Bisarjan: The sociocultural interpretation by Rabindranath | Robbar
Robbar
  • ৩ কার্তিক ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬

রবীন্দ্রনাটক ‘বিসর্জন’: চিরন্তন আবাহন

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বিসর্জন’ নাটকে জীববলি বন্ধকে মুখ্য সংকট করেননি। বরং সেই বলিপ্রথা-কেন্দ্রিক ধর্ম-সমাজের সংকটকে, ভীতিকে, পুরোহিত-তন্ত্রের প্রাচীনঐতিহ্য বহনের সংস্কারকে এবং অবশ্যই সেই পুণ্য-ধারণার বশবর্তী বিশ্বাসে-অন্যায় ও পাপের আশ্রয়-গ্রহণকে মূল সংকট বলে চিহ্নিত করেছেন।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ২১, ২০২৬, ১৩:৫৩   
Facebook WhatsApp Messenger

রবীন্দ্রনাথ ‘বিসর্জন’ নাটক রচনা করেছিলেন ১৮৯০ সালে। আজ থেকে ১৩৫ বছর পূর্বে, যে কাহিনির মূল দ্বন্দ্ব আরও আগে ১৮৮৭-তে ‘রাজর্ষি’ উপন্যাসে রচিত। কিন্তু বর্ণিত সমাজ আরও প্রাচীন, কেননা– নাটকে ত্রিপুরা আক্রমণে উদ্যত মোগল সেনাবাহিনীর যে কথা উল্লিখিত রয়েছে, ঐতিহাসিক ধারণায় সেই ঘটনাকাল ১৬৬০-’৬১ সালে। গোমতী নদীতীরে গোবিন্দমাণিক্যের রাজ্য হস্তচ্যুত হয়েছিল ভ্রাতা নক্ষত্ররায়ের ষড়যন্ত্রে। ত্রিপুরার উদয়পুরে রাজা গোবিন্দমাণিক্য ভুবনেশ্বরী-মন্দির স্থাপন করেছিলেন।

মনে হতে পারে, প্রায় ৩৫০ বছর পূর্বের সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা সম্বন্ধে জেনে আমাদের কী লাভ? আসলে এই আলোচনার উদ্দেশ্য হল, এহেন সংকট ক্রমবর্ধমান রূপ নিয়েছে মানবসমাজে। যেখানে ‘ধর্মের নামে মনুষ্যত্ব হারায় মানুষ’। সামাজিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রনৈতিক, ধর্মীয়– উপরোক্ত প্রতিক্ষেত্রেই, নাটকে রাজা ও রাজপুরোহিত রঘুপতির মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যার সঙ্গে জড়িত দেবীর পূজা। দেবীর মূর্তিকে ব্যবহার করার প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। জীববলি ও পাপ-পুণ্যের সংস্কার। রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ আমাদের জীবনে সংবেদনের শিক্ষা দেয়। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম-পরিবারের মানুষ হিসেবে, হিন্দুধর্মকে আঘাত করেছেন, দেবীমূর্তি বিসর্জন করেছেন অনায়াসে– এমন স্থূল ও সরল সিদ্ধান্তে আসা অনুচিত হবে। স্মর্তব্য যে, তিনি মানবতাবাদী ধারণার আবাহন করেছেন।

zoom
‘বিসর্জন’ বইয়ের প্রচ্ছদ

রবীন্দ্রনাথ জানতেন যে, কোনও ধর্মকে আইনের আয়নায় বসানো যাবে না। ‘ভারততীর্থ’ কবিতার কবি, প্রকৃতই হিন্দু-ব্রাহ্মণ পরিবারের। পরবর্তীকালে তাঁদের বাড়ির পূজা, বিশেষত দুর্গাপূজা বন্ধ হয়েছিল। আর উত্তরকালে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে প্রচলন ঘটল– পৌত্তলিকতার পূজার সীমা থেকে প্রাকৃতিক প্রার্থনার, সৌন্দর্য সাধনার… ব্যাপ্তির। শান্তিনিকেতনে শুরু হল পূজাবকাশের পূর্বে ‘শারদোৎসব’-এর উদযাপন। কিন্তু সেসব ঘটনা ১৯০৭-’০৮ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তীকালের। ঈশ্বর অনন্ত, মহাজাগতিক, অধ্যাত্ম উপলব্ধির; ভক্ত হবেন মুগ্ধ, মগ্ন, কখনওই মোহগ্রস্ত বা মত্ত নন। এই তো ঈশ্বর চেতনা। তাই তো ব্রহ্মচর্য থেকে সন্ন্যাসে যাত্রা। তাই তো বৈদিক যুগে প্রকৃতির পূজা!

‘বিসর্জন’ রচিত হয়েছে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে। রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকের অনেকগুলি পাঠ রয়েছে। কখনও ১৮৮৭-র ‘রাজর্ষি’ উপন্যাস নাট্যরূপ দেওয়ার প্রয়াস, কখনও নারী-বর্জিত ‘বিসর্জন’, কখনও বা ছাত্রদের উপযুক্ত ‘বিসর্জন’– কখনও বা সম্পূর্ণ বা প্রচলিত পাঠ ‘বিসর্জন’। রবীন্দ্রনাথ এই নাটকে এক ব্রাহ্মণ রাজপুরোহিতের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করালেন; কোথাও তাঁর পৌরহিত্য প্রসঙ্গে প্রশ্ন নেই, বর্ণনা নেই, পূজার নিষ্ঠা, পদ্ধতি, ভক্তি প্রসঙ্গে কোনও মন্তব্য নেই। আচার-ধর্ম পালনে কোনওরূপ অবহেলা নেই, সকলের শ্রদ্ধেয় সেই পুরোহিত প্রতাপশালী রঘুপতি। রঘুপতি অন্তর্ভক্তি অপেক্ষা বাহ্য প্রদর্শনকে অধিক গুরুত্ব দেন স্বাভাবিকভাবেই, কারণ, বাহ্যভক্তির ক্ষেত্রে দেবীর চেয়ে প্রতিমা উর্ধ্বে, নিবেদনের চেয়ে বলিদান উর্ধ্বে। উপলব্ধিতে বা জ্ঞানের আলোয় উপনীত হওয়ার চেয়ে প্রদীপ-প্রজ্জ্বলন উচ্চে, দেবীকে উপকারী দেখানোর চেয়ে ভয়ংকরীরূপে সকলকে সন্ত্রস্ত করাই যদি না মুখ্য হয়– তাহলে পুরোহিতের প্রয়োজন থাকে না! রঘুপতি সেই বিশ্বাসে বিশ্বাসী ছিলেন!

চিরকাল জগৎজননীর পূজার মাধ্যম হয়ে উঠেছেন তিনি– মানুষ তাঁকে প্রণামী দিয়ে গিয়েছে, শ্রদ্ধা-ভক্তি করেছে, নত থেকেছে, কৃতজ্ঞ থেকেছে। সেই পুরোহিত তাঁর ধর্মের নামে যদি মোহগ্রস্ত হন, দেবীকে যদি ব্যবহার করেন, ব্যক্তিস্বার্থ বা আত্মস্বার্থে– আর স্থিতধী রাজা তাঁর ধীর স্বভাবে যদি স্বতন্ত্র ও স্থির থাকতে পারেন, সে পরিণাম মারাত্মক! কারও আত্মস্বার্থ– যদি সংযত হতে না পারে, তবে ভক্তি ও শক্তির রাজনীতিকরণ, উগ্র ধর্মান্ধতা, যৌবনের মত্ততা ও কঠোরতা চরমে পৌঁছতে পারে।

zoom
‘বিসর্জন’ নাটকে রঘুপতির ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং

‘বিসর্জন’-এর প্রাসঙ্গিকতা ঘটনা বর্ণনে অথবা কাহিনি বুননে দেখলে চলবে না; এ শুধু বলিবন্ধ, রাজা-পুরোহিতের দ্বন্দ্ব, চক্রান্তের শিকার জয়সিংহের আত্মহনন ও দেবী প্রতিমার বিসর্জন নয়। অতিরিক্ত কিছু। এতে আছে মানবতার কল্যাণের প্রসঙ্গ। একে রঘুপতির ধর্মান্ধতাও বলা ঠিক নয়। ধর্মের কাছে, প্রজার কাছে, দেবীর কাছে– প্রার্থনা, পূজা ও অন্ধভক্তি আমরা দেখিনি। রঘুপতির নিবেদন তো মাতৃভক্তিতে নয়, মূর্তিকে ব্যবহার করে ভীতির সঞ্চারে। ব্রাহ্মণত্বের আস্ফালন, উপবীত-ধারী, বসন আচরণে শুধুমাত্র নিজের অবস্থানকে আদৃত করার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। ফলে রাজপুরোহিত হয়েও অনৈতিক-অমানবিক ষড়যন্ত্রে তিনি যথেষ্ঠ জড়িত। শক্তির মিথ্যা প্রচার করে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন রঘুপতি। আমরা রাজার পক্ষে নই, পুরোহিতের পক্ষেও নই, আমরা মানবজীবনের মূল সত্যকে উদঘাটনে উৎসুক। অথচ দেখি, রঘুপতি প্রত্যক্ষভাবে রাজাকে না বললেও, তাঁর ব্যবহার– প্রতিপদে প্রতিবাদী ও প্রবল প্রতাপের প্রকাশে উদ্ধত। কেন না এই রাজা, গোবিন্দমাণিক্য, ত্রিপুররাজ্যে বলি বন্ধ করেছেন।

রাজতন্ত্রের সঙ্গে গণতন্ত্রের চিরকালই বিস্তর ব্যবধান। গণতন্ত্রে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি প্রশাসন পরিচালনা করেন। তাই সেই প্রশাসনের অস্তিত্ব নির্ভর করে জনমুখী কার্য পরিকল্পনায় ও পরিচালনায়। কিন্তু আমাদের এই দেশ ভারতবর্ষ আজ ৮০ বর্ষকাল স্বাধীনতা লাভ করেও ২৬ জানুয়ারিকে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ বলেই পালনে অভ্যস্ত। গণতন্ত্র বা সাধারণতন্ত্র বলতে আমরা শিখিনি। আমাদের গণতন্ত্রের পাঠ দেওয়া হয়নি। নির্বাচনই আমাদের একমাত্র গণতান্ত্রিক চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। ধর্ম সেখানে হাতিয়ার হয়ে উঠেছে মাত্র। ইতিহাসের পাঠে Civics-এর তথ্যগত পাঠ থাকলেও– দেশাত্মবোধ, গণতন্ত্রবোধ, জাতি ও জনজাতির প্রতি সম্মানজনক ব্যবহার, দায়িত্ব, কর্তব্য, অধিকার ও অভ্যাসচর্চার কোনও প্রয়োগশিক্ষা আমাদের নেই। এ সম্বন্ধে কোনও ধারণাই অধিকাংশ মানুষের নেই। ফলে তাঁদের অধিকার তাঁরা ব্যবহার করেন কেবল ৫ বছর অন্তর।

যদিও বর্তমান National Education Policy-তে Foundation Course রাখা হয়েছে এহেন উদ্দেশ্যেই। যার মধ্যে আমরা দেশ, প্রতিষ্ঠান, অবদানকারী ব্যক্তিত্ব, সমাজ কল্যাণ প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা ও চর্চা করছি। ধর্ম, যা সমাজকে ধারণ করে, তার কোনও পাঠ আমরা বিদ্যালয় স্তরের আধুনিক শিক্ষায় রাখিনি কখনও। ফলে ধর্ম আমাদের আবেগ ও বিশ্বাসকে আন্দোলিত করেছে সময় ও স্বার্থ বিশেষে। এদিক থেকে Indian Knowledge System-কে জানার প্রয়াস শুরু হয়েছে নতুন করে। যার প্রায়োগিক দিকটি আধুনিক ভারতে প্রথম রবীন্দ্রনাথই চর্চা করেছিলেন শান্তিনিকেতনে প্রাচীন তপোবনের আদর্শে। দেশ, সমাজ, ধর্ম না জানলে তো বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ে না।

রবীন্দ্রনাটক ‘বিসর্জন’-এ মানবতাবাদী রাজা গোবিন্দমাণিক্য বলছেন–
‘দেবতার নামে/মনুষ্যত্ব হারায় মানুষ।’
‘এ জগতে দুর্বলেরা বড়ো অসহায় মা জননী, বাহুবল বড়োই নিষ্ঠুর স্বার্থ বড় ক্রূর, লোভ বড় নিদারুণ।’

সাধারণ মানুষ সম্বন্ধে রাজা হতাশ হয়ে বলছেন– ‘অজ্ঞান একান্ত অন্ধ।’

পরিবার প্রসঙ্গে বলছেন– ‘ভাই তাই ভাই নহে আর/পতি প্রতি, সতী বাম, বন্ধু শত্রু’

গৃহযুদ্ধ প্রসঙ্গে– ‘রাজহত্যা। ভাই দিয়ে ভ্রাতৃহত্যা।’

সমাজ ও ধর্ম সম্বন্ধে বলছেন– ‘হিংসা পুণ্য, দয়া নির্বাসিত।’

জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে বলছেন– ‘ধরণীর সহিবে না এত হিংসা’

এই রাজার কত চিন্তা প্রজার জন্য! যেখানে প্রয়োজনে তিনি– ‘কত শত বর্ষ ধরে যে প্রাচীন প্রথা দেবতা চরণতলে বৃদ্ধ হয়ে এলো…’ তাকেও বন্ধ করে দিতে পারেন। প্রজাদরদী সংবেদনশীল মুক্তচিন্তার অধিকারী রাজা, প্রজার জন্য নিঃস্বার্থ মঙ্গলকামনা করতে পারেন, তাঁর কাছে দেশ-রাজ্য সর্বপ্রথম, তারপর পরিবার, তারপর ব্যক্তিস্বার্থ বড়! যখন গোবিন্দমাণিক্যর বিরুদ্ধে অন্তরে-বাহিরে শত্রু, তখন নক্ষত্র স্বীকার করে বলে, ‘ক্ষমা করো ভাই।… রঘুপতি দেয় কুমন্ত্রণা, রক্ষো মোরে তার কাছ হতে।’ নয়নরায় এসে বলে– ‘মোগলের সৈন্য নিয়ে চাঁদপাল ত্রিপুরা আক্রমণে উদ্যত।’ গুণবতীও ধ্রুব-কে সরাতে চায়– কারণ এ-শিশু, তাঁর সন্তানকামনাকে বাধাদান ও গুরুত্বহীন করে। বিপন্ন বিস্ময়ে গোবিন্দমাণিক্য জানতে পারেন যে তাঁর ভ্রাতার নির্বাসন-পথে, মোগলসৈন্য নক্ষত্রকে রাজপদে বরণ করে, ত্রিপুরা অধিকারে আসছে।

‘এতো নহে নক্ষত্রের ভাষা। চাহে মোর
নির্বাসন, নতুবা ভাসাবে রক্তস্রোতে
সোনার ত্রিপুরা– দগ্ধ করে দিবে দেশ,
বন্দী হবে যৌবন,…!’

zoom
‘বিসর্জন’ নাটকে জয়সিংহের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ

নয়নরায় যুদ্ধ চাইলেও গোবিন্দের দৃষ্টিতে এ-তো মোগলের বিরোধিতা নয়; ত্রিপুরার রাজপুত্র রাজা হতে চায়। তাই গোবিন্দমাণিক্য ভেঙে পড়েন না, যুদ্ধও করতে চান না। হাহাকার ও দেবীপ্রতিমার বিসর্জনকে নাটককার রবীন্দ্রনাথ দেখান একত্র জটিলতায়। যা সামাজিক ভারসাম্যকে নষ্ট করে। রঘুপতি সাধারণ পুরোহিত নন, রাজপুরোহিত। অবশ্যই পণ্ডিত। তাঁর দ্বন্দ্ব-সংঘাত সরাসরি রাজার সঙ্গে। অর্থাৎ এই সংঘাত যখন রাষ্ট্রকে জড়িত করে, তখন পৌরোহিত্য অতিক্রম করে আসে ব্রাহ্মণত্বের সংঘাত, ক্ষত্রিয়ের সঙ্গে। পুরোহিত দেবীর মহিমা রক্ষা করতে ব্যগ্র– আত্ম-অহংকার, আত্মস্বার্থ, আত্মসম্মান রক্ষার্থে। তিনিই কঠোর জীবনের সংঘাত রচনা করেন, কোমল-প্রেম, সম্বন্ধের বন্ধন, আত্মীয়তা ও বিশ্বাসকে বিচ্ছিন্ন করে। সকলের মধ্যে অনিষ্টের আশঙ্কা-সঞ্চার তাঁর নেশা।

বলিপ্রথায় রাজার বাধাদানে অনিষ্ট যে, রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করবেই– এই বক্তব্যকে প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি তৎপর হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাটকে জীববলি বন্ধকে মুখ্য সংকট করেননি। বরং সেই বলিপ্রথা-কেন্দ্রিক ধর্ম-সমাজের সংকটকে, ভীতিকে, পুরোহিত-তন্ত্রের প্রাচীন ঐতিহ্য বহনের সংস্কারকে এবং অবশ্যই সেই পুণ্য-ধারণার বশবর্তী বিশ্বাসে-অন্যায় ও পাপের আশ্রয়-গ্রহণকে মূল সংকট বলে চিহ্নিত করেছেন।

zoom
বিসর্জন নাটকের সাম্প্রতিক অভিনয়ে গৌতম হালদার।

রবীন্দ্রনাটকের পরিণতি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও বিষাদের। হাহাকার করেন রঘুপতি– যাঁর জীবনমন্থন করা ধন– জয়সিংহের আত্মহননে সব ভেসে গেল; যেন ‘মরুভূমি ডুবে গেল করুণার প্লাবনে।’ অপর্না ভিখারিণী থেকে হয়ে উঠলো মা অমৃতময়ী; আর দেবী হলেন পাষাণী। রঘুপতি দেবীমূর্তিকে ভর্ৎসনার সুরে, অভিমানে, কেঁদে উঠে বলেছেন– ‘থাক্ তুই চিরকাল/ এই মতো– এই মন্দিরের সিংহাসনে/ সরল ভক্তির প্রতি গুপ্ত-উপহাস! দিব তোর পূজা প্রতিদিন, পদতলে/ করিব প্রণাম, দয়াময়ী মা বলিয়া/ ডাকিব তোমারে। তোর পরিচয় কারো কাছে নাহি প্রকাশিব, শুধু ফিরায়ে দে/ মোর জয়সিংহে।’

এর আগে ক্রন্দনে দেবীকে বলেছেন– ‘জড়, পাষাণের স্তূপ, মূঢ় নির্বোধের মতো।’

আর যে প্রশ্ন রঘুপতি করেছেন তা হল–

‘কোন দানবের এই ক্রূর পরিহাস জগতের মাঝখানে রয়েছে বসিয়া। মা বলিয়া ডাকে যত জীব, হাসে তত ঘোরতর অট্টহাস্যে নির্দয় বিদ্রূপ।’

নাটকের শুরুতে তিনি বলছেন–

‘কত শত বর্ষ ধরে যে প্রাচীন প্রথা/ দেবতা চরণতলে বৃদ্ধ হয়ে এল, সে কি পাপ হতে পারে?’

মা অমৃতময়ীর ভয়ঙ্করী রূপকেই প্রদর্শন করা হয়েছে– তাঁর কল্যাণীমূর্তির দর্শনকে গোপন করে– পুরোহিতের প্রতাপের প্রাবল্যে। অবহেলিত করুণাময়ী মাতা তাই এসেছেন– ভিখারিণীর বেশে, অপর্ণা (দেবী দুর্গা) নামে। তিনি বলেছেন– জীবমাত্রেই তাঁর সন্তান। এই দর্শনে বিশ্বাসী হয়েছেন রাজা গোবিন্দমাণিক্য। গুণবতীর সন্তানকামনায় ১০০ মহিষ ৩০০ ছাগবলির প্রতিশ্রুতি থাকে– বালক ধ্রুবকে হত্যায় উদ্যত রঘুপতি, প্রতিজ্ঞা করান জয়সিংহকে, হত্যার পরিকল্পনা করেন রাজাকে, অথচ আপন-সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় সবশেষে তাঁর যথার্থ পুণ্যের উপলব্ধি ঘটে। অজানিত আকস্মিক অঘটন, দুর্ভাগ্য ও বিপর্যয়ের বিপন্নতায় তাঁকে বিষণ্ণ করে। ‘বিসর্জন’ আমাদের শেখায় অতীতের যা-কিছু ভালো– মঙ্গলময় তাকে গ্রহণ করাই শ্রেয়। যা বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য পীড়াদায়ক, হতাশাব্যঞ্জক– অমঙ্গলের, তাকে বদল করা উচিত– সেখানেই আধুনিক সমাজের পরিচয় ও সার্থকতা।

zoom
দুর্গাপূজা এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য

মহিষাসুরমর্দিনীর রূপ আমাদের পূজার মূর্তি। সেখানে অসুর দলন অর্থে সর্বপ্রকার অসুরদলন। অসুর হল– অক্ষমতা, দুর্বৃত্ত, দুর্নীতিপরায়ণ, অন্যায়কারী– সমস্ত রিপু ও অসদগুণ। সেই অসুরকে হনন শুধুমাত্র দুর্বিষহ পুরুষকে নারীর হননই নয়– একইসঙ্গে এতে রয়েছে পশুপাখির অস্তিত্বের স্বীকৃতি, পূজা। তাই তো দুর্গা দেবীর সঙ্গে সন্তানেরাও তাঁদের বাহন– ইঁদুর, হাঁস, পেঁচা, ময়ূর, সাপ, সিংহ– স্থলচর, জলচর, উভচর, খেচর সর্বপ্রকারের পশুপাখি পূজ্যরূপে স্থান পাচ্ছেন। বলিদান বা সম্প্রদানের ক্ষেত্রে তাই– নরবলি থেকে পশুবলির পরিবর্তনে ফল সবজি-আদিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সমাজের রীতিনীতি মানুষের নির্মাণ। পূজার উদ্দেশ্য সমাজকল্যাণ। ‘মানসিক’ নির্ধারিত হয় নির্দিষ্ট বলিদানে। তার উত্তাপ, উত্তেজনা, উল্লাস অথবা উৎসাহ– আমাদের উন্নতি ঘটায় না।

উন্নত হতে গেলে নত হতে হয়। তখনই বিসর্জনে-আবাহন ঘটে। নাটকে কালীমূর্তির কথা থাকলেও আমরা দেখব দেবী দুর্গাকে। এই আবাহনের প্রথম ক্রিয়া দুর্গাপূজায় মহাষষ্ঠীতে বোধনের মধ্য দিয়ে হয়। বোধন হল বোধ বা জাগরণ, উদ্বোধন। এই জাগরণ তো চেতনা বা চৈতন্যের জাগরণ! দুর্গাপূজায় এই বোধনে দেবীর প্রাণ জেগে ওঠে। বোধনের মূল আচার হয় বিল্বমূল অর্থাৎ বেল গাছের নিচে। শাস্ত্রমতে দেবী দুর্গা বিল্ববৃক্ষে অবস্থান করেন। তাই ঘট-স্থাপন ও বৃক্ষপূজা করে দেবীকে জাগ্রত করার প্রার্থনা-পূজা হয়ে থাকে। রীতি অনুযায়ী শাক্ত ঐতিহ্য, সনাতন মতে আমিষ-ভোগ এবং বৈষ্ণব ও আঞ্চলিক বা সর্বজনীন মতে নিরামিষ ভোগ– দুই-ই উল্লিখিত।

zoom
বিসর্জন; শিল্পী: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

আধুনিক অশান্ত অস্থির অসহায় শিক্ষিত সামাজিক মন ক্রমে বলিবন্ধের প্রতি আগ্রহী হয়েছে। সবাই যে ঈশ্বরের সন্তান, নির্ভর, বিশ্বাস, সৃজন ও অংশ এই বিশ্বাস বিকশিত হলে– আমাদের দেবী সমান ভক্তিতেই পূজিত হবেন। সনাতন বা চিরন্তন রীতি অক্ষুণ্ণ থাক– উল্লাস-বিলাসিতা-বীভৎসতা থেকে সমাজ মুক্তি পাক– শান্তির অভিলাষী হই সকলে, সংযত হই আচারে-আচরণে। পদ-জাতি-শ্রেণি-বর্ণ-ধর্মভেদ ভুলে আমরা সেই দেবীর, দুর্গার, মহাকালীর পূজা প্রার্থনা করি, প্রণত হই– প্রতাপ ও ঔদ্ধত্য বিসর্জন দিয়ে পূজা করি সেই দুর্গতিনাশিনীর যাঁর মন্ত্র– দেশমাতৃকার, ভারতমাতার, বিশ্বজননীর। যেন মনে রাখি– আমরা ভারতমাতার সন্তান–ভারতবর্ষই আমাদের তীর্থক্ষেত্র। তাই শুভ হোক বিজয়া দশমী। মঙ্গল হোক সকলের। বিসর্জন নয়– প্রতিমা নিরঞ্জনে আমাদের চেতনা জাগ্রত হোক, ক্ষয়-ভয় দূর হোক। জীববলি, আত্মহনন, সৎ-সত্যের সম্মানহানি বন্ধ হোক। রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটক ধর্ম থেকে রাষ্ট্রের সংকটকে স্পষ্ট করে। সমাপ্তিতে অন্যতর উপলব্ধি ঘটে। আর ১৯১১-তে যখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ভারততীর্থ’ কবিতায় লেখেন–

“মা’র অভিষেকে এসো এসো ত্বরা
মঙ্গলঘট হয়নি যে ভরা
সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থ নীরে
আজি ভারতের মহামানবের সাগরতীরে
জাগো রে ধীরে।”

তখন মনে হয় এ পূজার বিদায়কালে রবীন্দ্রনাথের গানে দেবীকে প্রণতি জানিয়ে সকলে প্রার্থনা করি–

‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে–
নির্মল করো, উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে॥
জাগ্রত করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে।
মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করা হে॥
যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ।
সঞ্চার করো সকল কর্মে শান্ত তোমার ছন্দ।
চরণপদ্মে মম চিত নিষ্পন্দিত করো হে।
নন্দিত করো, নন্দিত করো, নন্দিত করো হে ॥’

Bisarjan Durga Puja 2026 Durgapuja Immersion Joysingha Mahisasura Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar sedition superstition tripura

Share this article on