

কেউ কেউ কারও কারও জীবনে পথপ্রদর্শক তো বটেই। সেই ভূমিকা আপনা থেকেই তৈরি হয়। গাইডের নিজস্ব একটা আনুষ্ঠানিক পরিচয়, পরিচিতি থাকে। টুরিস্ট গাইড থেকে শুরু করে গবেষণাক্ষেত্রে পিএইচডি গাইড– প্রত্যেকের একটা নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। আজকাল গবেষণার ক্ষেত্রে যেটা দেখা যায়, যিনি গবেষণা করছেন, তার সামনে বিষয় নির্বাচনের সুযোগ নেই। আসলে কাকে কী পড়ানো উচিত, কী শেখানো উচিত, সে কী শিখবে, তা ঠিক করে দেওয়ার আমরা কেউ নই। এই ভাবনাকে আঁকড়ে ধরলে ওই পথপ্রদর্শক বা গাইডের ভূমিকা অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।
প্রচ্ছদ: দীপঙ্কর ভৌমিক
‘গাইড’ মানেই কোনও একজনের বক্তব্য বা নির্দেশ, উপদেশ কিংবা পরামর্শকে অনুসরণ করা। যা বৃহত্তর পরিসরে, দৈনন্দিন জীবনে, মেনে চলা আমার পক্ষে সমস্যাদায়ক বলেই মনে হয়। ‘গাইড’ বললেই কেন জানি না, বাংলা সিনেমার ছবি বিশ্বাস কিংবা কমল মিত্রর কথা মনে পড়ে। ব্যক্তিগত স্তরে, পারিবারিক জীবনে, আমরা মোটামুটি যে-কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত, সেই রকম পরিবারের দোর্দণ্ডপ্রতাপ কর্তা– তাঁদের কথাই শেষ কথা, এমন ভূমিকাতেই ছবি বিশ্বাস, কমল মিত্রের মতো অভিনেতাকে দেখতে আমরা অভ্যস্ত। তাঁরা নিশ্চয়ই পরিবারের মঙ্গল চান, নীতি-নৈতিকতাকে আঁকড়ে সর্বার্থে সন্তানের ভালোটাই আশা করেন। কিন্তু নিজের মতামত, সিদ্ধান্তকে ‘চূড়ান্ত’ ভেবে, তা কারও-র ওপর চাপিয়ে দেওয়া, মোটেই ভালো ব্যাপার নয়। সেই দিক থেকে ‘গাইড’ বিষয়টাকে বিচার করলে মনে হয়, নানা স্তরের পথপ্রদর্শক। কিন্তু গাইড মাত্রেই যে ‘পথপ্রদর্শক’ হতে হবে, সেই বিষয়টি মোটেই জরুরি নয়। একদিক থেকে তা ক্ষতিকারকও।

তবে ছোটদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা। শিশুসন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে একটা সময় পর্যন্ত অভিভাবকদেরই যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। কারণ, একটি নির্দিষ্ট সময় অবধি শিশুদের কোনও বিবেচনাবোধ বা বুদ্ধিমত্তা তৈরি হয় না। মুশকিল হল, অভিভাবকরা অনেক ক্ষেত্রেই শিশুদের মনের ওপর থেকে তাঁদের দখলদারিত্ব সরাতে পারেন না। শিশুদের বোধ নিজেদের মতো পরিণত হয়। আমরা সেটাকে স্বীকৃতি দিই না। তাদের মন ও মানসিকতা বুঝতে না-পেরে ওই ছবি বিশ্বাস, কমল মিত্র-টাইপ আচার-আচরণ করতে থাকি। আসলে ট্রাডিশনাল পারিবারিক কাঠামো থেকে আমরা এখনও বেরতে পারিনি। একটা সময় পর্যন্ত, ছেলেমেয়ের বিয়ের সিদ্ধান্ত ছিল বাবা-মার হাতে বাঁধা। পুরনো দিনের সিনেমায়, বিয়ে-সংক্রান্ত বিষয়ে বাবা-মার সিদ্ধান্তই যে ‘শেষ কথা’, এমন ডায়লগ হামেশাই শোনা যেত। নায়ক-নায়িকার গলাতেও এই ধরনের কথা স্পষ্ট প্রাধান্য পেত যে, ‘তোমরা যাকে পছন্দ করবে, আমার আর দেখার কী আছে!’ দেখার আছে। আছে বলেই, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটি মোটেই ‘স্বাভাবিক’ নয়। আমাদের গোষ্ঠী-জীবনে এই ছবি সুপরিচিত। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হবে।
ধরা যাক, শিক্ষকতায় সুযোগ পেয়েছেন এমন কাউকে বলা হল, ‘আপনি যান, ওমুক ক্লাসে গিয়ে পড়ান।’ স্বভাবতই নতুন মাস্টার জিজ্ঞেস করতে পারেন, ‘ক্লাসে কী পড়াব?’ এবার যদি উত্তর হয়, ‘আপনি কী পড়াবেন, সেটা আপনিই ঠিক করবেন।’ তখন ফাঁপরে পড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।

আমরা অভ্যস্ত কোনটাতে? প্রত্যেকটা ক্লাসের জন্য একটা নির্দিষ্ট সিলেবাস আছে, আমরা সেই অনুযায়ী পড়ানোর চেষ্টা করি। শিক্ষক যত্ন করে সিলেবাসে অন্তর্গত বিষয় ভালোভাবে ছাত্রছাত্রীদের বোঝাবেন, শেখাবেন। এবং প্রয়োজনে অনুপ্রাণিত করবেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের তরফে যদি বলা হয়, ‘আপনার ছাত্রছাত্রীদের কী পড়াবেন, তা আপনি ঠিক করবেন’, অর্থাৎ শিক্ষককে বলা হচ্ছে, তোমার সিলেবাস তুমিই ঠিক করো– এই বিরাট দায়িত্ব যদি ঘাড়ে এসে পড়ে, তাহলে ভেবে দেখার চেষ্টা করুন, কতজন শিক্ষক সেই গুরুদায়িত্ব পালন করতে পারবেন? দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, অনেক শিক্ষকই এমন পরিস্থিতিতে দিশাহারা বোধ করেন, করবেনও। আসলে কাকে কী পড়ানো উচিত, কী শেখানো উচিত, সে কী শিখবে, তা ঠিক করে দেওয়ার আমরা কেউ নই। এই ভাবনাকে আঁকড়ে ধরলে ওই পথপ্রদর্শক বা গাইডের ভূমিকা অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।
তবে কেউ কেউ কারও কারও জীবনে পথপ্রদর্শক তো বটেই। সেই ভূমিকা আপনা থেকেই তৈরি হয়। গাইডের নিজস্ব একটা আনুষ্ঠানিক পরিচয়, পরিচিতি থাকে। টুরিস্ট গাইড থেকে শুরু করে গবেষণাক্ষেত্রে পিএইচডি গাইড– প্রত্যেকের একটা নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। আজকাল গবেষণার ক্ষেত্রে যেটা দেখা যায়, যিনি গবেষণা করছেন, তার সামনে বিষয় নির্বাচনের সুযোগ নেই। যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি জড়িত, সেখানকার বিভাগ থেকেই ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্রসঙ্গত, মনে পড়ে, অনেককাল আগে এক রুশ ভদ্রমহিলার কাছে রাশিয়ান ভাষা শেখার চেষ্টা করেছিলাম। এটা সেই সময়ের কথা, যখন রাশিয়া জুড়ে সোভিয়েত সিস্টেম অটুট। সেই রুশ ভদ্রমহিলার গবেষণার বিষয় ছিল, লেখক ভবানী ভট্টাচার্য। তাঁর বিখ্যাত লেখা, ‘শ্যাডো ফ্রম লাদাখ’।

মস্কোতে সেই ভদ্রমহিলা পিএইচডি করেন ভবানী ভট্টাচার্যর ওপরে। নানা গল্প-আড্ডার ফাঁকে, তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন ভাবনা বা দৃষ্টিকোণ থেকে ভবানী ভট্টাচার্যের ওপর গবেষণার সিদ্ধান্ত নিলেন? একটু চুপ থেকে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি তো কিছু নির্দিষ্ট করিনি। ডিপার্টমেন্ট অ্যাসাইন মি দ্যাট টাস্ক।’ অর্থাৎ, গবেষণার বিষয় বা চিন্তা– সেটাও গবেষকের হাতে নেই, গাইডের দ্বারা পুরোটাই নিয়ন্ত্রিত। আমাদের দেশে অনেক দিন পর্যন্ত ছবিটা অবশ্য অন্যরকম ছিল। যে-গবেষণা করবে, যার সঙ্গে গবেষণা করবে, তারাই গবেষণার বিষয় নির্বাচন করত। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আবেদন করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের তারপর অনুমোদন দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি, প্রক্রিয়া-পদ্ধতি চলত। এখন সেই স্বাধীনতাটুকুও নেই। আপনি একটা বিভাগে নাম নথিভুক্ত করবেন, তারপর বিভাগ আপনাকে গবেষণার জন্য যেমন দায়িত্ব দেবে, আপনাকে গাইডলাইন মেনে তা অনুসরণ করতে হবে। এই কারণেই রুশ ভদ্রমহিলার উদাহরণ দিলাম। কেন ভবানী ভট্টাচার্য গুরুত্বপূর্ণ, কোন দৃষ্টিকোণ থেকে– এসবে গবেষকের এখন আর কোনও ভূমিকা নেই। ফলে গাইড বা পথপ্রদর্শকের ধারণা, তা যত ব্যক্তিগত স্তরে সংগঠিত চেহারা পাবে, তত স্বাধীনতা কিংবা স্বনির্বাচনের যে অবকাশ, তা কমে যাবে।

আমাদের যেসব অ্যাকাডেমিক সাবজেক্ট, নতুন নতুন যে ডিসিপ্লিন তৈরি হচ্ছে শিক্ষাস্তরে, নতুন কোর্স চালু হচ্ছে, তার নিশ্চয়ই কতগুলো সদর্থক দিক আছে, কারণ একটু বিধিবদ্ধভাবে চালু না-হলে সেগুলো কার্যকর করা সমস্যার হয়ে দাঁড়ায়। সংগীতশিক্ষার দিকে খেয়াল করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট বোঝা যায়। সংগীতচর্চা এখন পাঁচটা শিক্ষণীয় বিষয়ের মতো, স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছে। সেখানে নির্দিষ্ট কোর্স, কোর্সের শেষে পরীক্ষা, পরীক্ষার শেষে একটা ডিগ্রি ইত্যাদি স্তর রয়েছে। অথচ আমাদের সেই পুরনো ওস্তাদদের ঘরানায় এমনটা ছিল না। শিক্ষার্থীরা যে যে ওস্তাদের কাছে তালিম নিত, তাদের কাছে সেটাই ছিল শংসাপত্রের সমতুল্য। কোন ওস্তাদের কাছে তারা শিখেছে, সেটাই তাদের পরিচয় হয়ে উঠত। আজকের দিনে ক্রমশ তা প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে। পুরোপুরি হারিয়ে গিয়েছে, তা বলব না। ক্রমশ কমে গিয়েছে, বা বদলে গিয়েছে। ফলে শিল্পীদের নিজস্বতাও হারাচ্ছে।

আমাদের সময়ে একটা নতুন বিষয় নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছিল– ‘উইমেন স্টাডিজ’। এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে তা অন্তর্ভুক্ত। প্রথম যখন উইমেন্স স্টাডিজের কথা উঠছে, তখন কিন্তু ঠিক নির্দিষ্ট বা রেগুলার ক্যারিকুলাম যাকে বলে, তার অন্তর্গত বলে ভাবা হয়নি। এই বিষয়ে চর্চা বা মনোযোগ নিবদ্ধ করা, আলোচনা, গবেষণা ইত্যাদির ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। তারপর একসময় এম.ফিল ডিগ্রি দেওয়ার জন্য কোর্স চালু করা হয়। তখন আমাদের নিজেদের মধ্যেও এই প্রশ্নও বেশ আলোচিত হয়েছিল যে, ‘উইমেন্স স্টাডিজ’টা কী? কী তার অর্থ? স্কোপই বা কী? সেই ধারণা কারওর কাছে তখন স্পষ্ট ছিল না। ফলে বিষয়টাকে পাঠ্যক্রমের অন্তভুক্ত করা, সেটা কতটা সঙ্গত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কারণ, অন্তভুক্ত করতে গেলেই তার সীমারেখা বেঁধে দিতে হবে। তাতে মূল চিন্তা ব্যাহত হবে কি না, সে-প্রশ্ন উঠেছিল। ব্যক্তির বিকাশ সমাজ-জীবন, ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন–কেন্দ্রিক হয়, তার মধ্যে থেকেই ব্যক্তির পূর্ণ বিকাশের সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করতে হয়। কিন্তু গাইডের অস্তিত্ব যত বেশি প্রত্যক্ষ হবে, ততই সেই বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হবে।
সন্তান পালনের কথা বলছিলাম, সেই জায়গায় ফিরে যাই আরও একবার। মনস্তত্বে ‘মিরর স্টেজ অফ ডেভেলপমেন্ট’ বলে একটা ব্যাপার আছে। তা এই যে, বাচ্চা যখন আয়নায় নিজেকে দেখে আর পাঁচটা জিনিসের থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারে, অর্থাৎ তার সচেতনতার স্তরে নিজেকে একটা জায়গা দিতে পারে, তখন তার নিজের সম্বন্ধে আলাদা একটা ধারণা তৈরি হয়। নিজের মধ্যে অস্তিত্বের বোধ জাগ্রত হয়। সেই বয়সটা ২-৩ বছরের মধ্যেই, অর্থাৎ যথেষ্টই কম বয়সে। আমাদের স্মৃতির সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মত হল, চার বছরের আগের স্মৃতি খুব বেশি থাকে না। জেমস রাসেলের আত্মজীবনীতে পাওয়া যায়, তাঁর চার বছর আগের স্মৃতি তেমন মনে নেই। তবে একটা ঘটনা তাঁর মনে রয়ে গিয়েছে। কী সেই ঘটনা?

রাসেলকে ছোটবেলায় কেউ আইসক্রিম কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তা না কি দেওয়া হয়নি! এটা ওঁর মনে আছে। পরিণত বয়সে আত্মজীবনীতে তিনি বলছেন, এটাই ওঁর ‘প্রথম’ স্মৃতি। যা থেকে গিয়েছে। লিখছেন, ‘আইসক্রিম ওয়াজ প্রমিসড, দ্য প্রমিস ওয়াজ নট কেপট!’ অর্থাৎ, একটা নেগেটিভ অভিজ্ঞতা দিয়ে জীবনটা শুরু হচ্ছে। ফলে স্মৃতি মোটামুটি ওই ‘মিরর স্টেজ’, ওই দুই-আড়াই বছর থেকে শুরু। এদিকে কমল মিত্র, ছবি বিশ্বাস গোত্রের অভিভাবকত্বের ধারণাটাকে শুধুমাত্র যে ছেলেমেয়েদের বিবাহের স্তর পর্যন্ত প্রসারিত করি, তা নয়। হামেশাই তার পরেও চলে সেই শাসনের পরিচর্যা। ছেলেমেয়েদের সারাজীবন– এবং অভিভাবকের মনোবাসনা: সন্তান সারা জীবন আমাদের প্রদর্শিত পথেই চলবে।
যে বয়স পর্যন্ত মনে করি শিশুর উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হয়নি, সে বয়সকে হামেশাই প্রসারিত করে থাকি আমরা। খতিয়ে দেখা যাবে, তত বয়স পর্যন্ত প্রসারিত করার কোনও প্রয়োজনই নেই। মিরর স্টেজ, কিংবা আর্লি মেমরি স্টেজ– তা চার বছরের মধ্যেই মিটে যায়। সে কোন স্কুলে পড়বে, কোথায় পড়বে, কী পড়বে– তার চেয়েও আজকাল খুব জরুরি প্রশ্ন হয়ে ওঠে: বাংলা, ইংরেজি না হিন্দি– কোন মাধ্যমে পড়বে? এসব সিদ্ধান্তের ভার আমরা সন্তানের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছি আজকাল। সিংহভাগ ক্ষেত্রে এসব সিদ্ধান্ত কোনওটাই বাচ্চার নয়, সিদ্ধান্ত তার বাবা-মা, অভিভাবকের। আরও একটু বড় হওয়ার পর তার মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এসে ঠিক করি, সে কোন স্ট্রিমে যাবে– সায়েন্স না আর্টস। নাকি হিউম্যানিটিজ, কিংবা মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং।

আমাদের সমাজে এটা প্রতিষ্ঠিত যে, ভালো শিক্ষার্থীরা সায়েন্স নিয়ে পড়ে। তার মধ্যে যারা ‘বিশেষ ভালো’ ছাত্র, তারা জয়েন্ট এন্ট্রাসে পরীক্ষা দেয়। তার মধ্যে যারা খুব ভালো র্যাংক করে, তারা ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ে। ওই যে আমরা শিশুর শৈশব-দশায় সে কোন মাধ্যম স্কুলে পড়বে দিয়ে শুরু করেছিলাম, বড়বেলাতেও স্নাতকস্তরে এসে সেই পথনির্দেশনা জারি রাখি। প্রচলিত কবিতার সুরে বলতে হয়, “রেখেছ বাঙালি ক’রে, মানুষ কর নি।”
ব্যক্তিবিশেষ কিংবা পূর্বজরা নন, গাইডের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে পালন করে বইও। গান কিংবা কবিতা বা একটা গাছের পাতাও। সবার ক্ষেত্রে বাঁধাধরা নিয়ম খাটে না। সাহিত্য একাডেমির একটা প্রোগ্রাম ছিল, বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের বক্তব্য রাখতেন। অনুষ্ঠানটির নাম ছিল: ‘দ্য বুকস দ্যাট ইনফ্লুয়েন্সড মি’। আমাদের পরিসরে, এমন অনেক মানুষের কথাই আমরা জানি, যাদের ক্ষেত্রে রামকৃষ্ণের ‘কথামৃত’ পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে। রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ে যাচ্ছে। অপরিচিত এক বৃদ্ধ একবার দেখা করতে এসেছেন জোড়াসাঁকোয়, কবির সঙ্গে। সৌজন্য-আলাপের পর তিনি বলেন, তাঁর মেয়ের জীবনে অল্পবয়সেই অকাল বৈধব্য নেমে এসেছে। নানা ঝড়ঝাপটা সামলে মেয়েটি শান্ত হয়ে পড়েছে। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেয়েটি ইতিমধ্যে একটি বই পড়েছে। তা হল রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থটি। এ-কথা জানার পরেই ওই ভদ্রলোক এসেছেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে, শুধু এই কথাটুকু জানাতে। ফলে, একটা বই কারও জীবনে বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে এমন গাইডের ভূমিকা পালন করে থাকে।

পরাধীন দেশে বিপ্লবী রাজনীতিতে যে সমস্ত বাঙালি অংশ নিয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই ‘আনন্দমঠ’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন, এ তো ঐতিহাসিক সত্য। বিপ্লবী সাহিত্য তাঁদের অনুপ্রাণিত করেছে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণে। অনেকের ক্ষেত্রে কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস– এঁদের রচনাবলি এই পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
এবার, আমরা যদি এমন একটা সমাজ তৈরি করি, যেখানে সকলকেই শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত-এ প্রভাবিত হতে হবে বা তার মূলভাবকে নিজেদের জীবনে আদর্শায়িত করতে হবে, বা মার্কসের ‘ক্যাপিটাল’-এ প্রভাবিত হতে হবে, কিংবা সকলকেই ‘গীতাঞ্জলি’তে প্রভাবিত হতে হবে, তাহলে তো গন্ডগোলের ব্যাপার! মিশনারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় যে-প্রশিক্ষণ পর্ব, সেখানে এমন পদ্ধতি এখনও দেখা যায় বইকি! আমার এক পরিচিত রাশিয়ান বন্ধুর কাছেই শুনেছিলাম, যে বয়সে সে স্কুলে পড়ছে, তখনই তাকে লেনিনের ‘স্টেট অ্যান্ড রেভলিউশন’ পাঠ্যপুস্তক হিসেবে পড়তে হত। প্রতিষ্ঠানের তরফে চাপিয়ে দেওয়া এমন শিক্ষাব্যবস্থা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সত্যিই ক্ষতিকর। এর ফলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে, বিশেষ করে শিশুমনে অনীহার সৃষ্টি হয়। স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে যায়। শেখা বা অধ্যয়নের, গ্রন্থপাঠ ও সেই জ্ঞানকে আত্মস্থ করার ইচ্ছাশক্তি তারা হারিয়ে ফেলে। যার দরুন মেধার মান পড়ে যায়।
আসলে সন্তানের মঙ্গলচিন্তার মধ্যেও ভীষণ বিপদ। ‘বিবিধ প্রবন্ধ’-এ বঙ্কিমচন্দ্রের একটি লেখা আছে, ‘ভালোবাসার অত্যাচার’। গাইড যিনি, তাঁকেই ঠিক করতে হবে, তিনি কীভাবে দাগ কাটতে চান– ভালোবাসায়, নাকি অত্যাচারে!
অনুলিখন: সুমন্ত চট্টোপাধ্যায়
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved