ে ধরা দিয়েছে। অঘটনের দিন এ-বাড়িতে কেউ চা করছে, কেউ মণীশের মৃতদেহের সামনে বসে, কেউ বলছে, কীভাবে খবরটা শুনে গাড়ি বার করে ড্রাইভার ডেকে এ-বাড়ি পৌঁছল, কেউ মিঠুকে ‘বিস্কিট’ দিয়ে হরলিক্স খাওয়াতে চাইছে, কেউ আবার ওকে গা-স্পঞ্জ করিয়ে দেবে বলছে, কেউ ফোন ধরছে, কেউ কেউ সরোজিনী গুপ্তের পেশাকে কটাক্ষ করে ‘ওসব নিয়ে থাকলেই পারতি শুধু শুধু সংসার করতে গেলি কেন’ বলে দেগে দিচ্ছে, কেউ ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি’ ম্যাগাজিনের কভার-স্টোরিতে প্রকাশিত সরোজিনীর সাম্প্রতিক ছবি নিয়ে ব্যঙ্গ করছে এবং এসবের মাঝখানে দেওয়ালে দেওয়ালে যে সরোজিনীর নানা পোট্রেটের দৃশ্য, তা প্রমাণ করছে আসলে এতগুলো মানুষ সরোজিনীর সংসারের ব্যক্তিগত স্পেসটাতে অতর্কিত হানা দিয়েছে!

zoom
সরোজিনী গুপ্ত-র চরিত্রে অপর্ণা সেন

সরোজিনীকে প্রত্যেকে এখন দু’ভাবে দেখছে– তিনি তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন, অসংসারী আত্মীয়া আর দ্বিতীয়, তিনি ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকা এক রূপবতী-গুণবতী সেলিব্রিটি। চরিত্রলিপি যে পর্দায় আলো-আঁধারে ফুটে উঠছে, তা এককথায় অসাধারণ। আরও অপূর্ব সময়ের অতিবাহন বোঝাতে এই আলো-আঁধারের সঙ্গে মিশে যাওয়া ভরতনাট্যম নৃত্যের বোলবাণী। মাঝে ১৮ বছর পেরিয়ে গিয়েছে– মিঠু আর ছোটটি নেই। এখন এ-চরিত্রে অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়। আজ এই সকালে পাশের ঘরে যে-নাচের ক্লাস চলছে, তা মিঠুর পছন্দ হচ্ছে না। সেই বিরক্তির ছাপ স্পষ্টত তার মুখে ফুটে উঠেছে। সে দিল্লিতে ডাক্তারি পড়া শেষ করেছে সদ্য। সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানেই প্র্যাকটিস করবে। এখন কলকাতায় সে বেড়াতে এসেছে ক’দিন হল। আসার বিশেষ কারণ, তার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী নিজের মতো করে পালন। আজ ১৯ এপ্রিল। ১৮ বছর আগে এদিনই মণীশ হৃদরোগ আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন। মিঠু আজ ঘুম থেকে উঠেছে ভোরবেলা। সকালে শীত-শীত করছিল বলে ফ্যান কমিয়ে রেখেছিল। এখন সে তার বয়াকে বলছে, ফ্যানের হাওয়া বাড়াতে। মিঠু যাকে ‘বয়া’ বলে ডাকে তার আসল নাম বেলা (চিত্রা সেন)। আজ সকালে মিঠু দু’টি কারণে অস্থির– কতক্ষণে বাবার ছবির জন্য মালা আনা যাবে, আর কখন দিল্লি থেকে তার একটা ফোন আসবে। মিঠু তাই চাইছে তার মায়ের, মানে সরোজিনীর গুপ্তের সকালের এই নাচের ক্লাস এবার শেষ হোক।

zoom
১৯শে এপ্রিল ছবির একটি দৃশ্য

ঘরোয়া ডিটেলিং ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমাশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। ময়না বলে মেয়েটার ঘর ঝাঁট দেবার আগে ফ্যান বন্ধ করা, নাচের ক্লাস শেষ বোঝাতে সে-ঘর মুছতে থাকা, বাড়ির ড্রাইভারকে দিনের বাজার করতে পাঠানো, কী কী রান্না হবে সরোজিনীকে বেলার জিজ্ঞেস করা, বেলাকে সরোজিনীর বারবার ঘুঙুরের বটুয়াটা সেলাই করে দেওয়ার কথা বলা এবং এ-বাড়ির আসবাব-শ্বেতপাথর-কাজের লোক-খাবার টেবিল দেখিয়ে এক উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারের ছবি ফুটিয়ে তোলা– সেই ডিটেলিং-এর পরিচয়। তীব্র পর্যবেক্ষণ শক্তি না থাকলে, বাঙালি ঘরোয়া জীবনের এমন নিখুঁত ডিটেলিং সিনেমার পর্দায় উঠে আসতে পারে না। এর পাশাপাশি কেবলমাত্র নাচ শিখিয়ে যে সরোজিনীর এই সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি, তাতে সূক্ষ্মভাবে প্রমাণিত হয় তিনি নামকরা নৃত্যশিল্পী। সুতরাং, এ-প্রশ্ন জাগতে পারে ঋতুপর্ণ ঘোষ, সরোজিনী গুপ্ত চরিত্রের অর্থাৎ বিত্তশালী নারী নৃত্যশিল্পীর সূত্র পেলেন কোথা থেকে? সরোজিনী চরিত্র ব্যবচ্ছেদ করলে বোঝা যায় তিনি তখনকার থাঙ্কমণি কুট্টি, মঞ্জুশ্রী চাকি সরকার, সুতপা তালুকদার, তনুশ্রী শঙ্কর, প্রীতি প্যাটেল কিংবা শর্মিলা বিশ্বাস প্রভৃতি শিল্পীর আদলে গড়ে উঠেছেন। কলকাতার নারী নৃত্যশিল্পীদের ইতিহাস সরোজিনীর মধ্যে নিহিত আছে। ‘১৯শে এপ্রিল’ ছবির বিন্যাস কতিপয় চরিত্র নিয়ে স্বল্পপরিসর হলেও তার ব্যঞ্জনা পুরোনো হলিউডের নয়, তা বলা যায় না। ছবি কিছুটা এগলে, কিংবা মিঠু চরিত্র পর্দায় এসে গেলেও সরোজিনী গুপ্তকে সরাসরি দর্শক পায় খানিক রহস্যের পর। তাঁর পোট্রেট দেখা যাচ্ছে বাড়ি জুড়ে। আলোচনা ও মূল প্লট তাঁকে ঘিরে চলছে, কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল তিনি বাইরের ঘরে ফোন ধরছেন বোঝা যাচ্ছে, কিংবা আলমারির এক পাল্লার ওপার থেকে শোনা যাচ্ছে তাঁর কণ্ঠস্বর। প্রধান চরিত্রের চারপাশে এই রহস্য ঋতুপর্ণ সরাসরি ধার করেছেন সত্যজিৎ রায়ের শিল্প থেকে; আরও স্পষ্ট করে বললে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ থেকে। ঋতুপর্ণের প্রথম ছবি ‘হীরের আংটি’-তেও এই শৈলী উপস্থিত। সরোজিনী যখন শেষমেশ পর্দায় আসেন– কটকী শাড়ি, নিপাট করে বাঁধা চুল, কপালে টিপ আর চটি ফটর ফটর করতে করতে প্রবল আত্মবিশ্বাসী ঢঙে– তখন ক্যামেরার দিকে তাঁর এগিয়ে আসা যেন মনে হয় প্রকৃত ‘হিরো’র প্রবেশ!

zoom
ঋতুপর্ণ ঘোষ

‘কাল্ট’ শব্দের সরাসরি বাংলা প্রতিশব্দ কিছু থাকলে সেই বিশেষণ ‘১৯শে এপ্রিল’ ছবির সঙ্গে জুতে যেতে পারে। আগে দূরদর্শনে রবিবার বিকেল চারটের বাংলা ছায়াছবি হোক, কিংবা কেব্‌ল টিভির সিনেমা হোক, বা আজকের ইউটিউব বা নানা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম– সব কালের, সব বয়সের বেশিরভাগ বাঙালি আজও ঋতুপর্ণ ঘোষ বলতে ‘১৯শে এপ্রিল’ বোঝে। অনেকের এ-ছবির কাহিনি হয়তো মুখস্থ। কিন্তু ঋতুপর্ণের এই ছবি কেবলমাত্র মা-মেয়ের গল্প কিংবা বাড়ির বাইরে কাজ করা নিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের সাংসারিক অসুবিধার চলচ্চিত্র ছিল না। সরোজিনী, মিঠু, বেলা আর সোমনাথবাবু (দীপঙ্কর দে)– এই চারটি মূল চরিত্রের কথোপকথনে ঘেরা ইঙ্গমার বার্গম্যান স্টাইলে জারিত এই চলচ্চিত্র আসলে একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ আর এক মনে-প্রাণে যে শিল্পীমানুষ– এ দু’য়ের অসহজ সহাবস্থানের গল্প হয়ে উঠেছিল। মণীশ আর সরোজিনীর কখনও বনিবনা হয়নি এই কারণেই। মণীশ ডাক্তার হলেও শিল্পী-মানুষ ছিলেন না; অন্যদিকে সরোজিনী প্রথম থেকে নামকরা নৃত্যশিল্পী, আর তারপর তিন বছরের জন্য নাচের মঞ্চ, অনুশীলন– সব ছেড়ে দিলেও যখন ফিরে এলেন, তারপর থেকে নাচ ছাড়া আর কিছু বোঝেননি। মণীশ আর তার মেয়ে মিঠুর মধ্যে তিনি ঢোকেননি, বেলার ওপর সংসারের প্রাত্যহিক সব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন আর ক্রমাগত অর্থ উপার্জন করেছেন মিঠুকে বড় করবেন বলে। অনেকে বলে থাকেন ‘১৯শে এপ্রিল’ নারীবাদী ছবি। মেয়েদের আখ্যান এ-ছবির মূল। কিন্তু এ-সিনেমার সমস্ত কলকাঠি আসলে পুরুষ চরিত্রদের হাতে। মণীশের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মিঠু সারাজীবন তার মা সরোজিনীকে সম্মান করতে পারেনি। সরোজিনীর প্রতিভা, খ্যাতি, রোজগারকে মণীশ যেমন খাটো করেছেন এবং কখনও ঈর্ষা, তেমন মিঠুও সংসারের জন্য মায়ের পরোক্ষ আত্মত্যাগকে কোনওদিন প্রশংসা তো দূরের কথা, ঠাহরই করতে পারেনি। মায়ের মতো হবে না বলে সে দিল্লির ঘরে তার প্রেমিক সুদীপ (প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়) ছেলেটিকে অবলীলায় বিয়ের পর ডাক্তারি না-করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। অথচ তার ‘বেস্ট’ স্কুল-কলেজে ও ডাক্তারি পড়ার খরচ জুগিয়েছেন মা সরোজিনী। এমনকী, সুদীপ তাকে বিয়ে করবে না জেনে সে আত্মহননের পথ বেছে নিতে গিয়েছে– সেক্ষেত্রেও একবার মায়ের কথা সে ভেবে দেখেনি। মণীশ মিঠুকে ‘প্যাম্পার’ করে তাকে একগুয়ে আর জেদি তৈরি করেছে বলে সরোজিনীর বিশ্বাস। সরোজিনী আর মিঠু কাছাকাছি আসতে পারেনি প্রয়াত মণীশ আর কিছুটা সুদীপের জন্য। সরোজিনী আর মিঠু আসলে শেষপর্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ক্রীড়নক হয়ে থেকে গিয়েছে। তাই সরোজিনী সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার পাবার পর যখন বাড়িতে টিভির লোকেরা এসেছে, তিনি ভরতনাট্যমের পোশাক পরে বাইরের ঘরে আসছেন, আর মিঠু সুদীপের ফোন ছেড়ে হাপুস নয়নে কাঁদছে আর তিনি মিঠুকে ‘তা সেজন্য এখানে এভাবে বসে থাকার কী হল’ জিজ্ঞেস করছেন, মিঠু উত্তর দিচ্ছে, ‘হিংসে! হলো?’ সরোজিনীও থামলেন না। ভেজা চোখে প্রত্যুত্তর দিলেন, ‘সেটা আর নতুন কী!’ সরোজিনীর সাফল্যে যে পরিবারের কেউ কখনও খুশি হয়নি, তা সরোজিনীর সহ্য হয়ে গিয়েছে– কোনও কিছু আর নতুন লাগে না।

zoom
১৯শে এপ্রিল ছবিতে দেবশ্রী রায় ও অপর্ণা সেন

বাঙালি জীবনে ও বাংলা সিনেমা-শিল্পে ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘১৯শে এপ্রিল’ ছবির প্রভাব অপরিসীম ও সুদূরপ্রসারী। প্রথমত, ঋতুপর্ণের কথাবিশ্ব। ঋতুপর্ণের মতো এমন সাধারণ অথচ ভীষণ রকম ব্যঞ্জনাময় সংলাপ লিখতে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে খুব কম পরিচালক পেরেছেন। অনেকে তর্ক জুড়তে পারেন কেবল সংলাপ কখনও সিনেমাশিল্পের পরাকাষ্ঠা হতে পারে না। হক কথা। সিনেমা সংলাপ, দৃশ্য, সম্পাদনা ও সংগীত নিয়ে গড়ে ওঠে। কিন্তু যে শিল্পীর যে শৈলীতে প্রতিভার প্রস্ফুরণ তা তো উল্লেখ করতেই হবে। কেবল এক ‘থ্যাঙ্কস’ নিয়ে কতরকম কথা আর চরিত্রচিত্রণ যে এই ‘১৯শে এপ্রিল’ ছবিতেই বিধৃত হয়েছে– তা যাঁরা এ-ছবি দেখেছেন তাঁরা জানেন। ঋতুপর্ণ চরিত্রের মুখে এমন সংলাপ বসাতে পারতেন যা আমাদের বাঙালি বাস্তব জীবনে হয়তো অনেকবার শোনা, কিন্তু সিনেমায় কী আশ্চর্যভাবে তা খোলতাই হত তা ভাবতে অবাক লাগে। এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবে ঋতুপর্ণের এই শৈলী বোধ করি তৈরি হয়েছিল সিনেমাশিল্প থেকে নয়, সম্পূর্ণ রেডিও-নাটক থেকে। একেকটি সংলাপের ওই রকম বিরতি, নিঃশ্বাস ও বিস্তার সিনেমার উত্তরাধিকার নয়। এ কেবল রেডিও-নাটকের অবদান হওয়া সম্ভব। এই সংলাপশৈলী পরবর্তীকালে বাংলা সিরিয়ালকেও মারাত্মক প্রভাবিত করেছিল। ঋতুপর্ণ এরপরেও বহু ছবি করবেন, কিন্তু তাঁর অননুকরণীয় কথাবিশ্ব তৈরি হয়েছিল ‘১৯শে এপ্রিল’ থেকে, এমন বললে অত্যুক্তি হয় না। ‘১৯শে এপ্রিল’ শব্দরাজি বাঙালি দর্শকের মনে আজও অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে।

রাত্তিরের খাওয়া সেরে সরোজিনী আর মিঠুর বসা হয়েছে মিঠুর ঘরে। তখনও লোডশেডিং। দু’জনেই খুব ক্লান্ত। সরোজিনী, মিঠুর টেবিল গোছাতে গিয়ে আবিষ্কার করেন চিঠি আর অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ। তিনি না ফিরলে আজ মিঠু আত্মহত্যা করত! মা-মেয়ের প্রচণ্ড রকম বচসা হয়। সরোজিনী রাগে, অভিমানে, অসহায়তায় মিঠুকে একটি চড় মারেন। মিঠু পুরনো কথা তুলতে বারণ করে মাকে। কিন্তু সরোজিনী সমস্ত কথা আজ শুনবেন এবং শোনাবেন বলে ঠিক করেন। সবকিছু আজ পরিষ্কার হওয়া দরকার। এমন সময় আলো ফেরে। বেডল্যাম্পের পাশে মণীশের মালা-দেওয়া ছবিটা দেখে সরোজিনীর আজকের তারিখটা খেয়াল পড়ে। তিনি স্বগতোক্তির মতো বলেন, ‘আজ নাইনটিন্থ?’ এতক্ষণ ধরে টেবিলের ওপরে জ্বলা মোমবাতিটি এক ফুঁয়ে নিভিয়ে ক্লান্ত গলায় মিঠু বলে, ‘এখন টুয়েনটিয়েথ!’

প্রতিটি উনিশে এপ্রিল আমাদের ঋতুপর্ণ ঘোষ (১৯৬৩-২০১৩) এবং তাঁর সিনেমাশিল্পকে মনে করিয়ে দিয়ে যায়। আমরা সেই স্মৃতিতে অনেক প্রহর থেকে যেতে চাই। তাঁর শিল্পের প্রভাব বাঙালি জীবনে নেভার নয়।

১৯শে এপ্রিল Aparna Sen Debashree Roy Rituparno Ghosh Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on