

বোর্হেস ও ফেররারির একটি সংলাপের নাম ‘দান্তে: অ্যান ইনিফিনিট রিডিং’, এক অনন্ত পাঠ। পড়তে পড়তে আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথের কথা, তাঁর অফুরান অন্তঃশক্তির কথা। আমাদের মধ্যে কেউ তো সাহস করে রবীন্দ্ররচনাকে ‘অ্যান ইনফিনিট রিডিং’ বলিনি। আমাদের নিগূঢ়নিহিত শূন্যতাকে তিনিও তো মানবায়িত করে তুলতে চেয়েছিলেন।
আরিস্ততল বলেছিলেন, অপরীক্ষিত জীবন বাঁচার যোগ্য নয়। অস্বালদো ফেররারির সঙ্গে হোর্হে লুইস বোর্হেসের (১৮৯৯-’৮৬) তিন খণ্ডে প্রকাশিত দীর্ঘ কথোপকথন পড়তে পড়তে আমার হাতের কাগজগুলি যেন আলোর পাখির মতো উড়ছে। ওরা তো স্বপ্নপথ খুঁজছে।
গত শতাব্দীতে লাতিন আমেরিকার সম্ভবত সবচেয়ে বৈপ্লবিক সাহিত্যিক বোর্হেসের সংলাপগুলি পড়তে পড়তে মনে পড়ল আলব্যের কাম্যুর কথা: ‘বুদ্ধিজীবী সে যে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করে।’ বোর্হেসের বিপুল পাঠের শিরা-উপশিরা বেয়ে প্রবাহিত হতে হতে তাঁকেই নতুন করে চিনছি যেন। সেই বোর্হেস, যাঁর সম্পর্কে কার্লোস ফুয়েন্তেস লিখেছিলেন: ‘তাঁর গদ্য ছাড়া আজকের দক্ষিণ আমেরিকায় কোনও আধুনিক উপন্যাস লেখা সম্ভব হত না।’ উপমহাদেশের বিশিষ্ট লাতিন আমেরিকান সাহিত্য-বিশেষজ্ঞ রাজু আলাউদ্দিন জানাচ্ছেন, গিয়্যের্মো কাবরেরা ইনফান্তে বলেছিলেন: ‘‘বোর্হেসের প্রভাব এড়িয়ে লিখছেন এরকম একজন লেখকও লাতিন আমেরিকায় নেই (‘No hay un solo escritor hispanamericano que escirba ahora Y que Pueda echar a un lado la influencia de Borges’)।’’ সেখানে প্রায় কেউ নেই যিনি তাঁর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাননি। তাঁর সম্পর্কে স্ববিরোধিতা ও দক্ষিণপন্থার অভিযোগ উঠেছে, কিন্তু উপন্যাসের নতুন বয়ান নির্মাণে তাঁর একক অবদান ঈশ্বরের মতো।

মার্কেসের বহু লেখাতেই বোর্হেসের প্রভাব আছে, বিশেষত শৈলী আর বিষয়বস্তুর ট্রিটমেন্টের দিক থেকে। বামপন্থীদের মধ্যে হুলিও কোর্তাসার, রিকার্দো পিগলিয়া, রবের্তো বোলানঞ প্রমুখ তাঁর কাছে ঋণী।
এই সংলাপের সময় আর্জেন্টেনীয় কবি, ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিকের বয়স ছিল ৮৬। ৫৫ বছর বয়সে সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যাওয়া প্রজ্ঞাপ্রবীণ বোর্হেস খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে প্রাচীন গ্রিসে সংলাপ আবিষ্কারের সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কথা বলেছেন। এই জ্বরাক্রান্ত সময়ে আত্মকরুণায় দ্রবীভূত না হয়ে শুধু সৃজনশীলভাবে বাঁচার জন্য এই সংলাপ প্রয়োজনীয়। বক্তৃতা নয়, সংলাপ।

প্রাচীন ভারতে ‘বিদথ’ [সভা বা সমিতি, public gathering]-তে গিয়ে নিজের কথা বলতে পারার রীতি ছিল। খ্রিস্টের জন্মের ১৫০০ বছর আগে ঋগ্বেদে কবিতার আঙ্গিকে সংবাদসূক্ত পাওয়া যায়, যেগুলি কথোপকথনাত্মক কবিতাই আসলে, ‘গান্ধারীর আবেদন’ বা ‘কর্ণকুন্তীসংবাদ’-এর মতো; অথর্ববেদেও এ জাতীয় রচনার দেখা মেলে, এর বিষয় কখনও দর্শন কখনও বা মানবজীবনের গূঢ়তর সত্যের অন্বেষণ। বেদের মধ্যে, বিশেষত ‘ব্রাহ্মণ’ ও ‘উপনিষদ’ অংশে, ছড়ানো আছে এরকম অজস্র গদ্য সংলাপ। আমরা মনে করতে পারি, বৃহদারণ্যক-উপনিষদে মৈত্রেয়ী-যাজ্ঞবল্ক্য, জনক-যাজ্ঞবল্ক্য বা গার্গী-যাজ্ঞবল্ক্য সংলাপ। বৈদিক যুগের অনতিপরে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে যাস্কের ‘নিরুক্ত’-র বাচনভঙ্গিতে, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে পতঞ্জলির মহাভাষ্যে, এমনকী, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও যেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথোপকথন চালানোর ঢঙেই আলোচিত হয়েছে বিভিন্ন তত্ত্ব। (ঋণ: মৌ দাশগুপ্ত) উনিশ শতকে শ্রেষ্ঠ বাঙালিদের যুক্তিজাগর বিশ্বজিজ্ঞাসা ছিল জগৎ পারাবারের সঙ্গে উৎকৃষ্ট এক সংলাপ। পোশাকি ও মেকি কথার প্রদর্শনীর আড়ালে প্রকৃত চিন্তার সজীব বিনিময় আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
রাজু আলাউদ্দিন জানাচ্ছেন, হোর্হে লুইস বোর্হেসের মতো অত বেশি সাক্ষাৎকার লাতিন আমেরিকায় আর কোনও সাহিত্যিক দেননি। অস্বালসো ফেররারির সঙ্গে এই প্রস্তুয়মান ১২০-টি কথোপকথনের সমাহার শুরু হয়েছিল ১৯৮৪ সালের ৯ মার্চ। চলে ১৯৮৫ সালের ২১ অক্টোবর পর্যন্ত। তাঁরা প্রতি সপ্তাহে একবার করে বসতেন। সেই মিউনিসিপাল রেডিও (‘রাদিও মুনিসিপাল’) সাক্ষাৎকারের লিখিত রূপ প্রকাশিত হয় আর্জেন্টিনার দৈনিক পত্রিকা ‘তিয়েম্পো আর্হেন্তিনো’-তে। আশ্চর্যজনকভাবে এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইংরেজি অনুবাদে নেই।

‘বই একটা বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়। সেটা একটা সম্পর্ক, অগণিত সম্পর্কের এক অক্ষরেখা।’ সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি বিষয় অক্লেশে ছুঁয়ে যাওয়ার এমন উদাহরণ বিরল। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া (পাণ্ডিত্যের দিক থেকে ব্যতিক্রম উমবের্তো একো) আর বিশ্বসাহিত্যে কাউকে চিনি না যিনি অনায়াসে অতখানি গভীর বিস্তারে যেতে পারেন। আর্জেন্টিনীয় আত্মপরিচয়, সংলাপ, এথিকস ও সংস্কৃতি, কাব্যিক ধীশক্তি, সময়, শৃঙ্খলা ও সময়, রাজনীতি ও সংস্কৃতি, ইতিহাস, কেল্টিক সংস্কৃতি, বুদ্ধ, বৌদ্ধধর্ম ও শিন্টোইজম, সক্রেটিস, প্লেটো, আরিস্ততল, ভার্জিল, লুক্রেশিয়াস, যিশুখ্রিস্ট, স্টোইসিজম, সেন্ট টমাস ও টালমুড, সিসেরো, রাবলে, শেকসপিয়র, বানিয়ান, বোয়ালো, পাসকাল, স্পিনোজা, মিলটন, এমার্সন, ভলতের, আলেকজান্ডার পোপ, নোভালিস, ব্লেক, ডি কুইনসি, এডগার অ্যালান পো, ফ্লবের, হাইনে, ভেরলেন, অসকার ওয়াইল্ড, সুইডেনবর্গ, মেলভিল, জোসেফ কনরাড, ভালেরি, রিলকে, ইয়েটস, রাসেল, বার্নার্ড শ, জয়েস, বোর্হেস এবং জনতা, বোর্হেস ও স্মৃতি, কী করে তাঁর রচনার জন্ম হয় ও লিখিত হয়, আবহমান ভ্রমণ, সমুদ্র, সময়োত্তর সাহিত্য, ব্যক্তিগত ঈশ্বর সম্পর্কে প্রতিপ্রশ্ন, প্রেম, স্বপ্ন, বন্ধুত্ব, মেটাফোর, হাস্যরস, বাস্তব ও ফ্যান্টাসি সাহিত্য, আবহমান…। এছাড়া রিকার্দো গুইরালদেস, দোমিঙ্গো ফাউস্তানো সার্মিয়েন্তো, পেদ্রো এনরিকেস উরেনঞা, আলোন্সো কিহানো প্রমুখ। প্রতিটি ক্ষেত্রে বোর্হেস ছুরি দিয়ে বিষয়টির মাংসপেশি ভেদ করে রক্তকণিকায় পৌঁছে যান। পাসকাল থেকে পৌঁছে যান তাঁর ভার্টিগোতে, মহাকাশ সম্পর্কে তাঁর আমৃত্যু বিস্ময় ও আতঙ্কে।

একসঙ্গে নয়, আলাদা আলাদা ভাবে বিন্যস্ত কথোপকথনে বিদ্যুৎ-বহ্নির মতো চিন্তাগুলি উঠে আসে, পরস্পরকে জড়িয়ে থাকে আঁশের মতো, চিরুনির দাঁতের মতো। তিনি ফেররারিকে বলছেন, ‘হ্যাঁ, সংস্কৃতি আমাদের একমাত্র পরিত্রাণ।’ তিনি জানেন, কোলরিজের কল্পনার সমুদ্র আসল সমুদ্রের চেয়ে বড়। শুধু সাহিত্যিকের কল্পনা নয়, ফেররারি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘এথিক্স– আপনি বলেছেন– এথিক্স ধর্মের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।’ এথিক্স না থাকলে যে কলকাঠি নড়ে যাবে বোর্হেসের প্রতিটি দার্শনিক বিচারে তা প্রকাশিত।
টমাস ডি কুইনসিকে উদ্ধৃত করে এক জায়গায় বোর্হেস বলছেন, একটি সমস্যাকে আবিষ্কার করা সেটির সমাধানের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। লেখকের দায় সম্পর্কে এক জায়গায় বলছেন, আব্রাহাম লিংকনের একজন সেক্রেটারির দরকার ছিল। বেশ কিছু ফোটোগ্রাফ নিয়ে আসা হল। তিনি একটিকে দেখে বললেন, না। জনৈক সভাসদ বলে উঠলেন, ‘এই ভদ্রলোক তার মুখের জন্য দায়ী নয়।’ লিঙ্কন উত্তর দিলেন, ‘তিরিশ বছর বাঁচার পর প্রত্যেকেই তার মুখের জন্য দায়ী। ‘যখন বলা হয়, মুখ হলো আত্মার প্রতিফলন, তখন হরেদরে একই কথা বলা হয়।’ ফেররারি উত্তর দেন, ‘গ্রিকেরা এবং দা ভিঞ্চি তো তাই বলেছেন।’

শেক্সপিয়র সম্পর্কে বোর্হেস বলে ওঠেন, ‘কী অদ্ভুত! শেকসপিয়র যেন অন্তহীন, যেন ওঁর সম্পর্কে যথেষ্ট বলা যায় না।’ অন্য লেখকরা যতই ‘বড়’ হন, শেক্সপিয়রের নাটকে যেন অনন্ত তাৎপর্য, ‘connotation of infinity’। বোর্হেস মনে করেছেন, এর একটি কারণ ইংরেজি ভাষার ঐশ্বর্য, যা অনেক দিক থেকে পাশ্চাত্যের অন্য ভাষাগুলিকে টেক্কা দেয়। লাতিনের মতো স্প্যানিশ একটি বিমূর্ত ভাষা, ইংরেজি অনেক বেশি শারীরিক (physical)। সেখানে আছে স্যাক্সন আর লাতিন ভাষার খেলা। জেমস জয়েসে প্রতিটি শব্দই যেন নিওলজিজম, যৌগিক। শুধু বিশেষ্যে নয়, বিশেষণে এবং ক্রিয়াপদে। জয়েস ক্রিয়াপদ নির্মাণ করেন। ইংরেজি ভাষার সেই ক্ষমতা আছে, একটি শব্দকে না বদলে বিশেষণ, বিশেষ্য বা ক্রিয়াপদ বানানো যায়। যাই হোক, বোর্হেস লক্ষ করেন যে, ‘একটু টাকাপয়সা হওয়ার পর শেকসপিয়র লেখা ছেড়ে দেন! হয়তো তাঁর অর্থসংকটের উত্তেজনাটা দরকার ছিল।’ স্মরণ করান, তাঁর শেক্সপিয়র বিষয়ক বইতে পল গ্রুসাক লিখেছেন, লন্ডন থেকে আসা অভিনেতাদের সঙ্গে বিরাট নৈশভোজের কিছুদিন পর তিনি মারা যান! মামলার ঝামেলায় ঢুকেছেন, তাই তাঁর নাটকে অত আইনের মেটাফোর। টাকা ধার দিতেন, হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে একজন অসাধারণ কবি মহাজন হতে পারেন না। তাঁকে ঠিক বোঝা যায় না। ফেররারি বোর্হেসকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর শেক্সপিয়র বিষয়ক ‘সবকিছু এবং কোনও কিছুই না’ গল্পে শেক্সপিয়র ঈশ্বরকে বলেন, ‘বৃথাই আমি অনেক মানুষ হয়ে গেছি, আমি একজন (অর্থাৎ শেক্সপিয়র) হতে চাই’। বোর্হেস উত্তর দেন তিনি শেক্সপিয়রকে ঈশ্বরের সঙ্গে তুলনা করছেন, এটি হল সর্বাধিক প্রশংসা, মানুষকে ঈশ্বরের সঙ্গে তুলনা করা। শেক্সপিয়রকে ঈশ্বরের উত্তর: ‘আমিও না। আমিও যে একজন হতে চাই!’
বোর্হেস দেখান বই পড়া কাকে বলে, ছবি দেখা কাকে বলে, স্ত্রাভিনস্কির সংগীতের বিশেষত্ব কী! শল্যচিকিৎসকের মতো সহজে প্রবেশ করেন জুল সোলার, পাউল ক্লে, হোর্হে লারকো ও পিকাসোর ছবির জগতে।

ফেররারি জয়েসের প্রসঙ্গ তোলায় বোর্হেস বলছেন, ‘‘ইউলিসিস’ যদি অতলস্পর্শী হয়, তার কারণ জয়েস সেটাই করতে চেয়েছিলেন। আমার মনে হয় ওটি একটি পরীক্ষামূলক রচনা, যাতে কিছু গোপনতা ধরা আছে– সবচেয়ে বড় কথা, সেটাই বইটির প্রকাশপদ্ধতি। প্রত্যেক অধ্যায়ে আধিপত্য করে একটি রং। যেমন ধরা যাক, লাল। ‘ইউলিসিসিস’-এর প্রতিটি অধ্যায়ে প্রত্যেক ঘটনাপর্ব (episode) দেহের এক-একটি ক্রিয়ার (body functions) কথা বলে। লাল রঙের ক্ষেত্রে রক্তপ্রবাহ বোঝাচ্ছে। কোনও একটি দৃশ্যের সঠিক সময় জানিয়ে দেন জয়েস, যাতে কোনও অধ্যায়ে স্টিভেন ডেডালাস-এর মনের সঙ্গে অন্য অধ্যায়ে লেওপল্ড ব্লুমের মনের তুলনা করা যায়। তারপর একটি মুহূর্ত আসে, যখন তারা দু’জনেই একসঙ্গে আকাশকুসুম রচনা করে। বোঝা যায়, এই সমান্তরাল কাঠামো খুব মূল্যবান। আরও যেটা, সেটা হল প্রতিটি ঘটনার মিল হোমারের ‘ওডিসি’-র ঘটনাপর্বগুলির সঙ্গে… বোঝা যায়, জীবন সমান্তরাল… তারপর সেই অধ্যায় যেখানে সমস্ত ধরনের মেটাফোর ব্যবহার করা হয়। তারপর সেই সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ: মলির একাকী অন্তর্কথন। বিরামচিহ্ন ছাড়া ৩০-৪০ পাতা, চেতনার ঢেউয়ের সঙ্গে মিলিয়ে, যদিও ইঙ্গিত করা হয় চেতনা প্রবাহিত হয় নিঃশব্দে, অর্থাৎ চিন্তা বা অনুভূতি বয়ে চলে আনুষঙ্গিক শব্দ ব্যবহার না করে। অর্থাৎ চেতনাপ্রবাহ ভাষাকে প্রত্যাখ্যান করে, প্রতি ক্ষেত্রেই ক্রিয়াপদের ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু অন্য কিছু নয়– যা সম্ভাব্য ইন্টারপ্রিটেশনকে দুরূহ করে তোলে।

বোর্হেস মনে করেন, জয়েসের রচনারীতি যেন (বাস্তবভিত্তিক উপন্যাস-সহ) সমগ্র সাহিত্যকে অসার প্রতিপন্ন করার পদ্ধতি, ঐতিহ্যকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গিয়ে তাকে ভেঙে ফেলার পদ্ধতি। ‘ইউলিসিস’ আর ‘ফিনেগান্স্ ওয়েক’ যেন সাহিত্যের সমাপ্তি ঘোষণা করে: দ্য এন্ড অফ লিটারেচার। এগুলো জয়েসের শেষ বিস্ফোরণ। লোকে অবশ্য এসব বোঝেনি, তাঁর ভক্তরাও নয়; এবং সাহিত্য থামেনি, যদিও বইদু’টিকে সাহিত্যের প্রায় শেষ মাইলফলক মনে করা হয়। যৌগিক শব্দের দানবীয় ব্যবহারের জন্য জয়েস অননুবাদনীয়। তাঁর বই যেন সাহিত্যের ‘লাস্ট জাজমেন্ট’। বোর্হেসের মতে, ‘ফিনেগান্স্ ওয়েক’-এর পর সাহিত্য রচনা অসম্ভব। যখন বই লেখা শেষ হয়, জয়েস একদিক থেকে সমস্ত পুরনো সাহিত্যের পরিসমাপ্তি ঘটান। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জয়েসের সঙ্গে শেষ না হয়ে গিয়ে সাহিত্য জয়েসের কাছ থেকে সুবিধে আদায় করে নিয়েছে।

বোর্হেস ও ফেররারির একটি সংলাপের নাম ‘দান্তে: অ্যান ইনিফিনিট রিডিং’, এক অনন্ত পাঠ। পড়তে পড়তে আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথের কথা, তাঁর অফুরান অন্তঃশক্তির কথা। আমাদের মধ্যে কেউ তো সাহস করে রবীন্দ্ররচনাকে ‘অ্যান ইনফিনিট রিডিং’ বলিনি। আমাদের নিগূঢ়নিহিত শূন্যতাকে তিনিও তো মানবায়িত করে তুলতে চেয়েছিলেন। ‘দিভিনা কম্মেদিয়া’ নাম দান্তে দেননি, কথাচ্ছলে বোর্হেস জানাচ্ছেন, দিয়েছিলেন বোকাচ্চো। দান্তের পুত্র না কি বলেছিলেন, Holy Scriptures নয়, তাঁর পিতা ন্যায়বিচারের জীবনকে বর্ণনা করতে চেয়েছিলেন স্বর্গ হিসেবে, অনুতপ্তদের জীবনকে পারগেটরি, এবং দুষ্ট ও অভিশপ্তদের জীবনকে ‘নরক’ হিসেবে। বোর্হেসের কাছে পুরাণ সবচেয়ে জরুরি নয়, পাপের সাজা ও পুরস্কার জরুরি নয়, জরুরি দান্তের কাব্যে প্রেমের দর্শন ও নান্দনিক সৌন্দর্য।
বোর্হেসের মতো গ্রিক, লাতিন, স্প্যানিশ, ফরাসি, ইংরেজি, ইতালীয়, জাপানির আন্তর্জাতিক ভাষাজালকে সম্যকভাবে অনুধাবন করার জন্য অপরিসীম উচ্চতা লাগে। তাঁর বীক্ষণ খেলা করে টমাস অ্যাকুইনাস, দান্তে, ভার্জিল, শেক্সপিয়র থেকে দস্তয়েভস্কি, চেস্টারটন, এমনকী, ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’-এর লেখক রবার্ট লুইস স্টিভেনশন পর্যন্ত। স্টিভেনশনকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন তাঁর নিজের সৃষ্টির কথা:
শিল্প একটা খেলা, কিন্তু একটি শিশু যেমন সিরিয়াসলি খেলা করে তেমনভাবে খেলতে হবে। শিশুটি নিজেকে নিয়ে হাসে না। একদিকে খেলার আইডিয়া, homo ludens, অন্যদিকে খেলার ভাবনা যাতে কতগুলি নিয়ম আছে। সাহিত্য রহস্যময়, তাতে দাবা খেলার মতো নিয়মগুলি ঠিক সংজ্ঞায়িত নয়, এটা এক ধরনের ম্যাজিক। এই রেটরিক কখনও ফুরয় না।

কে বলছেন? বাস্তবকে নতুন এক মায়ামুকুরে পড়েছিলেন যিনি। যিনি বলেছিলেন, ‘লিখন এক নিয়ন্ত্রিত স্বপ্ন শুধু’। যিনি লিখেছিলেন:
কথা বোলো না, যদি না তা নৈঃশব্দ্যকে গভীরতর করে।
সময় দিয়ে আমি তৈরি। সময় সেই নদী যা আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু আমিই সেই নদী। এটি একটি বাঘ যেটি আমায় ধ্বংস করে ফেলছে, কিন্তু আমিই সেই বাঘ। এটি সেই আগুন যা আমায় খায়, কিন্তু আমিই সেই আগুন। [‘Labyrinths’]
আমি জানি না আমি সত্যি সত্যিই বেঁচে আছি কি না। আমি সমস্ত লেখক যাদের লেখা আমি পড়েছি, সমস্ত মানুষ যাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, সমস্ত নারী যাদের আমি ভালোবেসেছি; সমস্ত শহর যেগুলি আমি দেখেছি।
কোনও কিছুই পাথরের ওপরে সৃষ্ট হয় না, সবকিছুই বালির ওপর, তবু আমরা এমনভাবে নির্মাণ করব যেন বালিটা পাথর।
এটা বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে এই সুদীর্ঘ সংলাপে গত শতাব্দীতে পাশ্চাত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ও সাহিত্যভাবুক একবারের জন্যও সাহিত্য-তাত্ত্বিকদের উল্লেখ করেননি, ভুল করেও ফুকো-দেরিদা-লাকাঁর নাম করেননি। হয়তো এই তত্ত্বমুখর সময়েও প্রকৃত শিল্পীর কাছে তাত্ত্বিকদের মূল্য নেই। উল্টো দিকে, ফরাসি পোস্টস্ট্রাকচারালিস্ট চিন্তাবিদদের ওপর আর্জেন্টিনার এই জাদুকরের প্রভাব অপরিসীম, কারণ তিনি তাঁদের একজন যাঁরা পাশ্চাত্যের দর্শন ও ভাষার স্ববিরোধ আর অস্থিরতাকে উদ্ঘাটিত করেন। রলাঁ বার্ত-এর ‘লেখকের মৃত্যু’-র বৈপ্লবিক ধারণা বোর্হেসের সেই গল্পটি থেকে জন্ম নিয়ে থাকতে পারে যেখানে ‘দন কিহোতে’-র স্রষ্টা হিসেবে অন্য আর-এক জনের নাম করা হয়। জাঁ বোদ্রিয়ার পোস্টমডার্ন হাইপার-রিয়ালিটি বোঝাতে মানচিত্র সম্পর্কে বোর্হেসের একটি আজগুবি উপাখ্যান ব্যবহার করেন। ফুকো তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘শব্দ ও বস্তু’ শুরুই করেন বোর্হেসের একটি রচনায় এক কাল্পনিক বিশ্বকোষের কথা উল্লেখ করে, যেটি শৃঙ্খলা ও জ্ঞানের স্থির ধারণাকে ধাক্কা দেয়।

এই রশ্মিজাগর, লতাগুল্মময় সংলাপের তৃতীয় খণ্ডের ভূমিকায় ফেররারি লিখছেন, ‘বোর্হেস বলেছেন, শেক্সপিয়র পড়ার সময় অন্তত কিছুক্ষণের জন্য আমরা শেক্সপিয়র হয়ে যাই। একই ভাবে এই সংলাপগুলি পড়ার সময় আমরা কিছুক্ষণের জন্য বোর্হেস হয়ে যাই।’ এখানে দেওয়ালে নোনার গন্ধ, সন্দীপন চিহ্নগুলি যায় মুছে, তবু বোর্হেসের কথার ক্রমবিস্তারী আভ্যন্তর প্রচ্ছায়ার সামনে একটু একটু করে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে থাকে আমাদের অভিজ্ঞান।
কৃতজ্ঞতা: রাজু আলাউদ্দিন, মৌ দাশগুপ্ত
পড়ুন শারদ সংখ্যা-র অন্যান্য লেখা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved