ghong the traditional raincoat made of chihar leaves। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চিহড় পাতার বর্ষাতি

সারা গ্রীষ্মকাল চিহড় পাতা সংগ্রহের পর শুরু হয় রোদে রাশিরাশি পাতা শুকোনোর কাজ। বর্ষার প্রাক্কালে আবহাওয়ায় যখন একটু সিক্ত ভাব আসে, তখন ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসা সবুজ পাতার রং পালটে হয়ে যায় হালকা তামাটে। সেই সময় পাহাড়ঘেঁষা গ্রামের মহিলারা বসেন ঘঙ বানাতে। সংগ্রহ করে রাখা সজারুর কাঁটা দু’দিক পালিশ করে একটার পর একটা চিহড় পাতা জুড়ে চলে পাতা সেলাইয়ের কাজ। প্রথমে একটা পাতা, তারপর আরও দুটো পাতা, আবার তিন-চারটে পাতা, তাদের নিচে আরও পাতা– এভাবে ক্রমে মাছের আঁশের মতো সাজিয়ে চলতে থাকে সেলাই। হাতের জাদুকরিতে তৈরি হতে থাকে ঘঙ।

প্রচ্ছদের আলোকচিত্র: সুদীপ পাত্র

শেষ আপডেট: জুন ১৩, ২০২৬, ১৬:০৪   
Facebook WhatsApp Messenger

পুরুলিয়া– রুক্ষ, ঊষর ও কঙ্করময়। সেই ঊষর জমিতে ঝরতে থাকা চিহড় পাতা জানান দেয় আষাঢ় আসছে। পাতাকুড়ানির দল ঝুড়ি আর বাঁশের তক্তা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে জঙ্গল-পাহাড়ের দিকে। গোটা গ্রীষ্মকাল জুড়ে তাঁরা সংগ্রহ করেন চিহড় পাতা। সূঁচ-সুতোর বাঁধনে এই পাতা দিয়েই তৈরি হয় ‘ঘঙ’– পুরুলিয়া জেলার নিজস্ব বর্ষাতি। প্রকৃতির সঙ্গে প্রান্তিক মানুষের নিবিড় সহাবস্থানের এক জীবন্ত সংস্কৃতি।

zoom
আলোকচিত্র: বেঙ্গল’স আনটোল্ড টেলস

১০-৪০ সেন্টিমিটার আয়তনের ‘চিহড়’ পাতার আকৃতি উটের ক্ষুরের মতো। সারা গ্রীষ্মকাল চিহড় পাতা সংগ্রহের পর শুরু হয় রোদে রাশিরাশি পাতা শুকনোর কাজ। বর্ষার প্রাক্কালে আবহাওয়ায় যখন একটু সিক্ত ভাব আসে, তখন ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসা সবুজ পাতার রং পালটে হয়ে যায় হালকা তামাটে। সেই সময় পাহাড়ঘেঁষা গ্রামের মহিলারা বসেন ঘঙ বানাতে। সংগ্রহ করে রাখা সজারুর কাঁটা দু’দিক পালিশ করে একটার পর একটা চিহড় পাতা জুড়ে চলে পাতা সেলাইয়ের কাজ। প্রথমে একটা পাতা, তারপর আরও দুটো পাতা, আবার তিন-চারটে পাতা, তাদের নিচে আরও পাতা– এভাবে ক্রমে মাছের আঁশের মতো সাজিয়ে চলতে থাকে সেলাই। হাতের জাদুকরিতে তৈরি হতে থাকে ঘঙ। এই কাজ বেশ সময় এবং ধৈর্য সাপেক্ষ। সকালে হয়তো বাড়ির কোনও মেয়ে বসে কাজ শুরু করলেন, তারপর দুপুরে সব কাজ সেরে তার মা হাত লাগালেন কাজে। পরিবারের প্রায় সব মহিলা মিলে, খানিকটা আড্ডার ছলে। ধীরে ধীরে ঘঙ ধারণ করতে থাকে একটি ত্রিভুজাকৃতি পিরামিড আকৃতির শিল্পরূপ। ছোট-বড় নানা হাতের দিনরাতের সাধনায় একটু একটু করে পূর্ণতা পায় একটা ঘঙ।

বর্ষা নামলে চাষিবাড়ির সকলে নিজের নিজের ঘঙ মাথায় দিয়ে বেরিয়ে পড়েন পাহাড়তলির খেতে। মাথা থেকে কোমর অবধি ছড়িয়ে পড়ে পাতার আচ্ছাদন, সামনের দিকটা উন্মুক্ত। দেখতে ঠিক যেন ডোঙার মতো। বৃষ্টিতে মই দেওয়া, বীজ বোনা, ফসল তোলা– সব কাজ চলে নির্বিঘ্নে। তাঁরা বলেন, যত জোরেই বৃষ্টি হোক, শিলাবৃষ্টি পড়ুক বা বিশাল ঝড় আসুক– ঘঙ তাঁদের মাতৃগর্ভের মতো প্রতিরোধ করে। তাদের ঠান্ডা ও কষ্ট অনুভব করতে দেয় না একটুও।

চিহড় পাতার তৈরি প্রাকৃতিক ঘঙ-এর ওজন প্রায় তিন-চার কেজি। একটি বড় ঘঙ বিক্রি হয় প্রায় ৮০-১০০ টাকায়। ৫০-৬০ টাকা দাম পড়ে ছোট ঘঙ-এর। আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায়, ছাতা ও রেনকোটের সহজলভ্যতায় এবং পলিথিন-ত্রিপলের সস্তা বিকল্প হাতের নাগালে চলে আসায় হারিয়ে যাচ্ছে এই চিহড় পাতার ঘঙ। প্রাকৃতিক ঘঙ-এর জায়গায় স্থান করে নিয়েছে বিভিন্নরকম সিন্থেটিক উপাদানের তৈরি বর্ষাতি ঘঙ। দামে কম, তার ওপর বানানোর ঝক্কি নেই, ফলে সহজেই চাষিরা এখন বিকল্পে ঝুঁকছেন। পুরুলিয়ার এই কুটিরশিল্প তাই এখন বিলুপ্তপ্রায়।

zoom
আলোকচিত্র: বনানি পাত্র

কিন্তু হাতের কাজের নিপুণতায় ক্লান্তিহীন পথ চলা অব্যাহত রয়েছে ঘঙ-এর। ভারী ‘ঘঙ’-এর পরিবর্তে গ্রামীণ মানুষ বৃষ্টির হাত থেকে মাথা বাঁচাতে আজও ব্যবহার করেন ‘ঘঙ টুপি’ আষাঢ় মাসে ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ি থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে পশ্চিমবঙ্গ-ঝাড়খণ্ডের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় ‘কানাইসর পাহাড়’ পুজো জঙ্গলমহলের আদিবাসী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব। পুজো উপলক্ষে সংগঠিত মেলায় প্রতি বছর অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে চিহড় পাতার এই ঘঙ টুপি– সবার চেয়ে আলাদা এবং অভিনব। বর্ষার সময় জঙ্গলমহল এলাকার মানুষজনের কাছে ঘঙ টুপি হয়ে ওঠে ঘরোয়া ছাতা। এখনও বেলপাহাড়ির পার্শ্ববর্তী বারোডাঙা, মালিবনি গ্রামে জঙ্গলের পরিচিত চিহড় গাছের পাতা দিয়ে তৈরি লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে যায়নি। আজকের দামি দামি হ্যাট, ক্যাপদের সঙ্গে লড়াইতে মাথা উঁচু করে সদর্পে টিকে আছে চিহড় পাতার ‘ঘঙ টুপি’। 

‘ঘঙ’ ছাতা তৈরি করেন ছোটনাগপুরের এক পাহাড়ি জনগোষ্ঠী মাহালি। ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার পাহাড়ি অঞ্চল, মেদিনীপুরের জামবনি, বেলপাহাড়ির জঙ্গলে এদের বাস। শিকারজীবী হলেও চিহড় পাতা দিয়ে ঘঙ ছাতা তৈরি এঁদের পেশা। জামবনী থানার চিলকীগড়ের কাছাকাছি পাশাপাশি দু’টি গ্রাম– বড় ঘঙ আর ছোট ঘঙ। মাহালিরা চিলকীগড়ের বন থেকে বড় বড় চিহড় পাতা তুলে আনেন। ছায়ায় পাতা শুকিয়ে বাখারির কাঠামোর উপর বাঁশের ঝুড়ি বা চালার (চাল ঝাড়া) আকারে ছাতা বাঁধেন। রোদ-বৃষ্টি থেকে মানুষকে রক্ষা করে চিহড় পাতার এই ছাতা। 

সাঁওতালদের ধর্মাচারগত জীবনেও ‘ঘঙ’ ছাতার গুরুত্ব আছে। ভাদ্রমাসের শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে সাঁওতালদের ‘ছাতোম পরব’। সাঁওতালদের এই পরবে ‘ছাতোম বোঙা’র থানে উৎসর্গিত হয় চিহড় পাতার ছাতা। পশ্চিম সীমান্ত বাংলার পুরুলিয়ার বরাবাজারের গড় মহলের রাজাদের সেই তিথিতেই ‘ইদ পরব’। রাজবাড়ির সামনের প্রশস্ত মাঠে সেদিন পোঁতা হয় একটি শালগাছ। তার মাথায় বাঁধা হয় কাপড়ের এক বৃহৎ রঙিন ছাতা। ইদ পরবে ছাতা থেকে বর্ষিত হয় দই, ফুল, আতপ তণ্ডুল। সুবর্ষণের কামনায় ‘ছাতোম পরব’ স্থানীয় রাজার আধিপত্য ও প্রভুত্ব ঘোষণার প্রতীকী অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানে রাজশক্তির দুর্দিনে আচার রক্ষা করতে গিয়ে ফিরে এসেছে সাঁওতালদের চিহড় পাতার ছাতা। 

কোনও এক বর্ষার সকালে, পুরুলিয়ার কোনও প্রত্যন্ত গ্রামে এখনও দেখা মেলে চিহড় পাতার এই বর্ষাতির। জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক দূষণ এবং পরিবেশ সংকটের এই সময়ে ঘঙ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা প্রজ্ঞার কথা। যে অঞ্চলে ঝাঁ-চকচকে আদবকায়দা নেই, নেই অর্থের প্রাচুর্য, সেখানে প্রকৃতিই হয়ে উঠেছিল প্রযুক্তির উৎস। ঘঙও তেমনই এক উত্তরাধিকার। এটি শুধু বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করার উপকরণ নয়; এটি জঙ্গলমহলের মানুষের জীবনসংগ্রাম, সৃজনশীলতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের প্রতীক।

জঙ্গলমহলের মারাংবুরুকে ঘিরে শালগাছ বেয়ে এ-গাছ ও-গাছে অনেক দোলনা বানিয়ে ওপরে উঠে গিয়েছে চিহড়লতা। সাহিত্যিক নলিনী বেরা তাঁর ‘অপারেশন পাঁচ কাহিনা’ ছোটগল্পে উল্লেখ করেছেন চিহড়লতার কথা– “আচমকা কে বা কারা সামনের বড় জঙ্গলে ডালেপাতায় ঝোপেঝাড়ে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে ‘হই-হুস হুস’ আওয়াজ করে কাকে যেন তাড়া করছে। জঙ্গল আর সে জঙ্গল নেই। গরু-ছাগল চরাতে এসে বট-অশ্বত্থের ঝুরিতে চিহড় লতার দোলনা বানিয়ে দোল খাওয়ার দিন শেষ!”

অযোধ্যা পাহাড়ে শালবনে চিহড় পাতার বিছানায় নিদ্রা যান বনদেবী সীতা মা। বনস্পতি শূন্য, সবুজহীন, অনাবৃত পাহাড় জলধারা ধরে রাখতে পারে না, হড়পা বানে সব ভেসে যায়। এই বৃক্ষলতা ঢাল হয়ে দাঁড়ায় পাথরে নেমে আসা ধ্বসের সামনে। বিরহোড় সম্প্রদায় চিহড়লতা দিয়ে ‘কুম্ভা’ নামক বাসস্থানও তৈরি করেন। পাহাড়-জঙ্গলের জনজাতি মানুষের জীবনে চিহড়লতা জড়িয়ে আছে অঙ্গাঙ্গীভাবে।

তাই মনে হয়, আধুনিকতার দৌড়ে অনেক কিছু বদলে গেলেও, অর্থনৈতিক সামর্থ সীমিত হলেও, মানুষের প্রকৃতিনির্ভর জ্ঞানের মূল্য কখনও ফুরিয়ে যায় না। ঘঙ সেই চিরন্তন জ্ঞানেরই এক নীরব সাক্ষী। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, বহু বহু যুগের অনুশীলনে প্রান্তিক মানুষজন অর্জন করেছে ঘঙ তৈরির নৈপুণ্য, প্রকৃতির নিজের হাতে তুলে দেওয়া উপহারে হস্তশিল্পের দক্ষতায় ঘঙ এক অত্যাশ্চর্য চারুশিল্প।

পশ্চিম সীমান্ত বাংলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার জঙ্গলের চিহড় গাছের বড় বড় পাতা জুড়ে জুড়ে অপূর্ব শিল্প সুষমায় বানানো ঘঙের গায়ে লেগে রয়েছে আদিম বন্যতার নির্যাস। যদিও আধুনিকতার জোয়ারে ঘঙের জায়গায় বসেছে উজ্জ্বল, রংবাহারি প্লাস্টিকের হালকা বর্ষাতি, কিন্তু এই জংলি ঘঙ নিজস্ব ছন্দে আজও বেঁচে আছে জঙ্গলের প্রান্তবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতির উপহার হয়ে, এক জীবন সংগ্রামের হাতিয়ার হয়ে।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন সৃজা মণ্ডল-এর অন্যান্য লেখা

………………………

Chihar Leaves Ghong raincoat Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Traditional Raincoat

Share this article on