How Mango Conquered the World from India to America by Dipankar Dasgupta | Robbar
Robbar
  • ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমের বিশ্বযাত্রা

মানুচ্চির বিবরণে নানা স্বাদ-গন্ধের আমের কথা রয়েছে। সেইরকম সব চমকপ্রদ আমের হদিশ মেলে মুর্শিদাবাদের নবাবের বাগানে। লাল আর গোলাপি আভা মেশানো অপূর্ব রঙের আম ‘চিনি শক্কর’। খোসা ছাড়ালে ভেতরের শাঁস গোলাপি। আঁশবিহীন রসাল আমে যেন চন্দনের সৌরভ। আবার মোচার আকৃতির আপেল-রঙা, পাতলা আঁটির ‘গুল শুকরি’ ছিল গোলাপ-গন্ধী। আজিমগঞ্জে বিরল প্রজাতির আম হত ‘চরকি চম্পা’। আঁশ থাকলেও প্রচুর রস আর তাতে অবিকল চাঁপা ফুলের সুবাস। কারও কাছে তার পরিচিতি ‘হুজুর পসন্দ’ নামে। হয়তো কোনও নবাব বা পদস্থ আধিকারিকের পছন্দের ফল ছিল বলে এই নাম। আবার এমন জনশ্রুতিও রয়েছে, চম্পাবতী নামের এক বাইজির নামে বিশেষ আমটির নাম রাখা হয়েছিল ‘চম্পা’।

শেষ আপডেট: জুন ২৯, ২০২৬, ২০:১১   
Facebook WhatsApp Messenger
How Mango Conquered the World from India to America by Dipankar Dasgupta | Robbar

শুধু কলকাতা বা সারা বাংলায় নয়, রাজ্য ও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আমেরিকার সিয়াটল, সান ফ্রান্সিসকো, নিউ ইয়র্ক কিংবা ওয়াশিংটন, ডিসি-ও এখন আমের সুবাসে আমোদিত। রাজধানী দিল্লির আমের মেলায় যখন এই বাংলার হিমসাগর, লক্ষ্মণভোগ, গোপালভোগ বা ফজলির রাজকীয় উপস্থিতি, কলকাতার নিউটাউনের জৈব হাটে যখন মালদা, মুর্শিদাবাদ-সহ নানা জেলার সব সেরা আমের সম্ভার, আমেরিকার রাজধানী শহরের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ডুপন্ট সার্কেলে তখন স্ব–মহিমায় শোভা পাচ্ছে বেনারসের ‘ল্যাংড়া’, মহারাষ্ট্রের ‘আলফানসো’ ও ‘কেসর’, লখনউয়ের ‘দশেরি’, অন্ধ্রপ্রদেশের ‘ব্যাঙ্গনপল্লে’ ও ‘হিমায়েত’ বা ‘ইমাম পসন্দ’, গুজরাতের ‘রাজাপুরি’। আমেরিকার নানা শহরে মার্কিন স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের জমকালো সব অনুষ্ঠানের মাঝেও অভূতপূর্ব সাড়া ফেলে দিয়েছে ভারতীয় ফলের রাজা আমের বৈচিত্র ও তার স্বর্গীয় স্বাদের সুষমা।

zoom
‘আলফানসো’ ও ‘কেসর’ আমের আমেরিকা ভ্রমণ

তবে ভারতীয় আম বলতে এতদিন অধিকাংশ বিদেশির ধারণায় ছিল শুধুই আলফানসো। কারণ, রপ্তানিযোগ্য আম হিসেবে ছিল তারই বিশেষ সমাদর। কাজেই বেনারসের ‘ল্যাংড়া’ বা মালিহাবাদের ‘দশেরি’ কিংবা অন্যান্য আরও কত আমের ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের অনন্যতা ও সৌরভ সম্পর্কে বিদেশে কোনও অভিজ্ঞতাই ছিল না। আমেরিকার বাজারে বিদেশিদের কাছে নানা জাতের আমের পরিচিতি বাড়াতে এবং প্রবাসী ভারতীয়দের কাছে আমের মধুর স্মৃতি উসকে দিতে ভারতীয় দূতাবাসের উদ্যোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় শহরে আয়োজিত হচ্ছে ‘ম্যাঙ্গো ম্যাজিক’, ‘ফ্রি ইন্ডিয়ান ম্যাংগো পার্টিজ’, ‘টেস্ট অব ইন্ডিয়া’ বা ‘টেস্ট দ্য ট্রপিকাল ম্যাজিক’ শিরোনামে বিনামূল্যে আম চেখে দেখার উৎসব। সঙ্গে কোথাও থাকছে আমের লস্যিও। মার্কিন ফল আমদানিকারক, ‘কস্টকো’-র মতো বড় রিটেল চেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি-সহ বহু মানুষ আমের প্রদর্শনীতে এসেছেন। ‘কেসর’ ও ‘ল্যাংড়া’ আম খেয়ে তো বহু মার্কিন বাসিন্দা একেবারে মুগ্ধ, আর প্রিয় আমের টুকরো মুখে দিয়ে প্রবাসী ভারতীয়দের অনেকেরই মনে ভেসে উঠছে দেশের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে কাটানো সেই গ্রীষ্মের দিনগুলির মনোরম স্মৃতি। সেই আবেগে কারও চোখে জল। বছরের প্রথম আমের বাক্স হাতে পেলে যেন তা প্রবাসে বড়দিনের আনন্দকেও ছাপিয়ে যায়। ইনস্টাগ্রামে এক প্রবাসী ভারতীয় লিখেছেন, ‘নিউইয়র্কে ৩টি আমের জন্য আমি ৫ ডলার দিয়েছি। কিন্তু দেশ থেকে আসা এই আমের সঙ্গে কোনও কিছুরই তুলনা হয় না। ভাইবোনদের সঙ্গে বালতি ভরে আম খাওয়ার সেই প্রতিযোগিতা, আমের অসাধারণ স্বাদ, হাসি আর অসংখ্য স্মৃতি– সবই খুব মনে পড়ে।’

zoom
সিয়াটলে ম্যাঙ্গো ম্যাজিক

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর সাম্প্রতিক ‘মন কি বাত’ পডকাস্টে ভারতীয় আমের আঞ্চলিক উৎকর্ষের কথা তুলে ধরে বলেছিলেন মহারাষ্ট্র ও কোঙ্কনের ‘আলফানসো’ বা ‘হাপুস’, গুজরাতের ‘কেসর’, উত্তর প্রদেশের ‘চৌসা’, ‘দশেরি’, ‘ল্যাংড়া’ থেকে শুরু করে বিহারের ‘জর্দালু’, অন্ধ্রপ্রদেশের ‘ব্যাঙ্গনপল্লে’, ‘নীলম’ বা ‘তোতাপুরি’ কিংবা বাংলার ‘হিমসাগর’, ‘কোহিতুর’, ‘লক্ষ্মণভোগ’, ‘ফজলি’ ও ‘আম্রপালি’-সহ বিভিন্ন জাতের শ্রেষ্ঠ আম গ্রামের বাগিচা থেকে এনে বিশ্বের দরবারে হাজির করতে হবে। রাজ্যবিশেষে বিভিন্ন প্রজাতি, মাটি ও জলবায়ুর গুণে আমের নানা রং, আকৃতি, স্বাদ ও সুবাস। অসামান্য তার ঐতিহ্য। ‘আলফানসো’ সুপরিচিত, কিন্তু মালদহের ‘লক্ষ্মণভোগ’-এর কৌলীন্য মোটেই কম নয়। নানা মহলের প্রত্যাশা, এই আমও একদিন আন্তর্জাতিক বাজারে স্থায়ী জায়গা করে নেবে। বছর দুয়েক আগেই খবর হয়েছিল, তখন তিহার জেলে বন্দি ডায়াবেটিসের রোগী দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল না কি জামিন আদায়ের জন্যে রোজ আম খেয়ে তাঁর সুগারের মাত্রা বাড়াচ্ছেন! তবে তিনি যদি ভুল করেও ‘লক্ষ্মণভোগ’ খেতেন, তাহলে তাঁর সুগার মোটেই বাড়ত না। কারণ, অন্যান্য আমের তুলনায় বাংলার এই বিশেষ আমটিতে শর্করার পরিমাণ সবচেয়ে কম। এই যুগে যখন মধুমেহর মতো অসংক্রামক নানা রোগের বাড়বাড়ন্ত তখন জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জি আই) ট্যাগ পাওয়া ‘লক্ষ্মণভোগ’ অবশ্যই অনেক গুরুত্ব পেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ আরও কয়েকটি দেশে আম উৎসব আয়োজনের পাশাপাশি নয়াদিল্লিতে মোট ৮২টি বিদেশি দূতাবাসেও ‘ল্যাংড়া’, ‘ব্যাঙ্গনপল্লে’, ‘দশেরি’ ও ‘কেসর’-সহ জি আই ট্যাগযুক্ত চার জাতের আম পাঠানো হয়েছে সাংস্কৃতিক কূটনীতির প্রতীক হিসেবে।

ভারতীয় আম নিয়ে মার্কিন ও প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে উন্মাদনা কিন্তু রীতিমতো বেড়ে চলেছে। ফলে আম আমদানি করে ‘কস্টকো’ সিয়াটল, লাস ভেগাস, নিউ জার্সি এবং লস অ্যাঞ্জেলেস এলাকার বিভিন্ন স্টোরে সরবরাহ করার মাত্র দু’ ঘন্টার মধ্যে সমস্ত আম বিক্রি হয়ে গিয়েছে। আবার নিউ ইয়র্কের ইউনিয়ন স্কোয়ারের আম মেলায় বৃষ্টি মাথায় করেও ভিড় জমিয়েছেন হাজার খানেক আম-প্রেমী। আগ্রহী মানুষেরা ঠিক খোঁজে থাকেন ভারত থেকে আমদানি করা আমের। সেই কারণেই ৫০ থেকে ৬০ মার্কিন ডলার দামের আমের বাক্সগুলি চটপট স্টোর থেকে উড়ে যাচ্ছে। সাধারণত একটি বাক্সে ১০ থেকে ১২টি আম থাকে, সেই হিসাবে প্রতিটি আমের দাম পড়ে প্রায় ৫ থেকে ৬ ডলার। বিমান পরিবহন খরচ-সহ আনুষঙ্গিক কারণে গত বছরের ৪০ থেকে ৪৫ ডলারের তুলনায় এবারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তবু ভারতের আম কিনতে বিপুল আগ্রহ। আর প্রিমিয়াম মানের আলফানসো আমের একটি বাক্সের দাম আরও বেশি– ৬৫.৯৯ মার্কিন ডলার পর্যন্ত।

zoom

অস্থিরচিত্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অচলাবস্থার মধ্যেও স্মরণ করা যেতে পারে, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের আশঙ্কায় ১৯৮৯ সালে আমেরিকায় ভারতীয় আম আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। তার পরের কয়েকটি দশক ধরে ভারত আম রপ্তানি করতে পারেনি। ভারতীয় আম বিষমুক্ত কি না যাচাই করার জন্য উন্নত প্রযুক্তির অভাব ছিল। দক্ষিণ আমেরিকার ফলের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ‘হট-ওয়াটার ট্রিটমেন্ট’ তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল ভারতীয় আমের চেহারা ও স্বাদ-গন্ধ নষ্ট করে দিত। বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে গামা বিকিরণ (গামা রেডিয়েশন) ব্যবহারের অনুমোদন আসে ২০০৬ সালে। তখনই ভারত থেকে আম রপ্তানির বিষয়টি আবার বিশেষ সম্ভাবনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ভারত সফরে এসে আমের স্বাদ পেয়ে বলে উঠেছিলেন, ‘দিস ইজ আ হেল অফ আ ফ্রুট’– এটা তো অসাধারণ এক ফল! সেই মন্তব্য আম আমদানিকারকেরা আজও আনন্দের সঙ্গে উদ্ধৃত করেন। এটা সত্যিই কথার কথা ছিল না। আম খেয়ে প্রেসিডেন্ট বুশের এত ভালো লেগেছিল যে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে তাঁর আলোচনায় রফা হয়, মার্কিন মোটর সাইকেল হার্লে ডেভিডসন ভারতের বাজারে ঢুকতে দেওয়ার বিনিময়ে আমেরিকার বাজারেও ভারতের আমের প্রবেশে ছাড়পত্র দেওয়া হবে।

সেবারে ভারত-মার্কিন অসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরকে স্মরণীয় করে রাখা হয়েছিল মার্কিন প্রতিনিধিদের ‘ম্যাংগো শেক’ পরিবেশনের মাধ্যমে। অবশেষে ১৮ বছরের খরা কাটিয়ে ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকায় রপ্তানি হওয়া ভারতীয় আমের কদর বাড়ছে। গত বছর অবশ্য কিছু টেকনিক্যাল সমস্যায় সানফ্রানসিসকো, লস অ্যাঞ্জেলেস ও আটলান্টায় প্রায় সওয়া চার কোটি টাকার আমের রপ্তানি আটকে দেওয়া হয়েছিল। তবে সব বাধা কাটিয়ে ভারতীয় আম আবার আমেরিকার মন জয় করছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভার্জিনিয়ার এক আমদানিকারক জানিয়েছেন, তাঁদের সমস্যা আম বিক্রি করা নয়, বরং সেইসব আম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছনোর আগেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। আর এক ব্যবসায়ী জানাচ্ছেন, তাঁর ফেডএক্স ডেলিভারি ভ্যানের মেক্সিকান চালক এখন মেক্সিকোর আম ছেড়ে ভারতের আম কিনছেন। মেক্সিকো বা লাতিন আমেরিকার ‘টমি অ্যাটকিনস’, ‘কেন্ট’ বা ‘আতাউলফো’ আমের সম্ভারে ওয়ালমার্ট, টার্গেট, কস্টকো বা পাড়ার সেভেন ইলেভেন স্টোর প্রায় সারা বছর ভরে থাকে। আমেরিকার বাজারের ৯৯ শতাংশ তো সেই সব আমেরই দখলে। পাঁচ-ছ’টি আমের একটি বাক্সের দাম ১১-১৩ ডলার। কিন্তু একবার যে ভারতের আমের স্বাদ পেয়েছে তার মুখে কি আর অন্য কোনও দেশের আম রুচবে? তাই ওই মেক্সিকান ড্রাইভার এখন ভারতীয় আমেই মজেছেন।

zoom
রণেন সেন ও মাইক জোহানেস-এর আম বিনিময়, ২০০৭

মার্কিনরা যত বেশি ভারতীয় আমের স্বাদ পাবেন, আমেরিকায় ভারতের নানা জাতের আমের বাজারও তত বাড়বে। দীর্ঘ ১৩-১৪ হাজার মাইল পেরিয়ে ভারতের আম আমেরিকার মাটিতে পৌঁছতে হ্যাপা অনেক। একটু দেরি হলেই সুস্বাদু সব আম পচে যাবে। তাই আম রপ্তানির জন্য তৈরি হয়েছে বিশেষ ‘গ্রিন চ্যানেল’ যাতে গাছ থেকে পাড়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সেগুলি লন্ডন বা দুবাই হয়ে পৌঁছে যায়। বড় বড় আমদানিকারক ছাড়াও হায়দরাবাদ বা তেলেঙ্গানার অনেক প্রবাসী পেশাদার বা ব্যবসায়ী নির্দিষ্ট মরসুমে আম আমদানি করে ইদানিং বাড়তি রোজগার করছেন। কস্টকো, প্যাটেল ব্রাদার্স কিংবা ইন্ডিয়া বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৈরি হয়েছে সম্ভাব্য ক্রেতাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্ৰুপ– ‘ইউএসম্যাংগোওয়ালে’। মার্কিন বিমানবন্দরে আমের কার্গো নামার আগেই সবার কাছে মেসেজ চলে যায় এবং আগাম বুকিংয়ের ভিত্তিতে বাড়ি বাড়ি দ্রুত ডেলিভারি হয়ে যায় রসালো ‘আলফানসো’, ‘কেসর’, ‘ল্যাংড়া’ কি ‘দশেরি’। আমদানিকারক আর খাঁটি ডিস্ট্রিবিউটররা চালান ধরে রাখতে একেবারে কট্টর প্রতিযোগিতা করে বুকিং সিস্টেম চালায়। সেলিব্রিটি শেফ বিকাশ খান্না ‘দিল ম্যাংগো মোর’ নামে একটা ব্র্যান্ড চালান, যার মাধ্যমে তিনি আমেরিকার ইস্ট কোস্টের বিভিন্ন শহরে উৎসাহী ক্রেতাদের কাছে হাজার হাজার আম পৌঁছে দিচ্ছেন। সৌদি আরব ও আরব আমিরশাহির পর আমেরিকাতেই আমদানি হয় সবচেয়ে বেশি ভারতীয় আম। বিদেশের বাজারে আমের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ইতালি, সিঙ্গাপুর, হংকং, জাপান, জার্মানি, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, এমনকী আইসল্যান্ডেও আম উৎসব আয়োজিত হচ্ছে।

ভারতীয় আমের প্রতি বিদেশিদের অনুরাগের ইতিহাস বিরাট। নৃত্যশিল্পী অমলাশঙ্কর যখন ছোটবেলায় তাঁর বাবা ইকনমিক জুয়েলারির অক্ষয় নন্দীর সঙ্গে প্রথম বিদেশে যান, তখন এক ফরাসি বৃদ্ধা তাঁকে শুকনো আমের আঁটি দেখিয়ে বলেছিলেন, এই দেখ তোমাদের দেশের ফলের বিচি, যার মতো সুস্বাদু ফল জীবনে আর খাইনি। সেই প্রাচীনকালে বাবর বাদশা থেকে পর্তুগিজ সেনাপতি, বিদেশি পর্যটক সকলের কাছেই আম ছিল প্রিয়। খোদ আকবর বাদশাও তো ছিলেন পুরো আম–পাগল! গোয়া থেকে পর্তুগিজ জ্যেসুইটদের নিজের দরবারে আমন্ত্রণ জানিয়ে সমাদরে রেখেছিলেন বছরের পর বছর। গাছের কলম তৈরি করে ফল চাষে তাঁরা ছিলেন দক্ষ। তাঁদের সাহায্যে দ্বারভাঙায় এক লাখ আম গাছ রোপন করিয়েছিলেন আকবর। আজকের ‘লাখ বাগে’ গড়ে উঠেছিল দেশের প্রথম সেই ফল বাগিচা। তবে শুধু বিহারে নয়, মুঘল সম্রাটের নির্দেশে সারা দেশেই প্রসার ঘটেছিল আম বাগানের। আমের পরিচর্যা নিয়ে মুঘল আমলে গভীর ভাবনাচিন্তার শেষ ছিল না। ‘বাবরনামা‘, ‘আইন–ই–আকবরি‘, ‘তুজুক–ই–জাহাঙ্গিরি‘তে রয়েছে আমের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ। আবার আম গাছের কলম করার কৌশল নিয়ে ফার্সিতে বই লিখেছিলেন যুবরাজ দারাশুকো। আবুল ফজল লিখেছিলেন, আমের স্বাদ–গন্ধ বাড়ানোর জন্যে গাছের গোড়ায় দেওয়া হত দুধ আর ঝোলা গুড়। 

zoom
আম পাড়া, বুন্দি চিত্র, ১৮৫০, সূত্র: ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম

১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের হাত ধরে প্রধানত ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে যে বহু আলোচিত ‘কলাম্বিয়ান এক্সচেঞ্জে‘র দুয়ার উন্মোচিত হয়েছিল তার প্রভাব পড়েছিল এশিয়ার ওপরেও। নতুন সমুদ্রপথে বাণিজ্যের সুযোগ প্রসারিত হওয়ায় গোয়ায় উপনিবেশ স্থাপনকারী পর্তুগিজদের মাধ্যমে ভারতে প্রথম আমদানি হয়েছিল পেঁপে, আনারস, পেয়ারা, সবেদা, কাজুবাদাম থেকে শুরু করে বহু ফল ও আলু, লঙ্কা, টোম্যাটোর মতো অনেক সবজি। অন্যদিকে উৎপত্তি ভারতে হলেও, ‘ফলের রাজা‘ হিসেবে আমকে প্রতিষ্ঠা করার পিছনে ছিল পর্তুগিজদের বড় অবদান। আগে যে আম হত, তা ছিল হাত দিয়ে খোসা ছুলে চুষে খাওয়ার। সমর–কুশলী পর্তুগিজ ভাইসরয় আলফানসো দ্য আলবুকার্কের নেতৃত্বেই ছুরি দিয়ে কেটে কেতাদুরস্তভাবে টেবিলে পরিবেশন করা সেরা জাতের আমের প্রচলন ঘটতে শুরু করল। তাঁর নামেই বিশেষ ধরনের আমের পরিচিতি ‘আলফানসো‘। কেরলের মালাবার উপকূলে মশলা কিনতে আসা পর্তুগিজরা ‘ম্যাংগো‘ শব্দটি চয়ন করেছিল মালয়ালাম ও তামিল ভাষায় ফলটির প্রতিশব্দ ‘মাঙ্গা‘ বা ‘মাঙ্গাই‘ থেকে।

ওই সময়ে গোয়া থেকে প্রতি বছর লিসবনের রাজদরবারে উপহার হিসেবে পাঠানো হত আমের ঝুড়ি। আমের সুস্বাদে আত্মহারা হয়ে সকলে এমন উৎসবে মেতে উঠত যে তখন স্বাভাবিক কাজকর্মও সব মুলতুবি হয়ে যেত। ষোড়শ শতকের বিখ্যাত পর্তুগিজ ভেষজ চিকিৎসক গার্সিয়া ডি ওর্টা লিখেছিলেন, ‘স্পেনের (অর্থাৎ ইউরোপের) যাবতীয় ফলকে হার মানিয়ে দিয়েছে আম।‘ তার সমর্থন মেলে ইতালীয় পর্যটক নিকোলাও মানুচ্চির মন্তব্যেও, ‘সর্বশ্রেষ্ঠ আমের ফলন গোয়ায়। আমি এমন সব আম খেয়েছি, যা স্বাদে–গন্ধে পিচ, প্লাম, নাশপাতি বা আপেলের মতো বৈচিত্রময়। প্রাণ ভরে যতই খাও, পেট খারাপ হওয়ার ভয় নেই।‘ আকবরের মতো তাঁর পৌত্র শাহজাহানও ছিলেন গভীর আম–প্রেমী। কোঙ্কন প্রদেশ থেকে দিল্লিতে আমের দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন। গোয়ায় ১০৬ ধরনের আকর্ষণীয় আমের প্রজাতির উল্লেখ রয়েছে ব্রিটিশদের বিভিন্ন প্রশাসনিক নথিতে। ১৭২৭ সালে স্কটিশ নাবিক আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের বিবরণেও মেলে গোয়ার আমের সুখ্যাতি। তাঁর মনে হয়েছিল, বিশ্বের সবচেয়ে সুস্বাদু ফল গোয়ার আম। আম নিয়ে আধুনিক ‘ম্যাংগো ডিপ্লোমেসি’র সূচনাও ঘটে পর্তুগিজদের মাধ্যমে। দাক্ষিণাত্যের সব রাজ্যে তো বটেই, বিশেষত মারাঠার রাজ দরবারে প্রতি বছরেই পর্তুগিজরা ঝুড়ি ঝুড়ি ‘আলফানসো’ বা ‘হাপুস’ আম পাঠাতেন ভেট হিসেবে। স্বাধীনতার আগের দশকে রাজা ষষ্ঠ জর্জের অভিষেক উপলক্ষে ঔপনিবেশিক শাসকেরা ভারত থেকে উপহার হিসেবে আম পাঠিয়েছিলেন বিলেতে। তবে ‘আলফানসো’ নিয়ে দেশে–বিদেশে বা অভিজাত সমাজে যতই মাতামাতি থাকুক, কোঙ্কনিদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় আম ‘হিলারিও’ আর ‘মানকুরদ’। আর গোলাপি আভা যুক্ত ‘মুসারত’ আম দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের জ্যাম ‘মাঙ্গাদা‘ গোয়ার অন্যতম ডেলিকেসি।

zoom
‘মুসারত’ আম দিয়ে তৈরি গোয়ার ‘মাঙ্গাদা’

ভারতে আমের চাষ চার থেকে ছ‘হাজার বছরের পুরনো। রামায়ণ, মহাভারত, উপনিষদ ও পুরাণে আম, রসালো বা সহকারের যেমন প্রচুর উল্লেখ রয়েছে, তেমনই কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব‘ কিংবা ‘ঋতুসংহার‘ কাব্যে বসন্ত সমাগমে আম্র–মুকুলের বিবরণও মনোমুগ্ধকর। স্কন্দপুরাণ অনুযায়ী দেবতা ও অসুরদের সমুদ্রমন্থনে যে পাঁচটি স্বর্গীয় বৃক্ষের উদ্ভব হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল আম গাছ। 

এই বাংলায় আমের সুখ্যাতির মূলে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ। ১৭০৪ সালে ঢাকা থেকে রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করার পরে গড়ে উঠেছিল নবাবের আম বাগান। ফলনের সময় মহার্ঘ ও বিশেষ জাতের আম গাছ পাহারায় মোতায়েন করা হত সশস্ত্র রক্ষী। পরবর্তীকালে লন্ডনের রয়্যাল হর্টিকালচার সোসাইটি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে নিজামত গার্ডেনসের সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিযুক্ত হন প্রবোধচন্দ্র দে। ১৮৯৭ সালে তাঁর লেখা ‘A Treatise on Mango’ বইয়ে বিভিন্ন ধরনের আমের বিশদ বর্ণনা রয়েছে। 

হাজারদুয়ারি প্রাসাদ ও মুবারক মঞ্জিলের প্রতিষ্ঠাতা নবাব হুমায়ুন জাঁ-র বিশেষ প্রিয় আম ছিল ‘নাজিম–পসন্দ‘। নবাব দরবারে আম প্রতিযোগিতায় প্রতি বছর সেরার শিরোপা জুটত। নবাব ভালোবাসতেন এই আম দিয়ে তৈরি দারুণ পোলাও খেতে। তারও বহু আগে দিল্লির দরবারে সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের বাবুর্চিরা ‘আম কা মিঠা পুলাও‘ প্রথম উদ্ভাবন করে প্রচুর ইনাম পেয়েছিল। আবার লখনউয়ে সুখ্যাতি লাভ করেছে আমের জিলিপি।

zoom
লখনউয়ের বিখ্যাত আমের জিলিপি

মানুচ্চির বিবরণে নানা স্বাদ–গন্ধের আমের কথা রয়েছে। সেইরকম সব চমকপ্রদ আমের হদিশ মেলে মুর্শিদাবাদের নবাবের বাগানে। লাল আর গোলাপি আভা মেশানো অপূর্ব রঙের আম ‘চিনি শক্কর’। খোসা ছাড়ালে ভেতরের শাঁস গোলাপি। আঁশবিহীন রসাল আমে যেন চন্দনের সৌরভ। আবার মোচার আকৃতির আপেল–রঙা, পাতলা আঁটির ‘গুল শুকরি’ ছিল গোলাপ–গন্ধী। আজিমগঞ্জে বিরল প্রজাতির আম হত ‘চরকি চম্পা’। আঁশ থাকলেও প্রচুর রস আর তাতে অবিকল চাঁপা ফুলের সুবাস। কারও কাছে তার পরিচিতি ‘হুজুর পসন্দ‘ নামে। হয়তো কোনও নবাব বা পদস্থ আধিকারিকের পছন্দের ফল ছিল বলে এই নাম। আবার এমন জনশ্রুতিও রয়েছে, চম্পাবতী নামের এক বাইজির নামে বিশেষ আমটির নাম রাখা হয়েছিল ‘চম্পা‘। মুর্শিদাবাদের ইচ্ছাগঞ্জে শীতলাবিবির বাগানে ছিল দারুণ একরকম আম ‘বিড়া’। পরে সেই বাগান নবাব খাকর মির্জা বাহাদুর ওরফে বুধুন সাহেবের হেফাজতে চলে আসে। সেই একশ আমের দাম ছিল তখনকার দিনে ১৬ টাকা। এছাড়া ছিল ‘ক্ষীরসাপাতি’, ‘চুসনি’, ‘নাজুক–বদন’, ‘মিছরিখণ্ড’, ‘সিন্দুরিয়া’, ‘টিয়াকাটা’, ‘তোতামুখী’, ‘হালুয়া দুলদুল’, ‘বাদশাপসন্দ’, ‘রানিপসন্দ’, ‘বেগমপসন্দ’, ‘মালিপসন্দ’–সহ আরও কত আম। একেকটি আমের একেকরকম বৈশিষ্ট্য, তার নামের পিছনে কত কাহিনি।

নবাবদের প্রিয় আমগুলির মধ্যে অন্যতম ‘আনানাস‘। আনারসের সুবাস ভরা হালকা টক–মিষ্টি স্বাদের। আর একটি পছন্দের আম ‘রানি পসন্দ‘ নামকরণ করেছিলেন বাংলার শেষ নবাব নাজিম মনসুর আলি খান ফেরাদুন জাঁ–র দেওয়ান প্রসন্ন নারায়ণ দেব। নবাবি আমলের গোড়ার দিকের সেরা জাতের আমগুলির মধ্যে আকর্ষণীয় ছিল ‘বিমলি‘– গোলাকার, সুগন্ধি, অল্প টক–মিষ্টি স্বাদের এই আম গাছ ছিল নবাব আলিবর্দি খানের বাগানে। কথিত আছে সেই আমের স্বাদে অভিভূত বাগানের মালি তাঁর প্রিয় পত্নীর নাম অনুসারে আমটির নাম দিয়েছিলেন। মালির আন্তরিকতার কথা জানতে পেরে নবাবও সেই নামই বহাল রেখেছিলেন। খরমুজা আমে মিলত ফুটির গন্ধ আর দাম ছিল পাঁচ টাকা শ‘। ‘কালাপাহাড়’ তো বিখ্যাত আম। ‘মির্জাপসন্দ’ আম থেকে তার উৎপত্তি। গাছের পাতা সরু ও চকচকে, বোঁটা কালচে, পাকলেও রং ধরে না। প্রায় ৫০০ গ্রাম ওজন। খুব পাতলা খোসা। দারুণ মিষ্টি। আর মুর্শিদাবাদের গৌরব ‘কোহিতুর’। মেজ যুবরাজ নবাব হোসেন আলি মির্জা বাহাদুরের বাগানের সেই আম নিয়ে এক গল্প আছে। একবার ইউনানি চিকিৎসক হাকিম আগা মহম্মদ যুবরাজের কাছে কিছু সেরা আম উপহার পাঠিয়েছিলেন। যুবরাজ ছিলেন মুর্শিদাবাদের প্রথম ‘ম্যাংগো টেস্টার‘– আম চাখিয়ে। তিনি সব খাওয়ার পর একটি আম তাঁর সবচেয়ে বেশি পছন্দ হল। সেই গাছের জন্যে তিনি ওই আমলে বখশিস দিয়েছিলেন দুই হাজার টাকা। কোহিতুরের মতো বিখ্যাত আর এক জাতের আম ছিল ‘মোলামজাম‘। ওইসব আমগাছে পাকার সঙ্গে সঙ্গেই পেড়ে খেয়ে ফেলতে হত। নবাবি আমলে আমটি ঠিক কখন পাকছে, সেই মাহেন্দ্রক্ষণের ওপর কড়া নজর রাখার জন্য নবাবের বাগানে আলাদা ভাবে নিয়োগ করা হত ‘আম–পেয়াদা‘। আর সেই সব আম যেমন তুলোয় করে রাখা হত, তেমনই সেগুলি কাটার সময় লোহার বঁটি বা ছুরির বদলে ব্যবহার করা হত বাঁশের ছুরি। মহার্ঘ সেই সব আম নবাবেরা খেতেন সোনার কাঠি বিঁধিয়ে। 

zoom
আম বিনিময়, কুলু, ১৮ শতক

সেই সব নবাবি বিলাসিতার যুগ পেরিয়ে এখন আমেরিকা-সহ নানা দেশে আম উৎসব বা বিদেশি দূতাবাসে আম উপহার পাঠানোর প্রসঙ্গে আবার মনে পড়ে যায় পুরনো কলকাতায় আম খাওয়ানোর রেওয়াজের কথা। ধনী মানুষেরা গ্রীষ্মকালে বাজি ধরে আম খাওয়াতেন। সেই খাওয়া দেখার জন্য লোকে ভিড় জমাত। ভরপেট খাওয়ার পরেও ৩০-৪০টা আম লোকে হামেশাই খেত। আবার সেই সমাজে একটা জমাটি খেলা ছিল। খাইয়ের চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে পাতে আম দেওয়া হত। তিনি খেয়ে খেয়ে নাম বলে দিতেন– এটা ‘পেয়ারাফুলি‘, এটা ‘ধোনা‘, ‘কপাটভাঙা‘, ‘ইলশেপেটি‘, ‘কিষেনভোগ‘ ইত্যাদি। এমন সব সমঝদার মানুষ ছিলেন। কল্যাণী দত্ত লিখেছেন, ‘কখনও ওস্তাদকে ভুল করতে দেখিনি‘। বসিয়ে আম খাওয়ানো ছাড়াও ভোজনরসিকদের বাড়ি বাড়ি আমের ঝুড়ি পাঠানো হত। আম খাওয়ানোর আনন্দ এমনই ছিল যে গিন্নির সোনার হার বন্ধক রেখেও একান্নবর্তী পরিবারে একদল খাইয়েকে ডেকে রকমারি আম খাওয়ানো হয়েছে। আম খাওয়া ও খাওয়ানোর সেই আভিজাত্য ও বিলাসিতার ছবিটা একালে আমাদের কাছে শুধু কল্পনাতেই রয়ে যাবে।

A Treatise on Mango Donald Trump George Bush Goa Mango MANGO A GLOBAL HISTORY Mango Export Manmohan Singh mughal history Mughals Murshidabad Murshidkuli Khan narendra modi Prime Minister Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar USA

Share this article on