

আশিতেই আমরা রামরাজত্ব দেখেছিলাম কি না? খবরের কাগজে পড়েছিলাম, রামচন্দ্রের ভূমিকায় অভিনয় করা অরুণ গোভিল ট্রেনে কোথায় একটা যাচ্ছিলেন। তো তাঁকে দেখে একদল বয়স্ক লোক কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, রাবণকে সেটে চা-বিস্কুট খেতে দেখে দৌড়ে এক বালক পালিয়েছিল ‘বাবা রে, রাবণ চা খাচ্ছে’ বলতে বলতে, লঙ্কায় যুদ্ধের দৃশ্যের শুটিংয়ের সময় মারাত্মক ধোঁয়া তৈরি করায় অভিনেতারা কাশতে কাশতে ডায়ালগই ভুলে যাচ্ছিলেন।
আমার বন্ধু ভোলা এখন নামকরা ডাক্তার। ডাবলিনে অনেক বছর চাকরি করে কলকাতায় ফিরে এসে আমার মুখোমুখি হয়ে হালফিলে কবে একটা পুরনো গল্প খোঁড়াখুড়ি করতে বসেছিল। তাতে ওর মনে হল, আমি এখন ‘বিনাইন সেনেসেন্ট ফরগেটফুলনেস’ অসুখে ভুগছি। আস্তে আস্তে সেটা আলঝেইমার্স হয়ে যাবে। সবশেষে ডিমেনশিয়া। এখন নিজের বাবার জন্মদিন কবে মনে করতে পারছি না, তখন আমি না কি ভোলাকেও চিনতে পারব না।
ভোলার খোঁড়াখুড়িটা শুরু হয়েছিল সেদিনের আড্ডায় নাকের সামনে খবরের কাগজ মেলে ধরে জেলখানায় একটা চোখ বন্ধ হওয়া শ্রী-হীন ইমরান খানের ফটো দেখতে দেখতে। ভোলা অনেক করে আমায় মনে করানোর চেষ্টা করল, আশি সালে জানুয়ারি মাসে দমদম এয়ারপোর্টে ইমরান খানকে দেখতে যাওয়ার কথা। বাংলাদেশে খেলতে যাবে পাকিস্তান। দমদমে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে যাবে। ক্যাপ্টেন আসিফ ইকবাল শুধু দলের সঙ্গে আসেননি। হায়দরাবাদে মামাবাড়িতে গেছেন। বাকিদের এদিক-ওদিক দেখা যাচ্ছে। ভোলা ইমরানকে আবিষ্কার করেছিল একটা টেলিফোন বুথে। সত্যিই! ওর মনে আছে, পরদিনের কাগজে লেখা হয়েছিল, ইমরান চাপা গলায় ‘ফিসফিসিয়ে’ অনেকক্ষণ কথা বলেছিলেন আর পাঁকাল মাছের মতো কেবলই পিছলে পিছলে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

সত্যিই আমার কিছু মনে থাকে না তো, তাই ভোলাকে বললাম, কোন কাগজ? ভোলা তো ভুলো নয়, তাই কিছুই ভোলেনি, নামও বলে দিল কাগজটার। এও বলল, সেদিনের সেই কাগজের সাংবাদিক দূর থেকে দেখেই দিব্যি বুঝতে পেরেছিলেন, এয়ারপোর্টের সোফায় বসে করাচির বাড়ির ঠিকানায় বিশাল বড় চিঠি লিখে যাচ্ছেন সাদিক মহম্মদ। অনেকদিন দেশে চিঠি দেওয়া হয়নি তো! ডিজিটাল জঙ্গল ঘাঁটাঘাটি করে আমি কিন্তু সেদিনের কাগজটা রীতিমতো পেয়ে গেলাম। দেখি সত্যিই প্রথম পাতায় ইমরানের টেলিফোনে কথা বলার ছবি। তার নিচে ক্যাপশন: ‘বন্ধু না বান্ধবী? বিমান থেকে নেমেই ফোনের গরজ। দমদমে পাক ক্রিকেট দলের হিরো ইমরান খাঁ।’ আমি সবকিছু ভুলে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু মনে মনে অনেক কিছু কল্পনাও করে নিতে পারছি। তাতে দেখলুম, হলুদ নিউজপ্রিন্টের মোলায়েম প্যাডে স্পোর্টস এডিটর ক্যাপশন লেখা শেষ করেই নাকে নস্যি ঠেসে পাশের লোকটিকে তা পড়ে শোনাচ্ছে, তাতে দু’জনের কী সাংঘাতিক হাসি-আহ্লাদ!
তো আমায় যে এখনও পুরোপুরি ‘বিনাইন সেনেসেন্ট ফরগেটফুলনেস’ গ্রাস করেনি তা প্রমাণ করতে বললাম, কোথায় নেতাজি ইনডোরের সামনে ‘ইয়ারানা’র শুটিং করতে আসা অমিতাভকে তো ভুলিনি। ভোলা বলল, সে তো ভুলিসনি ডান্ডা খেয়েছিলি বলে, না হলে সেটাও ভুলে যেতিস। তো সারা জমানা তখন অমিতাভ বচ্চনের দিওয়ানা। সাড়ে চার ফুটের আমার আর এক বন্ধু বুবাইয়ের তখন কানঢাকা চুল। ওই ব্যাটাকে সঙ্গ দিতে গিয়েই ইন্ডোরের সামনে সেদিন মাউন্টেড পুলিশের ডান্ডার খোঁচা খেয়েছিলাম। দেখি কী, যেমন নোটন, আমার দিদির মেয়ে, ওর বর অর্ণবের ছবিতে ডনের লুক বানিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছে, তেমনই বুবাইয়ের ক্রিকেটার ছেলেও ওর বাবাকে টুনি লাইট লাগানো জ্যাকেট পরিয়ে তলায় লিখেছে, ‘আমার ড্যাডিকে দেখুন’।

নোটনকে বললাম– ব্যাপারটা কী রে? নোটন বলল, ‘রেট্রো গো রেট্রো… আশির দশকের ভিন্টেজ লুক গো। চুল পাফ করিয়ে আমিও ছবি ছাড়ব, হলিউড, বলিউড সব উডেই চলছে এমনটা, ছবির অ্যানালগ ক্যামেরার গ্রেইন আর সামান্য ফ্যাকাসে রং মেখে নিচ্ছে প্রত্যেকে, তুমিও মেখে নাও দেখি…।’
মেখে তো নেব, কিন্তু কী মেখে নেব? আশির কলকাতাতেই শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের নতুন উপন্যাস ‘চন্দনেশ্বর জংশন’ কিনেছে শুভ। সেও আমার বন্ধু। তখনকার ১২ টাকার উপর টোয়েন্টি পার্সেন্ট ছাড় পেয়েছে, প্রথম ২০০ বইয়ে লেখকের সই, শুভ সেই ২০০ জনের একজন, সুনীল হওয়ার স্বপ্নে চুর শুভকে দ্যাখে কে! তখন তো ট্রোল কাকে বলে জানতাম না, জানতাম রগর, আমরা শুভকে নিয়ে সেটাই করেছিলাম মনে আছে। কিন্তু এই সব ফূর্তির কী রং বুঝতে পারছি না, সে রং মাখলে আমাকে কেমন লাগবে তাও সিওর নই।

তো সেই আশিতেই কাগজে পড়েছিলাম আসামে বাঙালির বিপদের ঘনঘটা। তখনও সেই একই গল্প– রাইটার্সে জ্যোতিবাবুর সঙ্গে আলোচনায় বসেছে জর্জ ফার্নান্ডেজ, কিছু একটা করতে হবে। সেখানে ছিলেন রাজ্যের এক প্রতিমন্ত্রী। রাম চ্যাটার্জি। কাগজে লেখা হত ‘রামবাবু’। প্রতিমন্ত্রীমশাই সটান জর্জকে প্রশ্ন করছেন, ‘বাঙালিরা যে অন্য রাজ্যের সর্বত্র তাড়া খাচ্ছে, মার খাচ্ছে, বাঙালিদের অবস্থা যে ইহুদিদের মতো কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে আপনি কী বলেন?’ তাতে জর্জ নিরুত্তর। সে খবর পড়ে সে কী আমোদ আমাদের… কিন্তু হর্ষ জাগায় এমন খবরের কী রং সত্যিই জানি না। জানি না বলেই ভিন্টেজ লুকটা কিছুতেই আনতে পারছি না, কী বিপদ!
আশিতে ‘আসিয়াছিল’ রামানন্দ সাগরের রামায়ণ। ঘরে ঘরে। হিমানীশ গোস্বামী লিখেছিলেন, টিভির সামনে আমরা না কি শিশুর মতো অসহায়। সুধীর মৈত্র ছবি এঁকেছিলেন নবজাতক অয়েলক্লথে শুয়ে পা ছুড়ছে, তাকে কোনওমতে সামলানো হবে এবং চমকানো হচ্ছে, ‘রামায়ণ শুরু হবে একদম কাঁদবে না’। সেইসব রামরাজত্বের দিনের কথা ভেবে আমারই কান্না পাচ্ছে, ওদিকে সে ছবিতে ঘরের একধারে উন্মুখ জনগণের ভিড়, এই বুঝি বেজে উঠবে, ‘মঙ্গল ভবন অমঙ্গল আ-আ-আ-ই-ই-ই…।’ পাড়ার মুদি তেজোর মা ছেলেকে হেল্প করতে নানা ধরনের ডাল ঠোঙা থেকে বার করে কৌটোয় ভরতে ভরতে যতক্ষণ না গান শুরু হচ্ছে, আওড়ে যাচ্ছেন, ‘রাম সিয়া রাম, সিয়া রাম জয় জয় রাম’।

বলুন, আশিতেই আমরা রামরাজত্ব দেখেছিলাম কি না? খবরের কাগজে পড়েছিলাম, রামচন্দ্রের ভূমিকায় অভিনয় করা অরুণ গোভিল ট্রেনে কোথায় একটা যাচ্ছিলেন। তো তাঁকে দেখে একদল বয়স্ক লোক কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, রাবণকে সেটে চা-বিস্কুট খেতে দেখে দৌড়ে এক বালক পালিয়েছিল ‘বাবা রে, রাবণ চা খাচ্ছে’ বলতে বলতে, লঙ্কায় যুদ্ধের দৃশ্যের শুটিংয়ের সময় মারাত্মক ধোঁয়া তৈরি করায় অভিনেতারা কাশতে কাশতে ডায়ালগই ভুলে যাচ্ছিলেন– সেসব খবর দিব্যি তো পড়তাম আমরা। তখন কলকাতা ছিল চুটকিরও শহর। আমরাও চায়ের দোকানে বসে চুটকিগুলো নিয়ে ক্যাচ লোফালোফি করতাম… অর্থাৎ আশিতেই গোরখপুর বা কাটিহারের মতো কলকাতাতেও রামরাজত্বের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, সে-ই শুরু! অতএব রামের অবয়বে আমি স্ট্যাটাস দিতেই পারি, চ্যাট জিপিটিকে শুধু বলে দিতে হবে, আমার কপালে চন্দন থাকবে, সিঁদুরের নিখুঁত ত্রিপুণ্ড, মুক্তোর কারুকাজ করা মুকুট পরাবেন, মুকুটের নকশায় যেন স্নিগ্ধতা থাকে, গায়ে সোনালি রেশমি বস্ত্র ফেলবেন– মোদ্দা কথা লুকের মধ্যে যেন আশির ভিন্টেজ চার্মটা থাকে!
মনে আছে আপনাদের, তিরাশিতে ‘গিয়াছিলেন’ সুদীপ্তা সেনগুপ্ত? অ্যান্টার্কটিকায়। ‘ফিরিয়াওছিলেন’। যে যাদবপুরে ‘তুই থাকবি, না মুই থাকব’ নিয়ে লম্ফঝম্ফ চলছে, সেখানেই তখন তিনি গবেষণা করতেন। ভোলার ম্যাটিনি আইডল ইমরানকে দেখতে এয়ারপোর্ট যাওয়া প্রসঙ্গে মনে পড়ল– আমাদের মা দুর্গা, এখন যিনি অশীতিপর, সে-ই সুদীপ্তা ফিরেছিলেন নিঝুম দমদমে। কোথাও কোনও কোলাহল হয়নি। এখনকার মতো সব ধরনের ‘মূল’ মালা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েনি। কী ভালো ছিলাম বলুন তো! এয়ারপোর্টে থাকার মধ্যে ছিলেন ওঁর মা পুষ্পদেবী। কলকাতায় ফেরার ঢের ঢের পরে কখনও একবার কাগজেই পড়েছিলাম সুদীপ্তার ইন্টারভিউ। প্রশ্নকর্তা জানতে চেয়েছিলেন, সেখানে সিল মাছের রোস্ট খেয়েছিলেন কি না! সুদীপ্তা তো হেসে খুন। কত কেজি চাল কত কেজি গম ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে তাঁরা পৌঁছেছিলেন সে ফিরিস্তি দিয়ে বলেছিলেন, তিনিই সেখানে হেঁশেলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

মা দুর্গা বলে কথা, রান্না করতে দুটো হাতই লাগে, বাকিগুলো তো গবেষণার জন্য ছিলই। মনে আছে, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ইংল্যান্ডে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে ফেরার পরে কলকাতারই কোনও সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘সৌরভ তুমি ওখানে ভাত পেয়েছিলে?’ যা নিয়ে খিল্লি আজও চলছে। যদিও সত্যিই তেমন কিছু সৌরভকে কোনও সাংবাদিক বলেছিলেন কি না আমরা কেউ শুনিনি। অবশ্য সে তো ছিয়ানব্বইয়ের গল্প। সুদীপ্তারটা তিরাশির। আমার মার খুব ভালো লাগত ওঁর কথা। বাবার চাকরির কারণে সুদীপ্তা ছোটবেলায় কখনও কখনও নেপালেও থাকতেন। তখন বিশ্বাস করতেন, মা দুর্গার বাড়ি সত্যিই কৈলাসে। পরে তাঁর মনে হয়েছিল, প্রত্যেক নারীর মধ্যে এক-একটা করে দুর্গা ঘাপটি মেরে আছে।
নোটনকে বললাম, একবার এ-আইকে বলে দ্যাখ তো, ওরা তোকে তিন লেয়ারের জামা-উইন্ডপ্রুফ টুপি আর গ্লেসিয়ার গগলস পরিয়ে একটা ছবি করে দিতে পারে কি না? ওরে ভুলিস না আশির কলকাতা মানে শুধু শতাব্দীর চুলের সামনে দিকটা ফোলানো নয়, সুদীপ্তার মতো মা দুর্গারও! নোটন অবশ্য রাজি হয়নি। ওর যুক্তিও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। সুদীপ্তা সাজলে ওর মুখই না কি কেউ বুঝতে পারবে না।

যে পাঁচ-সাড়ে পাঁচ দশক এই শহরে কাটাচ্ছি, তাতে এটা বুঝেছি যে, একটা জিনিস কোনও সময় পালটায় না। আড্ডা। ভোলার সঙ্গে খোশগল্প। শুভকে উত্যক্ত করা। কথায় কথায় রাম-রাবণ-বিভীষণ সাজা। সুদীপ্তাকে অবহেলায় ফোঁস-ফোঁস। সে সব কিছুরই রিভলভিং স্টেজ চিরকালই আড্ডা। প্রত্যেক দশকেই সুদীপ্তারা নানা রূপে আড্ডার টপিক। হতেই হবে। এবং মঞ্চ একটাই। চায়ের দোকান। ভবার অথবা শম্ভুর। আটের দশকেই বিমল কর জানতে চেয়েছিলেন, কলকাতা শহরের প্রথম চায়ের দোকানটা কোথায়? সদুত্তর না পেয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন, উত্তর আর মধ্য কলকাতাতেই হবে। দক্ষিণকে ধর্তব্যে রাখলেন না। ‘সেখানে তো তখন ঝোপঝাড়’। আমারও মনে পড়ল প্রথমবার নবারুণ ভট্টাচার্যকে চাক্ষুষ করার কথা। ন্যাশনাল ইকোনমিক রেস্টুরেন্টে। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে। আমার কাছে সেটাই কলকাতা আশির সেরা স্মৃতি। চ্যাট জিপিটিকে লিখলাম– আমার মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ি থাকবে। পুরোটাই প্রায় সাদা চুল এলোমেলো। সুতির ফতুয়া পরব। কণ্ঠাস্থি যেন স্পষ্ট বোঝা যায়। আমার হাতে একটা খোলা বইও থাকবে।
ছেড়ে দিন বইয়ের দরকার নেই।
নবারুণ চায়ের দোকানে বসে থাকবেন। টেবিলে রাখা গরম দুধ-চা থেকে ধোঁয়া উঠবে। প্লেটে পোচ, এক পিস সেঁকা রুটি। স্ট্যাটাসে সে ছবি দিয়ে ওর বই থেকে নিয়ে লিখে দেব–
‘একটা কথায় ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়বে কবে
সারা শহর উথাল পাথাল, ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে…।’
…………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন মিনি সিরিজ-এর অন্যান্য লেখা
…………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved