

থিয়েটারের জন্য এমন পাগলামি রেওয়াজে দাঁড়িয়ে গেল ১৯৮৪-তে। নান্দীকারের জাতীয় নাট্যমেলা এল আর ‘ভিনি ভিডি ভিসি’ হয়ে গেল! রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর নেতৃত্বে সরকারের খানিক পিঠ-চাপড়ানি আর বেসরকারি অনেক খয়রাতি জোগাড় করে, দেশের বাছাই করা নট নির্দেশক দলকে এক ছাদের তলায় এনে দিলেন শ্যামবাজার স্ট্রিটের দলবল। হাবিব তনভির, কাভালম নারায়ণ পানিক্কর, শ্রীরাম লাগু, প্রসন্ন, রতন থিয়াম, মহেশ এলকুঞ্চওয়ার, বি জয়শ্রী, সত্যদেব দুবে, তীজন বাঈ– কত ভাবে কত ভঙ্গিতে বয়ে চলেছে সমকালীন ভারতের নাট্যচর্চা– দেখে আমাদের চোখ খুলে গেল।
বাঙালি যখন বারোমাস সারা অঙ্গে বোরোলিন মেখে নিত, গাভাসকার-কপিলদেব দ্বৈরথে কোন পক্ষ নেবে ভেবে আকুল হত, ইন্দিরা গান্ধী মারা গিয়েছেন শুনে অ্যান্টেনা উঁচিয়ে শর্ট-ওয়েভ রেডিয়োতে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস টিউন করে পাকা খবর শুনতে চাইত, কিংবা সাদা-কালো থেকে হঠাৎ রঙিন হয়ে ওঠা টেলিভিশনে লাইভ টেলিকাস্ট দেখতে দেখতে পর্দা জুড়ে ‘অনুষ্ঠান প্রচারে বিঘ্ন ঘটায় দুঃখিত’ ভেসে ওঠায় ক্ষেপে বোম হত– তখন কলকাতা জুড়ে থিয়েটারের বান ডেকেছিল।
১৯৮০-র দশক জুড়ে কলকাতার জনসংস্কৃতির উপরমহল তো বটেই, নিচের মহলেরও অনেকখানি জুড়ে ছিল থিয়েটার, যাকে বলে নাট্যকলা।
উত্তর কলকাতা জুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো পাবলিক থিয়েটার চাইছিল দক্ষিণেও মৌরসি পাট্টা গাড়তে। গ্রুপ থিয়েটারের পতাকা হইহই করে উড়ছিল সবেধন নীলমণি একাডেমি অফ ফাইন আর্টসে। তারই ফাঁকে নান্দীকারের জাতীয় নাট্যমেলা চেনাচ্ছিল থিয়েটার অফ রুটসের বরপুত্র রতন থিয়ামকে। থার্ড থিয়েটারের ঘাঁটি কার্জন পার্কে ‘মিছিল’ দেখতে তিল ধারণের ঠাঁই মিলছিল না কোনও-কোনওদিন। থেকে থেকে কলকাতার বুকে পাড়ি জমাচ্ছিলেন পিটার ব্রুক, ইয়েরশে গ্রোতস্কি, ফ্রিৎজ ভেনেভিৎজ।

সরকারের বদান্যতায় সবে মাথা তোলা পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি আর পোড়খাওয়া উৎপল দত্তর যোগসাজশে ‘আ মিডসামার নাইটস ড্রিম’ হয়ে যাচ্ছিল ‘চৈতালী রাতের স্বপ্ন’। একদিন শো-র ক’ঘণ্টা আগে রবীন্দ্রসদনের গ্রিনরুম জুড়ে অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন উৎপল। আস্তিন গোটাচ্ছিলেন। কমরেডদের ডাক পাঠাচ্ছিলেন সদলবল স্টেটসম্যান হাউস যাবেন বলে। কেন? সেদিনকার খবরের কাগজে ধরণী ঘোষ আচ্ছা সে ধুনে দিয়েছেন ‘চৈতালী রাতের স্বপ্ন’-কে। তাই গায়ের ঝাল মেটাতে হবে, ধরণীকে গণপিটুনি দিয়ে!
চার দশক বাদে ধরণীর কোনও উত্তরসূরি এসব ফিরিস্তি দিলে ‘আষাঢ়ে গপ্পো’ বলায় দায়ে পড়তে হতে পারে! তবু দু’কথা নিবেদন করতে সাধ হয়। লক্ষ্মীর সঙ্গে সরস্বতীর ভাব থাকলে কী কী হতে পারে তার আন্দাজ এতে মিলবে।
তখনও টিভির পর্দায় সেঁটে যায়নি বাঙালি গৃহকোণ। সিনেমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শনি-রবি-ছুটির দিনে ডাবল শো তো বটেই, হাটবার বৃহস্পতিতেও ভিড় লেগে আছে কলকাতার পুরোনো থিয়েটার পাড়ায়। শয্যাতুলুনির টাকায় ডজন দেড়েক টিকিট কেটে জামাইবাবুকে বগলদাবা করে শ্যালক-শ্যালিকার দল হাতিবাগানের থিয়েটারে ঢুকছে, দেখে-শুনে দিদির নাকের পাটা ফুলে নাকছাবিটা দুলে দুলে উঠছে– এই দৃশ্য তখন জলভাত। সিনেমার সৌমিত্র তখন থিয়েটার পাড়ার বেতাজ বাদশা। তাঁকে ঘিরে গ্রহ-উপগ্রহের ভিড়ে অনুপকুমার, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়দের আলাদা করে চেনা যাচ্ছে। রঞ্জিতমল কাংকারিয়ার তাঁবে থাকা স্টারের আশেপাশে তখনও হইহই ব্যাপার। রঙমহল, বিশ্বরূপা, সারকারিনা, রঙ্গনা, বিজন থিয়েটার– শ্রীরাধিকে-চন্দ্রাবলি কারে ধরি কারে ফেলি! আরও আছে। ব্লো-হট বিনোদনের পসরা সাজানো একদিকে গরানহাটায় মিনার্ভা। অন্যদিকে গড়পাড়ে রামমোহন মঞ্চ। মানিকতলা খালপাড়ে কাশী বিশ্বনাথ মঞ্চ, প্রতাপ মঞ্চ। আশেপাশে বয়েজ ওন হল, নেতাজি ইনস্টিটিউট। মিস শেফালি ও তাঁর অজস্র ক্লোন দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে লোকে! দেখাদেখি কালীঘাট পাড়ায় তপন থিয়েটারেও নাও ভিড়িয়েছে সওদাগরি চাল। জমে উঠেছে নহবৎ। সহস্র রজনী পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে। থামার লক্ষণ নেই! দেখাদেখি পাশের বিয়েবাড়িটার নামই হয়ে গেল ‘নহবৎ’। বক্স-অফিসে সাড়া ফেলা নাটকের নামে হওয়া সেই বিয়েবাড়িটা এখনও আছে, তার সাইনবোর্ডে যে লেটারিং সেটা হুবহু আসলটার মতো!
এসব কথা আজকাল কেউ বলে না। অথচ, আশির দশকে বেশিরভাগ লোকে অধুনালুপ্ত এই পাবলিক থিয়েটারকেই বুঝত। শিয়ালদা-হাওড়া দিয়ে জুড়ে থাকা মফস্সল বাংলার সঙ্গে কলকাতার প্রাণের আহ্লাদ ছিল বাণিজ্যবান্ধব এই নাট্য সংস্কৃতি। একদিন হঠাৎ পুজোর মুখে স্টার থিয়েটারে আগুন লাগল। ছাই হয়ে গেল সাধের রঙ্গালয়। আকাল লাগল লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে। এখন সব অলীক।

গ্রুপ থিয়েটারের উঁচকপালে নাট্যমোদীদের চেহারা এখনকার মতো মলিন নয় তখন। ঠিকানা বলতে দু’-তিনটে। রবীন্দ্রসদন সপ্তাহে একদিন, বুধবার। মাঝেসাঝে ইউনিভার্সিটি ইনসটিটিউট। আর একাডেমি অফ ফাইন আর্টস। মনে পড়ছে, ৭ নং ক্যামাক স্ট্রিট থেকে বেরিয়ে রাণু মুখার্জির গাড়ি থিয়েটার রোড ধরে এসে একাডেমির পোর্টিকোতে থামত রোজ। দীর্ঘকায়া গৌরাঙ্গিনীকে দেখতে মন্ত্রমুগ্ধ দাঁড়িয়ে থাকতাম। সেখানে ঢুকবার দুটো টিকিট কাউন্টারের বাঁ-দিকেরটাতে বহুরূপী-র খাস দখল। শনি-রবির সন্ধে তাঁদের জন্য বরাদ্দ রেখেছিলেন ‘লেডি’। শুক্রবার পিপলস লিটল থিয়েটারের জন্য। বুধ-বৃহস্পতি নান্দীকারের। আর দুটো ভাগ করে নিত অন্যান্য সবাই। বাংলা খবরের কাগজ কী ইংরিজি, অনেকখানি জায়গা জুড়ে সেইসব নাটকের সমালোচনা বেরত। রবিবারের কাগজে পাতা জুড়ে থাকত বিজ্ঞাপন।
তাতে একবার– ১৯৮০-তে, জানা গেল, শম্ভু মিত্রকে সামনে রেখে ব্রেশটের ‘গ্যালিলেওর জীবন’ করবে বলে জোট বেঁধেছে অনেকগুলো দল। জার্মানি থেকে উড়িয়ে এনেছে ফ্রিৎজ বেনেভিৎজকে। বক্স অফিস খুলতে না-খুলতে কয়েক মাসের টিকিট উড়ে গেল! শম্ভু ততদিনে সরে গেছেন নিয়মিত চর্চা থেকে। কালেভদ্রে ফিরছেন। তাঁকে দেখবে বলে সারা রাত জেগে আছে মানুষ, সকাল ১০টায় কাউন্টার খুললে টিকিট কাটবে বলে!

থিয়েটারের জন্য এমন পাগলামি রেওয়াজে দাঁড়িয়ে গেল ১৯৮৪-তে। নান্দীকারের জাতীয় নাট্যমেলা এল আর ‘ভিনি ভিডি ভিসি’ হয়ে গেল! রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর নেতৃত্বে সরকারের খানিক পিঠ-চাপড়ানি আর বেসরকারি অনেক খয়রাতি জোগাড় করে, দেশের বাছাই করা নট নির্দেশক দলকে এক ছাদের তলায় এনে দিলেন শ্যামবাজার স্ট্রিটের দলবল। হাবিব তনভির, কাভালম নারায়ণ পানিক্কর, শ্রীরাম লাগু, প্রসন্ন, রতন থিয়াম, মহেশ এলকুঞ্চওয়ার, বি জয়শ্রী, সত্যদেব দুবে, তীজন বাঈ– কত ভাবে কত ভঙ্গিতে বয়ে চলেছে সমকালীন ভারতের নাট্যচর্চা– দেখে আমাদের চোখ খুলে গেল।

বিস্ময় বাঁধ মানল না যখন বাংলাদেশ থেকে এল ঢাকা থিয়েটার, ‘কীত্তনখোলা’ নিয়ে। সেলিম আল দীনের লেখা নাটকে নাসির উদ্দিন ইউসুফের নির্দেশনা– ইয়োরোপিয়ান ড্রামাটার্জির শেকড় উপড়ে দেশজ নাট্যের দরজায় চেরাগ জ্বালিয়ে দিল আমাদের সামনে। যেন নতুন করে চিনলাম স্বাধীন বাংলাদেশকে। রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, আলী যাকের-কে সমীহ করলাম। এর জের টেনে নান্দীপট জমিয়ে দিল পদ্মা-গঙ্গা উৎসব। টাইটেল স্পনসর চেয়েছিলেন শম্ভু মিত্র যেন আসেন উদ্বোধনে। তাই হল। ফেরদৌসী মজুমদারের একক অভিনয়ে ‘কোকিলারা’ দেখে তৃপ্তি মিত্রর ‘অপরাজিতা’ মনে পড়ে গেল কারওর কারওর। কেউ কেউ দেখে নিলেন তৃপ্তির ‘সরীসৃপ’– যাতে পাবলিক থিয়েটারের মৌতাত, সঙ্গে গ্রুপ থিয়েটারের মেজাজ মিলে গেল এক সুতোয়। এই ধারাতে পাওয়া গেল উৎপল দত্তকেও, ‘আজকের শাজাহান’ নিয়ে।

সাতের দশকে নাট্যভাষা নিয়ে নিরীক্ষা চলেছে দেশ জুড়ে। কলকাতা নাম লেখায়নি। এবারে লেখাল। শাঁওলী মিত্র কথকতার শৈলীতে মহাভারতের অন্য বয়ান শোনালেন ‘নাথবতী অনাথবৎ’-এ। সেখানেও ঢল নামল।

সাহেবি ধরাচুড়ো খুলে দেশের নাটক খুঁজতে বেরিয়ে বিভাস চক্রবর্তী হাত ধরলেন মৈমনসিংহ গীতিকার। তাঁর নির্দেশনায় অন্য থিয়েটারের ‘মাধব মালঞ্চী কইন্যা’ বুঝিয়ে দিল রূপকথার চাল আজও ভাতে বাড়ে। আধুনিকতার চেনা বয়ানে ঘটাতে পারে অন্তর্ঘাত। গাঙে জোয়ার না-এলেও ‘মাধব মালঞ্চী কইন্যা’ চলল বছরের পর বছর। মনোজ মিত্রর ‘রাজদর্শন’ নিয়ে হিল্লি-দিল্লি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন বহুরূপী, ‘কিনু কাহারের থেটার’ দিয়ে তাঁরাও ছুঁয়ে ফেললেন দেশজ নাট্যের নাড়ি।

উত্তর-ঔপনিবেশিক নাট্যকলায় আমাদের হাতেখড়ি এবারে যেন পাকাপোক্ত হল।
তা বলে সাহেবি আন্দাজ মুছে গেল? দিন ফুরোল মেথড অ্যাক্টিং-এর? মোটেই না। অসিত মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়দের হাতযশে বেঁচে রইল সেসব। রিহার্সালে আরও রপ্ত হল নিচু চাবির অভিনয়ের ঢং। শ্যামানন্দ জালান-ঊষা গাঙ্গুলিরা হিন্দি থিয়েটারের ঝান্ডা উঁচিয়ে রাখলেন। যাঁকে দেখা যেত ব্রিটিশ কাউন্সিলের ডেস্কে, সেই জারিন চৌধুরী বিশেষভাবে সক্ষম ছেলেমেয়েদের নিয়ে অবাক-করা নাট্যভাষের উপস্থাপন করলেন। একের পর এক।
শীতের কলকাতার সাগর পাড়ের হাওয়া লাগত কলকাতায়। সেই সময় ব্রিটিশ কাউন্সিল, আমেরিকান সেন্টার, গোর্কি সদনের বদান্যতায় ইউরোপ-আমেরিকার কত নাটক দেখেছে রবীন্দ্রসদন, কলামন্দির। ওয়ার্কশপ করতে এসেছেন গ্রোতস্কি। ট্রেনিং করিয়ে গেছেন পিটার ব্রুক। ম্যাক্স মুলার ভবনের জলপানি পেয়ে নিরীক্ষাধর্মী নাটক করে চলেছেন অঞ্জন দত্ত। আর প্রসেনিয়াম নিয়ে মুখ ঘোরানো বাদল সরকার? অনাড়ম্বর আগ্রহে তৈরি করে চলেছেন একের পর এক প্রজন্মের দিন-বদলাতে-চাওয়া নাট্যকর্মীকে।
এই সীমাহীন বৈচিত্রকে হেমিংওয়ের ভাষায় ‘মুভেবল ফিস্ট’ বললে কি বাদ সাধবেন কেউ?

আরও এক থিয়েটার ছিল। যাকে দেখা যেত না, শোনা যেত। শুক্রবার রাত আটটায় একরকম বোধন হয়ে যেত। আসলি খেল জমত রবিবারের দুপুরে। আড়াইটের স্থানীয় সংবাদ শেষ হলেই আকাশবাণী কলকাতায় ঘোষণা শুরু হত ‘শুরু হচ্ছে নাটক’ দিয়ে। কমবেশি ৫০ মিনিটের নিটোল শ্রাব্য বিনোদন। এখনও দেখতে পাই দক্ষিণের বারান্দায় বোর্ড পেতে ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং করতে করতে কান পেতে আছেন আমার দীপকদা। বুঝি ধীমান চক্রবর্তী কি শুক্লা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলা চিনতে পেরে ঈষৎ উৎফুল্ল। পাশের বাড়ির ছাদের আলসেয় শুকোতে দেওয়া বড়ির পাশে মায়ের চুল আঁচড়ে দিতে দিতে আনমনা হয়ে গেছেন সোনালিদি। মন তার আমাদের মার্ফি ট্রানজিস্টরে।
এবং ছিল বিবিধ ভারতী। সেখানকার অবিসংবাদিত সম্রাজ্ঞী শ্রাবন্তী মজুমদার। জিংগল-কুইন তো তিনি বটেই, নানান রকমের স্পনসর্ড প্রোগ্রাম চলত তাঁর অঙ্গুলিহেলনে। রীতিমতো নাটক, যাকে বলে! গল্পেগাছায় ‘বোরোলিনের সংসার’ তাই আজও বেজে চলে লাখো বাঙালির বুকের কন্দরে। ‘অমর কাহিনি আরব্য রজনী’-র শেহেরজাদে কত ফাগুনের মাধুরী ছড়িয়েছেন আশির দশক জুড়ে– তা গুণে শেষ করা যায় না! ‘শনিবারের বারবেলা’-র সেই প্লুতস্বরে জমানো হরেক অভিমান ঝরে পড়েছে অনাঘ্রাত আদরের মতো। মনে পড়ে, পাবলিক থিয়েটারের কত নাটকের টুকরো শুনেছি সেইসব দুপুরে। ‘শ্রীমতী ভয়ংকরী’-তে রবি ঘোষকে নাজেহাল করতেন যে মুখরা বঙ্গবালা তাঁকে আজও মনে রেখেছে ১৯৮৫-র হেমন্তের বেলা। কোনও বশীকরণের মন্ত্রে তাঁকে ভোলানো যায়নি। আর শুনেছি যাত্রা। স্বপনকুমার, বীণা দাশগুপ্ত, শেখর গাঙ্গুলি, জ্যোৎস্না দত্তর সুরেলা সম্মোহনে ভোঁ হয়ে কেটে গেছে কত মধ্যদিন! চিতপুরে কোন পালা খোলা হল, কোন কোম্পানি কবে কোথায় গাইতে যাচ্ছে, বায়নায় জন্য নায়েক বন্ধুরা কোন নাম্বারে যোগাযোগ করবেন, কোলিয়ারি বুকিং-এর মনসবদার সন্দীপ ভাণ্ডারীকে এবারে যোগাযোগ করা যাবে কি না– সব বলে দিতেন উপস্থাপক কল্যাণ সুন্দর।

যাত্রাকে থিয়েটার মানতে ভারি বয়েই গেছিল সেই সময়ের কলকাতার, কিন্তু ভুললে চলবে না ১৯৮০-র দশক চিতপুরের যাত্রার রমরমার মরসুম। সাতের দশক জুড়ে যাত্রা ময়দান কাঁপিয়ে একটু জিরোতে চাওয়া উৎপল মাঠের যাত্রার মেজাজ উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন শহরের থিয়েটারে। রেখে গিয়েছিলেন তাঁর হাতে গড়া উজ্জ্বল এক ঝাঁক কুশীলবকে। প্রসেনিয়াম-করা অজিতেশ কিংবা ভুলে-যাওয়া অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় দিব্যি মানিয়ে নিয়েছিলেন সেখানকার পেশাদার কাঠামোয়। সারকারিনার অমর ঘোষ পাল্টে দিয়েছিলেন যাত্রার আলোকসম্পাতের ভোল।
এ-সবই হয়েছিল বাম আমলে। প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় বামফ্রন্ট সরকারের শাসনকালে। লাল ঝান্ডার সঙ্গে গ্রুপ থিয়েটারের এক ধরনের বেরাদরি ছিল। কিছু ভালো-লাগা মন্দ-লাগা ছিল। তোষণ ছিল, তোষামোদ ছিল। কিন্তু নাক গলানো ছিল না বললেই চলে।
‘শতফুল বিকশিত হোক’-এর হাঁক পেড়ে মাও সে তুং-ও ছিলেন সেই লেফট ইকোসিস্টেমে। বুঝি সেটাই ছিল চাবিকাঠি, যার দরুন এত আশকারা আর আরাম পেয়েছিল আশির দশকের কলকাতার থিয়েটার। নইলে ভবি ভুলত না।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved