Fish-Eating Ghost in Bengali Folklore and Cultural residue | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাঙালির মাছের লোভই মেছোভূতের প্রাণ

বাংলার সামাজিক-অর্থনৈতিক ইতিহাসও এই ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ঔপনিবেশিক সময়ে এবং তার আগেও বাংলায় খাদ্যসংকট, দুর্ভিক্ষ এবং দারিদ্রের অভিজ্ঞতা বারবার ফিরে এসেছে। বিশেষ করে মন্বন্তর, বন্যা, খরা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ঘটনা খাদ্যের মূল্য এবং তার প্রতি আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে তুলেছিল।

প্রচ্ছদের আর্টওয়ার্ক: নারায়ণ দেবনাথ

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১৯:৩৪   
Facebook WhatsApp Messenger

ভূত মানুষের থেকে বেশি খায়, গল্পে কথায় বারবার তাই শুনে আসি। চলে যাওয়া মানুষের প্রিয় খাবার রান্না করতে বা খেতে গিয়ে অস্বস্তিও হয়। আমাদের সামাজিক গঠনে বা সংস্কৃতিতে ভূত যেমন কেবল ভয় দেখানোর উপকরণ হিসেবেই চিহ্নিত না, ঠিক তেমন মাছের উপস্থিতিও কেবল খাদ্যাভ্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক চিহ্ন, যা অর্থনীতি, ভূগোল, লোকবিশ্বাস এবং মানসিক গঠনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার জলবহুল পরিবেশে গড়ে ওঠা বাংলার সমাজে মাছ সহজলভ্য প্রোটিনের উৎস হিসেবে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই এটি সামাজিক আচার, ধর্মীয় অনুষঙ্গ এবং প্রতীকী বিন্যাসের মধ্যেও এক বিশেষ স্থান অধিকার করে। এই বাস্তবতারই এক সাংস্কৃতিক প্রতিফলন দেখা যায় মেছোভূতের ধারণায়– যেখানে মাছের প্রতি আকর্ষণ মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে।

zoom
সত্যজিৎ রায়ের আঁকায় বিভিন্ন যুগের ভূত

লোকসংস্কৃতির আলোচনায় ‘মেছোভূত’-কে সাধারণত এমন এক অতৃপ্ত আত্মা হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল মাছের প্রতি অদম্য লোভ। কিন্তু এই বর্ণনাকে যদি নৃবিজ্ঞান ও লোকসাহিত্য তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে এটি কেবল এক ভৌতিক কল্পকাহিনি নয়; বরং একটি সাংস্কৃতিক আচরণের প্রতীকী রূপ। ব্রোনিস্লভ মালিনোভস্কির কার্যকারণবাদী (functionalism) দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, লোককথা সমাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং চাহিদার প্রতিফলন। সেই অর্থে মেছোভূত হল বাংলার মানুষের দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস এবং তার সঙ্গে যুক্ত মানসিক নির্ভরতার এক রূপক প্রকাশ।

zoom
ব্রোনিস্লভ মালিনোভস্কি

এখানে ‘মাছ’ একটি বস্তুগত বাস্তবতা হলেও, তা ধীরে ধীরে প্রতীকী অর্থ ধারণ করেছে। বাঙালির জীবনে মাছের ব্যবহার লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এটি কেবল দৈনন্দিন খাদ্য নয়; বরং বিবাহে কনের বাড়িতে বড় মাছ পাঠানো, উৎসবে বিশেষ মাছ রান্না, কিংবা পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে নিবেদন– এই সমস্ত আচার-অনুষ্ঠানে মাছ এক সাংস্কৃতিক সংকেত হিসেবে কাজ করে। নৃবিজ্ঞানী ক্লদ লেভি-স্ট্রসের ‘culinary triangle’ ধারণা অনুযায়ী, খাদ্য কেবল ভৌত উপাদান নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ভাষা। সেই ভাষায় মাছ বাঙালির পরিচয় বহন করে।

zoom
নৃবিজ্ঞানী ক্লদ লেভি-স্ট্রস ও তাঁর বিখ্যাত বই

এই প্রেক্ষাপটে মেছোভূতের ধারণা এক ধরনের ‘cultural residue’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অর্থাৎ, মানুষের জীবদ্দশার অভ্যাস, আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক বাস্তবতা মৃত্যুর পরও গল্পের মাধ্যমে বেঁচে থাকে। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, অভ্যাস (habit) এবং আকাঙ্ক্ষা (desire) মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে গভীর ছাপ ফেলে। যদিও শারীরিক মৃত্যুর সঙ্গে সেই স্নায়বিক কার্যকলাপের অবসান ঘটে, তবুও সংস্কৃতি সেই অভিজ্ঞতাগুলিকে প্রতীকী আকারে সংরক্ষণ করে। ‘মেছোভূত’ সেই সংরক্ষণেরই একটি উদাহরণ– যেখানে মাছের প্রতি আকর্ষণ একটি ‘unfinished desire’ হিসেবে প্রতিফলিত হয়।

zoom
স্বপনকুমারের বইয়ের প্রচ্ছদে ‘মেছোভূত’। শিল্পী: নারায়ণ দেবনাথ

এছাড়া, বাংলার সামাজিক-অর্থনৈতিক ইতিহাসও এই ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ঔপনিবেশিক সময়ে এবং তার আগেও বাংলায় খাদ্যসংকট, দুর্ভিক্ষ এবং দারিদ্রের অভিজ্ঞতা বারবার ফিরে এসেছে। বিশেষ করে মন্বন্তর, বন্যা, খরা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ঘটনা খাদ্যের মূল্য এবং তার প্রতি আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে তুলেছিল। এই বাস্তবতায় মাছ কেবল স্বাদের বস্তু নয়; এটি ছিল বেঁচে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। ফলে, মাছের প্রতি আকর্ষণ এক ধরনের অস্তিত্বগত প্রয়োজন হয়ে ওঠে, যা লোককথায় অতিরঞ্জিত হয়ে মেছোভূতের রূপ ধারণ করে।

zoom
ভুষণ্ডীর মাঠের ভূত। শিল্পী: যতীন্দ্রকুমার সেন

লোকবিশ্বাসে মেছোভূতের আচরণ– যেমন রাতে মাছ চুরি করা, জেলেদের নৌকায় ভিড় করা, বা রান্নাঘরে ঢুকে পড়া, মাছ কিনে ফেরায় মানুষের পিছু নেওয়া– এই সবই আসলে সামাজিক অভিজ্ঞতার প্রতীকী পুনর্নির্মাণ। এগুলিকে যদি ‘symbolic enactment’ হিসেবে দেখা যায়, তবে বোঝা যায়, সমাজ তার অভাব, আকাঙ্ক্ষা এবং অভ্যাসকে গল্পের মাধ্যমে পুনরাবৃত্তি করছে। এখানে ভূত বাস্তব সত্তা নয়; বরং একটি সাংস্কৃতিক ভাষ্য, যার মাধ্যমে মানুষ তার অভিজ্ঞতাকে ব্যাখ্যা করে।

তবে এই ব্যাখ্যার মধ্যে কেবল যুক্তি নয়, রয়েছে এক ধরনের নান্দনিকতা এবং হাস্যরসও। মেছোভূতকে প্রায়ই বোকা বানানো যায়, তাকে মাছ দিয়ে ফাঁদে ফেলা যায়– এই ধরনের গল্পগুলি দেখায়, বাঙালি তার ভয়ের সঙ্গেও এক ধরনের সাংস্কৃতিক সমঝোতা গড়ে তোলে। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ‘uncanny’ ধারণা অনুযায়ী, ভয়ের সঙ্গে পরিচিতির একটি সূক্ষ্ম সম্পর্ক থাকে। মেছোভূত সেই ‘uncanny familiarity’-রই উদাহরণ– যেখানে ভয় এবং দৈনন্দিনতা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।

zoom
সিগমুন্ড ফ্রয়েড ও তাঁর বই ‘The Uncanny’

সবশেষে বলা যায়, মেছোভূতের ধারণা বাংলার সংস্কৃতিতে মাছের গভীর প্রভাবকে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এটি দেখায়, কীভাবে একটি সাধারণ খাদ্যবস্তু ধীরে ধীরে একটি জটিল সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়, এবং সেই প্রতীক মৃত্যুর পরও গল্পের মাধ্যমে জীবিত থাকে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মেছোভূত কোনও অতিপ্রাকৃত সত্তা নয়; এটি বাঙালির সমষ্টিগত স্মৃতি, অভ্যাস এবং আকাঙ্ক্ষার এক বহুমাত্রিক প্রতিফলন।

Bengali Folklore Bronislaw Malinowski Claude Lévi-Strauss culinary triangle cultural residue fish-eating ghost Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar sigmund freud মেছো মেছোভূত

Share this article on