
আজ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুদিন। এই শহরের রাখালের মৃত্যুদিন। যে রাখাল, কলকাতায় নয়, প্রয়াত হয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। স্মৃতিশক্তি-র এই লেখাটি সেই শেষদিনের শক্তি চট্টোপাধ্য়ায়কে নিয়ে। বসন্তের সমস্ত রং নিয়ে যিনি চলে গিয়েছিলেন ১৯৯৫ সালের, ২৩ মার্চ। শেষদিনের সে অভিজ্ঞতা, লিখেছেন তাঁর কন্যা।
২৩ মার্চের ভুলে থাকা দিন বৎসরান্তে ফেরার সময় হয়ে আসছে। অসংখ্য বছরের জন্য শান্তিনিকেতন এড়িয়ে কয়েক বছর হল আবার যাওয়া শুরু করেছিলাম, মূলত ঈশিতাদির জন্য। পাকেচক্রে বন্ধুদের নতুন দলে এবার ওই সময়ের অত্যন্ত গায়ে গায়ে এ বছর আবার শান্তিনিকেতন যাওয়ার কথা। বসন্ত। সেই বসন্ত।
সে বছর মার্চে আমি ২৪। বাবা– অতিথি অধ্যাপক সেখানে। মা যথাসম্ভব থাকছে। একটা সময় এমন এল, মায়ের না-ফিরলেই নয়। আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল দিন তিন-চারেক থাকার। মা ফিরে এল। অথচ পরদিনই আমি গেলাম না গড়িমসি করে। পরিচিত বন্ধুরা কেউ নেই, আমার আগ্রহ কম। আরে বাবা একটা দিনের তো মামলা। যাব কাল! মা একটু অসন্তুষ্ট হল।

ওদিকে শান্তিনিকেতনে তখন ‘ক্যাম্প’ নামক একটি সংস্থা থেকে বাবার ওপর তথ্যচিত্র তুলতে এসেছিল। অচিন্ত্য– নামটাই শুধু মনে আছে, সম্ভবত নাজেশ আফরোজের প্রযোজনায় এসেছিলেন, আরও কিছু মানুষজন-সহ। পরে ভিডিও-তে দেখেছি, সারাদিন বিশ্বভারতীর নানা জায়গায়, সোনাঝুরি জঙ্গলের মধ্যে এবং আরও বেশ কিছু বসন্তুকাব্য মেশানো অঞ্চলে সারাদিন ধরে শুটিং চলেছিল। মা না-থাকলে বাবা সবসময় সুযোগ নিত, তখনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গোটা দিন, হয়তো দেড়দিনব্যাপী এই উথালপাথাল কর্মকাণ্ড চলেছিল, পরে অন্যদের লেখা থেকে যতদূর বুঝেছি।
এখানে যে-কথাটা উল্লেখ করার, তার অল্প কিছুদিন আগে বর্ধমানে যুক্ত লাহিড়ীর (বাবার অনুজ কবি) কোয়ার্টারে দিনকয়েক থাকাকালীন বুকে হঠাৎ ব্যথা হওয়ায় সেখানকার হাসপাতালে চেক-আপ, ইসিজি প্রভৃতি হয়েছিল, কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক কোনও অস্বাভাবিকত্ব পাওয়া যায়নি রিপোর্টে। বাবা তখন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত, কোনও ওষুধই খেতে হয় না। কেউ বলেননি, সেই কারণে।
আমি বসন্তের দুপুরে শুকনো পাতা মাড়িয়ে স্টেশন থেকে পৌঁছলাম রতনকুঠি, বাবা অপেক্ষা করছিল। দোল ছিল ১৯ মার্চ, বাবার বন্ধুবান্ধবদের প্রায় প্রত্যেকে কলকাতায় ফিরে গিয়েছিল। রতনকুঠি থেকে বাবা বিকেলে পূর্বপল্লী গেস্ট হাউসে থাকবে, সঙ্গে আমিও। দুপুরে একসঙ্গে ভাত খেলাম। খেতে খেতে বাবা বলল, ‘…(নামটা আজ আর মনে নেই), আমার হিসেবটা এবার করে ফেল। কিছু আর বাকি রইল না তো?’
রতনকুঠির বারান্দায় বসে একটু কথাবার্তা হল। বাবা বলল, একটু পরেই বিক্রম আর নীলাঞ্জন চলে আসবে, আমরা একসঙ্গে বেরব। আমি বললাম, ‘ওরা কে?’ বাবা বলল, ‘ওরা এখানকার ছাত্র। খুব ভালো ছেলে, সবসময় আমার সঙ্গে থাকে।’
যাই হোক, কোনও কারণে ওরা এল না তখন, বিকেলের দিকে আমরা গেস্টহাউসে জিনিসপত্র রেখে হাঁটতে বেরলাম। কোনও রিকশা নিল না। মনে আছে, সেদিন দু’-তিনবার হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়ে পড়ল, বলল, বুকে ব্যথা করছে। আমি বললাম, কী হল বাবা? চল রিকশা নিই! শুনল না। ও কিছু হবে না, ঠিক হয়ে গিয়েছি– বলে আবার হাঁটতে শুরু করল। বেশ কয়েকজনের বাড়ি নিয়ে গেল আমাকে, কিন্তু বেশিরভাগই ছিলেন না।

তারপরের স্মৃতি আগেপিছে মিশে আছে। কখনওই বাবার কাছে টাকা থাকত না, আমরা ছোট থেকেই খুব দামি কিছুর জন্য বায়না করিনি। কবে গেলাম কো-অপারেটিভে? সকালে? পরদিন? না বিকেলে? ছ’টা মাটির/ সেরামিকের কাপ খুব ভালো লাগল– ‘এগুলো কিনে দেবে বাবা?’ –‘কেন…!’ কিনলাম, সঙ্গে ওইরকমই দুটো গ্লাস। খুবই তৃপ্তি। কো-অপারেটিভের বাইরে মাশরুম বিক্রি হচ্ছিল। বললাম, ‘কিনব, বাবা?’ –‘কেন….!’ কিনলাম দু’-প্যাকেট অয়েস্টার মাশরুম। সেদিন সত্যকাকুর (সাঁই) বাড়ি রাতে আমরা খাব। মিষ্টুনি আর আমি মাশরুম রাঁধলাম। মাশরুমটা একটু কেমন হয়ে গিয়েছিল। সেদ্ধ করে জল ফেলে খুব নেড়েচেড়ে রান্না তো হল। কিন্তু খেতে তত ভালো লাগছিল না। বাবার তো কোনও হেলদোল নেই…
–কেমন লাগছে, বাবা?
–ভালোই তো!
–আরেকটু নাও তাহলে।
–দে।
আমিও দিলাম আবার।
তারপর গল্পগাছা সেরে হাঁটতে হাঁটতে গেস্টহাউস। পরদিন ভোরে আমার ট্রেন, বিশ্বভারতী এক্সপ্রেস। ঘুমিয়ে পড়লাম। টুকিটাকি কথা, গান– এসবই চলেছে সত্যকাকুর বাড়ি। আমি আর মিষ্টুনি গল্প করেছি নিজেরা, বাবা-সত্যকাকুদের কথাতেও মাঝে মাঝে অংশগ্রহণ করেছি। ক্যাম্পের শুটিং নাকি খুব ভালো হয়েছে, কিন্তু খুব খাটিয়েছে নাকি ব্যাটারা, সেটা কয়েকবার শুনলাম।
সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে খুশি করেও দিয়েছে তারা– সেটার অর্থ তাদের তোলা ভিডিও-তে বুঝেছি পরবর্তীকালে। এইসব ছুতোর খুবই সদ্ব্যবহার করত বাবা। তা নিয়ে বকলামও অনেক। ‘কেন তুমি এরকম করবে, তোমার শরীর ভালো না’– এই জাতীয় কথা বাবা দু’রকমভাবে উড়িয়ে দিল।
প্রথমে তো বলল, ‘আরে বেশি খাইনি!’ আমি অবিশ্বাস করে আরও বকতে, বলল, ‘আরে এই তো একদিনই খেলাম– আর খাব না। শুয়ে পড়, শুয়ে পড়, তোর কাল যাওয়া!’

সেই প্রায় শেষ স্বাভাবিক কথা বিনিময়।
পরদিন ভোরে টের পাচ্ছি বাবা উঠে পড়েছে। এদিক-সেদিক যাচ্ছে, আমি আরও মুড়িসুড়ি দিয়ে দেরিতে ওঠার মতলব করছি– বসন্তের ভোররাত, ২৩ মার্চ, শান্তিনিকেতন। মাঝে মাঝে বাবা ডাকছে, ‘বাবুয়া, উঠে পড়!’ আমি উঠছি না। বাবা বলছে, ‘তোর ট্রেন, দেরি হয়ে যাবে!’ আমি উঠছি না। বলছে, ‘আমি গিজারের জল গরম করে ফ্লাস্কে তোর চা করে রেখেছি!’ আমি বলছি, ‘উঠছি, দাঁড়াও না, আরেকটু পরে।’ হঠাৎ বলছে, ‘আমার শরীরটা খারাপ লাগছে, বাথরুমে যাব।’ আমি লাফ দিয়ে উঠেছি। ‘কী হয়েছে বাবা?…’ ‘আমি বাথরুম থেকে আসি দাঁড়া’… বাথরুমে গিয়ে আর বেরচ্ছে না। দরজা খুলে দেখি, কমোডের উপর বসে, ঘাড় কাত হয়ে গিয়েছে। আমার তখন নিজের গলা দিয়ে প্রাণ বেরিয়ে যাবে মনে হচ্ছে। ভয়ংকর কষ্টে বাবা এক-পা দু’-পা ফেলে আমার ঘাড়ে ভর দিয়ে বিছানায় শুল। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়, দরজা খুলে চিৎকার করছি, ‘কেউ আছেন? কেউ আছেন?’ শরৎকাকুর ঘরে গিয়ে ধাক্কা দিলাম অনেকবার প্রচণ্ড জোরে জোরে, ডাকলাম, ‘শরৎকাকু, শরৎকাকু, শিগগির ওঠো’! কতবার ডাকলাম শরৎকাকু একটা সাড়াও দিল না। আবার ঘরে দৌড়ে গেলাম। বাবার ঘাড় কাত হয়ে রয়েছে। ঘরের জানলা খুলে বাইরের নিকষ অন্ধকারে চিৎকার করতে লাগলাম, ‘হেলপ হেলপ হেলপ হেলপ!’ নিচে দৌড়ে গেলাম, চিৎকার করতে করতে, ‘হেলপ হেলপ! কেউ আছেন, কেউ আছেন? বাবা ভীষণ অসুস্থ! কেউ আছেন?’
কেউ নেই। কেউ এল না।

জানি না, হয়তো পাঁচ মিনিট, বেশ অনেক পরে (হয়তো অনেক নয়, হয়তো ১৫ মিনিট) একজন আসতে ডাক্তারকে ফোন করা হল বারবার। ডাক্তার ফোন তুললেন না। আমি ক্রমাগত হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলতে থাকলাম। ওঁরা নিলেন না।
তাপর আমি গিয়ে বাবার বুকের ভেতর হাত রেখে বসে রইলাম।
……………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন শক্তি চট্টোপাধ্যায়-এর স্মৃতিচারণ স্মৃতিশক্তি
……………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved