Gary Sobers: A Poet’s Tribute। Robbar
Robbar
  • ২২ আশ্বিন ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ৯ অক্টোবর ২০২৬

ক্রিকেটের বহুরূপী

১৭ জুলাই, ২০২৬। প্রয়াত হয়েছিলেন স্যর গ্যারি সোবার্স। স্থানাঙ্কের দূরত্ব সত্ত্বেও– সোবার্সের খেলা, সোবার্সের দর্শন ছড়িয়ে পড়েছে স্বাভাবিকভাবেই নানা দেশে, নানা মানুষের চিন্তনে। গ্যারি সোবার্স চেয়েছিলেন ক্রিকেট জিতুক। জয়-পরাজয় বা পরিসংখ্যান বড় কথা নয়। শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রেও কি এই দর্শন অকেজো? রোববার.ইন-এর শারদসংখ্যায় সীমানা ও সময়ের সেতু পেরিয়ে তর্পণ করা হল গ্যারি সোবার্সকে। হাজার বছরের বাংলা ভাষার অক্ষরের জল দিয়ে।  

শেষ আপডেট: অক্টোবর ৯, ২০২৬, ২০:৫৭   
Facebook WhatsApp Messenger

সেটা ছয়ের দশক। রানাঘাটের পাবলিক লাইব্রেরিতে, প্রথমবারের জন্য দেখতে পাই ‘স্পোর্ট অ্যান্ড পাসটাইম’ নামের একটি পত্রিকা। নিয়মিত প্রকাশিত হত। ‘নবাঙ্কুর’ ক্লাবের প্রধান, ভৃগুদা, সেই পত্রিকা আনাতেন। গ্যারি সোবার্সকে প্রথম সেই পত্রিকাতেই খুঁজে পেয়েছিলাম। তখনই পৃথিবীর ‘শ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন তিনি। তার পরেই ১৯৬৬-’৬৭ সিরিজে তিন টেস্টের জন্য ভারত সফর করতে এসেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল, যার অধিনায়ক ছিলেন গ্যারি সোবার্স।

zoom

 

১৯৬৬। ইংল্যান্ডে সফর করছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। একের পর এক ম্যাচ ইংল্যান্ড হেরে যাচ্ছে। পাঁচটি টেস্ট হয়েছিল। তিনবার ক্যাপ্টেন বদল। পঞ্চম টেস্টটিতে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ছিলেন স্বল্পকেশ, নিরুপদ্রব, ভালো মানুষ– ডেনিস ব্রায়ান ক্লোজ। খেলায় যে খুব নাম করেছিলেন, তা নয়। তবে রসিক ছিলেন। সাংবাদিকদের কাছে ম্লান মুখে তাঁদের এই পরাজয়ের স্বপক্ষে যা বলেছিলেন, তা হল: ‘আমরা তো ১১ জন খেলি। কিন্তু আমাদের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড় সংখ্যা ১৪ জন। কী করে জিতব?’ তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, কেন তিনি তিনি বলছেন যে ১৪ জন! ব্রায়ান ক্লোজ উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলে যে গ্যারি সোবার্স আছেন! উনি একাই তিন রকম বল করতে পারেন।’

zoom
সদ্য ১৮। ব্রায়ার ক্লোজ। টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেকের দিন। খেলেছেন ৪৫ বছর পর্যন্ত। তখন অবশ্য ইন্দ্রলুপ্ত

সত্যিই গ্যারি সোবার্স তিন রকম বল করতে পারতেন। এক, মিডিয়াম পেস– যেটা অনেক সময় পেস বোলারের কাছাকাছি গতিতেও পৌঁছয়। দুই, স্পিন। তিন– সোবার্স চায়নাম্যান বলও অকস্মাৎ ডেলিভার করতে পারতেন। ফলে, বোঝাই যাচ্ছে, সোবার্স এতটাই প্রতিভাধর ছিলেন, যে-সময়টা জুড়ে তিনি খেলেছেন– সেটা ক্রিকেট ইতিহাসের খুব লক্ষণীয় এক সময়।

zoom
সোবার্সের ডেলিভারি

সোবার্সের প্রথম জীবন কেটেছিল খুবই দারিদ্রের মধ্যে। পুলিশের দলে ব্যান্ড বাজাতেন তিনি। পুলিশ মার্চের সময় ড্রাম বাজাতেন। তখন তাঁর ১৪-১৫ বছর বয়স। এর পাশাপাশি ক্রিকেট খেলতেন নানা জায়গায়। খেলতে খেলতেই এক সময় জাতীয় ক্রিকেট দলে ঢুকে পড়েন তিনি। এবং পাঁচের দশকের প্রথম দিকে, ১৯৫৪ সালে, তাঁর টেস্ট অভিষেক হয়। যখন তিনি এই ইংল্যান্ড সফরে আসেন, তখন প্রথম দেখেন ট্রেভর বেইলিকে। সে সফরে ফ্রেড ট্রুম্যানকেও দেখেন। যাকে বলা হত ‘ফায়ারি ফ্রেড’। তিনি প্রথম ৩০০-এর বেশি উইকেট নিয়েছিলেন– ৩০৭টি। সেরা বোলিং ৩১ রান দিয়ে ৮ উইকেট, ১৯৫২ সালে। ম্যাঞ্চেস্টারে, ভারতের বিরুদ্ধেই। আর ট্রেভর বেইলি ইংল্যান্ডের প্রতিষ্ঠিত এক অলরাউন্ডার। ট্রেভর বেইলি ক্রিকেটে ‘ডাবল’ করেছিলেন অর্থাৎ টেস্টে হাজার রান করেছেন এবং টেস্টে ১০০টা উইকেট পেয়েছেন। ট্রেভর বেইলি ছিলেন এমনই উচ্চমানের একজন অলরাউন্ডার। ওঁকে বলা হত ‘বার্নাকল’– সমুদ্রের পাথরে আটকে থাকা এক শক্ত প্রাণী। এতই জমাটি ছিল ওঁর ডিফেন্স। সোবার্স, বলা বাহুল্য, ট্রেভর বেইলিকে ছাড়িয়ে বিশ্বস্মরণীয় খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন এবং ‘স্যর’ উপাধি পান পরে। ট্রেভর বেইলিই কথা তবে বললাম কেন? বললাম, কারণ ট্রেভর একটা বই লিখেছিলেন। তাঁর থেকে বয়সে অনেক ছোট একজন ক্রিকেটারকে নিয়ে। সেই বইয়ের নাম: ‘স্যর গ্যারি’। গ্যারি সোবার্সকে নিয়ে লেখা এই বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। ভূমিকা লিখেছিলেন রিচি বেনো। ভূমিকায় লেখা: গ্যারিকে আমি প্রথম যে ডেলিভারিটা করেছিলাম, তা ব্যাট ছোঁয়ানোর পর এত জোরে যেতে লাগল যে, আমি হাত তুলে নিলাম। হাতের তলা দিয়ে বলটা বাউন্ডারিতে পৌঁছয়। একটা স্ট্রেট ড্রাইভ।’ স্মৃতি থেকে বলছি, সম্ভবত, এই ভাবেই বেনো শুরু করছেন তাঁর ভূমিকা।

 

সোবার্স তখন খ্যাতির তুঙ্গে! দেশের ক্যাপ্টেন। সব দেশের বিরুদ্ধেই সিরিজ জয় রয়েছে। অবসরকালে সোবার্সের টেস্ট সেঞ্চুরির সংখ্যা ২৬। ২৬– মানে ব্র্যাডম্যানের পরেই! এছাড়া, মনে রাখতে হবে, দু’টি বেসরকারি টেস্টে দু’টি সেঞ্চুরি ছিল তাঁর। একটি বিশ্ব একাদশের খেলায়, আরেকটি দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে। তখন দক্ষিণ আফ্রিকা বর্ণবিদ্বেষের কারণে নিষিদ্ধ। বিশ্ব একাদশের বিরুদ্ধে তাঁর রান ছিল ২৫৪। কিন্তু সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই পরিসংখ্যানে গৃহীত হয়নি, কারণ ‘বেসরকারি’ টেস্ট। যদি অন্তর্ভুক্ত হত, তাহলে তাঁর সেঞ্চুরির সংখ্যা দাঁড়াত ২৮। ব্র্যাডম্যানের ২৯, সোবার্সের ২৮।

zoom
ট্রেভর বেইলি। ফ্রেড ট্রুম্যান

সোবার্স রিটায়ার করেছিলেন ’৭৩ সালে। অর্থাৎ ’৫৪ থেকে ’৭৩– প্রায় বিশ বছরের খেলাজীবনে তিনি ২৬টা সেঞ্চুরি নিয়ে রিটায়ার করছেন। টেস্টে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান ৩৬৫ নট আউট ও মোট সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী হিসেবে ৮,০৩২ রান নিয়ে তিনি অবসর নিয়েছিলেন।

১৯৬৭-’৬৮। ইংল্যান্ড এসেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। এই সফরে দেখা গেল, ইংল্যান্ড ভয়ংকর রক্ষণাত্মক হয়ে রয়েছে। কীরকম? একটা ছোট মজার প্রবাদ বলি। ইয়র্কশায়ার টিমের ক্যাপ্টেন এবং ভাইস ক্যাপ্টেন– তাঁরা দু’জনেই ওপেন করেন। গাড়ি চালিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছেন। ল্যাঙ্কাশায়ারের সঙ্গে তাঁদের খেলা। যেটাকে ‘গোলাপের যুদ্ধ’ বলা হত। ক্যাপ্টেন গাড়ি চালাতে চালাতে বললেন, ডিকি, মনে রেখো, যদি টসে জিতি লাঞ্চের আগে একটা চারও নয়। ভাইস ক্যাপ্টেন বিনীতভাবে উত্তর দিলেন ‘রাইট স্কিপ।’

zoom
স্পোর্ট অ্যান্ড পাসটাইম-এর প্রচ্ছদে গ্যারি

এতটাই রক্ষণাত্মক ছিল ইংল্যান্ড জাতীয় ক্রিকেট দল। তার আগে হেরেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে, একাধিকবার। এই সফরে গিয়ে তাঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, কিছুতেই হারবে না। ৫টি টেস্টের সিরিজ। জানুয়ারি থেকে মার্চ। প্রথম তিনটি টেস্ট ড্র হয়েছে। যে টেস্টের কথা বলছি, সেটি চতুর্থ। চায়ের একটু আগে, ২ উইকেটে ৯২ রানে গ্যারি সোবার্স ইনিংস ডিক্লেয়ার করলেন। খেলার সময় বাকি রয়েছে ১৬৫ মিনিট। ইংল্যান্ডকে জেতার জন্য করতে হবে ২১৫। তখন কিন্তু টি-টোয়েন্টি বহুদূর। এমনকী, ওয়ানডে ক্রিকেটেরই তো জন্ম হবে তারও সাত-আট বছর পরে। অর্থাৎ, ক্রিকেটের বিশ্বকাপ শুরু হবে। যদিও ইংল্যান্ডের কাউন্টিগুলোতে রবিবার করে ওয়ান ডে খেলার একটা চল ছিল। এই ওয়ান ডে খেলেই গ্যারি সোবার্স রোজগার করতেন।

zoom
জিওফ্রে বয়কট এবং জন এডরিচ

ফলে, বোঝাই যাচ্ছে, অত দ্রুত রান তোলা, ব্যাপারটা মোটেই সেদিনের ক্রিকেটে সহজ ছিল না। আজকের ‘বাজবল’ ক্রিকেটের মতো নয় ব্যাপারটা। ওদিকে গ্যারি সোবার্স সর্বাত্মকভাবে তাঁর বোলারদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ইংল্যান্ডের হয়ে ওপেন করলেন জন এডরিচ ও জিওফ্রে বয়কট। দলের ৫৫ রানের মাথায়, এডরিচের ব্যক্তিগত রান যখন ২৯, উইলি রদ্রিগেজের বলে বোল্ড হয়ে যান। তিন নম্বরে নামলেন কলিন কাউড্রে। কাউড্রের আজীবনের স্ট্রাইক রেট ৩৬.০২। অর্থাৎ, ১০০টি বল খেললে তিনি ৩৬ রান করেন। কিন্তু কী যে ভূত চাপল সেদিন কাউড্রের মাথায়! তিনি করলেন ৭৫ বলে ৭১। হিন্দিতে যাকে বলে ‘ধুঁয়াধার বল্লেবাজি’, তা-ই করেছিলেন তিনি। ওদিকে হাল ধরে, আত্মনিয়ন্ত্রণের সমস্ত রীতি মেনে, বয়কট করলেন ১৬২ বলে ৮০। ইংল্যান্ড মাত্র তিন উইকেট হারিয়ে ২১৫ রান তুলে ফেলল। এবং জিতে গেল সেই টেস্ট।

zoom

পঞ্চম টেস্ট ইংল্যান্ড ড্র করল আবার। ফলে সিরিজের ফলাফল ১-০। এই হল সোবার্সের ক্রিকেট-সৌভাগ্যের অবনমনের সূচনা। তখনও টেস্ট ক্রিকেটের চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হয়নি। কিন্তু অঘোষিত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজই ছিল। যার অধিনায়ক ছিলেন গ্যারি সোবার্স। সমালোচকরা এই হারের জন্য ক্রমাগত দায়ী করতে থাকলেন সোবার্সকে। যেন ইচ্ছে করেই তিনি একটি টেস্ট পরাজয়ের মুখে ছুড়ে দিয়ে এসেছেন ওই ডিক্লেয়ারেশন দ্বারা, এমনটাই অভিহিত করতে লাগলেন ক্রীড়া সাংবাদিক ও সমালোচকেরা। ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার শরবিদ্ধ হতে লাগলেন, পাতায় পাতায়, অক্ষরে অক্ষরে।

zoom

কোনও মানুষ যদি কোনও কারণে ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী’ হয়ে ওঠে, যদি পৌঁছে যায় খ্যাতির শিখরে, তাহলে তাঁর সমবয়সি সতীর্থরা কেউ কেউ শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠেন। সোবার্সের এই পতনকালে, উঠতে শুরু করলেন তাঁর প্রধানতম শত্রু রোহন কানহাই। তিনি ছিলেন আমাদের গাভাসকরের ‘আইডল’। প্রথম জয়সীমা, তারপরে কানহাই। কানহাই সোবার্সকে সহ্য করতে পারতেন না। কানহাইয়ের ‘ব্লাস্টিং ফর রানস’ বইটি পড়লে তাঁর মনোভাব বোঝা যায়।
পরে কানহাই অধিনায়কও হয়েছিলেন। ওই সমস্ত সমালোচনা, সতীর্থর গোপন হিংসা, সোবার্স টের পেয়েছেন তাঁর ক্রিকেটজীবনের অন্তিম দিনগুলোয়।

zoom
এম এল জয়সীমা। রোহন কানহাই

তিনি অস্ট্রেলিয়া সফরে গেলেন এ ঘটনার পরপরই। দলের মনোবল তখন ভাঙতে শুরু করেছে। ওয়েস হল, চার্লি গ্রিফিথ– দুই ফাস্ট বোলিংয়ের স্তম্ভ, তাঁরা অফ ফর্ম হয়ে যাচ্ছেন। হারতে হল অস্ট্রেলিয়াতেও। সোবার্সের জীবনে এই সময় পরিবর্তন এল ব্যক্তিগতভাবেও। বিবাহ করলেন। কিন্তু কেরিয়ার? পতনোন্মুখ।

zoom
চার্লি গ্রিফিথ। ওয়েস হল

সোবার্সের প্রতি সমালোচনার একটাই প্রধান ধারা। তা হল ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ছিল, সেই চ্যাম্পিয়ানশিপ তারা ধরে রাখতে পারল না সোবার্সের ওই ডিক্লেয়ারেশনের জুয়া খেলায়। তখন কিন্তু টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ছিল না, আগেই বলেছি, অঘোষিত বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

সোবার্স সেসময় একটা উত্তর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি আরেকটা ড্র চাইনি। আমি ফলাফল চেয়েছিলাম। জিততেই চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম খেলাটা জিতুক। শেষমেশ খেলার জয় হয়েছে।’

zoom
ঘরোয়া গ্যারি। বার্বাডোজ। ১৯৭২

সোবার্সের এই কথার ভেতরকার যে দার্শনিক উচ্চতা, বলা বাহুল্য, তা বোঝার মতো মন কোনওকালেই সংখ্যায় বেশি নয়। কারণ যা চটুল, যা চকচকে, যা আমোদ দেয়– সেই জিনিসটার প্রতিই তো মানুষের আকর্ষণ। আর সমর্থকরা সবসময়ই জয় আশা করেন, তাই না?

এবং একথা তো সত্যিই যে, কাউড্রে এবং বয়কট যে স্বভাববিরোধী খেলা খেলবেন, আকস্মিকের খেলা, তা তো কেউ ভাবেনি! ওয়েস্ট ইন্ডিজও না। তাই সোবার্সের এই ঝুঁকি নেওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

zoom
যুবক গ্যারি

১৯৭৫ সালে, প্রথম একদিবসীয় ক্রিকেট বিশ্বকাপ হয়। সোবার্সের খুবই ইচ্ছে ছিল, খেলবেন সেই বিশ্বকাপে। কিন্তু খেলতে পারলেন না। ’৭৩ সালেই ওঁকে অবসর নিতে হয়েছিল। যে সিরিজে ওঁকে অবসর নিতে হয়েছিল, সেই সিরিজেও তাঁর একটা সেঞ্চুরি ছিল। ২০ বছর একটানা ক্রিকেট খেলার পরও, মনে হয়, সোবার্সের মধ্যে আরও কিছুটা ক্রিকেট বাকি ছিল।

২.
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবারে অনেকে রয়েছেন। ভাইবোনেরা তো বটেই। সকলের পড়াশোনা, বিয়ে, এমনকী, ওঁর যে ভাগনে-ভাগনি– তাঁদের ভবিষ্যৎ– সেসবের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন অজিতেশ। এত বড় সংসার, তা চালানো সহজ নয়। নাটক করে, আর সামান্য কিছু বাংলা ছবিতে অভিনয় করে সংসারের হাল ধরা অসম্ভব। অজিতেশকে তাই মাঝে মাঝেই হিন্দি ছবিতে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে। আশ্চর্যের কিছু নেই, কারণ বাংলা থিয়েটারের অনেকেই তো সিনেমায় অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে। তবে কেউ বোধহয় হিন্দি ছবিতে উৎপল দত্তর মতো প্রতিষ্ঠা পাননি। অজিতেশ, অসম্ভব প্রতিভাবান হলেও, তিনিও প্রতিষ্ঠা পাননি হিন্দি ছবিতে। সম্ভবত, তার কারণ অজিতেশের কাছে অধিকাংশ সময়ই এসে পড়ত খলচরিত্র। এদিকে অজিতেশকে বারবারই কলকাতার থিয়েটারের নাট্যকার-নাট্যনির্দেশক-অভিনেতাদের মুখোমুখি পড়তে হত। তাঁদের প্রশ্ন এসে পড়ত বারেবারেই– কেন অজিতেশ যাত্রায় গেলেন? কেনই-বা হিন্দি ছবিতে ওই ধরনের থার্ড ক্লাস ভিলেনের অভিনয় করেন!

zoom
নাটক ‘শাহি সংবাদ’। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রত্যুত্তরে অজিতেশ বলেছিলেন যে, ‘হিন্দি ছবিতে নায়িকার আঁচল বা ওড়না ধরে টান মারলেই বা স্ক্রিনে কোনও নারীর সঙ্গে অসদাচরণ করলেই, আমার কোনও বোনের বিয়ে হয়ে যায়। আমার ভাইয়ের পরীক্ষার ফি জমা পড়ে যায়। সেই জন্য এগুলো করি।’

এ উত্তর অজিতেশ যাঁদের দিতেন তাঁরা অত দরিদ্র নন, তাঁদের পরিবার অতখানি অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে ছিল না। তবু অজিতেশ হাসিচ্ছলে উত্তর দিতেন তাঁদের। অজিতেশের এক আত্মীয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল আমার। অজিতেশ যাঁকে এনে রেখেছিলেন নিজের কাছে। তিনিই আমাকে একথা জানিয়েছিলেন।

zoom

গ্যারি সোবার্সকেও, তাঁর ভাইবোনদের জন্য, চিন্তিত থাকতে হত। সোবার্স তখন প্রতিষ্ঠিত, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন। তখনও, সোবার্সকে প্রতি রবিবার ওয়ান ডে খেলতে হত। যখন তিনি ইংল্যান্ডে কাউন্টি খেলছেন, তখন রবিবার রবিবার এইসব ম্যাচ খেলতেন। কিছু টাকা পেতেন খেলার বিনিময়ে। ট্রেভর বেইলি, যে বই লিখেছিলেন, ‘স্যর গ্যারি’, সেখানে দেখতে পাই এই ওয়ান ডে খেলার জন্যই ওঁর একটা হাঁটুর ওপর বড্ড বেশি চাপ পড়েছিল। তাছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের অন্যতম প্রধান বোলারও তো ছিলেন উনি। একটা হাঁটুর ওপর নিরন্তর চাপ পড়তে পড়তে, ওঁর হাঁটু জখম হয়ে গিয়েছিল। এই হাঁটুর সমস্যা না-হলে, হয়তো আরও বছর দুয়েক এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন সোবার্স নিজের ক্রীড়াজীবন। অর্থাৎ, প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে পারতেন হয়তো-বা। কিন্তু এই রবিবার করে ওয়ান ডে ক্রিকেট খেলে অর্থোপার্জন করাটা তাঁর তৎকালীন সাংসারিক পরিস্থিতির জন্য ছিল সবথেকে জরুরি।

zoom
ছন্দের রং সাদা-কালো

কোনও কোনও মানুষের ক্ষেত্রে একটা বা দুটো কাজের কলঙ্ক সারা জীবন ধাওয়া করে চলে তাকে। হয়তো, কখনওসখনও মৃত্যুর পরও। সোবার্সের ডিক্লেয়ার করার যে ঘটনা, তার ২০ বছর কেটে গিয়েছে তখন। ইংল্যান্ডে এমসিসি-র আমন্ত্রণে গ্যারি সোবার্স এসেছেন। সম্ভবত ’৮৭ সাল। একদিবসীয় ক্রিকেট বিশ্বকাপ হচ্ছে তখন।

সেই পুরনো প্রশ্ন আবার ঘুরে এসেছে তাঁর কাছে। ‘ওই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পর আপনার বিরুদ্ধে প্রচুর সমালোচনা হয়েছিল। পরে, টেস্টে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতেও অনেকটা সময় লাগে। মানে, আবার নতুন করে লয়েডের টিমটা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। সোবার্সের প্রতি প্রশ্ন, ’৮৭ সালেও: ‘আপনি এখন যদি সুযোগ পেতেন তাহলে কি বলবেন যে, ভুল করেছিলেন? সংশোধন করতেন?’

zoom
ক্লাইভ লয়েড

সোবার্স বলেছিলেন, ‘এখন তো আমি সেই সুযোগ পাব না আর। আর যদি আমি সুযোগ পেতাম, তাহলেও সেই একই কাজ করতাম।’

এতটা সময় পেরিয়ে গিয়েছে। বিষমাখানো তিরের ফলা ২০ বছর পর, আবার তার শরীরে লেগেছে। তিনি এখনও অবিচল। নিজের সিদ্ধান্তে। কোনও কিছুই টলাতে পারবে না তাঁকে। এটা কোনও শিশুসুলভ বা নেতাসুলভ জেদ নয়। এটা সংকল্প।

উনি বলছেন, ‘ডিক্লেয়ার করতাম এই কারণে যে, আমি চেয়েছিলাম খেলাটার একটা ফলাফল হোক। খেলাটার জয় হোক। একের পর এক টেস্টে ওই প্রবল রক্ষণাত্মক ড্র– আমি চাইনি। চেয়েছিলাম উজ্জীবিত ক্রিকেট খেলতে। লক্ষ করে দেখবেন, ওই ডিক্লেয়ারেশনের পরে, ইংল্যান্ড দলও খুব আশ্চর্যজনকভাবে, খানিকটা চরিত্র-বিরোধী হয়েই খুব উজ্জীবিত ক্রিকেট খেলে। এবং জয়লাভ করে। ফলে খেলার জয় হয়। আমি সেই একই সিদ্ধান্ত এখনও নিতাম।’

এ-ই আমি শিখেছি গ্যারি সোবার্সের থেকে। দেখলাম, আমি আসলে চাইতাম কবিতা আমার ভেতরে অবস্থান করুক। তাকে হারিয়ে ফেললে আমি হেরে যাব। কিন্তু আমি তাকে পাচ্ছি না। সারাজীবন ধরে লিখতে লিখতে যে পরিবেশে আমি আছি, সে পরিবেশে থাকলে আমি এইরকম পাতার পর পাতা লিখেই চলব। হয়তো এরপরেও তা-ই লিখব। কিন্তু আমার দরকার লেখাটা। লেখা ছাপা, পুরস্কার পাওয়া, চোখের সামনে নীরবে থ্রেট কালচারের উত্থান ও তার প্রসারণ দেখা, দেখে যাওয়া– এইটা আমার অবচেতনকে এতটা পুড়িয়ে দেবে যে আমি কবিতার কাছে পৌঁছতে পারব না। শুধু কয়েকটা লাইন লিখে যাব। তাই আমি থামিয়ে দিলাম লেখাপ্রকাশ। এর পিছনে গ্যারি সোবার্সের কোনও ভূমিকা নেই– একথা কিছুতেই জোর দিয়ে বলা যায় না।

zoom
গ্যারিঞ্চা, পেলে

গ্যারি সোবার্স যে সময় পৃথিবী কাঁপাচ্ছেন, অর্থাৎ, ছয়ের দশকে– সেই একই সময়ে ফুটবলে আসছেন পেলে, গ্যারিঞ্চা। মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে এসে পড়ছেন মহম্মদ আলি। বিটল্‌স-এর সঙ্গে গিটার বাজাচ্ছেন জিমি হেনড্রিক্স। একটি ভিডিওতে দেখা যায় যে, গিটার বাজাতে বাজাতে মাথাটা মাইক্রোফোনের সামনে নামিয়ে এনে জিমি হেনড্রিক্স ভারী গলায় বলে উঠছেন: ‘ফ্রি-ডাহ-মাহ! ফ্রি-ডাহ-মাহ!’ অর্থাৎ ফ্রিডম– স্বাধীনতা। তখন কৃষ্ণাঙ্গরা স্বাধীনতা চাইছেন। ফুটবলে পেলে-গ্যারিঞ্চা, রিংয়ে মহম্মদ আলি, গিটারিস্ট হিসেবে জিমি হেনড্রিক্স। সকলেই এই ফ্রিডম ডিজায়ারের অন্তর্গত।

zoom
জিমি হেনড্রিক্স

১৯৬৬ সালে পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে জর্জ হ্যারিসনের। জর্জ হ্যারিসন– ‘বিটল্‌স’-এর চারজনের একজন। পরে, রবিশঙ্কর ওঁকে সেতার শিখিয়েছেন। গুরু-শিষ্য হয়ে ওঠেন দু’জনে।

রবিশঙ্করের সাক্ষ্যে পাওয়া যায় যে, তিনি ‘বিটল্‌স’-এর একটি কনসার্ট শুনতে গিয়েছেন। সেই কনসার্টে গিটার বাজাতে বাজাতে একটা সময় গিটারে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন জিমি হেনড্রিক্স। আর, উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল হলঘর ভর্তি যুবক-যুবতীর দল। প্রেক্ষাগৃহ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন রবিশঙ্কর। পরে বলেছিলেন, ‘বাদ্যযন্ত্রের একটা সম্মান আছে। এই আগুন ধরিয়ে দেওয়া মেনে নেওয়া যায় না।’

zoom
জর্জ হ্যারিসনকে সেতার শেখাচ্ছেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর

রবিশঙ্করের মনোভাব আমরা বুঝতে পারি। তিনি সম্পদশালী বনেদি ঘরের সন্তান। উস্তাদ আলাউদ্দিনের কাছে আর উস্তাদ আলি আকবর খাঁ সাহেবের কাছে তাঁর সংগীতজীবনের অনেকখানি অতিবাহিত হয়েছে। তাঁর পক্ষে এমনটা ভাবা ‘অস্বাভাবিক’ নয়। তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির দিক থেকে ব্যাপারটা ভেবেছেন। অন্যপক্ষে, যদি জিমি হেনড্রিক্সের গিটারে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার কথা ভাবি, তাহলে সেটা এসেছে এক দারিদ্রপীড়িত বর্ণবিদ্বেষের নরক থেকে মাথা তোলার আগ্নেয় বাসনায়। সে দিকটাও আমরা ভেবে দেখতে পারি। জিমি হেনড্রিক্সের নিজের গিটারে নিজেরই অগ্নিসংযোগ আর শেতাঙ্গদের প্রবল রক্ষণাত্মক মনোভাবের বিরুদ্ধে পরাজয়ের ঝুঁকি নিয়ে সোবার্সের ডিক্লেয়ারেশন– একই ভূ-তলে দাঁড়িয়ে থাকে তখন। স্বাধীনতার স্পৃহা জয়যুক্ত হয় সোবার্সের এই ডিক্লেয়ারেশনেও।

zoom
স্বাধীনতার আগুন

৩.
১৯৭১-’৭২। বিশ্ব একাদশের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার খেলা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে, পার্থে। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক তখন ইয়ান চ্যাপেল। দু’জন বোলার উঠে এসেছেন। একজন ডেনিস লিলি। আর-একজন জেফ থমসন। এবং লেন প্যাসকোও কিছু কম যাচ্ছেন না। সেই সময় অস্ট্রেলিয়ায় আট বলের ওভার। সোবার্স তখন বিশ্ব একাদশের অধিনায়ক। ডেনিস লিলির আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য গ্যারি সোবার্স। তিনি যখনই ব্যাট করতে আসছেন, তখনই শরীর লক্ষ করে বল করছেন লিলি। এভাবেই ইয়ান চ্যাপেল তৈরি করেছিলেন লিলির মনোভাবকে সে কথা বব উইলিসের ‘দ্য ক্রিকেট রেভোলিউশন’ বই পড়লে বোঝা যায়। মনে রাখতে হবে, তখন কিন্তু সোবার্সের ১৮ বছর টেস্ট খেলা হয়ে গিয়েছে। কাউন্টি খেলে অতিরিক্ত পরিশ্রমে তখন হাঁটু বেশ খানিকটা জখম। আর লিলি তখন তরুণ তুর্কি। পূর্ণ শক্তিতে সোবার্সকে একের পর এক বাউন্সার দিতে থাকলেন লিলি। তার মধ্যেও ডাবল সেঞ্চুরি করলেন সোবার্স। ৩২৬ বলে ২৫৪ রান। ৩৩টি ৪, ২টি ৬।

zoom
জেফ থমসন। ডেনিস লিলি

পরে অস্ট্রেলিয়া যখন ব্যাটিং করতে নামে, তখন ইনিংসের শেষের দিকে ব্যাট হাতে এলেন ডেনিস লিলি। ফাস্ট বোলারদের মধ্যে একটা অলিখিত নিয়ম রয়েছে যে, যা সকলেই জানে, একজন ফাস্ট বোলার আরেকজনকে সচরাচর কোনও বাউন্সার দেয় না। যদিও সোবার্সকে সে অর্থে ‘ফাস্ট বোলার’ ধরা হত না।

zoom
লিলির ডেলিভারি

ডেনিস লিলি ক্রিজে দাঁড়ালেন। গার্ড নিলেন। ব্যাট ঠুকে মনোনিবেশ করলেন। বোলার গ্যারি সোবার্স। ক্রিকেট জীবনের উপান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন। সোবার্স দৌড়চ্ছেন। হাত থেকে ছাড়লেন বল। বল পিচে পড়ে, ডেনিস লিলিকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে, তাঁর মুখের পাশে হাওয়া লাগিয়ে বেরিয়ে গেল। নীল হয়ে গেল লিলির মুখ। উনি বুঝলেন, আট বলের ওভারের এই ম্যাচে, আরও ক’টা বল এমন হতে চলেছে। পরের বলটা আগের বলের মতো হল না। হল আরও ভয়াহব। আরও দ্রুত। লাফিয়ে উঠল ওই রকম গুড লেংথ স্পট থেকেই। এবারেও লিলি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু লিলির বাম কাঁধে লাগল সেই বল। লিলি একটা হাত দিয়ে কাঁধের যে অংশটায় লেগেছে, সে জায়গাটা একটুখানি ডলে দেওয়ার চেষ্টা করলেন যন্ত্রণায়। সোবার্স লম্বা লম্বা পা ফেলে তখন শান্তভাবে এগিয়ে আসছেন। পিচের সামনে, সিলি পয়েন্টের কাছেই, পড়ে আছে সোবার্সের অস্ত্র– লাল বল। সোবার্স আস্তে আস্তে বল কুড়িয়ে, ঘুরে চলে যাওয়ার আগে, লিলির দিকে তাকিয়ে, একটু হেসে বললেন, ‘তুমি একা নও, অন্যরাও পারে।’

zoom
গ্যারি সোবার্স

পুরো সিরিজটায় লিলি আর কখনও গ্যারি সোবার্সকে বাউন্সার দেননি।

সেই কবে, একটু ফোঁস করতে বলেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। ক্রিকেট থেকে শিল্প– ফোঁস করার প্রয়োজন যে রয়েছে, গ্যারি সোবার্সও শিখিয়েছিলেন আমাকে। সারাজীবন কেটে গেল, তার প্রয়োগ করা হল কই!

…………………………………………………………………………………
অনুলিখন সম্বিত বসু

Bengali sports writing cricket history Gary Sobers greatest cricket all-rounder Joy Goswami Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sir Garfield Sobers West Indies cricket legend

Share this article on