


রাতের ‘শেষ’ লোকাল ট্রেনে সওয়ার হওয়া আমার জীবনগোলার্ধে মাদকতার জলশ্যাওলা বিছিয়ে রেখেছে। আনাড়ি প্যাসেঞ্জারের ত্রাস– এই বুঝি গন্তব্যস্টেশন পেরিয়ে গেল। পাঁড় অভিজ্ঞ প্যাসেঞ্জারের রেলা। হকারদের পারস্পরিক ঝগড়া। মেরুকরণ থেকে পর্নগ্রাফি– প্রান্তিক মানুষের টিপ্পনি, আহা, যেন পরশপাথর! আর, এসবের মাঝেই একদিন ‘শেষ’ ক্যানিং লোকালে দেখা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সঙ্গে।
‘ফেরা’-র কোনও ‘কিউআর কোড’ হয় না। ফিরতে চাওয়ার নানা ছক হয়তো আছে। রয়েছে ছলনা এবং ছেলেমানুষি। কিন্তু ছাড়পত্র নেই। ফিরতে চাওয়ার বিস্তার হয়তো অনেক। বিন্যাস নেই। স্ক্যান করলেই ফেরার ঠিকানা দিকচক্রবালে রামধনু রঙে লেখা হয়ে যায় না। ফেরার ‘শেষ’ ট্রেন চলে যাওয়ার পরেও সিগন্যাল ঘরে রাতলণ্ঠনের দোদুল নাচন থামে না, তাই। কখনও-বা ভুল ট্রেনে দেখা হয়ে যায় গীত ও আদিত্যের। ‘জব উই মেট।’ সেও এক ভ্রান্তিবিলাস বটে! ক্ষণিকের ছোট ছোট প্রমাদের মাশুল জ্বলজ্বল করে ভালোবাসার শীর্ষে।

১
তবে তারও আগে ‘হেলেন’-এর কথা।
৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। ঘন কালো চুল। সবুজ আঙুরের মতো চোখ। পুষ্ট স্তন, চওড়া জঘন। হেলেন একটি পুতুল। সিলিকন ও ইন্ডিয়ান রাবার দিয়ে বানানো। ‘খুব জীবনানুগভাবেই বানানো’। চিনে নির্মিত হলেও চেহারার ধাঁচায় ভূমধ্যসাগরীর কন্যের হাওয়াযৌবন। মুখে লাস্য ও বিষণ্ণতার যুগলবন্দি।
লিসবনের বাজার থেকে তাকে কিনেছিল দুই পোলিশ নাবিক, দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধু। ডান পায়ের নিচে মার্কার পেন দিয়ে ‘হেলেন’ নামটি লেখা ছিল। আর, লেখা ছিল, পোলিশ ভাষায় দু’টি শব্দ– ‘বেদনার কুয়ো’। কারও নামে কি দেওয়া এই ‘হেলেন’ নামটি? ওই দুই বন্ধু বিভিন্ন শহরের একই বেশ্যালয়ে যেত। কখনও একই নারীর কাছে। এমন কোনও নারীকে ভেবে কি এই ‘হেলেন’ নামকরণ, যে এদের দু’জনকে, বা কোনও একজনকে, প্রত্যাখ্যান করেছিল? যাই হোক, মাসের পর মাস, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায়, ‘হেলেন’ হাতবদল হয়ে যেত, কামরা থেকে কামরায়। তারপর একদিন জাহাজখানি বিক্রি হয়ে গেল। দু’জন নাবিক, দুই হরিহর আত্মা বন্ধু, ছেড়ে দিল কাজ। নতুন যারা এল নাবিক হয়ে, তাদের বেশিরভাগ লাতিনো, বা মেস্টিজো। চট্টগ্রামের ৩ জন বাঙালিও না কি ছিল। কোনও এক কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে, প্রশান্ত মহাসাগর পার হওয়ার সময়ে, পোর্টহোল থেকে ফেলে দেওয়া হয় ‘হেলেন’-কে। কিছু দিন সমুদ্রতরঙ্গে সে ঘুরে বেড়ায় এলোমেলো। তারপর পেয়ে যায় আন্তর্মহাদেশীয় বাণিজ্যস্রোত। গোলার্ধ পরিক্রমা করে, বিষুবরেখা পেরিয়ে, চলে আসে, বঙ্গোপসাগরে। এবং এক পূর্ণিমার জোয়ারে ভেসে ওঠে আন্দামানের অগম্য দ্বীপে।

সে দ্বীপে প্রাচীন জনজাতির মানুষের বাস। তারা অসভ্য। বর্বর। মার্জিত ভাষা জানে না। সুশীল সংযোগ বোঝে না। ধার ধারে না শিষ্টাচারের। অঢেল সমুদ্র, অপরিমিত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং অপরিসীম লোকবিশ্বাস তাদের সম্বল। তারা মনে করে, উইপোকা হল তাদের পূর্বপুরুষ। সেজন্য উইপাকা তারা মারে না। খায় না। বরং সংরক্ষণ করে।
‘হেলেন’ বা সিলিকনের যৌনপুতুলটি ও-দ্বীপে আত্মপ্রকাশ করার পরেই পুরুষ ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাসা বাধল এক ভয়ানক বিষণ্ণতার রোগ। তারা কর্মোদ্যম হারাল। বনজ ছত্রাকের রস খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকে দিনমান। এদিকে, সমুদ্রে ভেসে উঠতে থাকল নানা সামুদ্রিক প্রাণীর দেহাবশেষ। ফলমূলে ধরল কীট। সংরক্ষিত উইপোকারা দ্বীপের উপর দিকে পাহাড় পানে ধাবিত হল।
তারপর, এক কার্তিক পূর্ণিমার তিনদিন বাদে– দুপুর পেরতেই সমুদ্র সরতে শুরু করল। যেন কোনও দানব চুমুকে-চুমুকে সাফ করে দিয়েছে নোনাজল। উন্মোচিত হল বেলাভূমি। আগ্নেয়শিলার ভাস্কর্য, চাটান, গুহা। ধাপকাটা সিঁড়ি। পাথর কুঁদে বানানো দৈত্যাকার পাখি-সহ অদ্ভুতদর্শন প্রাণীশরীরের রিলিফ। এবং সূর্যাস্তের আগেই নারকেল গাছের সমান উচ্চতার জল এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল দ্বীপে। ভেসে গেল অসভ্যদের পরিচয়, ভিটে।
তাও কেউ কেউ বাঁচল। প্রবীণরা বলল, এমনই ঘটেছিল তিন দশক আগে। মেদিনীর জ্বর হয়েছে গো! সমুদ্র আবার ফিরে এল। ততক্ষণে প্রবীণদের চোখে আঁকা হয়ে গিয়েছে জলের তলায় লুক্কায়িত চাটান, গুহার নিখুঁত নকশা। সেখানেই তো থাকত তাদের পূর্বপুরুষরা। এ কি তবে কিছুর সংকেত, নির্দেশ? পূর্বপুরুষরা কি কোনও বার্তা দিতে চাইছে? এই ভেসে আসা পুতুল কি যত নষ্টের গোড়া?
‘হেলেন’-কে এই প্রাচীন জনজাতি কত সাধ করে সাজিয়েছিল মাছের কাঁটার আভরণে, উলকিতে। কান ও নাক ফুটিয়ে দেশজ অলংকারের শোভা যোগ করেছিল। এবার সব খুলে নেওয়া হল, গয়না। ঘষে তোলার চেষ্টা হল উলকি। দেহের প্রতিটি ছিদ্রপথে ভরে দেওয়া হল বীজ, ডুমুরের। তারপর পাতায় মুড়ে নিয়ে যাওয়া হল মাঝসমুদ্রে, সুস্থির শিলাপ্রবালের দেশে। কুলপতি পাতায় মোড়া ‘হেলেন’-কে পিঠে বেঁধে ডুব দিল।

জলের তলায় প্রবাল গুহায় রেখে আসার জন্য।
প্রবাল গুহায় অসংখ্য গোলকধাঁধার ফাঁদ। সেখানে স্বতঃপ্রভ মাছের দল খেলা করে। সেখানে ভোররাতের সব স্বপ্ন, শিশুদের দেয়ালা, না-পাওয়া চিরন্তন নারীর জন্য না-পাওয়া পুরুষের চিনচিনে ব্যথাসমগ্র থরে-থরে সাজানো। প্রবীণেরা, নারকেল ছাউনিতে আগুনের ধারে বসে, এসব গল্পের শিকড়বাকড়ই তো বুনে চলে। তরুণ প্রজন্মের মনের নাবাল মাটিতে। হয়তো নয়, নিশ্চিতভাবে, সেই বুননের কোনও এক বাঁকে আটকে রয়ে গিয়েছে কুলপতি, যে কি না ছাড়তে গিয়েছিল, ‘হেলেন’-কে।
যে কি না আর ফেরেনি কখনও।
২
এই ‘হেলেন’-কে পেয়েছিলাম, পড়েছিলাম বাড়ি ফেরার ট্রেনে। তখন করোনা সবে পেরিয়েছে। বা, পেরয়নি। মুখে মাস্ক বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার। সাদাটে আচ্ছাদনের উপর থেকে চোখেরা জেগে থাকে। চশমার কাচে জমে বেমক্কা বাষ্প। দিনভর লোক টেনে-টেনে ততক্ষণে গতরক্লান্ত হয়েছে লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল। যাত্রীগণও তেমন হুঁশিয়ার নয়। কেউ ঢুলছে। কেউ নরম দৃষ্টিতে রেল-চলে-যাওয়া ট্র্যাকের পাশের অন্ধকার মাপছে। কেউ মাস্ক খুলে বাদাম খাওয়ার চেষ্টা করছে, এবং যত না চিবতে পারছে তার চেয়ে বেশি ছড়িয়ে ফেলছে চারপাশে।
ভয়ে ও দুর্ভাবনায় সে-সময় ট্রেন এড়িয়ে চলতাম। এত লোক, বিধিনিষেধ মানা দূর অস্ত, মুখ থেকে থুতু ছড়িয়ে যাওয়া নিয়েও কেউ বদার করে না, এমন বেয়াকুব ভিড়ে নিজেকে জল-বিনা মছলি লাগে। সে-রাতে অন্যোন্যপায় হয়ে চেপেছিলাম। আর, হেলেন ছিল সঙ্গী, সহযাত্রী।
অফিসটফিস করে, কোনও বারে গিয়ে গেলাসে গেলাসে ঠোকাঠুকি করে ‘গ্লাসনস্ত’ বলে, ঘন রাতের দিকের লোকাল ট্রেনে সওয়ার হওয়া– আমার জীবনগোলার্ধে এক মাদকতার জলশ্যাওলা বিছিয়ে রেখেছে। আনাড়ি প্যাসেঞ্জারের ত্রাস– এই বুঝি গন্তব্যস্টেশন পেরিয়ে গেল। পাঁড় অভিজ্ঞ প্যাসেঞ্জারের রেলা ও মস্তি লুটে নেওয়ার কায়দা। হকারদের পারস্পরিক ঝগড়া। বৈঠকখানা বাজারে না-বিক্রি হওয়া দেশি উচ্ছেদের চট পেতে ট্রেনের কামরায় বিছিয়ে দিয়ে লোকজনদের কেনানোর প্রয়াস। তৎসহ, হঠাৎ কোনও সুন্দরী মহিলা উঠে পড়লে– পুরুষ সহযাত্রীদের চোরাদৃষ্টিতে বিশুদ্ধ বাসনার উদ্ভাস– আহা, দেখার মতো! যত রাত গভীর হয়, শেষের লোকাল ট্রেনগুলি প্রান্তিক মানুষের সমাহারে তত সেজে ওঠে। তাদের বাংলা ভাষা, তাদের ঠাট্টা, তাদের মারামারি, তাদের গাঁজা থেকে মিনি সাট্টার আড্ডা বসানো, ভোটের আগের মেরুকরণ বা পর্নোগ্রাফিক সাইটের কর্মকাণ্ড নিয়ে তাদের দেওয়া টকঝাল বিবরণ– যেন নুনমরিচের অমোঘ টাচ-আপ। মস্তিষ্কের মিয়ানো কোষগুচ্ছকে মুহূর্তে রঙিন ও সজাগ করে।

রাতের যে-ট্রেন যাত্রী বমি করতে-করতে শেষ স্টেশনের দিকে এগিয়ে চলে, সে-ই তো পরের ভোরে সরীসৃপের মতো যাত্রী খেতে-খেতে শহরগামী হয়। সপ্তাশ্ব ঘোড়ায় চেপে টহল দেওয়া সূর্যের আলো কি তখন তার রাতপোশাক ও রাতসিঁদুর মুছে দিতে চায়? ফেলে আসা আলিঙ্গন বা কালশিটের চিহ্ন দেখাতে চায় না? রাতের বৃষ্টি, রাতের কুয়াশা, রাতের ভ্যাপসা কি রাতেই শেষ হয়ে যায়? ‘শেষ’ ট্রেনে ফেরা আহত প্রেমিক, নীলরতনের চিন্তিত পেশেন্ট পার্টি, চাকরি হারানো ‘ডি’ গ্রুপ, বা অন্ধ নারীভিক্ষুক কি নিজের-নিজের সব রাতস্মৃতিকে সাতসমুদ্র পেরিয়ে প্রবাল দ্বীপের মরীচিকাময় গুহায় গচ্ছিত রেখে– পরের দিন আবারও ফিরে আসতে পারে– আলোয় আলোয় এই আকাশে?
৩
প্রতি বছর আগস্টে। একজন নারী একটি বদ্বীপে শোয়ানো মায়ের কবরে ফুল দিতে যেত। এই শোকবাসর ঘিরে তৈরি হয়েছিল সেই নারীর একটি নিজস্ব মন-দ্বীপ। সেখানে অন্য কারও প্রবেশাধিকার ছিল না। তবে নিয়তির শ্রেষ্ঠ পরিহাস: লোহার তৈরি বাসরঘরেই তো সবসময় কালনাগিণী ঢোকে– ছিদ্রপথে।
এ নারীর জীবনেও এল একজন পুরুষ, ছিদ্রপথে। ওই বদ্বীপে গিয়েই একবার। যে-নারীর যৌনজীবন দুরন্ত, যে-নারী কি না স্বামী ব্যতীত অন্য পুরুষের অঙ্কশায়িনী হয়নি, সেই নারীটিই এবার অনিবারণীয় রাত-আদরে ভেসে গেল– আকস্মিকভাবে দেখা হওয়া পুরুষটির সঙ্গে। আর, ভোরে উঠে দেখল, পুরুষটি চলে গিয়েছে। তাকে ঘুমন্ত রেখে। সে এই পুরুষটির নাম জানে না। ধাম জানে না। ল্যাভেন্ডারের উদাস গন্ধের সঙ্গে পুরুষটি রেখে গিয়েছিল দেহবিনিময়ের উষ্ণ ইয়াদ, এবং বিছানার পাশে রাখা বইয়ের পাতায় ২০ ডলারের একটি লন্ড্রি বিল! এই নারীর মূল্য, বা আগের রাতটির মর্যাদা কি এই ২০ ডলার, মাত্র?

এ নারীর কথা লিখেছেন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। ‘আনটিল আগস্ট’। এই উপন্যাসটি না কি তিনি লিখেছিলেন স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়ার দিন-কালে। উত্তরপুরুষগণ, তাঁর মৃত্যুর পরে, এটি ছাপাতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। শেষে, সংশয় কাটিয়ে, ছাপান। ভাগ্যিস! পড়তে পড়তে মনে হয়, ‘কপি’ করে দিই। পুরোটা টুকি। সুন্দরবনের কোনও বদ্বীপে, মায়ের কবরে, প্রতি বছর ফুল দিতে যায় কোনও নারী। তার প্রথম যাত্রাপথ শিয়ালদা থেকে ক্যানিং লোকাল ধরে। তারপর বোটে করে ভেসে-ভেসে যাওয়া কোনও দ্বীপের অভিমুখে।
কোনও ডাউট নেই, রাতের ‘শেষ’ ক্যানিং লোকালে একদিন আমার সঙ্গে ঠিক দেখা হয়ে যাবে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের। গরগরে ঝাল আলুরদমে মাখা মুড়ি খাব আমরা। তারপর ফটাস জল। মার্কেস নিশ্চয় তামাক বানাবেন। আমি, প্রথমে ‘না’ বলেও, ‘একটান দেখি’ বলে কাউন্টার চাইব। গাবো-কে তারপর বলব, আপনার ইন্টারভিউ নিতে চাই। গাবো হয়তো রাজি হবে, বা হবে না, বা প্রচুর টাকা চাইবে, যা দেওয়া সম্ভব নয়, ফলে খিস্তি খাব।
আসলে, ইন্টারভিউয়ের নামে আমি একটিই প্রশ্ন করতে চাই। সেটি করতে চাই– যখন সোনারপুরে আমাকে নামিয়ে, রাতের ‘শেষ’ ক্যানিং লোকাল ভোঁ দিতে-দিতে গাবোকে নিয়ে চলে যাচ্ছে আরও দক্ষিণে– তখন। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে, ট্রেনের জানলার কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে, গাবোকে বলব– উপন্যাসের ওই নারীকে স্যর পেয়েছিলেন কোথায়?
ঋণ: পরিমল ভট্টাচার্য, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved