
দেশপ্রেমই তো জুড়েছিল অতীন আর এলাকে, আবার দেশপ্রেমীদের গোষ্ঠী আর তার নিয়মাবলি, তার কঠোর মুখাবয়ব যখন ধারালো হয়ে উঠল, তাদের মিলনের সবচেয়ে বড় বাধা হল সে-ই। ঠিক চার অধ্যায়ের উল্টোপিঠে রইল ‘ঘরে বাইরে’। যেখানে নিখিলেশ আর বিমলার মধ্যে দূরত্ব রচে দিল দেশপ্রেমী সন্দীপ! কেননা রবীন্দ্রনাথ ‘ঘরে বাইরে’-র সন্দীপের মধ্যে আঁকতে চেয়েছিলেন স্বদেশি বিপ্লবীদের সেই সত্য ও নিষ্ঠুর ছবি। মায়ামোহাঞ্জনভরা দৃষ্টিতে নয়, সব ইল্যুশন সরিয়ে দেখা।
প্রেম তো আসলে এক সাঁকো!
আর দেশপ্রেম বা ছোট আকারের গোষ্ঠীপ্রেম? তা কি রোমিও-জুলিয়েটের মধ্যেকার সেই ঝুলবারান্দা? যা প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে রচে তুলছে অসেতুসম্ভব দূরত্ব?
অথচ, তা তো হওয়ার কথা ছিল না। দেশপ্রেমই তো জুড়েছিল অতীন আর এলাকে, আবার দেশপ্রেমীদের গোষ্ঠী আর তার নিয়মাবলি, তার কঠোর মুখাবয়ব যখন ধারালো হয়ে উঠল, তাদের মিলনের সবচেয়ে বড় বাধা হল সে-ই। ঠিক চার অধ্যায়ের উল্টোপিঠে রইল ‘ঘরে বাইরে’। যেখানে নিখিলেশ আর বিমলার মধ্যে দূরত্ব রচে দিল দেশপ্রেমী সন্দীপ! কেননা রবীন্দ্রনাথ ‘ঘরে বাইরে’-র সন্দীপের মধ্যে আঁকতে চেয়েছিলেন স্বদেশি বিপ্লবীদের সেই সত্য ও নিষ্ঠুর ছবি। মায়ামোহাঞ্জনভরা দৃষ্টিতে নয়, সব ইলিউশন সরিয়ে দেখা। মিথ-ভালোবাসা বাঙালির মাথায় যেটা আসবেই না, স্বীকার করতেই পা কাঁপবে– এক স্বদেশির একবগ্গা, ডগম্যাটিক একটা চারিত্র্য। মানুষী দুর্বলতা, মানুষী ক্ষুদ্রতার ওপরে এক অতিমানবিক মুখোশ পরে, যা ঘুরে ঘুরে বেড়ায় আর চারিদিকে নিজেকে জাহির করে। গরিব মুসলমানের বিক্রি হওয়া মিলের কাপড় টেনে আগুনে ফেলে দেশমাতার পূজায়। ডবল স্ট্যান্ডার্ডে ভরপুর এই দেশপ্রেমকে চিরেফেঁড়ে দেখতে চেয়েছেন রবি।

কী ভীষণ এই দেখা। রবীন্দ্রনাথের এই দেখা। নিজের সমসময়ে বসে যেদিকে সব মানুষ ছুটে চলেছে তার বিপরীতমুখে এই রচনা, যা বলে চলে বারবার, জাতীয়তাবাদ যদি মানবতার বিরোধী হয়ে ওঠে, তবে তা ভুল। সে যুগের লিবারাল রবি আজকের দিনে এসে, কী ভাষায় ট্রোলড হতেন, ভাবতেই পারি না! আর এখানেই তিনি আন্তর্জাতিক।
‘আমি অনেক সময়েই ভাবতাম আমরা একে অপরকে এখনো জানিই না।
কারণ তুমি নিজের অতীতের কথা প্রায় কিছুই বলতে না, বা বললেও খুব অল্প। আর, আমি তো, কথাই বলতে পারি না!
কিন্তু তোমার ব্যাপারে একটা জিনিস আমাকে অবাক করেছে। তোমার একটা চমৎকার বাড়ি আছে, পরিবারের সবাই আছে। বাবা মা ভাইবোন। তবু তুমি একা হতে, একা থাকতে চাও।’
একাকিত্বের সেতু। সেই টানে অল্প কিছুদিনের জন্য বাঁধা পড়েছিল দু’টি মন। দু’টি মন পরস্পরকে খুঁজে নিয়েছিল যুদ্ধের আবহে। ইংগেবর্গ বাখম্যান, পরে হবেন অস্ট্রিয়ার অন্যতম মুখ, সাংস্কৃতিক জগতের বিশ্বযুদ্ধোত্তর প্রতিভূ, তিনি তরুণী তখন। ১৯৪৫-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সময়ে সে মেয়ের একমাত্র পরিচয়, সে নাৎসি পার্টির সদস্যের কন্যা। বাবা নাৎসি পার্টিতে নাম লেখানো অধ্যাপক। মেয়েটির ঘৃণা হয়, বাবা ও তাঁর প্রজন্মের প্রতিটি তথাকথিত ইন্টেলেকচুয়ালের ওপরে। কেননা, তাঁরা ছোটদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, লড়াইখ্যাপা এই মানুষগুলো মারাত্মক অন্ধ।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিত্রশক্তির সেনা এসে প্রকৃত অর্থেই থানা গেড়ে বসে তাদের গ্রামে। শুরু হয় যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত করা। সেখানেই, ব্রিটিশ সেনার সদস্য জ্যাক হামেশের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ। প্রথম প্রশ্ন করেছিল হামেশ, মেয়েটিকে, তুমি কি জার্মান গার্লস লিগ-এর সদস্য? এই লিগ, বুঁদ ডয়েচর মেডল, ছিল নাৎসি হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ। ছাত্রলিগ। সেই লিগে নাম লেখায়নি ইংগেবর্গ। তাদের মিটিংয়েও যায়নি। সে কথা বলতে গিয়ে সে কেঁপে ওঠে, ঘেমে ওঠে, লাল হয়ে ওঠে। এই ব্যাপারটা তার মনে হয়েছিল তার নিজের দুর্বলতা। ‘সত্যি বলতে গিয়ে কেন যে এত রাঙা হয়ে উঠি!’ কিন্তু আসলে, জ্যাকের সামনে নিজের ওই নাৎসি পরিচিতির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদেই যে সে এত সন্ত্রস্ত হয়েছিল, তা বুঝতে বাকি থাকে না।
জ্যাক নিশ্চিত অন্তর দিয়ে বুঝতে পারেন সত্যিটা। তাই তার পরদিন থেকে গ্রামের বাসিন্দা এই শিক্ষিতা তরুণীর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব শুরু হয়ে যায়। উভয়পক্ষই অবাক হয়ে যান। তাদের প্রথম কথোপকথন হল বই নিয়ে, এবং সেখানে কী কী বই তিনি পড়েছেন, বলতে গিয়ে তিনি টমাস মান, জুয়াইখ, শিন্টসলার এবং হফমানস্থালের কথা বললেন, আর হামেশ বিস্মিত হলেন এমন কারওকে খুঁজে পেয়ে, যে, এইসব বই পড়েছে, যদিও তার বড় হয়ে ওঠা একটা নাৎসি পরিমণ্ডলে। তাঁর ডায়েরি দেখিয়ে দিল, কত মন দিয়ে তিনি হামেশের কথা শুনেছেন এবং তার সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবনের গল্প শুনেছেন। তাঁর বিবরণে, ১৪ জুনের মিটিংয়ের শেষটা ছিল একটা স্বপ্নের ছবি, ধ্বংসাত্মক সর্বনাশের শেষে আবার নতুন করে মিলিত হওয়ার ছবি। ঠিক যেমন একটা ছবি শাগাল হয়তো আঁকতে পারতেন, কিন্তু আঁকেননি। যখন ১৯৩৮-এ অস্ট্রিয়া থেকে বিতাড়িত একজন ইহুদি তাঁর হাতে চুম্বন করল, এবং কারিন্থিয়িয়ান নাৎসি পরিবারের ১৮ বছরের মেয়েটি একটা আপেল গাছের ডালে উঠে বসে রাত্রিতে আনন্দের অশ্রুপাত করতে করতে ভাবল, এই হাত সে কখনও ধুয়ে ফেলবে না!
জীবনের শ্রেষ্ঠ বসন্ত ও গ্রীষ্ম, তাঁর সেই স্বল্প দিনের সম্পর্ককে এভাবেই অভিহিত করেছিলেন বাখম্যান। আর পরবর্তী প্রেমপত্রে হামেশ লেখেন,
‘আমার কেমন মনে হয় তুমি আমি যেখানে এসে মিলেছি, তা এই একা হবার বাসনায়।
…
আমার পথ তো আমাকে আবার অন্য কোথাও ভাসিয়ে নিয়ে যাবেই। এখন সে কথা ভাবতে আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে। তবে যখন ঘটনাটা বাস্তবে পরিণত হবে তখনই একমাত্র বুঝতে পারব, সেটা ঠিক কতটা কঠিন দাঁড়ায়, তোমাকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে থাকা।’
গল্পের মতো এই সম্পর্কটা কোনও হলোকস্ট বিষয়ক চলচ্চিত্র নয়, বাস্তব। তাই বাখম্যানের ‘ওয়ার ডায়েরি’ বিমূঢ় করে।

‘আমার ভবিষ্যৎটা আমার কাছে এখন এক ভয়াবহ প্রহেলিকাময় আবর্ত।… তুমি, তোমার চিন্তাই আমাকে বাঁচাবে। তোমার কথা ভাবলেই, নিশ্চিতভাবেই অনেক বাধা পেরনোটা সহজ হয়ে আসবে।’
ওপরের লাইনগুলো প্রকৃত প্রেমের কথা। আর সেই কথার আলো ১৯৪৬ থেকে আসে, কিন্তু আলোর জোর কমে না।
এভাবেই, দুই সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর রাজনীতির অবস্থান থেকে প্রেম? বা বিবদমান দু’টি দেশের মধ্যে? আমরা কি যুদ্ধরত পাকিস্তান আর ভারতের প্রেমগাথা লিখি? ভাবি? ভাবি না তো, অনেক প্রাচীন কোন গাথার, লায়লা মজনু বা হীর-রঞ্ঝাকে আবার নতুন করে রচনা করতে।
আজ আর আমরা অভ্যস্ত থাকি না হিন্দু-মুসলমান পুরুষ নারীকে নিয়ে লেখা আখ্যান পড়তে। জসীমউদ্দিনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ ভুলে যাই। নতুন করে সোজন ও দুলির প্রেমের গল্প লেখার কথা কি ভাবি কেউ?
১৩২১ সনে শৈলবালা ঘোষজায়া দরিদ্র মুসলিম যুবকের সঙ্গে হিন্দু মেয়ের প্রেম দেখালেন ‘শেখ আন্দু’ উপন্যাসে। প্রবাসীর পাতা থেকে সে কাহিনি দাবানলের মতো বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
প্রেম নয় উপজীব্য তবু মানবিক বোধের কাহিনি, জ্যোতির্ময়ী দেবীর কলমে ‘এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা’-র মতো লেখাকে মনে পড়ে কি? যেখানে নোয়াখালি থেকে দাঙ্গার কালে সুতারাকে আশ্রয় দেন তমিজচাচার পরিবার। ছ’ মাসের ওপর। আর সে কারণে সে তার নিজের সমাজে চিহ্নিত ও বর্জিত হয়। সে কলকাতায় এলে তার দাদার শ্বশুরবাড়িতে তাকে থাকতে দিলে ঘর ‘নোংরা’ হয়। এই কাহিনিও ভুলে যাই আজ আমরা। অথচ এখনই বোধহয় সবচেয়ে বেশি মনে করার কথা ছিল এইসব কাহিনি।
আমরা কি কেউ ইদানীং দুই পৃথিবীর প্রেমের কথা ভেবেছি? আমাদের সমসময়ে পেয়েছি কি দেশপ্রেম বনাম প্রেমের আখ্যান? আমরা কেউ লিখছি, দুই প্রেমিক-প্রেমিকার একজনের হঠাৎ বদল, হঠাৎ মনোভঙ্গি পাল্টে যাওয়া, একে-অপরকে দাগিয়ে দেওয়া ‘চাড্ডি’ বলে অথবা ‘সেকুমাকু’ বলে?
ভাবিনি, ভাবতে যে পারি না আজ আর, তার কারণ চারিদিকের নতুন করে ঘনিয়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার বলয়ে লেখকদের আর মন নাই, কুসুম! নিরাপত্তায়, সফট অপশনে, আমরা বসে আছি কুয়োতে। ভয়ে ঢেকে গিয়েছে আমাদের অন্তর্দৃষ্টি, আমাদের চাওয়াপাওয়া। বাংলার বুকেও যে মেঘ কিছুমাত্র বেমিল নয়। না-হলে কথায় কথায় নানা উসকানির ফুলকিতে, নানা দিকে ছড়ায় না উত্তেজনার আগুন, বাজে না বিপদঘণ্টি বারবার।
………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন যশোধরা রায়চৌধুরী-র অন্যান্য লেখা
………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved