The many Guides we meet across various zones | Robbar
Robbar
  • ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গাইডের গ্যালাক্সি

শহরতলি বা মফস্সলের, এমনকী শহরের বাবা-মায়ের কাছে এক আকর্ষণীয় শব্দ ‘টিউশন’ ও ‘গাইডেন্স’। ভবিষ্যতে কারা ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে ,কোন স্যর কেমন পড়ায়, তাই নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় তুমুল আলোচনা। নামকরা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা ছাড়াও, প্রতিটি পাড়ায় একটি বা দু’টি ‘অমুকদা’ বা ‘তমুকদি’ থাকে। একটি-দু’টি ছাত্রছাত্রী থেকে তাদের পড়ানোর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দূর থেকে বহুদূরে। অফলাইন অনলাইনের রমরমা।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ১৫:৫৬   
Facebook WhatsApp Messenger

রাতের অন্ধকার নেমে আসছে দ্রুত। কিছুক্ষণ আগেই ঝলমলে রোদ ছিল। শৃঙ্গজয়ের আনন্দ নিয়ে ফিরছেন পর্বত অভিযাত্রীরা। শেরপা গাইডদের অনুসরণ করে একসঙ্গে নামছেন সবাই। হঠাৎ এক্সপিডিশন লিডার শেরপার চোখে পড়ল সেই দৃশ্য। বরফে মোড়া খাদের পাশে এক বিপদসংকুল জায়গা। সেখানেই থাকার কথা একটা দড়ি। যাকে পর্বতারোহণের ভাষায় বলা হয়– ‘ফিক্সড লাইন’ বা ‘ফিক্সড রোপ’। সেটা উধাও। মুহূর্তে অভিজ্ঞ শেরপা বুঝলেন তুষার ধসে হারিয়ে গিয়েছে সেই দড়ি। একটা ঠান্ডা স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল সেই গাইড শেরপার!

zoom
কে টু শৃঙ্গ

পর্বত অভিযাত্রীদের ভাষায় তাঁরা এখন ‘ডেথ জোনে’ দাঁড়িয়ে। অভিযাত্রীদের কেউ কেউ সেখানেই ক্যাম্প করে থেকে যাওয়ার কথা ভাবলেন। কিন্তু বিপদের গন্ধ টের পেলেন সেই শেরপা গাইড। কেননা তখন তাঁরা ২৭ হাজার ফিট উচ্চতায়। চরম ঠান্ডা, ঝোড়ো হাওয়া, অক্সিজেন কম। এখানে বেশিক্ষণ থাকা মানে ‘সেরিব্রাল ইডিমা’ হতে পারে। মানে মস্তিষ্কে জল জমতে পারে। হতে পারে ‘পালমোনারি ইডিমা’। অর্থাৎ ফুসফুসে জল জমতে পারে। এসব না-হলেও শরীর জমে যাওয়ার ঝুঁকি এখানে মারাত্মক। এই ডেথ জোন থেকে উদ্ধার কাজ চালানো প্রায় অসম্ভব। যে করেই হোক নিচের ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন শেরপা গাইডরা।

zoom
‘ডেথ জোনে’ দাঁড়িয়ে অভিযাত্রীরা

যাঁরা গাইডের রাস্তা ধরতে পারলেন না, শারীরিক ক্লান্তিতে থেকে গিয়েছিলেন ডেথ জোনে, তারা কেউ বরফে চাপা পড়লেন, কেউ অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন, কেউ ভয়ংকর ফ্রস্ট বাইটের শিকার হলেন। পর্বতারোহণের ইতিহাসে এ এক অন্ধকার দিন। এই পর্বতারোহীরা ছিলেন ইতালি, কোরিয়া ও অন্যান্য দেশের।

রাত পেরিয়ে আবহাওয়া সামান্য ভালো হতেই ‘হাই ক্যাম্প’ থেকে আবার ডেথ জোনের দিকে উদ্ধার কাজের জন্য রওনা দেন সেই সাহসী গাইড শেরপা। ভরসা ছিল রেডিও, স্যাটেলাইট ফোন আর অক্সিজেন সিলিন্ডার। কিন্তু শেষপর্যন্ত ১৮ জন অভিযাত্রীর মধ্যে ১১ জনই মারা যান।

zoom
দুঃসাহসী গাইড পেমবা

এই ঘটনা ১৫ বছরেরও আগেকার। বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কে টু (K2) জয় করে বেস ক্যাম্পে ফেরার পথের। পাহাড়ের এই গল্পের নায়ককে সবাই বলতো ‘টাইগার অফ দ্য ডেথ জোন’। নাম পেমবা। আসল পরিচয় সে একজন শেরপা ‘গাইড’।

গভীর জঙ্গল। পশু শিকারে বেরিয়েছে একদল শিকারি। তাদের সামনে নিঃশব্দে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক আশ্চর্য লোক। ঘন বনে শিকারের সন্ধান দেওয়া এই লোকটিও আসলে একজন গাইড। ‘হান্টিং গাইড’। আফ্রিকায় থাকা এমন গাইডদের অতীতকালে ডাকা হত– ‘হোয়াইট হান্টার্স’ নামে।

টুরিস্ট স্পটে পর্যটকদের ভিড়। যে মানুষটি চিনিয়ে দিচ্ছে অচেনা জায়গা অজানা ইতিহাস, সেও আসলে এক পথপ্রদর্শক। ১৯ শতকে আলপাইন পর্বতমালায় পর্বতারোহণ যখন একটা খেলার অঙ্গ হয়ে উঠেছিল, তখন সেখানে গড়ে ওঠে পাহাড় চেনানোর অভিজ্ঞ গাইড। বনে-জঙ্গলে-পাহাড়ে ট্রেকিং করতে এক্সপার্ট লোকেরাও আদতে গাইড। আফ্রিকায় যারা বেড়াতে যান তাঁরা অনেকেই জানেন সেখানে তৈরি হয়েছে ‘ফিল্ড গাইডস অ্যাসোসিয়েশন অফ সাদার্ন আফ্রিকা’। আর উগান্ডাতে ‘উগান্ডা সাফারি গাইডস অ্যাসোসিয়েশন’। এদের সঙ্গে জঙ্গলে বেড়ানোর নাম অ্যাডভেঞ্চার।

zoom
আফ্রিকান ‘হোয়াইট হান্টার্স’, প্রাচীন রেখাচিত্র

কোন জলে কত গভীরতায় লেখা আছে মাছের ঠিকানা। কে জানে? অথচ মাছ ধরা অনেকেরই নেশা। কিন্তু কোন পুকুরে, কোন নদীতে বা সমুদ্রের কোন গভীরতায় ছিপ বা জাল ফেললে মাছ পাওয়া যাবে, বলা ভারি শক্ত। পুকুর-ডোবা-বিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছিপ ফেলে ছাতা মাথায় বসে থাকে অভিজ্ঞ মাছ শিকারি। দেশে-বিদেশে এই দৃশ্য অনাদিকালের। নদীতে সমুদ্রে জেলেরা, যাদের বিদেশি ভাষায় আমরা ‘ফিশারম্যান’ বলি, এরাও বংশপরম্পরায় গাইডেন্স দিয়ে যায় পরবর্তী প্রজন্মকে।

সব নদী শান্ত নয়। সব নদী সাগরে গিয়েও মেশে না। পাহাড়ি নদী তো আরও রহস্যময়। কোথায় যে পাথুরে, কোথায় যে অতল গভীর, তা বলা ভারি শক্ত। তাই ‘রিভার র‍্যাফটিং’ করতে গেলেও চাই গাইড। পাথুরে নদীতেও আছে বিপদ, আছে ঝুঁকি। এই গাইডই চিনিয়ে দেয় নদীর বিপদ বাঁক। আচমকা ঢেউয়ের মুখে কী করা উচিত। এমন কি দুর্ঘটনায় নৌকো উল্টে গেলেও কেমন করে বাঁচতে হবে।

প্লেন চালাতে গিয়ে, আকাশ পথে রাস্তা চিনতে লাগে অভিজ্ঞ পাইলট। ফাঁকা আকাশেও হতে পারে ট্রাফিক জ্যাম। বিমানের ওঠা নামার ঝুঁকি, আকাশপথের টারব্যুলেন্স, নতুন পাইলটকে শিখিয়ে দেয় পাশে থাকা গাইড পাইলট। শুধু র‌্যাডার নয়,পাশে চাই কো-পাইলটও।

zoom
আকাশপথের টারব্যুলেন্স

ইতিহাস বলছে সম্রাট নেপোলিয়ান ইতালিতে ‘গাইড রেজিমেন্ট’ তৈরি করেছিলেন। যারা নেপোলিয়ন ও অন্য সেনাপতিদের ব্যক্তিগত রক্ষী হিসেবে কাজ করত। দেশের খুঁটিনাটি বিশদভাবে জানত। বেলজিয়াম, সুইস, এমনকী ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতেও এই গাইড রেজিমেন্টের কথা জানা যায়। এরা ‘মিলিটারি গাইড’। শুধু যুদ্ধের সময় নয়, তার আগেও এদের থাকে বিরাট ভূমিকা। অন্য দেশের গলিঘুঁজি, রাস্তার খুঁটিনাটি, যা কি না ‘গুগল ম্যাপ’-এ নেই, এমনকী সেই জায়গার স্থানীয় ভাষাও জানতে হয় এই গাইডদের।

গাইডদের জীবনটাই গল্পের। এমনই এক গল্পে, দুই মাঝবয়সি স্বামী-স্ত্রী সুন্দরবনে বাঘ দেখতে এসেছেন। সারাদিন বাইনোকুলার দিয়ে জঙ্গলে চোখ রেখে, বাঘ কেন একটা হরিণ শিশুও চোখে পড়েনি! নোনাজল, রোদ্দুর আর দুপুরে বিরাট খাওয়া-দাওয়ায় শরীর ঝিমিয়ে গিয়েছে। কিঞ্চিত বিরক্ত হয়ে ভদ্রমহিলা টুরিস্ট গাইডকে বললেন, বাঘটাগ কিছুই তো দেখাতে পারলেন না। এত টাকা খরচা করে দূর থেকে এলাম। অপ্রস্তুত টুরিস্ট গাইড। মুখে সামান্য হাসি এনে বললেন, এই যে একটা বাঘ দেখতে পাব, সেই রোমাঞ্চ নিয়ে সারাদিন কত নদী, জঙ্গল দেখলেন, এটাও তো বিরাট প্রাপ্তি। লঞ্চে বসে কতজন আর বাঘ দেখতে পায় বলুন। বরঞ্চ অনেক বছর বাদে যখন আপনার ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো দেখবেন, তখন আপনার এই সুন্দরবনের কথা মনে পড়বে।

zoom
নোনাজল, রোদ্দুর আর সুন্দরবন

পুরনো প্রাসাদের ছাদে বসে, সন্ধে নামার আগে বুড়ো গাইড শোনাচ্ছে কাল্পনিক ভুতুড়ে গল্প। গুপ্তঘাতক বা রাজাদের অজানা গোপন প্রেমকাহিনি। প্রাচীন সম্রাটদের স্থাপত্য কীর্তি, গাইডের বাচন ভঙ্গিমায় হয়ে উঠেছে অলৌকিক। ঐতিহাসিক জায়গায় বেড়াতে গেলে এমনটি ঘটেই থাকে। এইসব অদ্ভুত গল্পকথা তাৎক্ষণিকভাবে সাধারণ পর্যটকদের অতিরিক্ত বিনোদন জোগায়। কেউই মনে হয় বেড়াতে গিয়ে ইতিহাস বই খুলে বসে না। যদিও এখন মোবাইলের যুগে গুগল খুলে পড়ে নেয় অনেকেই। গুগলও আসলে একটা গাইড।

শহরতলি বা মফস্সলের, এমনকী শহরের বাবা-মায়ের কাছে এক আকর্ষণীয় শব্দ ‘টিউশন’ ও ‘গাইডেন্স’। ভবিষ্যতে কারা ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে ,কোন স্যর কেমন পড়ায়, তাই নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় তুমুল আলোচনা। নামকরা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা ছাড়াও, প্রতিটি পাড়ায় একটি বা দু’টি ‘অমুকদা’ বা ‘তমুকদি’ থাকে। একটি-দু’টি ছাত্রছাত্রী থেকে তাদের পড়ানোর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দূর থেকে বহুদূরে। অফলাইন অনলাইনের রমরমা। নোটস, মক টেস্ট, স্পেশাল কেয়ার। বিজ্ঞাপনী কোচিং সেন্টারগুলোর পাশাপাশি এই পার্সোনাল গাইডদের সাফল্যের ক্যারিয়ার গ্রাফও সমীহ করার মতো। তাদের বাড়ির সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাবা-মায়ের ভিড়। ফলত, নিকটবর্তী চা দোকান  বা কফি শপে বিক্রিবাট্টা ভালোই। এই টিউশনির রুটিন সোমবার কাকভোর থেকে শুরু। আর চলে রবিবার গভীর রাত্রি পর্যন্ত। সিনেমা, থিয়েটার, গান, কবিতা, বর্ষা, বসন্ত– এরা কখন আসে কখন যায়, লেখা থাকে না সেই সব টিউশনির ক্লাসে।

zoom
গল্পকথায় সাধারণ পর্যটকদের অতিরিক্ত বিনোদন জোগান গাইডেরা

মজার কথা হল, এই গাইডদের না কি আবার মাঝেমধ্যে গাইড করেন গার্জিয়ানরা। যেমন হয়তো বলেন, ‘প্রচুর হোমওয়ার্ক দেবেন। বাড়িতে তো একদম পড়াশোনা করে না। খালি ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ আর মোবাইল।’ আবার ওয়ান টু ওয়ান প্রাইভেট টিউশনে, মেয়ের মা ,স্মার্ট যুবকটিকে বলে, ‘মেয়ের বাবা কিন্তু খুব কনজারভেটিভ।’ নিরীহ মধ্যবিত্ত পরিবারে দাদু-ঠাকুমাকে পড়াতে আসা গৃহশিক্ষককে অনেকেই বলতে শুনেছেন, ‘নিজের ছোট ভাইবোন বলে পরিও কিন্তু।’

সব গাইডের ভাগ্য সমান হয় না। শহুরে জীবনযাত্রা কঠিন। সেখানে চলে দর কষাকষি। স্টুডেন্টের গার্জিয়ান হয়তো বলে বসল, “টিউশন ফি’টা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?” আবার কোনও বাড়িতে হয়তো আছে মাল্টিন্যাশনালে চাকরি করা শিক্ষার্থীর দাদা। সে জিজ্ঞেস করে বসতে পারে, ‘আচ্ছা স্যর? আপনি পলিটিক্স করেন না তো?’

zoom
‘টিউশন’ ও ‘গাইডেন্স’ অবিচ্ছেদ্য

লোকে বলে, এত কিছুর ফাঁকে, গার্জিয়ান কিন্তু সেই কথাটি বলতে ভোলেন না। হয় বলেন, ‘আমার ছেলেটা খুব ট্যালেন্টেড। আপনি শুধু একটু গাইড করে দিলেই হবে।’ নতুবা বলেন, ‘আমার ছেলেটা বা মেয়েটা না একেবারেই… দেখবেন যেন অন্তত কোনওমতে টেনেটুনে পাশ করে যায়।’

দূরদেশে বসে থাকা এক বৃদ্ধের কাছে এই টিউশনের স্মৃতি অবশ্য অন্যরকম। মফস্সলের এক হাইস্কুল। সেখানে স্কুলের শেষে প্রতিদিন এক স্যরের বাড়িতে পড়তে যাওয়া। পড়াশোনোয় সে অবশ্য ভালো ছাত্র ছিল। কিন্তু সে কোচিং ক্লাসে যেত, শুধু সেই মেয়েটিকে দেখতে। তখন তার মনে হত, তার পাড়ায় কেন, পৃথিবীতে অমন সুন্দর কিশোরী আর হয় না। ওদিকে মেয়েটি পড়াশোনায় একদম ভালো ছিল না। ছেলেটি চেষ্টা করত, আড়ালে আবডালে মেয়েটিকে অঙ্ক বোঝানোর।

তারপর অনেকদিন হয়ে গেল। হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়ায় কবে থেকে যেন, সেই ছেলে এখন পরবাসে। কিন্তু আজও তাঁর মনে আছে বৃষ্টির সন্ধের অন্ধকারে কোচিং ক্লাসের সেই মেয়েটিকে। ভেজা বাতাসে আশ্চর্য অলৌকিক চুম্বকীয় টিউশন।

death zone Flight Guide K2 Mountain peak Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar sunderban Teachers Day trekking

Share this article on